শিশুর বেড়ে ওঠা । দশম মাস

বাবু ১০ মাসে পড়লো ? বাচ্চাদের যে বয়সটায় তারা সবচেয়ে বেশি আদর কাড়ে , এ বয়সটি তার মাঝেই পড়ে। বাবুর শারিরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ঠিক ঠাক হচ্ছে কিনা লক্ষ্য রাখুন। এ বয়েসে বেশীরভাগ বাচ্চাই খুব হাসিখুশি ও কর্মচঞ্চল থাকে। হামাগুড়ি দেয়া এ সময়ের খুব স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য , যদিও হামাগুড়ি সব বাচ্চা হাঁটুতে ভর দিয়ে দেয় না। কোন বাচ্চা বুক আর পেটে ভর দিয়ে, কেউবা এক হাঁটু ব্যবহার করে অদ্ভুত ভঙ্গীতে সামনের দিকে আগানোর এবং ঘরের বিভিন্ন প্রান্তে চলাচল করার চেষ্টা করে।  এগুলো প্রত্যেকটি স্বাভাবিক এবং কিছুদিনের মধ্যে কিংবা দুই-এক মাসের মধ্যেই যে তিনি দু পায়ের উপর ভর করে হাঁটতে শিখবেন তারই প্রস্তুতি।

বাচ্চা এসময় আপনাকে ধরে কিংবা কোন ফার্নিচার ধরে দাঁড়াবে কিংবা দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে এবং বেশীরভাগ বাচ্চাই এসময় কিছুর সাপোর্ট নিয়ে কয়েক কদম এলোমেলো পদক্ষেপ ফেলা শুরু করে দেয়। তবে দশ মা বয়সে বাচ্চদের মোটামুটি কোন সাপোর্ট ছাড়াই বসতে শেখার কথা।বুস্টার সিট, হাই চেয়ার ইত্যাদি এসময় সবচেয়ে বেশি কাজে লাগে।

শিশুর মানসিক ও ব্যাক্তিত্ব গঠনঃ

আপনার বাচ্চার মানসিক গঠন এখন অনেকটাই পরিপক্ব, তাকে উদ্দেশ্য করে আপনাদের বলা বেশীরভাগ শব্দই সে কম-বেশী বুঝতে শিখবে, এবং কিছু শব্দ নকল করতে চেষ্টাও শুরু করতে পারে। হয়তো প্রথমবারের মত মাম্মা- কিংবা বাবা ডাকও শুনে ফেলতে পারেন। এসময় বাচ্চা হঠাৎ এমন কিছু কিংবা এমন কোন শব্দে ভয় পেতে পারে, যাতা সে আগে ভয় পেত না, যেমন খুব ছোট বাচ্চারা সাধারনত ব্লেন্ডার কিংবা ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের শব্দে ভীত হয় না, কিন্তু পরবর্তীতে শিশুরা এশব শব্দে ভীত বোধ করতে পারে, এটা স্বাভাবিক, এসময় তার কাছে থাকুন এবং কিসের থেকে শব্দ আসছে তা দেখিয়ে তাকে অভয় দিন। এর পরও ভয় পেলে তাকে সে স্থান থেকে সরিয়ে নেয়াই ভালো।

শিশুর ব্যাক্তিত্ব গঠন এ সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। এসময় থেকেই একজন আলাদা মানুষ হিসেবে তার মধ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হতে থাকবে। সবসময় মনে রাখবেন, পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী, আবেগ –অনুভূতি এবং বহির্জগতের প্রতি আচরন এক এক জন মানুষের এক এক রকম হবে, তাই কাছে থেকে বাবুকে লক্ষ্য করুন এবং তার ব্যাক্তিত্ব বিকাশে একটি নিরাপদ ও নির্মল পারিবারিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে যথাসম্ভব চেষ্টা করুন।

বাচ্চা কথা বুঝতে পারে!

আপনার বাচ্চা এখন ছোট ছোট শব্দ আর বাক্যের টুকরো বুঝতে শুরু করে। বড়দের ভাষা ব্যবহার করে তার কথাগুলোই আবার তাকে বলুন।আস্তে আস্তে সে স্বনির্ভর হতে শিখবে, আর আপনি তাকে ছেড়ে গেলে কান্নাকাটি কম করবে। কিন্তু মাঝেমধ্যে ওকে ছেড়ে যেতে গেলে গোলমাল হবে, আর প্রচুর চোখের পানি পড়বে।

আপনার বাচ্চা এখন সহজ নির্দেশ বুঝতে পারে। তার মানে এই নয় যে ও সব সময় ‘না’ কথাটা গ্রাহ্য করবে! ও ‘না’ শব্দটা ভালো ভাবে বুঝবে যদি সেটা ওকে ঠিক আর ভুল, নিরাপদ আর বিপজ্জনকের মধ্যে তফাৎ শেখানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।

শিশুর খাবার

বাবুর খাবারে এখন নতুন কিছু যুক্ত করতে পারেন। ছয় মাস থেকে সাধারণত খুব সহজপাচ্য জিনিস খাওয়ানো হয়, এই বয়স থেকে আস্তে আস্তে সবুজ শাকশব্জি, ফল, মাংস ইত্যাদির বিভিন্ন ভ্যারাইটি যুক্ত করতে পারেন। এসময় বাবুকে নিজে খাওয়ার ব্যাপারে বিশেষভাবে উৎসাহিত করুন। নিজে হাতে নিয়ে খেতে পারে এমন কিছু হাতে দিন, এগুলোকে সাধারণত ফিঙার ফুড বলা হয়ে থাকে। অনেকেই বিস্কিট কিংবা এক টুকরো আপেল ধরিয়ে দেন বাচ্চাকে- এটি ভয়ানক বিপদ দেকে আনতে পারে, বিশেষ করে বাচ্চা যখন হঠাৎ বড় একটি টুকরো কামড়ে নিয়ে গিলে ফেলার চেষ্টা করে। তাই খাবার নির্বাচনে যথেষ্ট সতর্ক থাকবেন, এবং বাচ্চার খাবার সময় সবসময় বড়দের তত্বাবধানে রাখতে হবে।

কোন কোন শক্ত খাবার সবচেয়ে ভালো?

যখন আপনার শিশুর বয়স ৬ মাস হয়, তখন বুকের দুধে পাশাপাশি সে খুব অল্প পরিমাণে নরম, চটকে দেওয়া পরিবারের সাধারণ খাবার খেতে পারে৷

প্রথমদিকে এক চামচ দেওয়া যথেষ্ট৷ ওর মুখোমুখি বসুন এবং আপনার পরিষ্কার আঙুলে বা চামচে করে ওকে সামান্য নরম খাবার খেতে দিন৷ সেই খাবার কীভাবে মুখের ভিতরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খেতে হয় ও গিলতে হয় সেই ব্যাপারটা বুঝতে হয়ত ওর খানিকটা সময় লাগবে৷ ধৈর্য্য ধরুন। ও শিখে নেবে৷

শুরুতে ওকে দিনে একবার করে চটকানো খাবার খেতে দিন, তারপর দিনে দুবার এবং তারপরে দিনে ৩ বার করে দিন৷ চটকানো খাবার খাওয়ানোর আগে ও পরে ওকে বুকের দুধ খেতে দিন৷

ক্রমশ ওর খাওয়ায় আত্মপ্রত্যয় বাড়ার সাথে সাথে ওকে আরো দলা পাকানো খাবার খেতে দেওয়া যায়৷ প্রথমে আপনি ওকে ভালো করে রান্না করা সুজি, সাবুদানা (পায়েস বা খিচুড়ি), ভাত ও ডাল দিতে পারেন, যাতে ওর নানা স্বাদগন্ধের খাবার খেতে শিখতে পারে।সলিড খাবার খাওয়ার পরে আপনার শিশুর পায়খানায় পরিবর্তন হবে, আরো গাঢ় ও দুর্গন্ধময় হয়ে উঠবে৷ এটা স্বাভাবিক৷

যখন আপনার শিশু নিজে নিজে জিনিস হাতে তুলে নিতে শুরু করবে তখন বুঝবেন তাকে আরো পেট ভরা খাবার খেতে দেওয়ার সময় হয়েছে৷ ওকে ভালো করে সিদ্ধ করা ডিম, ভালো করে কাঁটা ছাড়ানো, চটকানো মাছ বা হাড় বাদ দেওয়া মাংস, আলু ও বীন বা যদি ওর দাঁত উঠতে শুরু করে তাহলে শুকনো পাউরুটি বা রাস্ক দিয়ে দেখতে পারেন৷

খাবার খাওয়ার আগে ওর হাত সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে দিন৷  এখনও আপনার বুকের দুধ ওর জন্য স্বাস্থ্যকর, তাই যখন চাইবে ওকে বুকের দুধ খাওয়ান৷ এখন যেহেতু সে বড় হচ্ছে, তাই পরিষ্কার, বিশুদ্ধ  পানি খেতে পারে, তবে ওকে চা, কফি, কোলা বা চিনিযুক্ত পানীয় দেবেন না৷

বাচ্চার নিরাপত্তা

বাচ্চার জন্য নিরাপত্তা বিষয়ে চাইল্ডপ্রুফিং নিয়ে আমরা আগেও কথা কথা বলেছি। এসময় বাচ্চা হামাগুড়ি বা ক্রল করে ঘরের বিভিন্ন বিপদজনক জায়গায় পৌঁছে যেতে পারে, কিংবা ক্ষতিকর কিছু ধরতে কিংবা মুখে পুরে দিতে পারে। তাই এ বিষয়ে যদি কোন পদক্ষেপ নেয়া বাকি থাকে, তা দ্রুত নিয়ে নিন।

কোনো কিছু ছুড়ে ফেলে দেয়া এখন তার প্রিয় খেলার মধ্যে একটি, যতবার তুলে আনবেন, ততবারই সে ফেলবে, আর এই কাজে খুবই মজ পাবে। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে টু–কি (pick-a-boo)  দিলে তো কথাই নেই, একবার শুরু করলে বন্ধই করা যাবে না। বাচ্চাদের এই বয়সটা বাবা-মায়েদের জন্য বিশেষ ভাবে মজাদার, বাচ্চা নিত্যনুতন সব কাণ্ড-কারখানা অন্য কোনো বিনোদনের মাধ্যম কে অনায়াসে টেক্কা দেয়। যতখানি সম্ভব বাচ্চার সাথে কথা বলুন, বাচ্চাকে বোঝার চেষ্টা করুন এবং তাদের সাথে দিনের বেশ কিছুক্ষন সময় খেলা করুন। তার বিভিন্ন কর্মকান্ডে পরিবারের অন্যদের অংশ গ্রহন এবং বাহবা পেলে সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেড়ে উঠবে । কারো হাতে কিছু এনে দিলে থ্যাঙ্কিউ , কিংবা কাউকে দেখলে সালাম বা হ্যালো বলা , বিদায়ের সময় বাই-বাই বলা এগুলো বাচ্চারা এ বয়স থেকেই শিখতে থাকে ।

যত দ্রুত সম্ভব আপনার শিশুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান যদি:

  • ১ দিনের বেশি তার পেটের পাতলা পায়খানা থাকে
  • তার ত্বক বা ঠোঁট শুকিয়ে যায়
  • তার প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ দেখায় ও কম ঘন ঘন প্রস্রাব হয়
  • কোনো পানীয় খেতে না চায়, পায়খানার সঙ্গে রক্ত পড়ে বা পেট ফুলে যায়
  • এক দিনের বেশি সময় ধরে বমি হয়, বা এক দিনের বেশি জ্বর থাকে

শিশুর মাইলস্টোনঃ দশম মাস

  • হামাগুড়ি দিবে, নিজে নিজে বসতে শিখবে
  • দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে, কিছু ধরে নিজেকে টেনে তুলতে পারবে  এবং  সাহায্য নিয়ে দাঁড়াতে পারবে।
  • কোন জিনিষ হতবদল করতে পারবে।
  • হাত থেকে কিছু পড়ে গেলে তা খোঁজার চেষ্টা করবে।
  • হাত থেকে খেলনা নিয়ে নিলে প্রতিবাদ জানাবে।
  • কোন জিনিষের দিকে নির্দেশ করতে পারবে।
  • খেলনা নাগালের বাইরে থাকলে তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে।
  • দু আঙ্গুলের সাহায্যে কিছু তুলতে পারবে।
  • ছোট ছোট শব্দ বলার চেস্টা করবে যেমন দাদা, বাবা, মা ।
  • নিজের মতামত দিতে চেস্টা করবে- যেমন কি চায় বা কি চায় না ।
  • নিজে নিজে খাবার খাওয়ার চেস্টা করবে।
  • বড়দের অনুকরণ করতে শিখবে যেমন: মোবাইলে কথা বলা বা চিরুনি দিয়ে মাথা আচঁড়ানো।
  • হাত নেড়ে বিদায় জানাতে পারবে।
  • নাম ধরে ডাকলে সাড়া দিতে পারবে বা ফিরে তাকাবে।
  • “না” বললে বুঝতে পারবে। যদিও সবসময় তা পালন করবে না।

বিপদচিহ্ন

  • জড়সড় বা নিস্তেজ থাকা।
  • চলন্ত কিছুর দিকে দৃস্টি না দেয়া।
  • মাথার ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারা
  • কারও দিকে তাকিয়ে না হাঁসা।
  • আকর্ষনীয় কিছু দেখলে আগ্রহী না হওয়া
  • কোন ধরনের শব্দ না করা
  • দাঁর করিয়ে দিলে পায়ে ভর দিতে না পারা।
  • কোন কিছু হাত দিয়ে মুখের কাছে আনতে না পারা
  • যিনি সর্বাধিক যত্ন নেন (খাবার খেতে দেন) তার প্রতি কোন আগ্রহ না দেখানো
  • কোন শব্দে প্রতিক্রিয়া না দেখানো।
  • কোন দিকে গড়াগড়ি দিতে না পারা।
  • কোন কিছু মতামত দিতে না পারা যেমন পছন্দ বা অপছন্দ

এ সময় কি কি  মাইলস্টোন আপনার শিশু অর্জন করতে যাচ্ছে তা জানার সাথে সাথে ভুলে যাবেন না যে এট শুধু মাত্র একটা গাইডলাইন। প্রতিটি শিশুই ইউনিক ( স্বকীয় ) এবং তার বেড়ে ওঠার গতিও ভিন্ন।যে শিশুটি অন্যদের থেকে প্রথমে বসতে শিখেছে সে হয়ত সবার শেষে হামাগুড়ি দিতে শিখবে। অথবা ১৮ মাস বয়সী যে শিশুটি শব্দ ও অঙ্গাভঙ্গির মাধ্যমে এখনো ভাবের আদান প্রদান করছে সে হটাৎ করেই দুই বছর বয়সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাক্য বলা শুরু করতে পারে।এই টাইমলাইন সিরিজ যেন আপনার কোন রকম দুঃশ্চিন্তার কারন না হয় খেয়াল রাখবেন। প্রতিটি টাইমলাইনকে একটি গাইড হিসেবে ধরে নিতে হবে ।নবজাতক এর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোন আশঙ্কা বা জিজ্ঞাসা থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।

সব বাবা-মায়েদের এবং তাদের বেড়ে উঠতে থাকা ছোট্ট সোনার জন্য শুভকামনা।

 <<শিশুর বেড়ে ওঠা – ৯ মাস

শিশুর বেড়ে ওঠা – ১১ মাস>> 

Related posts

Leave a Comment