নবজাতকের ওজন | স্বাভাবিক বৃদ্ধি – হ্রাস এবং শিশুর গড় ওজন।

জন্মের সময় গড়ে নবজাতকের ওজন প্রায় ৭.৫ পাউন্ড (৩.৪ কেজি) হয় যদিও ৫.৮ – ১০ পাউন্ডকে (২.৬ – ৪.৫ কেজি ) শিশুর ওজনের স্বাভাবিক পরিসীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সব বাবা মায়েরাই চায় তাদের সন্তান সাধারণের মাঝে অসাধারণ হয়ে তাদের গর্বিত করুক। কিন্তু শুধুমাত্র একটা বিষয়ে তারা চায় তাদের সন্তান অন্যদের মতো সাধারণ বা স্বাভাবিক মাত্রায় থাকুক। সেটা হচ্ছে “ওজন “। বাচ্চার ওজন কম হলে সে অসুস্থ নাকি আকারে ছোট সেটা নিয়ে বাবা মায়ের দুশ্চিন্তা বেড়ে যায় আবার ওজন বেশি হলে তার ওবেসিটি নিয়ে তারা চিন্তিত হয়ে পড়েন।

তবে, আমাদের আজকের আর্টিকেলের তথ্য সমূহ আপনার চিন্তা কমাতে সাহায্য করবে।

যদি নবজাতকের স্বাস্থ্যকর ওজনের প্রশ্ন আসে তবে তার পরিসর বিস্তৃত। শিশু খাওয়া -দাওয়া, মল-মূত্র ত্যাগ ইত্যাদি ঠিক থাকলে উদ্বিগ্ন হওয়ার সাধারণত কোন কারণ নেই।

নবজাতক শিশুর ওজনে কোন বিষয়গুলো প্রভাব বিস্তার বা অবদান রাখে?

আপনার কি মনে হচ্ছে যে, পাশের দোলনায় থাকা নবজাতকের তুলনায় আপনার শিশুর ওজন কম বা বেশি। আপনি হয়তো মনে মনে ভাবছেন, দুজনইতো নবজাত, তবে ওজনের পার্থক্যের কারণ কি? এই পার্থক্য বিভিন্ন কারণে হতে পারে। যেমন:

  • গর্ভাবস্থার আগে ও গর্ভাবস্থায় মায়ের ওজন এবং ডায়েট (যদি গর্ভাবস্থায় আপনার ওজন বেশি হয় তবে আপনার নবজাতকের ওজন বেশি হতে পারে। আর যদি গর্ভাবস্থায় পর্যাপ্ত পুষ্টি না পান তবে আপনার শিশুটির ওজন কম হতে পারে)।
  • আপনার প্রসব পূর্ববর্তী স্বাস্থ্য উদাহরণস্বরূপ, আপনি ধুমাপান বা অ্যালকোহল আসক্ত কিনা বা আপনার ডায়াবেটিস আছে কিনা এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে।
  • আপনার নিজের জন্মকালীন ওজন, জেনেটিক্স (জন্মের সময় আপনার ও আপনার স্বামীর আকারের প্রভাব সন্তানের উপর থাকতে পারে)।
  • আপনার বয়স (কিশোরী মায়েদের নবজাতকের আকার সাধারণত ছোট হয়ে থাকে)।
  • আপনার নবজাতক ছেলে কিনা মেয়ে তার উপরও ওজন নির্ভর করে (ছেলে নবজাতকের ওজন সাধারণত বেশি হয়)।
  • প্রথম সন্তানের ওজন পরবর্তী সন্তাদের তুলনায় কম হয়।
  • আপনার যদি যমজ বা ট্রিপলেট সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় তবে তাদের ওজন অন্য বাচ্চাদের (সিঙ্গেল) তুলনায় কম হতে পারে।
  • শিশুর জাতি বা বর্ণ ((ককেশীয় শিশুরা কখনো কখনো আফ্রিকান-আমেরিকান, এশিয়ান বা নেটিভ আমেরিকান শিশুদের চেয়ে আকারে বড় হয়)।

কেমন হওয়া উচিত নবজাতকের গড় ওজন?

ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত শিশুরা গড়ে প্রায় ৭.৫ পাউন্ড নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তবে, এটি শিশুর বর্ণ বা গোত্র অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, পূর্ণ-মেয়াদে জন্মগ্রহণকারী ১০ জন শিশুর মধ্যে ৮ জন ৫ পাউন্ড থেকে  ৮ পাউন্ড ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

আপনার নবজাতকের ওজন যদি উল্লেখিত সীমারেখার মধ্যে থাকে তবে তার আকার নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। যদি তার ওজন এর চেয়ে বেশি বা কম হয় তবে আপনার চিকিৎসক নিশ্চয় তার সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য কিছু পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারে।

জন্মের পর নবজাতকের ওজন হ্রাস

হাসপাতাল থেকে ছাড়ার পর যদি আপনার নবজাতকের ওজন ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমে যায় তবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না। ওজন কমে যাওয়ার কারণ কি? নবজাতকের শরীর থেকে এসময় কিছু তরল পদার্থ বেরিয়ে যায় যা প্রসবের পর স্বাভাবিক।

যেহেতু জন্মানোর পর তাকে প্রচুর খাবার দেওয়ার প্রয়োজন হয় না (প্রসবের পর দুদিন পর্যন্ত বুকের দুধ না আসা স্বাভাবিক), তাই সে সময়টাতে শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়া ওজন ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়না।

তবে এতে চিন্তিত হবেন না, পাঁচদিনের মধ্যে আবার তার ওজন বাড়তে শুরু করবে। ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে নবজাতক পুনরায় তার ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়ের ওজন ফিরে পাবে।

নবজাতকের দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধির হার বা গ্রোথ স্পার্ট (Growth Spurt)

সাধারণত, ১, ২ ও ৪ সপ্তাহ বয়সের মধ্যে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ আপনার নবজাতকের ওজন সহ অন্যান্য বিষয়সমূহ পর্যবেক্ষণ করবেন (যদি আপনার চিকিৎসকের সাথে দেখা করার নির্দিষ্ট কোন দিনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া না ও থাকে, তারপরও যেকোন সময় আপনার শিশুর ওজন পরীক্ষা করে আনতে পারেন।)

নবজাতকের ওজন পরিমাপের জন্য বাসার ওজন মেশিন ব্যবহার না করায় ভালো কারণ নবজাতকের ওজনের ক্ষেত্রে স্কেলটি আউন্সগুলোর ভগ্নাংশ পরিমাপ করার পক্ষে যথেষ্ট সংবেদনশীল নয়!

সাধারণত, একবার নবজাতকের জন্মকালীন ওজন ফিরে আসার পর প্রথম ৪ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে ৪ থেকে ৭ আউন্স পর্যন্ত ওজন বাড়ে মানে প্রতি মাসে ১ থেকে ২ পাউন্ড।

৪ মাস পর দেখা যায়, ফর্মুলা মিল্ক খাওয়ানো বাচ্চারা কিছুটা দ্রুত হারে বাড়ে কারণ ফর্মুলা মিল্কে মায়ের দুধের চেয়ে ক্যালরির পরিমাণ বেশি থাকে। এবং বাবা মায়েরা সাধারণত বোতলে খাওয়ানো বাচ্চাদের জোড় করে বোতলে পুরো দুধ টুকু খাইয়ে দেয়। অন্যদিকে বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চারা নিজের প্রয়োজনের বেশি দুধ পান করেনা তাই তাদের বৃদ্ধির হার ফর্মুলা খাওয়া বাচ্চাদের তুলনায় একটু কম থাকে।

আপনার ছোট্ট শিশুটি পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ পাচ্ছে কিনা তা নিয়ে যদি আপনি  নিশ্চিত না হন তবে এই নিয়মটি অনুসরণ করতে পারেন: যদি আপনার বাচ্চা পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ পায়, তবে সে দিনে ৮ থেকে ১০ বার প্রস্রাব ও ৫ বার মল ত্যাগ করবে (ফর্মুলা মিল্ক পান করা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কিছুটা কম হতে পারে)।

বেশিরভাগ শিশুর গ্রোথ স্পার্ট সাধারণ ৭-১০ দিন বয়সে হয়। পরে আবার ৩ সপ্তাহ ও ৬ সপ্তাহ বয়সে তা লক্ষ্য করা যায়। আপনার ছোট্ট সোনা যদি এ সময়গুলোতে বেশি খেতে চায়  বা সে যদি ঘন ঘন দুধ পান করতে চাই এতে অবাক হবেন না।

ব্রেস্টফিডিং অনেকটা চাহিদা ও যোগানের মতো, শিশু যত বেশি দুধ পান করবে, মায়ের বুকে তত বেশি দুধ উৎপন্ন হবে। বাচ্চার ওজন গ্রোথ স্পার্ট এর সময়গুলোতে  দ্রুত গতিতে বাড়তে পারে এবং এর মধ্যবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।

শিশুর খুব বেশি ওজন বৃদ্ধি বা ওজন হ্রাস নিয়ন্ত্রণের উপায় কি?

যদি দেখা যায় যে, প্রতি সপ্তাহে ধারাবাহিকভাবে আপনার বাচ্চার ওজন ৪ আউন্সের চেয়ে কম বাড়ছে, তবে আপনাকে ওজন সম্পর্কিত সমস্যা খুঁজে বের করে তা সমাধানের উপায় নির্ণয় করতে হবে। এই ধরনের সমস্যার জন্য সাধারণত কিছু কারণ দায়ী হতে পারে। যেমন:

হয়তো আপনার শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ পাচ্ছেনা। ওজন বাড়াতে হলে ২৪ ঘন্টায় কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ বার দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। কখনো দিনের বেলা তিন ঘণ্টার বেশি বা রাতে চার ঘন্টার বেশি না খাইয়ে রাখা যাবেনা।

খেয়াল রাখবেন বাচ্চা যেন একটা স্তন পুরোপুরি খাওয়া শেষে অন্যটা খায়, কারণ সর্বোচ্চ ফ্যাট সমৃদ্ধ হাইন্ড মিল্ক শেষের দিকে আসে। একটি স্তন ১০ থেকে ১৫ মিনিট খাওয়ানোর পর অন্যটি তাকে খেতে দিবেন।

বাচ্চারা অনেক সময় জিহ্বা বা ঠোঁটের টাইয়ের কারণে ঠিক মতো দুধ খেতে পারেনা। কিভাবে চোয়ালের পেশীগুলি সমন্বয় করতে হবে তা এ বয়সী শিশুর পক্ষে কখনো কখনো জানা সম্ভব হয়না। ফলে, সে খেতে গিয়ে ক্লান্ত বা হতাশ হয়ে পড়ে। এই ক্ষেত্রে, পাম্প করা মায়ের দুধের বোতল বা ফর্মুলা মিল্ক তার ওজন বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে। এই ধরনের সমস্যা সমাধানে “ল্যাক্টেশন এক্সপার্ট ” সহায়তা করতে পারে।

আপনার শিশু কি চুষনি ব্যবহার করে বা অন্য কোন তরল পানীয় পান করে? দুধ পান করা ব্যতীত অন্য কিছু চোষার মাধ্যমে সন্তুষ্টি মানে সে তার চাহিদা অনুযায়ী দুধ পান করতে পারছেনা। যদি এটি হয় তবে আপাতত চুষনী বা জল দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

আপনার স্তনে যতটা দুধ উৎপন্ন হওয়ার কথা ততটা হয়তো হচ্ছেনা কারণ আপনি পেটে চাপ প্রয়োগ করে ঘুমাচ্ছেন (ফলে, আপনার স্তনে চাপ সৃষ্টি হয়)। দেখা যাচ্ছে আপনি কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পর ক্লান্ত কারণ সারাদিন আপনার প্রচুর শক্তি ব্যয় হয়েছে বা আপনার বাচ্চা হয়তো পুরো রাত ঘুমিয়ে কাটাচ্ছে । ফলে তার খাওয়াতে কিছুটা ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। চাহিদা ও যোগানের ভিত্তিতে মায়ের স্তনে দুধ উৎপন্ন হয় যার জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। যদি সম্ভব হয় তবে আপনার খাওয়া-দাওয়া ও বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। চেষ্টা করবেন পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালরি গ্রহণ ও প্রচুর জলপান করতে।

যদি বাচ্চার ওজন সপ্তাহে ৭ আউন্সের বেশি বাড়ে তাহলে? যদি এটি কেবল এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটে থাকে তবে আপনার শিশু হয়তো “গ্রোথ স্পার্টেসর” মাঝ পর্যায়ে আছে।

কিছু নবজাতক অন্যদের তুলনায় খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। যদি এমন হয়ে থাকে যে, আপনি শুধু তাকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন তবুও তার ওজন বৃদ্ধি পাচ্ছে তবে এমন ভাবার কারণ নেই যে আপনি তাকে বেশি খাওয়াচ্ছেন, কারণ শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়া বাচ্চারা সাধারণত প্রয়োজনের অতিরিক্ত দুধ খায়না। হতে পারে অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি  তার ক্রমবর্ধমান ক্ষুধার একটি চিহ্ন।

যদি আপনার শিশু বোতলের মাধ্যমে ফর্মুলা মিল্ক পান করে থাকে তবে কিছু লক্ষণ আপনাকে বুঝিয়ে দেবে তার পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ পান হয়েছে, তাকে আর জোর করতে হবেনা। লক্ষণ সমূহ হলো:

  • ঠোঁট বন্ধ করে রাখবে।
  • চোষা বন্ধ করে দেবে।
  • নিপলটি মুখ থেকে বের করে দেবে।
  • মাথা সরিয়ে নেবে।

কখন চিকিৎসকের শরনাপন্ন হওয়া উচিত?

যদি আপনার শিশুর মলমূত্র ত্যাগের পরিমাণ ঠিক থাকে,ঘুম থাকে জাগার পর তাকে সজাগ মনে হয় এবং সে যদি স্তন বা বোতল থেকে ঠিকভাবে দুধ চুষে খেতে পারে তবে তার ওজন নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। যেসব নবজাতকের বৃদ্ধি ধীরে হয় তারা হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই অন্যান্য স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতই ওজন লাভ করবে ঠিক একই ভাবে যাদের ওজন দ্রুত বাড়ে তাদেরও একটা সময় গিয়ে ওজন বৃদ্ধির হার কমে স্বাভাবিক অবস্থায় চলে আসবে।

তবে, নিম্নলিখিত লক্ষন গুলোর কোন একটি দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে:

  • যদি বাচ্চার বয়স ২ সপ্তাহ হওয়ার পরেও জন্মকালীন ওজন ফিরে না আসে।
  • জন্মকালীন ওজন ফেরত আসার পরেও যদি নাটকীয় ভাবে আবার কমে যায়।
  • ঘুম থেকে উঠার পরেও যদি তাকে অবসন্ন ও ভাবলেশহীন দেখায়।
  • বোতল বা স্তন পান কোনটিতেই সে আগ্রহী হচ্ছেনা।
  • দৈর্ঘ্যের তুলনায় ওজন বেশি বৃদ্ধি পাওয়া বা অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবনতা দেখা দেওয়া।

আপনার যদি  নবজাতকের ওজন সম্পর্কে কোন সংশয় বা প্রশ্ন থাকে তবে শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করতে ভুলবেন না। এই সমস্ত উত্থান-পতনগুলো আপনার শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের অংশ এবং সময়ের সাথে স্থিতিশীল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনায় বেশি।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts