নরমাল ডেলিভারি কত সপ্তাহে হয় ?

Updated on

স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারি কত সপ্তাহে হতে পারে ? 

সাধারণত ৩৭ সপ্তাহ থেকে ৪২ সপ্তাহের মধ্যে বেশিরভাগ শিশুর নরমাল ডেলিভারি বা স্বাভাবিক প্রসব হয়। তার মানে আপনি ৫ সপ্তাহ সময় পাচ্ছেন, যার যেকোন সময়ে শিশু জন্ম নিলে সে ডেলিভারিকে নরমাল বা স্বাভাবিক বলা যাবে।

শিশু যদি ৩৭ সপ্তাহের আগে জন্মগ্রহন করে, তাহলে সে শিশুকে প্রিম্যাচুর শিশু বলা হয় যার নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন পড়তে পারে। কিন্তু গর্ভাবস্থা যদি ৪২ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, সেক্ষেত্রে তাকে দীর্ঘায়িত গর্ভাবস্থা বলা হয়। দীর্ঘায়িত গর্ভাবস্থা হলে বিভিন্ন প্রকার জটিলতার আশংকা বেড়ে যেতে পারে।

আপনার ডাক্তার হয়তো আপনাকে শিশু জন্মের সম্ভাব্য কোন তারিখ বলে দিয়েছেন, কিন্তু মাথায় রাখবেন, কেবল শতকরা ৪% শিশুর ক্ষেত্রে পূর্বে নির্দিষ্ট করে দেওয়া তারিখে নরমাল ডেলিভারি হয়।

বেশিরভাগ শিশুই ৩৭ সপ্তাহ থেকে ৪১ সপ্তাহের মধ্যে, বিশেষত, পূর্বে নির্দিষ্ট করে দেওয়া তারিখের এক সপ্তাহ আগে বা পরে জন্মগ্রহণ করে। মায়ের গর্ভে যমজ শিশু কিংবা এর বেশি হলে, সেক্ষেত্রে প্রায় সব সময়ই শিশুরা প্রিম্যাচিওর হয়।

শেষ কবে পিরিয়ড হয়েছে সেটার উপর নির্ভর না করে, ডেটিং স্ক্যানের মাধ্যমে শিশু পৃথিবীতে আগমনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ণয় করলে তা অপেক্ষাকৃত বেশি নির্ভুল হয়। কারণ, পিরিয়ড চক্রের মধ্যে ডিম্বস্ফুটনের দিন একেক নারীর একেক রকম হতে পারে। মূলত মাসিক চক্রের ব্যাপ্তির উপর নির্ভর করেই এটা হয়ে থাকে। কিন্তু ডেটিং স্ক্যানে এসবের বালাই নেই। এখানে ভ্রুণের সাইজ দেখে একদম সঠিক সপ্তাহ এবং সর্বোচ্চ নির্ভুল তারিখ দেওয়া হয়।

[ আরও পড়ুনঃ আলট্রাসাউন্ড রিপোর্ট এবং মাসিকের ভিত্তিতে (LMP) নির্ণয় করা গর্ভের শিশুর বয়স এবং ডিউ ডেটের মধ্যে পার্থক্য হয় কেন? ]

শিশু যখন গর্ভে আসে, ইমপ্ল্যান্টেশনে কত সময় লাগছে সেটার উপরও গর্ভাবস্থা বিলম্বিত হবে নাকি কম সময়ের হবে সেটা নির্ভর করে। নিষিক্ত ডিম্ব যদি সময় নিয়ে ইমপ্ল্যান্ট হয়, তাহলে গর্ভাবস্থাও বেশী সময় ধরে হয়ে থাকে।

সাধারণত, যেসব মায়েরা আগে সন্তান জন্ম দিয়েছেন- তাদের গর্ভাবস্থা তূলনামূলক কিছুটা ছোট হয়। প্রথম মা হতে যাচ্ছেন, এমন নারীদের ক্ষেত্রে বিলম্বিত গর্ভাবস্থা হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

খর্বকায় নারীদের তুলনায় লম্বা নারীদের গর্ভকালীন সময় দীর্ঘ হয়। এশিয়া, আফ্রিকা অঞ্চলের নারীদের তুলনায় ইউরোপীয় অঞ্চলের নারীদের গর্ভকালীন সময় বেশী সময় ধরে হয়।

তবে পূর্বে নির্ধারিত করে দেওয়া সময়ের এক সপ্তাহ পরেও যদি নরমাল ডেলিভারি হয়, তাহলেও চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। প্রায় প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে এক জন ৪১ সপ্তাহ অথবা এর বেশি সময় ধরে গর্ভে থাকে।ধারণা করা হয়, ৫% থেকে ১০% নারীদের গর্ভকাল ৪২ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হতে পারে। প্রসবের তারিখ পেরিয়ে গেলে কি করবেন তা জানতে আমাদের আর্টিকেলটি পড়ুন।

গর্ভাবস্থার কত সপ্তাহ চলছে, সেটা জানা কেন জরুরি?

ডাক্তারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আপনার গর্ভাবস্থার সঠিক বয়স ( gestational age) জানা ডাক্তারের জন্যে খুবই দরকারি। কারণ গর্ভাবস্থা যখন ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসতে থাকবে, মায়ের ভেতরে থাকা ভ্রুণ স্বাভাবিকভাবে শিশু হয়ে বের হওয়ার জন্যে আপনা আপনিই প্রস্তুত হয়ে যাবে।

আর এই কারণেই গর্ভাবস্থার শেষের দিকে এসে, পূর্বে নির্ধারিত সম্ভাব্য ডেলিভারির তারিখ যখন এগুতে থাকে, তখন মায়ের এবং শিশুর সঠিক অবস্থা জানতে বিভিন্ন প্রকার টেস্ট ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়।

পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে হৃদস্পন্দন ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, ফুসুফুস ঠিকভাবে বেড়ে উঠেছে কিনা সেটা খুব গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়, কারণ শিশুর ডেলিভারির সময় এই ইস্যুটি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

গর্ভাবস্থার কোন সপ্তাহে কি ঘটে বা ঘটতে পারে তা ডাক্তার সুনিশ্চিতভাবে জানেন, আর তাইতো কোন মায়ের গর্ভাবস্থার সঠিক বয়স জানলে তিনি লক্ষণ দেখেই বলে দিতে পারেন সময় অনুযায়ী মা এবং শিশুর সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। নরমাল ডেলিভারি হওয়ার লক্ষণ গুলো সম্পর্কে আমাদের আর্টিকেল থেকে জেনে নিন।

গর্ভাবস্থার স্থায়ীত্ব ডেলিভারির সময় এবং শিশুর উপর কেমন প্রভাব ফেলে?

গর্ভাবস্থা বিলম্বিত হচ্ছে নাকি ছোট হচ্ছে সেটার উপরই নির্ভর করে শিশু স্বাভাবিক হয়েছে নাকি প্রিম্যাচুর অথবা প্রলংড হয়েছে। গর্ভাবস্থা যদি ৩৭ সপ্তাহের কম হয়, সেক্ষেত্রে সে শিশুকে প্রি-টার্ম বা প্রিম্যাচুর শিশু বলা হয়। আবার যদি শিশু জন্ম হতে হতে ৪২ সপ্তাহ পেরিয়ে যায়, তাকে প্রোলোংড বা দীর্ঘায়িত বলা হয়। উভয়ই বেশ আশংকাজনক এবং বিপদের ঝুঁকি রয়েছে তাই এসব ক্ষেত্রে শিশুকে বাড়তি দেখভাল করতে হয়।

প্রিম্যাচিওর বার্থ

৩৭ সপ্তাহের আগেই যদি ডাক্তার বাচ্চা জন্ম নেয়ার লক্ষণ দেখেন , তাহলে তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করেন যাতে তখনই ডেলিভারি না করা যায়। তিনি মা-কে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেন।

কিন্তু যদি কোনভাবেই আটকানো না যায়, তাহলে ডাক্তার ডেলিভারি করিয়ে ফেলেন। আর এই জন্যেই এমন মুহুর্তে যাতে বিচলিত না হতে হয়, তাই আগে থেকেই কে ডেলিভারি করাবেন সেটা ঠিক করে রাখুন। এক্ষেত্রে আপনার গাইনীর সাথে সাথে একজন শিশু বিশেষজ্ঞেরও উপস্থিত থাকাটা জরুরী।

প্রিম্যাচ্যুর শিশুকে প্রথম কয়েকদিন বেশ নিবিড়ভাবে পরিচর্যায় রাখতে হয়। তাই শিশুর জন্মের প্রথম কয়েকদিন তাকে হাসপাতালেই থাকতে হবে।

প্রলংড বা দীর্ঘায়ীত জন্ম  

স্বাভাবিক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি ডেলিভারির কোন লক্ষণ দেখা না যায়, সেটা নিশ্চিতভাবেই চিন্তার বিষয়। এমতাবস্থায় ডাক্তার হয়তো আপনার ও শিশুর অবস্থা বুঝে কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। এখন আপনি হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন যে, শিশু পেটে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছু সময় বেশি থাকলে ক্ষতি কি।

যদি এমন প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খায়, তাহলে জেনে রাখুন – মায়ের গর্ভে শিশুকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদান, তন্ত্র সংক্রান্ত সহযোগিতাসহ শিশুকে ধরে রাখার কাজ করে প্লাসেন্টা (Placenta)। কিন্তু এই প্লাসেন্টা কেবল ৪০-৪২ সপ্তাহ পর্যন্তই কাজ করে। ৪০-৪২ সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পর স্বাভাবিক গর্ভাবস্থার সময় যখন চলে যায়, তখন প্লেসেন্টা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে এবং এই কাজগুলো করা বন্ধ করে দিতে থাকে।

প্লাসেন্টা যদি কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তাহলে শিশুর শ্বাসযন্ত্রজনিত কিংবা অপুষ্টিজনিত কোন সমস্যার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। আর তাইতো গর্ভাবস্থার ৪১ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলে ডাক্তার আর দেরি না করে ডেলিভারি করিয়ে ফেলার পরামর্শ দেন।

গর্ভাবস্থার বয়স কিভাবে নির্ণয় করবো?

শেষ পিরিয়ডের প্রথম দিন থেকেই সপ্তাহ গণণা শুরু করা হয়। ৪০ সপ্তাহের সম্ভাব্য একটি হিসাব করতে ডাক্তার শেষ পিরিয়ডের প্রথম দিনকে একটি গাইডলাইন ধরে নেন।

কিন্তু এভাবে গর্ভাবস্থার বয়স নির্ণয় করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক কিংবা কাছাকাছি ফলাফল পাওয়া যায় না। কারণ ডিম্বস্ফোটনের চক্র যা গর্ভনিষেকে প্রভাব ফেলে, তা একেক নারীর একেক রকম হতে পারে। তাই সবার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রযোজ্য হবে না৷ যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে গর্ভাবস্থার বয়স নির্ণয়ে এই পদ্ধতি বেশ উপকারী।

গর্ভাবস্থার বয়স নির্ণয়ে সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা করা যা সাধারণত গর্ভের প্রথম তিন মাসের মধ্যে করা হয়। পিরিয়ডের তারিখ ধরে হিসাবের চেয়ে এই পরীক্ষা ভালো এবং অনেকটাই নির্ভুল বলা যায়। আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা করলে ডাক্তার অনেকটা নিশ্চিতভাবেই শিশুর জন্মের সম্ভাব্য তারিখ দিতে পারেন।

সঠিকভাবে শিশুর সম্ভাব্য জন্মের তারিখ বের করতে পারলে মা ও শিশু উভয়কে বিভিন্ন প্রকার বিপদাপদ থেকে দূরে রাখা যায় এবং ‘হাসপাতালে এখনই নিয়ে যাবো কি যাবো না’ নিয়ে দোটানাও কমে যায়।

[ আরও পড়ুনঃ প্রসবের সময় এপিডিউরাল পদ্ধতিতে ব্যথা নিয়ন্ত্রণ বা ব্যথামুক্ত সন্তান প্রসব ]

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment