বয়স অনুযায়ী শিশুর ওজন ও উচ্চতা বৃদ্ধির চার্ট । ০-১২ মাস

শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি 

শিশুর সামগ্রিক বৃদ্ধি ও বিকাশকে আমরা কয়েকভাগে ভাগ করতে পারি, যেমন- শারিরিক বিকাশ, মানসিক বিকাশ, সামাজিক বিকাশ। শারিরিক বিকাশ দৃশ্যমান এবং সহজেই বোধগম্য, শিশুর ওজন ও উচ্চতা দিয়ে আমরা শারিরিক বিকাশ বুঝতে পারি, জন্মের পর শিশুর বয়সের সাথে সাথে নির্দিষ্ট হারে ওজন বাড়তে থাকে এবং উচ্চতাও বৃদ্ধি পায়।

জন্মের পর পর প্রথম সপ্তাহে বাচ্চা ওজন হারায় এবং ২-৩ সপ্তাহে ওজন স্থির থাকে তার পর ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে থাকে। প্রথম ৩ মাসে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০ গ্রাম করে ওজন বাড়ে। তারপর পরবর্তী মাসগুলোতে আর একটু কম হারে ওজন বাড়তে থাকে, ৩-১২ মাস বয়স পর্যন্ত প্রতিমাসে গড়ে ৪০ গ্রাম ওজন বাড়ে। ৫-৬ মাস বয়সে শিশুর ওজন জন্ম ওজনের দ্বিগুন হয় ১ বৎসরে ৩ গুন, ২ বছরে চারগুন, ৩ বছরে পাঁচগুন, ৫ বছরে ছয়গুন এবং ১০ বছর বয়সে ১০ গুন হয়।

তবে জন্ম ওজনের পার্থক্যের কারনে একই বয়সী দুটি শিশুর ওজনের কিছু তারতম্য ঘটতে পারে। তবে এ তারতম্য শিশুর সঠিক পরিচর্যা ও পুষ্টি পেলে স্বাভাবিক ওজনে পৌছে যায়, কারন প্রতি শিশুর স্বাভাবিক ওজনে পৌছার সুপ্ত ক্ষমতা থাকে।

তিন বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিমাসেই শিশুর ওজন নেয়া উচিত। পর পর দুইমাস শিশুর ওজন যদি না বাড়ে, তবে খেয়াল করতে হবে শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছে কিনা। পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করার পরও যদি অবস্থার পরিবর্তন না হয় তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সুষম খাদ্য সঠিক পুষ্টি পেলে শিশু ওজনে ও উচ্চতায় সঠিকভাবে বেড়ে উঠবে।

জন্মের সময় শিশুর দৈর্ঘ্য থাকে সাধারণত ৫০ সেঃ মিঃ, ৩ মাসে এ দৈর্ঘ্য গিয়ে দাড়ায় ৬০ সেঃ মিটার, ৯ মাসে হয় ৭০ সেঃ মিঃ, ১ বছরে ৭৫ সেঃ মিঃ, ২ বছরে ৮৫ সেঃমিঃ, ৩ বছরে ৯৫ সেঃ মিঃ এবং ৪ বছরে ১০০ সেঃ মিঃ তার পর প্রতিবছর ৫ সেঃ মিঃ করে বাড়তে থাকে বয়ঃ সন্ধিকাল পর্যন্ত। সাধারণত একজন মেয়ে শিশু ২ বছর বয়সে বয়স্ক মানুষের উচ্চতার অর্ধেক উচ্চতা অর্জন করে এবং ছেলে শিশু এ উচ্চতা অর্জন করে ২ ১/২ বছর বয়সে। ছেলে শিশু ও মেয়ে শিশুর ওজন ও উচ্চতায় কিছুটা তারতম্য থাকে। এ ক্ষেত্রে ছেলে শিশুরা মেয়ে শিশুর চেয়ে কিছুটা এগিয়ে থাকে।

শিশুর ওজন  উচ্চতার চার্ট যেভাবে বুঝবেন

শিশুর বৃদ্ধি সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা তা বুঝতে হলে নিয়মিত ওজন, উচ্চতা নিয়ে তাকে গ্রোথ চার্টের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। গ্রোথ চার্ট হচ্ছে বৈজ্ঞানিক ভাবে তৈরী করা একটি চার্ট যাতে বয়স অনুযায়ী ওজন,উচ্চতা,মাথার পরিধি গ্রাফের সাহায্যে সন্নিবেশিত থাকে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যারা শিশু স্বাস্থ্য ও পুস্টি নিয়ে গবেষণা করেন তারা শিশুর বৃদ্ধি পরিমাপের জন্য এই গ্রোথ চার্ট তৈরী করেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রনীত গ্রোথ চার্টটি সর্বজন স্বীকৃত। তাছাড়া বর্তমানে CDC(Centre for Disease Control and prevention) কর্তৃক প্রনীত ও প্রকাশিত গ্রোথ চার্টটি বেশ জনপ্রিয়। শিশু চিকিৎসকেরা বয়স অনুযায়ী শিশুর ওজন, উচ্চতা ও মাথার পরিধি পরিমাপ করে এই চার্টের সাথে মিলিয়ে শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ এবং পুস্টির অবস্থা নিরুপন করেন। ছেলে শিশু ও মেয়ে শিশুর জন্য আলাদা আলাদা চার্ট তৈরী করা হয়েছে। । ছেলে ও মেয়েদের জন্যে এই চার্টটি আলাদা, কারণ ছেলেদের ওজন ও উচ্চতা বৃদ্ধির হার গড়ে মেয়েদের তুলনায় বেশী এবং তাদের বেড়ে ওঠার পদ্ধতিও কিছুটা ভিন্ন। এই চার্টের মাধ্যমে সমবয়সী অন্যান্য শিশুদের সাথে আপনার শিশুর ওজন ও উচ্চতা তুলনা করে দেখতে পারবেন

সেন্টাইল রেখা

অধিকাংশ শিশুর ওজন ও উচ্চতার (বা দৈর্ঘ্য) সীমা চার্টের বক্র রেখা বা সেন্টাইল রেখা দ্বারা বুঝানো হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনার শিশুর উচ্চতা যদি ২৫তম সেন্টাইল রেখাতে থাকে, তাহলে এটি বোঝায় যে, আপনি যদি ১০০টি সমবয়সী শিশুকে খাটো থেকে লম্বা অনুসারে সাজান, তাহলে আপনার শিশু হবে ২৫তম এবং ৭৫ জন শিশু তার চেয়ে লম্বা হবে।একটি শিশুর ওজন বা উচ্চতা চার্টের সেন্টাইল রেখার যেকোন জায়গায় হওয়া স্বাভাবিক।

সেন্টাইল রেখা প্রত্যাশিত ওজন এবং উচ্চতা বৃদ্ধির চিত্র প্রকাশ করে, কিন্তু ওজন এবং উচ্চতা সাধারণত হুবহু একটি সেন্টাইল রেখা অনুসরণ করে না। উদাহরনসরূপ, আপনার বাচ্চার ওজন যদি ২৫ তম পার্সেন্টাইলে থাকে তবে তার উচ্চতাও যে ২৫ তম পার্সেন্টাইলে থাকবে তা নয়, সে উচ্চতার ৫০ তম পার্সেন্টাইলে থাকতে পারে।

সব শিশুই আলাদা এবং একই শিশুর (ভাই বোন হওয়া সত্বেও) বিকাশের সেন্টাইল চিত্র অন্য শিশুর সেন্টাইল চিত্রের সাথে অবিকল মিলে যাবে না।

০-১২ মাস বয়সী ছেলেদের বৃদ্ধির চার্ট

এ চার্টে WHO growth standard অনুযায়ী তৃতীয় থেকে ৯৭তম পারসেন্টাইল পর্যন্ত ছেলে বাচ্চার বৃদ্ধির পরিমাপ দেয়া হয়েছে। আপনার বাচ্চা এই সীমার মধ্যে থাকলে ধরে নেয়া যায় সে বৃদ্ধির স্বাভাবিক সীমার মধ্যে আছে।

তবে সে ঠিকভাবে বেড়ে উঠছে কিনা তা জানতে হলে নিয়মিত তার ওজন, উচ্চতা মেপে একটি চার্ট তৈরি করতে হবে।

বয়স (মাস)উচ্চতা (সে.মি) তৃতীয় থেকে ৯৭ তম পার্সেন্টাইলওজন (কেজি) তৃতীয় থেকে ৯৭ তম পার্সেন্টাইলমাথার পরিধি (সে.মি) তৃতীয় থেকে ৯৭ তম পার্সেন্টাইল
0৪৬.৩-৫৩.৪২.৫-৪.৩৩২.১-৩৬.৯
1৫১.১-৫৮.৪৩.৪-৫.৭৩৫.১-৩৯.৫
2৫৪.৭-৬২.২৪.৪-৭৩৬.৯-৪১.৩
3৫৭.৬-৬৫.৩৫.১-৭.৯৩৮.৩-৪২.৭
4৬০.০-৬৭.৮৫.৬-৮.৬৩৯.৪-৪৩.৯
5৬১.৯-৬৯.৯৬.১-৯.২৪০.৩-৪৪.৮
6৬৩.৬-৭১.৬৬.৪-৯.৭৪১.০-৪৫.৬
7৬৫.১-৭৩.২৬.৭-১০.২৪১.৭-৪৬.৩
8৬৬.৫-৭৪.৭৭.০-১০.৫৪২.২-৪৬.৯
9৬৭.৭-৭৬.২৭.২-১০.৯৪২.৬-৪৭.৪
10৬৯.০-৭৭.৬৭.৫-১১.২৪৩.০-৪৭.৮
11৭০.২-৭৮.৯৭.৪-১১.৫৪৩.৪-৪৮.২
12৭১.৩-৮০.২৭.৮-১১.৮৪৩.৬-৪৮.৫

০-১২ মাস বয়সী মেয়েদের বৃদ্ধির চার্ট

এ চার্টে WHO growth standard অনুযায়ী তৃতীয় থেকে ৯৭তম পারসেন্টাইল পর্যন্ত মেয়ে বাচ্চার বৃদ্ধির পরিমাপ দেয়া হয়েছে। আপনার বাচ্চা এই সীমার মধ্যে থাকলে ধরে নেয়া যায় সে বৃদ্ধির স্বাভাবিক সীমার মধ্যে আছে।

বয়স (মাস)উচ্চতা (সে.মি) তৃতীয় থেকে ৯৭ তম পার্সেন্টাইলওজন (কেজি) তৃতীয় থেকে ৯৭ তম পার্সেন্টাইলমাথার পরিধি (সে.মি) তৃতীয় থেকে ৯৭ তম পার্সেন্টাইল
0৪৫.৬-৫২.৭২.৪-৪.২৩১.৭-৩৬.১
1৫০.০-৫৭.৪৩.২-৫.৪৩৪.৩-৩৮.৮
2৫৩.২-৬০.৯৪.০-৬.৫৩৬.০-৪০.৫
3৫৫.৮-৬৩.৮৪.৬-৭.৪৩৭.২-৪১.৯
4৫৮.০-৬৬.২৫.১-৮.১৩৮.২-৪৩.০
5৫৯.৯-৬৮.২৫.৫-৮.৭৩৯.০-৪৩.৯
6৬১.৫-৭০.০৫.৮-৯.২৩৯.৭-৪৪.৬
7৬২.৯-৭১.৬৬.১-৯.৬৪০.৪-৪৫.৩
8৬৪.৩-৭৩.২৬.৩-১০.০৪০.৯-৪৫.৯
9৬৫.৬-৭৪.৭৬.৬-১০.৪৪১.৩-৪৬.৩
10৬৬.৮-৭৬.১৬.৮-১০.৭৪১.৭-৪৬.৮
11৬৮.০-৭৭.৫৭.০-১১.০৪২.০-৪৭.১
12৬৯.২-৭৮.৯৭.১-১১.৩৪২.৩-৪৭.৫

তথ্যসূত্রঃ WHO growth standards,  babycenter.com

 

যে বিষয়গুলো মনে রাখতে হবে 

গ্রোথ চার্টের বক্র রেখা থেকে সামায়িক ভাবে সরে যাওয়া বাচ্চাদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। বাচ্চার অসুস্থতার কারণে এমন হতে পারে। তবে ডাক্তার যদি দেখেন যে বেশ কিছু সময় ধরে বাচ্চা এ রেখা ফলো করে বেড়ে উঠছে না তবে তিনি পরীক্ষা করে দেখবেন কোন সমস্যা আছে কিনা।বড় ধরনের কোন পার্থক্য থাকলে অথবা আপনার ডাক্তার বা নার্স শিশুর ওজন নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তাহলে তারা শিশুর বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) সেন্টাইল গণনা করতে পারেন। আপনার শিশু ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি না কম তা এই গণনা থেকে বোঝা যাবে। এমতাবস্থায়, শিশুর খাদ্যাভ্যাস ও শারিরীক অনুশীলনের জন্য স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ গ্রহণ করুন। শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে উঠার ব্যাপারে আপনার পরিকল্পনায় যদি কোন পরিবর্তন আনতে হয়, তবে তারা এক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করতে পারেন।

প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চার ক্ষেত্রে ডাক্তার হয়ত পরিবর্তিত চার্ট ফলো করতে বলবেন। কারণ প্রি-ম্যাচিউর শিশুরা স্বাভাবিক সময় জন্ম নেয়া বাচ্চাদের মত একই হারে বাড়বেনা। যদি আপনি এই চার্ট ফলো করতে চান তবে প্রি-ম্যাচিউর বাচ্চার ক্ষেত্রে তার ডিউ ডেটকে তার জন্ম তারিখ হিসেবে ধরে নিতে হবে। অর্থাৎ যে দিনে তার জন্ম হওয়ার কথা ছিল সে দিনটিকে তার জন্ম তারিখ হিসেব করে এ চার্ট ফলো করতে হবে।

Related posts

Leave a Comment