৯-১২ মাস বয়সী শিশুর বিকাশে যেভাবে সাহায্য করবেন

৯-১২  মাসে শিশুর পরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য

বাবা মা তাদের শিশুর প্রথম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক । কিন্তু তাই বলে তাকে কিছু শেখাবার জন্য আপনার নিজেকে কোনো চাপের মধ্যে ফেলতে হবেনা। শিশুদের ব্যাপারে বিস্ময়কর যে জিনিস সেটা হচ্ছে তারা তাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকেই শিখতে থাকে। আপনি যখন গান করেন, কথা বলেন, এবং আপনার শিশুর সাথে খেলা করেন, তার মস্তিষ্ক সেগুলোর সাথে এমন সমন্বয় ঘটিয়ে থাকে যে সে ভাষা, অঙ্ক, সঙ্গীত এবং যুক্তিবিদ্যা শিখতে সুযোগ পায়।

আপনি যখন আপনার শিশুকে সান্ত্বনা দেন, আপনি তাকে জানতে দেন যে এ পৃথিবী তার জন্য নিরাপদ। যত বেশি সে নিজেকে পরিতৃপ্ত মনে করে তত বেশি করে সে শিখতে পারে কেমনভাবে সবকিছু কাজ করে। তার প্রতি আপনার স্নেহ-ভালবাসা সম্বন্ধে সে যত বেশি নিশ্চিত হতে পারে, তত বেশি সে অন্যদের সাথে নিজেকে মানিয়ে চলতে পারে এবং উদ্বেগ বা সমস্যার মোকাবেলা করা শিখবে। সুতরাং দুশ্চিন্তা না করে শিশুর সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করুন।

 

৯-১২ মাস বয়সী বাচ্চার যা যা দরকার

আপনার শিশু হয়তো পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারবে আর বিছানা বা সোফার শেষ মাথা পর্যন্ত দৌড়াতে শুরু করবে। তার এই নতুন ধরণের স্বাধীনতা সে ভালবাসে, কিন্তু তার প্রতি আপনার নজর রাখতে হবে। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে গিয়ে তার পক্ষে বিপদে পড়ার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।

কখনো কখনো সে আপনাকে, তাকে সাহায্য করার জন্য এবং একই কাজ বার বার করার জন্য অস্থির করে তুলতে পারে। সে মাটিতে জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলতে এবং আপনি তা তুলে দিচ্ছেন সেটা দেখতে ভালবাসে। আপনি ধৈর্য ধরুন এবং তাকে সাহায্য করুন। সে সব নতুন অভিজ্ঞতা তার হচ্ছে সেগুলো তার জন্য খুবই পরিশ্রমসাধ্য। যখনই পারবেন তাকে কোলে নেবেন। সে এতে নষ্ট হয়ে যাবেনা। এ থেকে সে বর্তমান ও ভবিষ্যতে তার মানসিক চাপের মোকাবেলা করতে শিখবে।

শিশুর ব্যাক্তিত্ব গঠন এ সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। এসময় থেকেই একজন আলাদা মানুষ হিসেবে তার মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হতে থাকবে। সবসময় মনে রাখবেন, পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী, আবেগ –অনুভূতি এবং বহির্জগতের প্রতি আচরন এক এক জন মানুষের এক এক রকম হবে, তাই কাছে থেকে বাবুকে লক্ষ্য করুন এবং তার ব্যাক্তিত্ব বিকাশে একটি নিরাপদ ও নির্মল পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে যথাসম্ভব চেষ্টা করুন।

 

আপনার শিশুর বিকাশে সাহায্য করুন

নিরাপত্তা

আপনার ঘরটিকে শিশুর জন্য নিরাপদ করে তুলুন। বৈদ্যুতিক তারের প্লাগ পয়েন্টগুলো ঢেকে দিন, দেখবেন কোন তার যেন এদিক অদিক পড়ে না থাকে, সিঁড়ির পথ খোলা না থাকে, শিশু যেখানে থাকবে বা খেলা করবে সেখানে ধারালো কিনারাসহ অথবা সহজে উলটে যেতে পারে এমন আসবাবপত্র যেন না থাকে।

বিষাক্ত ও বিপজ্জনক জিনিসপত্র ( যেমন মাঝাঘষা বা ধোয়ার তরল বা পাউডার জাতীয় পদার্থ) নাগালের বাইরে রাখবে।

এখন বাচ্চা আরো সহজে বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে ছোটখাটো জিনিস তুলতে পারে। সে হয়তো মেঝেতে পড়ে থাকা জিনিস তুলে মুখে দেবে। মেঝেতে কী আছে খেয়াল রাখুন যাতে ওর কোনো ক্ষতি না হয়।

এই বয়সে বাচ্চাদের পেটে পায় কৃমি হয়।মাটি থেকে বা অসুরক্ষিত পানির মাধ্যমে আপনার শিশুর কৃমি হতে পারে, এবং এর ফলে সে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে৷আপনার শিশু মেঝেতে শোওয়া, হামাগুড়ি দেওয়া বা খেলার আগে মেঝে সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিন৷ এটা তাকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করবে৷ যদি আপনি মেঝে পরিষ্কার করতে না পারেন তাহলে একটা বড় পরিষ্কার চাদর বা মাদুর পেতে দিন৷

আরও পড়ুনঃ হামাগুড়ি দেয়া ও সদ্য হাঁটতে শেখা শিশুর নিরাপত্তা

নিশ্চয়তা

আপনার শিশুর সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান দেখাবেন যদিও তখন সেটা আপনার কাছে যুক্তিসঙ্গত নাও মনে হতে পারে।

আপনার শিশুর প্রথম জন্মদিন পালন করুন, তবে সেটা অনাড়ম্বর রাখবেন। একটা কেক, অল্প কিছুক্ষণের জন্য আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু বান্ধবের সাথে দেখা করা, এবং অনেক অনেক আদর ও চুমু এসব পেলেই সে নিজেকে বিশেষ একজন গণ্যমান্য বলে মনে করবে।

আপনার শিশুর নিজস্ব ব্যাক্তিত্তের প্রতি সম্মান দেখাবেন। আমরা প্রত্যেকে আমাদের চারিদিকের মানুষজন ও জিনিশপত্রের ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সাড়া দিয়ে থাকি।

একজন মা কিংবা বাবা হিসেবে আপনিই হলেন আপনার বাচ্চার সবচেয়ে ভালো খেলার সাথী। তাই তার সঙ্গে খেলা করার জন্য প্রতিদিনই সময় দেয়ার চেষ্টা করুন।

আরও পড়ুনঃ শিশুর প্রথম জন্মদিন কেমন হওয়া উচিৎ

স্বাস্থ্য

আপনার শিশুর সাথে আপনিও ব্যায়াম করুনঃ মেঝের উপর হামাগুড়ি দিন, আস্তে আস্তে শিশুর হাত পা একটু প্রসারিত করুন, তার সামনে একটা বল ঠেলে দিতে পারেন, বাথটাবে খেলা করতে পারেন। মোট কথা শিশুর সাথে আপনিও ব্যাস্ত থাকুন।

শিশুর আরামপ্রদ ঘুমের জন্য নিয়মমাফিক একটা বেডটাইম রুটিন তৈরি করুন। সান্তনাদায়াক সরঞ্জাম, আরামে জড়িয়ে ধরা যায় এমন খেলনা বা বালিশ এবং হালকা সুরেলা বাজনা এতে সাহায্য করতে পারে।

বাচ্চার দাঁত এর যত্ন আরো আগেই শুরু করা উচিত, যদি এখনো তেমনভাবে করা না হয়, তাহলে শুরু করার জন্য এখনই উপযুক্ত সময় । একটি পরিষ্কার পাতলা নরম কাপড় বিশুদ্ধ পানিতে ধুয়ে নিয়ে  বাচ্চার মারি ও দাঁত আলতোভাবে পরিষ্কার করাতে হবে।

জ্ঞান অর্জন

আপনার শিশুকে খালি টিন দিন যাতে সে পানি, বালি বা ঘরের ছোটখাটো জিনিস ভরতে পারে, আবার খালি করতে পারে।

প্রত্যেকদিন আপনার শিশুর কাছে জোরে জোরে পড়বেন। বইয়ের পাতা উল্টাতে এবং ছবির বইয়ে আঙ্গুল দিয়ে জিনিসপত্র দেখাতে তাকে উৎসাহ দেবেন।

আপনার বাচ্চা এখন ছোট ছোট শব্দ আর বাক্যের টুকরো বুঝতে শুরু করে। বড়দের ভাষা ব্যবহার করে তার কথাগুলোই আবার তাকে বলুন।আস্তে আস্তে সে স্বনির্ভর হতে শিখবে, আর আপনি তাকে ছেড়ে গেলে কান্নাকাটি কম করবে। কিন্তু মাঝেমধ্যে ওকে ছেড়ে যেতে গেলে গোলমাল হবে, আর প্রচুর চোখের পানি পড়বে।

আরও পড়ুনঃ  শিশুকে ভালো ভাবে কথা বলতে শেখানোর কিছু টিপস

সমন্বয়সাধন

আপনার শিশুর কোন বড় অথবা ছোট সাফল্যে তার প্রশংসা করুন, যেমন কাপ থেকে খাওয়া, মা-মা উচ্চারণ করা, কোন পাত্রে জিনিস রাখা কিংবা নিজে নিজে পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করা।

আপনার শিশুকে যদি কোন কিছু করা থেকে থামাতে চান তাহলে তার মনোযোগ অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করুন। তার মেজাজ খারাপ দেখলে তাকে কোলে তুলে নিয়ে সান্ত্বনা দিন।

আপনার বাচ্চা এখন সহজ নির্দেশ বুঝতে পারে। তার মানে এই নয় যে ও সব সময় ‘না’ কথাটা গ্রাহ্য করবে! ও ‘না’ শব্দটা ভালো ভাবে বুঝবে যদি সেটা ওকে ঠিক আর ভুল, নিরাপদ আর বিপজ্জনকের মধ্যে তফাৎ শেখানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।

আপনি কি আশা করতে পারেন

মনে রাখবেন প্রত্যেক শিশু আপন গতিতে বিকাশ লাভ করে। এগুলো শুধু নীতিসম্পর্কিত নির্দেশাবলী। আপনার শিশুর বিকাশলাভ সম্পর্কে যদি কোন উদ্বেগ থাকে, তাহলে আপানর ডাক্তার অথবা অন্য কোন বিশ্বাস ভাজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করুন।

  • আপনার শিশু হয়ত নিজে থেকেই উঠে দাঁড়াতে পারবে, আসবাবপত্র ধরে ধরে ঘুরতে পারবে এবং কয়েক পা নিজেই চলতে পারবে। যে যাইহোক, অনেক শিশু আবার ১৫ মাস বা তারও বেশি বয়সের আগে হাঁটতেই পারেনা।
  • সে অস্পষ্টভাবে শুরু করে খুব শীগ্রই একটা বা দুটো কথা বলতে শুরু করবে, যেমন মামা ও বাবা- বাবা ইত্যাদি।
  • সে বিভিন্ন কারণে কাঁদতে পারে। সে ভয় পেটে পারে, নিজেকে অসহায় মনে করতে পারে, কিংবা নৈরাশ্যে ভুগতে পারে এই কারণে যে সে এখনো পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে নৈপুণ্য লাভ করতে পারেনি। অথবা দৈনন্দিন রুটিনে বদল হওয়ার কারণে তার মেজাজ বিগড়ে যেতে পারে।
  • সে হাত দিয়ে খাবার ও কাঁপে চুমুক দিয়ে খেতে আরাম বোধ করবে। তার গলায় আটকে যেতে পারে এমন কোন খাবার তাকে দেবেন না, যেমন- বাদাম, কিশমিশ, ভুট্টার খই বা সবজি ও ফলের শক্ত অংশ।

এ সময় কি কি  মাইলস্টোন আপনার শিশু অর্জন করতে যাচ্ছে তা জানার সাথে সাথে ভুলে যাবেন না যে এট শুধু মাত্র একটা গাইডলাইন। প্রতিটি শিশুই ইউনিক ( স্বকীয় ) এবং তার বেড়ে ওঠার গতিও ভিন্ন।যে শিশুটি অন্যদের থেকে প্রথমে বসতে শিখেছে সে হয়ত সবার শেষে হামাগুড়ি দিতে শিখবে। অথবা ১৮ মাস বয়সী যে শিশুটি শব্দ ও অঙ্গাভঙ্গির মাধ্যমে এখনো ভাবের আদান প্রদান করছে সে হটাৎ করেই দুই বছর বয়সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাক্য বলা শুরু করতে পারে।এই টাইমলাইন সিরিজ যেন আপনার কোন রকম দুঃশ্চিন্তার কারন না হয় খেয়াল রাখবেন। প্রতিটি টাইমলাইনকে একটি গাইড হিসেবে ধরে নিতে হবে ।নবজাতক এর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোন আশঙ্কা বা জিজ্ঞাসা থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।

মাস অনুযায়ী শিশুর বেড়ে ওঠা সম্পর্কে জানতে পড়ুন-

 

আরও পড়ুনঃ  

আপনার নিজের যত্ন নেবেন

বাবা-মা দুজনেই যদি চাকরিজীবী হন, কি ধরণের শিশুসেবা আপনাদের ও শিশুর জন্য মঙ্গলজনক হবে তা ভেবে দেখুন। বিশ্বস্ত বন্ধুদের কাছ থেকে সুপারিশ নিতে পারেন। এমন একজন সেবাদানকারীর খোঁজ করুন যে আপনাদের বিবেচনায়, আপনার শিশুর সেবাযত্ন করতে পারবে। কেয়ারগিভার বা চাইল্ড কেয়ার সেন্টারগুলোতে গিয়ে দেখতে পারেন কিভাবে ছেলেমেয়েদের যত্ন নেয়া হয়। পরিবেশ নিরাপদ ও পরিষ্কার কিনা নিশ্চিত করুন। যদি সম্ভব হয় প্রথম কয়েকদিন আপনার শিশুর সাথে আপনিও যাবেন। একবার যদি সে কোন সেবাদানকারীর সাথে মানিয়ে নেয় তবে তার সাথেই তাকে রাখার ব্যাবস্থা করুন। শিশুর দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করুন, প্রয়োজনে পরামর্শ দিতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না। আপনার শিশুর সেবাপ্রদানকারীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবেন। শিশুর স্বাচ্ছন্দ্য ও সফল বিকাশলাভের জন্য আপনারাই তার সহচর।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment