সপ্তাহ ২৩ । গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

গর্ভাবস্থা এর এ সপ্তাহে আপনার গর্ভের শিশুটির ওজন প্রায় এক পাউন্ডের কিছু বেশি হবে, অনেকটা জাম্বুরার আকারের। তবে শিশুটির দেহ লম্বা করলে ১১ ইঞ্চির মত হবে । গর্ভের শিশুটি দেখতে এখন অনেকটাই নবজাতক এর মতই তবে অনেক শুকনো। আপনার শিশু এখনও আরও ওজন লাভ করবে।যদিও আপনি এখন ২৩ সপ্তাহের গর্ভবতী,কিন্তু আপনার শিশুর অঙ্গ ও হাড় তার চামড়ার (যা উন্নয়নশীল শিরা এবং ধমনীর জন্য লালচে দেখতে লাগছে) মাধ্যমে দৃশ্যমান। তবে তার শরীরে একবার যখন চর্বি স্থায়ীভাবে জমে যাবে তখন তার ত্বকও অসচ্ছ হয়ে যাবে।

শিশুটি এখন আপনার নড়াচড়া অনুভব করতে পারবে এবং শব্দও আরও স্পষ্ট শুনবে। আপনি যদি এখন কোনো গান ছেড়ে তার তালে তালে নাচেন , সেটাও সে অনুভব করতে পারবে । প্রাত্যহিক শব্দগুলো, যেমন নিকটবর্তী মানুষের কণ্ঠস্বর , রাস্তার ট্র্যাফিকের আওয়াজের সাথে সে একটু একটু অভ্যস্ত হতে থাকবে।

পেটের ভেতর শিশুট যখন পাশ ফিরবে সেটাও এখন আপনার কাছে দৃশ্যমান হবে। শিশুটির ফুসফুসের রক্তনালীগুলো এখন দ্রুত বিকাশ লাভ করছে যাতে জন্মের পর পরই শিশুটি শ্বাস নিতে পারে ।

গর্ভধারণ এর এ সপ্তাহে আপনি

আপনার গোড়ালি ও পায়ের পাতা এখন থেকে ফোলা শুরু করতে পারে এবং দিনের শেষের দিকে এটা আপনার জন্য আরও পীড়াদায়ক হয়ে উঠতে পারে । ওডেমা (Oedema ) বা পায়ের ফোলাভাব গর্ভাবস্থায় একটা সাধারণ সমস্যা। পায়ের রক্ত প্রবাহী নালীগুলোতে পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে ( fluid Retention ) এরকম ফোলা ভাব হয়। যে রক্তনালীগুলো আপনার পায়ে রক্ত সঞ্চালন করছে গর্ভের শিশুর অবস্থানের কারণে সেই নালিগুলোতে চাপ পড়ে। এর ফলে রক্ত থেকে পানি আর কিছু লবণ আলাদা হয়ে রক্তনালী দিয়ে পায়ের টিস্যুতে প্রবেশ করে এবং পা ফুলে যায় । আপনার শরীরের অন্যান্য অংশেও এরকম পানি ও রক্তের তারতম্য হতে পারে যার কারণে Oedema র সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে । তবে যদি পা খুব বেশী ফুলে যায় তবে তা preeclampsia এর লক্ষন হতে পারে। এমনটা সন্দেহ হলে অবশ্যয় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

অনেক গর্ভবতী হয়ত লক্ষ্য করেছেন দাঁত ব্রাশের সময় মাড়ি থেকে রক্ত বের হয়। এটা অস্বাভাবিক কোনো কিছু নয়। গর্ভাবস্থায় দেহ হরমোনের পরিবর্তন হয় এবং তার প্রতিক্রিয়া মাড়িতেও দেখা দিতে পারে।ই অবস্থাকে বলা হয় গর্ভাবস্থার মাড়ির প্রদাহ বা (pregnancy gingivitis)। এই অসুবিধা মোকাবিলা করার জন্য সর্বাগ্রে যা করণীয় তা হলো গর্ভাবস্থার শুরু থেকে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ বা পরিষ্কার করা নিশ্চিত করা যাতে ডেন্টাল প্লাক সৃষ্টি না হয়। এ ক্ষেত্রে দন্ত চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে গর্ভাবস্থার পুর্বেই দাঁত স্কেলিং করা এবং সঠিক ব্রাশ চালনা পদ্ধতি জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

গর্ভকালীন সময়ে মাথা ব্যথা হওয়া একটি সাধারণ লক্ষণ। এ সময় মাথা ব্যথার পরিমাণ বেড়ে যায়; বিশেষ করে শরীরের ভেতর হরমোনের মুক্ত চলাচলের কারণে এটি হয়ে থাকে। এসময় শরীরে রক্তের পরিমাণ এবং চলাচলের মাত্রাও বেড়ে যায়। এটাও আর একটি কারণ হতে পারে।

শিশু যখন মায়ের পেটে বৃদ্ধি পায় আর তখন মায়ের পেটের বৃদ্ধিটাও স্বাভাবিক। তখন একজন মায়ের হাঁটা চলা কিংবা বিভিন্ন কাজের সময়ে ‘কোমর ব্যাথা’ আর ‘হাঁটু ব্যাথা’ অনুভুত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এসময় হাড়ের জয়েন্টের সমস্যাও কোমরে ব্যাথার কারন হিসেবে গণ্য হতে পারে। আবার গর্ভাবস্থায় লিগামেন্ট ঢিলে হয়ে যাবার কারনে পায়েও ব্যাথা অনুভুত হতে পারে। আর এ জন্য দায়ী গর্ভকালীন সময়ের কিছু হরমোন। তাছাড়াও অতিরিক্ত ওজনের কারনেও এমনটা হতে পারে।

২০তম সপ্তাহ থেকেই হঠাৎ হঠাৎ আপনার জরায়ুর পেশী কুঁচকে যাওয়ার মতো অনুভূতি শুরু হতে পারে, তবে এতে কোনো ব্যথা থাকবে না। এটাকে বলা হয় Braxton hicks contraction ( এটাকে  practice contractions ও বলা হয়) । কিন্তু যদি পেশীর এই সঙ্কোচনভাব বেশি বেশি হয় এবং সাথে ব্যথাও থাকে, তাহলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিৎ কারণ এটা সময়ের আগেই প্রসব যন্ত্রণা শুরু হবার পূর্বলক্ষণ হতে পারে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে করনীয়

গর্ভাবস্থায় নানা শারীরিক সমস্যা হয়। এ সময় হতে পারে পিঠে ব্যথা, রাতে ঘুম না হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি। ব্যায়ামের উপকারিতা এখানেই। নিয়মিত ব্যায়াম করলে পিঠে ব্যথা কমে যায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। স্ট্রেস ও অ্যাংজাইটি কমিয়ে ব্যায়াম রাতে ঘুম আনতে সাহায্য করে। শরীরের রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে উজ্জ্বলতা নিয়ে আসে চেহারায়।হরমোনাল পরিবর্তনের জন্য এ সময় জয়েন্ট শিথিল হয়ে যায়। তাই হাত, পায়ে ব্যথা হতে পারে। ব্যায়াম করলে জয়েন্টের ভেতর যে লুব্রিকেটিং ফ্লুইড থাকে, তার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে হাত, পায়ের ব্যথা কমায়।ব্যায়াম শরীরের নিম্নাংশের মাসল টোন করে শরীরকে ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত করে। মাসলকে শক্তিশালী করে ডেলিভারির সময় লেবার পেইন কমায়।গর্ভধারণের পর শরীরে অনেক পরিবর্তন হয়। এগুলো অনেক সময় মেনে নিতে কষ্ট হয়; তাই মন-মেজাজ ভালো থাকে না। ব্যায়াম করলে ব্রেনে এক ধরনের কেমিক্যাল নিঃসৃত হয় যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া শরীরের এনার্জি লেভেল বাড়িয়ে মুড ভালো রাখে। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ব্যায়াম করলে বাচ্চা হওয়ার পর দ্রুত বেড়ে যাওয়া ওজন কমে যায়।তবে যে ধরনের ব্যায়ামই করুন না কেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজ থেকে কোনো ব্যায়াম শুরু করবেন না।

গর্ভাবস্থায় সাধারণ অসুখ, মূত্রাশয় সংক্রমণ, কোষ্ঠকাঠিন্য, অর্শরোগ, এই ধরণের সমস্যা গুলো পানি খেয়েই রোধ করা যায়। পানি শূন্যতার জন্য ডেলিভারির সময় কনট্রেবসন বেশি হতে পারে এবং লেবার পেইনও তাড়াতাড়ি শুরু হয়। ইউটেরাসে এমিউনিটি ফ্লুইডে (যার বেশির ভাগ পানি) সারাদিন ধরেই পানির বদল হতে থাকে। তাই গর্ভাবস্থায় প্রচুর পরিমানে পানি খাওয়া প্রয়োজন।

আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে আপনার ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাক। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

আপনার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অন্য সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণে প্রোটিন, ফলিক এসিড ও অয়রন সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন। আপনার উদরে বেড়ে উঠা শিশুর বৃদ্ধির জন্য এই উপাদানগুলো অনেক বেশি প্রয়োজন। প্রচুর পরিমানে ভিটামিন- সি খাওয়ার চেষ্টা করুন।

একটানা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকাটা আপনার জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে। আপনি খেয়াল করে দেখবেন যে আপনার পায়ের শিরাগুলো বেশ স্পষ্ট বোঝা যাবে। শিশুটির আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে আপনার শরীরের ভর কেন্দ্রেও পরিবর্তন আসবে এবং আপনার বর্ধিত ওজনের ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা হবে। সমান তলা বিশিষ্ট জুতা পরার চেষ্টা করুন এবং যখনই মনে হবে কোনোভাবে দাঁড়ালে বা বসলে আপনি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে পারেন, তাহলে সেটা না করুন।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

সময় কাটানোর অংশ হিসেবে বাচ্চার নাম এখন থেকেই খুজতে পারেন। বাচ্চার সুন্দর আরবি বা বাংলা নাম ও নামের অর্থ জানতে Fairyland Baby Names Finder এর সাহায্য নিতে পারেন।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২২
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২৪>>

 

তথ্যসূত্রঃ

www.maya.com.bd/content/web/wp/1821/
babycenter.com
parenting.com 

 

Related posts

Leave a Comment