গর্ভাবস্থায় খাবার কিভাবে নিরাপদ রাখবেন?

খাবার নিরাপদ রাখা

যখন আপনি গর্ভবতী হন, আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং খাদ্য বিষক্রিয়াসহ  আপনার অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিছু কিছু জীবাণু যা হয়তো গর্ভ পূর্ববর্তী অবস্থায় পারত না, কিন্তু গর্ভাবস্থায় এখন তার চেয়ে মারাত্মক অসুস্থতা তৈরী করতে পারে এবং আপনার জন্ম না নেয়া বাচ্চারও ক্ষতি করতে পারে। বিষক্রিয়া পরিহার করার কিছু উপায় এখানে দেয়া হলো যা আপনাকে সাহায্য করবে।

ঠান্ডা রাখুন

  • ফ্রিজ ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা তার নীচে রাখুন।
  • যে খাবার ঠান্ডায় রাখা প্রয়োজন তা ফ্রিজে তৎক্ষনাত রেখে দিন।
  • যে খাবার ফ্রিজে ছিল যদি তা দুই ঘন্টা বা তার বেশী বাইরে রাখা হয় তাহলে ঐ খাবার খাবেন না।
  • হিমানীমুক্ত এবং মাখিয়ে রাখা (মেরিনেট) খাবার, বিশেষ করে মাংস, ফ্রিজে রাখুন।

সাধারণত কক্ষ তাপমাত্রায় রান্না করা করা খাবার ২ ঘন্টার বেশি সময় রাখা ঠিক নয়। এতে করে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটার সম্ভাবনা থাকে। রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণের জন্য পচনশীল খাবার ও রান্না করা খাবার সাধারণত ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হয়। খাবার অতিরিক্ত বেশি সময় সংরক্ষণ করা উচিত নয় যদি রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করা হয় তবুও না।

পরিষ্কার রাখুন

  • খাবার প্রস্তুত শুরু করা বা খাওয়ার আগে, এমনকি হাল্কা খাবার হলেও ভালো করে হাত ধুয়ে এবং শুকিয়ে নিন।
  • বেঞ্চ, রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি এবং খাবার থালাবাসন পরিষ্কার রাখুন।
  • কাঁচা এবং রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন এবং প্রত্যেকটির জন্য ভিন্ন কাটিং বোর্ড এবং ছুরি ব্যবহার করুন।
  • কাঁচা মাংস থেকে বের হওয়া পানি অন্য খাবারের উপর পরতে দেয়া যাবে না।
  • ডায়রিয়ার মতো কোন রোগ দ্বারা অসুস্থ হয়ে থাকলে অন্যের জন্য খাবার তৈরী করা থেকে বিরত থাকুন।

খাদ্য প্রস্তুতের সময় হাত সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রতিবার ব্যবহারের পর বাসনকোসন পরিষ্কার রাখতে হবে। রান্নাঘরকে পোকামাকড় ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণি থেকে নিরাপদ রাখতে হবে।রান্নার জন্য কাঁচা মাংস আলাদা রাখতে হবে। প্রত্যেক খাদ্যদ্রব্যের জন্য আলাদা পাত্র ও অন্যান্য উপকরণ নির্বাচন করতে হবে। একটি খাদ্য যাতে অন্য খাদ্য বা উপাদানের সাথে না মিশে যায় এজন্য আলাদা আলাদা পাত্রে রাখতে হবে বা সংরক্ষণ করতে হবে।

পানির অপর নাম জীবন তবে অবশ্যই তা হতে হবে বিশুদ্ধ। খাবার বিশেষ করে ফলমূল খাওয়ার সময় পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে খেতে হবে।

গরম রাখুন

  • গরম বাষ্পায়িত না হওয়া পর্যন্ত খাবার রান্না করুন।
  • গরম বাষ্পায়িত না হওয়া পর্যন্ত খাবার পুনরায় গরম করুন।
  • নিশ্চিত হোন যে রান্না করা মাংসে কোন গোলাপী ভাব যেন না থাকে যেমন কিমা বা সসেজ।
  • পরিবেশনের আগে সকল ধরনের মেরিনেড করা কাঁচা মাংসের পানি/জুস ফুটন্ত হওয়া পর্যন্ত গরম করুন।

রান্নার সময় বেশকিছু জিনিস মাথায় রাখা খুবই জরুরি বিশেষ করে গরুর মাংস, পোল্ট্রি ও ডিম রান্নার সময় বেশি গুরুত্ব সহকারে রান্না করতে হবে। মাংস ও ডিম রান্নার জন্য নূন্যতম তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর অধিক রাখা খুবই জরুরি। পরবর্তি সময়ে খাবার খাওয়ার জন্য খাদ্য পুনরায় গরম করে নেওয়া ভাল।

লেভেল পরীক্ষা করুন

  • মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খাবেন না।
  • খাবার ‘ভালো থাকার’ তারিখ নোট করুন এবং তা অনুসরণ করুন।
  • সংরক্ষণ এবং রান্না করার নিয়মাবলী অনুসরণ করুন।
  • মোড়কবিহীন খাবারের ব্যাপারে তথ্য জিজ্ঞাসা করুন।

লিষ্টেরিয়া

লিষ্টেরিয়া একটি খাদ্যে-জন্মানো ব্যাকটেরিয়া (জীবাণু) যা এক ধরনের লিষ্টেরিয়োসিস নামক খাদ্য বিষক্রিয়া রোগ করতে পারে। এটি সাধারণত স্বাস্থ্যবান মানুষের কোন সমস্যা করে না, কিন্তু গর্ভবতী মহিলাদের মতো কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন লোকদেরকে এই ব্যাকটেরিয়া সহজেই আক্রমন করে। খুব কম পরিস্থিতিতে, গর্ভবতী মহিলা এই সংক্রমণ তার পেটের বাচ্চাকে স্থানান্তর করতে পারে যার ফলে গর্ভপাত, মরা বাচ্চা জন্ম বা অকালে প্রজনন হতে পারে এবং নতুন জন্ম নেয়া শিশুকে অসুস্থ করতে পারে। যদি মায়ের লিষ্টেরিয়োসিস হয়, অ্যান্টিবায়োটিক অনেক সময় জন্ম না নেয়া বা নতুন জন্ম নেয়া শিশুকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে।

প্রাপ্ত:বয়স্কদের ক্ষেত্রে লিষ্টেরিয়োসিস হলে কোন উপসর্গ নাও থাকতে পারে বা আপনার জ্বর হতে পারে এবং ক্লান্তি অনুভব করবেন (কিন্তু এসব উপসর্গগুলো অন্য কারণেও হতে পারে)। যদি গর্ভাবস্থায় আপনার জ্বর হয়, সর্বদা আপনার ডাক্তার বা ধাত্রীকে তা বলুন।

লিষ্টেরিয়া সাধারণত আশেপাশের পরিবেশে পাওয়া যায় যেমন উদ্ভিদ এবং পশুপাখির বিষ্ঠা, মাটি এবং পানিতে । এমনকি ফ্রিজে রাখা খাবারের উপর লিষ্টেরিয়া জন্মাতে পারে, কিন্তু বাষ্প উঠে ঐ রকম গরমে খাবার রান্না করলে বা পুনরায় খাবার গরম করলে লিষ্টেরিয়া মারা যায়।

কিছু খাবার আছে যেগুলোতে এই ব্যাকটেরিয়া বহন করার ঝুঁকি বেশী। সেগুলো এড়িয়ে চললে লিষ্টেরিয়োসিস হওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারবেন:

  • পাস্তুরণ ছাড়া দুগ্ধজাতীয় দ্রব্য যেমন, নরম বা অর্ধ-নরম পনির (এগুলো যদি রান্না করা খাবারে থাকে তাহলে ঠিক আছে)
  • রান্না করা ঠান্ডা মুরগীর মাংস
  • প্রক্রিয়াজাত ঠান্ডা মাংস
  • আগে তৈরী করা সালাদ
  • কাঁচা সামুদ্রিক খাবার
  • নরম আইসক্রিম

কিছু উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন খাবার খাদ্য বিষক্রিয়া তৈরী করতে পারে। সর্বদা ডিম সম্পূর্ণভাবে রান্না করুন এবং কাঁচা মাংস এবং মুরগী, গুদামজাত সুশি এবং কাঁচা ডিম সমৃদ্ধ খাবার যেমন বাড়ীতে তৈরী মেয়নেজ, মুস্ অথবা এ্যয়লি পরিহার করুন।

খাবার ফ্রীজে রাখা

আসলে সংসারে নিত্য প্রয়োজনীয় ফ্রিজটি আছে আপনার দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুলতে। তার মানে কিন্তু এই নয় যে পুষ্টিহীন, মানহীন খাবার খেয়েই জীবনধারণ করতে হবে। আপনার অবশ্যই জানতে হবে কোন খাবার কত দিন রাখতে পারবেন ফ্রিজে। সে অনুযায়ীই ফ্রিজ ব্যবহার করুন।

ফ্রিজে কাঁচা খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি এক রকম আবার রান্না করা খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি আরেক রকম। এ দুই ধরনের খাবার ফ্রিজে আলাদা করে রাখা উচিত।আবার খুব বেশি খাবার একসঙ্গে না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে রাখতে পারেন। একসঙ্গে যদি বেশি খাবার রেখে দেন, তাহলে বের করে রান্নার আগে কাঁচা মাছ বা মাংস পুরোটাই আপনাকে ভিজিয়ে রাখতে হবে। আবার রান্না করা খাবার পুরোটাই জ্বাল দিতে হবে। এতে করে খাবারের পুষ্টি ও স্বাদ দুটোই নষ্ট হয়।

ফ্রিজে খাবার যদি আপনি বাক্সে করে রাখতে অভ্যস্ত হন, তাহলে বাক্সগুলোর মাঝে কিছুটা জায়গা ফাঁকা রাখবেন। তাহলে ভেতরে বাতাস চলাচল করতে পারবে।অনেকে মাসের পর মাস ডিপ ফ্রিজে মৌসুমি ফলমূল রেখে দেন। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই সংরক্ষণের নিয়মাবলি মেনে তারপর রাখতে হবে। তবে বেশি দিন রাখার ফলে ফলের স্বাদ এতটাই নষ্ট হয়ে যায় যে, পরে আর রস করে ছাড়া মুখে তোলাই দায় হয়ে যায়।খাবার রাখার নিয়মকানুন নাহয় মানলেন। স্বাদের ক্ষেত্রেও না হয় ছাড় দেওয়া হলো। কিন্তু পুষ্টিমান? সেটা তো মাথায় রাখতেই হবে। কেননা, খাবারে যদি পুষ্টি না থাকে, তবে আর থাকল কী?

আমরা অনেকেই ভাবি ফ্রিজে খাবার ঢুকিয়ে রাখা মানে তা ঠিক থাকবে | তবে মনে রাখুন ঠান্ডার কারণে ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে কাজ করে ‚ কিন্তু করে | তাই ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে তা অবশ্যই গরম করে নিয়ে তবেই খান |

খাবার গরম করার আগে এই বিষয়গুলো অবশ্যই মনে রাখবেন :

  • উচ্চ তাপমাত্রায় খাবার কখনো গরম করবেন না | এতে খাবারের নিউটিয়েন্টস‚ ভিটামিন এবং মিনারেল নষ্ট হয়ে যায় | তার বদলে অল্প আঁচে খাবার গরম করুন | এর ফলে খাবারে যে ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়ে তাও খানিকটা মরে যায় |
  • খাবার গরম না করে স্টিমিং করে নিন | অল্প জল খাবারের ওপর ছিটিয়ে লো ফ্লেমের ওপর খাবারের পাত্র বসিয়ে রাখুন | মাইক্রো ওয়েভে খাবার গরম করলেও এই ভাবেই করুন |
  • ডাল‚ সুপ বা ঝোল গরম করার সময় সেটা একবার ফুটিয়ে নিন | মাইক্রো ওয়েভ ওভেনে মাঝে মাঝে খাবার হাতা দিয়ে নাড়িয়ে দিন |
  • পাঁউরুটি‚ পিজা বা ভাজা ফ্রিজে রাখলে তা নেতিয়ে যায় | তাই ফ্রিজ থেকে বের করে কিছুক্ষণ রুম টেম্পরেচারে রেখে তাওয়ায় গরম করুন | মাইক্রো না করাই ভাল কারণ এরে ফলে তা আরো শক্ত হয়ে যাবে |
  • দুদিনের বেশি যে খাবার ফ্রিজে রাখা আছে তা খাবেন না |

বিশেষজ্ঞদের মতে , ফ্রিজে মাংস দুই থেকে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা ভালো, এর বেশি নয় । আর মাছ রাখা যেতে পারে সর্বোচ্চ ১৫ দিন। তবে মাছের মাথাগুলো আরও দ্রুত রান্না করে ফেলা ভালো। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রাখলে যেমন কিছু খাবারে ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয়, তেমনি কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয় ঠান্ডা জায়গায়। আবার কোনো খাবার যদি আপনি জীবাণুসহ ফ্রিজে রাখেন, তাহলে ওই জীবাণুও খাবারে থেকেই যায়। তাই ফ্রিজে রাখার আগেই দেখে নেবেন খাবারটা ঠিক আছে কি না। তা ছাড়া ফ্রিজে রাখার পর যদি কখনো কোনো খাবারের বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদ পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে সেটা আর না খাওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

প্লাস্টিকের বাক্সের ব্যাবহার

প্লাস্টিকের বাক্সে খাবার রাখা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরাপদ নয়। চিকিৎসকরা বেশিরভাগ সময়ই এতে খাবার রাখতে নিষেধ করেন। খাবার রাখার সময় এই প্লাস্টিক থেকে বের হয় এক ধরনের রাসায়নিক।  যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।নানা অসুবিধা সত্ত্বেও গৃহস্থলীর নানা কাজে নিত্য প্রয়োজনীয় এই জিনিসটি ব্যবহার করা হয় বহুল পরিমাণে। প্লাস্টিকের বাক্স ব্যবহার করলেও সেক্ষত্রে কিছু বিধি মেনে চলা উচিত।

প্লাস্টিক কন্টেনারে কখনওই খাবার গরম করবেন না। এমনকী, তা মাইক্রোওয়েভ সেফ হলেও নয়।পলিথিনের পাত্রে গরম খাবার রাখাও ঠিক নয়। আর অবশ্যই মনে রাখবেন প্লাস্টিকের পাত্র যতটা সম্ভব গরম জলের থেকে দূরে সরিয়ে রাখা উচিত।

এ ছাড়া মনে রাখবেন, কাচ বা স্টিলের বাসনের মতো প্লাস্টিক কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা যায় না। পুরনো প্লাস্টিকের ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment