আয়রনের অভাব জনিত রক্তস্বল্পতার ওষুধ সম্পর্কে বিস্তারিত

গর্ভাবস্থায় আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতার চিকিৎসার জন্য কোন ঔষুধ ব্যবহার করা হয়?

আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতার মানে শরীর আয়রনের মাত্রা কম থাকা যা শরীরের প্রয়োজনীয় লোহিত রক্তকণিকা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিছু মহিলা গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতার সমস্যায় ভুগে থাকেন । ভিটামিনের পাশাপাশি আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ হতে পারে গর্ভাবস্থায় আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা বা এনিমিয়ার সবচেয়ে কার্যকরী চিকিৎসা।

ঠিক কোন ডোজের ওষুধ আপনার লাগবে তা নির্ধারণ করতে হয়তোবা কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। তবে, ঔষুধের সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত ও অপ্রীতিকর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে চলার জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী কোন কর্মী বা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা হতে পারে সর্বোত্তম একটি মাধ্যম। একজন গর্ভবতীকে বিভিন্ন সময়ে প্রসব পূর্ববর্তী ভিটামিন ও আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ কি নিরাপদ?

হ্যাঁ, গর্ভাবস্থায় আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ তবে তা অবশ্যই ডাক্তার কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। সুপারিশকৃত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ফলে রক্তস্বল্পতা জনিত সমস্যার সমাধান আপনি নিজেই উপলব্ধি করতে পারবেন।

এর সাথে গর্ভাবস্থার প্রয়োজনীয় অন্যান্য ভিটামিন গুলো গ্রহণের কথা  ভুলবেন না কারণ এই সময় মিনারেল, প্রোটিন, ক্যালসিয়ামের মতো উপাদান গুলোর উপস্থিতি মা ও অনাগত শিশু উভয়ের জন্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাথে আয়রনতো আছেই।

দ্রষ্টব্য: প্রাপ্তবয়স্কদের আয়রন ট্যাবলেট শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। ভুলবশত এই ট্যাবলেট কোন শিশু যদি গিলে ফেলে তবে সে অসুস্থ হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর মতো ভয়ংকর অপ্রত্যাশিত ঘটনাও ঘটতে পারে। আপনার আয়রন ক্যাপসুলগুলো নিরাপদে বাচ্চাদের নাগালের বাইরে রাখুন।

আয়রন সাপ্লিমেন্টের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কী কী?  

আয়রন গ্রহণের পর যে পরিবর্তনটি সর্বপ্রথম আপনার দৃষ্টিগোচর হবে সেটি হচ্ছে মলের গাঢ় বা কালো রং কারণ আপনার শরীর সাপ্লিমেন্টের সম্পুর্ন  মিনারেল শোষণ করেনা। রোজকার থেকে আলাদা হলেও এটি নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। এটি শুধুমাত্র শরীরে অতিরিক্ত আয়রনের একটি সাধারণ প্রতিক্রিয়া।

এই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পর সাধারণত গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সম্পর্কিত কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যেমন: পেটে ফোলা ভাব, বমি বমি ভাব ও পেট খারাপ হওয়া।

গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য একটি সাধারণ সমস্যা। আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয়তো কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। যদি আপনার কোষ্ঠকাঠিন্য জনিত সমস্যা থেকে থাকে তবে চেষ্টা করবেন প্রচুর পরিমাণে জল পান করতে ও খাদ্য তালিকায় কমপক্ষে ২৫ গ্রাম ফাইবার যুক্ত খাবার রাখতে। যখনই বাথরুমের চাপ আসবে তখনই বাথরুম সারার চেষ্টা করুণ, চেপে রাখবেন না।

শরীরচর্চার রুটিন প্রনয়নের ক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন ও এই সময়ের নানা রকম সমস্যার উপশমের জন্য চেষ্টা করবেন আলুবোখারার জুস পান করতে। আপনার ডাক্তার প্রয়োজনে আপনাকে মল নরম করার ওষুধের পরামর্শ দিতে পারেন।

আয়রনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলোর সাথে মোকাবেলার উপায় কি এবং কিভাবে আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহন করলে তা সবচাইতে কার্যকরী হবে?  

আপনি কখন ও কিভাবে আয়রন গ্রহণ করছেন- এই দুটো বিষয় কিন্তু অনেক বড় পার্থক্যের তৈরি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরে যদি আপনি বমি বমি ভাব অনুভব করেন তবে হালকা নাস্তা বা ফলের রস খাওয়ার পর এটি সেবন করতে পারেন।

কখনো ভারী খাবারের সাথে আয়রন গ্রহণ করবেন না – অতিরিক্ত খাবার আয়রনের সঠিক শোষণকে বাধা দেয়। এসিডের সংমিশ্রণে আয়রনের শোষণ ক্ষমতা অনেকাংশে বেড়ে যায়। সর্বাধিক উপকার পেতে পারে চেষ্টা করবেন কমলার রস জাতীয় কিছু পানের পর আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে।

মেডিসিন শরীরের আয়রন শোষণ ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, অম্বল, গলাজ্বালা, বুকজ্বালা গর্ভাবস্থার সাধারণ কিছু অসুস্থতা। কিন্তু, অম্লনাশক ঔষুধ আয়রনের শোষণকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি আপনার এই ধরনের ঔষুধ গ্রহণের প্রয়োজন হয় তবে অ্যান্টাসিড সেবনের কমপক্ষে দুই ঘন্টা আগে বা দুই ঘন্টা পরে আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ উত্তম।

আয়রন আপনার শরীরকে কিছু কিছু ওষুধ শোষণে বাঁধা প্রদান করতে পারে। যেমন- levothyroxine, যেটা থাইরয়েডের সমস্যার জন্য দেয়া হয়। যদি levothyroxine এবং আয়রন সাপ্লিমেন্ট দুটোই আপনার নিতে হয় তবে দুটো ওষুধ গ্রহণের মাঝখানে যেন অন্তত ৪ ঘণ্টার বিরতি থাকে। এছাড়াও আপনি যদি অন্য কোন ওষুধ গ্রহন করে থাকেন তবে সেগুলোর প্রভাব সম্পর্কেও জেনে নিন।

কিছু খাবার ও পানীয় দেহে সঠিকমাত্রায় আয়রন শোষণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। যেমন:

  • কফি এবং চা।
  • ডিম।
  • দুগ্ধজাত পণ্য।
  • ভুষি, সয়া, বাদাম, বীজ এবং ফাইটেট এসিড  পরিমাণে বেশি থাকা অন্যান্য খাবার (ফসফরাসের স্টোরেজ ফর্ম)।

সর্বোত্তম ফলাফলের জন্য, চেষ্টা করবেন এই জাতীয়  খাবার ও পানীয় গ্রহণের এক ঘন্টা পূর্বে বা দুই ঘন্টা পরে আয়রন সাপ্লিমেন্ট সেবন করতে। ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্টে সেবনের ক্ষেত্রে ও একই নিয়ম অনুসরণ করতে পারেন।

প্রথম প্রথম এতো নিয়ম মনে রাখা কঠিন মনে হলেও কিছুদিন পর তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, কোন কাজ শুরু করার পর যদি তার ধারাবাহিকতা টানা ২১ দিন চলমান রাখা যায় তবে তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।

তাছাড়া, আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ শুরুর পর প্রথম দিকে কিছু অপ্রত্যাশিত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তা বলে আয়রন সেবন ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই। হয়তো, আপনার চিকিৎসক ভিন্ন ধরনের সাপ্লিমেন্ট সুপারিশ করবেন বা একই ডোজকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর গ্রহণের পরামর্শ দিবেন।

আয়রন সাপ্লিমেন্টের কি কোন বিকল্প আছে?

যদি আপনি আয়নের সাপ্লিমেন্টের বিকল্প কিছু গ্রহণ করতে চান তবে অবশ্যই এই ব্যাপারে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন। যদি আপনার আয়রন ক্যাপসুল গ্রহণ করতে অসুবিধা হয়, তবে আপনি ডাক্তারের নিকট হতে তরল সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন (দাঁতে দাগ পড়া রোধ করতে আপনি তরল আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের জন্য স্ট্র ব্যবহার করতে পারেন।)

যদি আপনার আয়রনের ঘাটতি জনিত রক্তাল্পতা তীব্র হয় ও ক্যাপসুল সেবনে প্রত্যাশিত ফলাফল না পান তবে আপনাকে শিরার মধ্য দিয়ে IV এর মাধ্যমে আয়রন নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। আপনার চিকিৎসক পারেন আপনাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করতে। হয়তো তিনি আপনাকে হেমাটোলজিস্ট বা মেটার্নাল ফেটাল মেডিসিন (এমএফএম) বিশেষজ্ঞের নিকট হতে চিকিৎসা গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করতে  পারেন।

[ আরও পড়ুনঃ গর্ভাবস্থায় আয়রনের ঘাটতি জনিত রক্তশূন্যতা বা এনিমিয়া কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন ]

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts