সপ্তাহ অনুযায়ী গর্ভধারন । সপ্তাহ – ১৯

গর্ভাবস্থার ১৯ তম সপ্তাহে  আমের আকার হওয়া শিশুটি প্রায় পুরোটা সময়ই ঘুমিয়ে কাটাবে। ঘুমের মধ্যেই তার বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হবে, আর তার পরিপক্ক হবার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিও সঞ্চয় হতে থাকবে। শিশুটি কখন জেগে আছে, সেটাও আপনি বাইরে থেকেই বেশ ভালোভাবে টের পাবেন। পাঁচটি ইন্দ্রিয়ও সুগঠিত হয়ে উঠবে যার মাধ্যমে শিশুটি স্বাদ নেবে, গন্ধ শুঁকবে, শব্দ শুনবে।কিছু কিছু গবেষণা অনুযায়ী শিশুটি এখন আপনার কথা শুনতে পারে। তাই তার সাথে এখন আপনি কথা বলতে পারেন। গল্প বা গান গেয়ে শোনাতে পারেন।

শিশুটির ত্বকের চারপাশে vernix caseosa নামের এক ধরনের চর্বিযুক্ত আবরন তৈরি হবে যা শিশুটির কোমল ত্বককে চারপাশের amniotic fluid থেকে রক্ষা করবে। ডেলিভারির সময় আসলে এ আবরণটি আস্তে আস্তে খসে পরে।

এতদিনে তার আঙ্গুলের রেখা স্পষ্ট হয়ে যাবে। তার মানে, এখন থেকে তার নিজস্বতা বহনকারী আঙ্গুলের ছাপ থাকবে। বৃক্ক (Kidney) থেকে এখন নিয়মিত মূত্র তৈরি হবে যার একটা বড় অংশ গিয়ে মিশবে অ্যামনিওটিক তরলের (Amniotic Fluid) সাথে। শিশুটির ওজন এখন প্রায় ২৪০ গ্রাম এবং ৭ ইঞ্ছি লম্বা।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনি

টান টান হয়ে যাওয়া পেশীর কারণে আপনার পেট ও শ্রোণীচক্রে প্রচণ্ড ব্যথা করতে পারে। কোনো কোনো গর্ভবতী মা শ্রোণীচক্রের অসহনীয় ব্যথায় ভোগেন এবং তার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। আপনি কিছু Pelvic Floor Exercise চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

চেয়ারে বসা অবস্থা থেকে আপনি যদি খুব দ্রুত উঠে দাঁড়াতে যান, কিংবা যখন আপনি গোসল করে বের হন তার পর পর আপনার জ্ঞান হারানোর মতো অনুভূতি হতে পারে। চেয়ার থেকে আস্তে ধীরে উঠুন। আর যদি কখনো জ্ঞান হারানোর মতো অনুভূতি হয় তাহলে হাতের কাছে যা আছে তা শক্ত করে ধরুন এবং আস্তে আস্তে হাঁটুন। জেনে নিন কি কি কারণে এসময় জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হতে পারে।

ইতিমধ্যেই আগের চাইতে আপনার ওজন নিশ্চয়ই প্রায় ৮/১৪ পাউন্ড (৩ থেকে ৬  কেজি) বেড়ে গেছে। কি কি খাচ্ছেন সে ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে আপনার ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাক। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

বিগত কয়েকমাস গর্ভস্থ শিশুটির নিচের দিকে অবস্থানের কারণে মূত্রথলিতে বেশি চাপ পড়েছে এবং আপনার মূত্রের বেগও নিশ্চয়ই স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ছিলো। এখন থেকে সেটা বেশ অনেকটাই কমে আসবে, কারণ এখন মুত্রথলির ওপর চাপও কমে যাবে। যদি তা না হয়, এবং মূত্রত্যাগের সময় যদি জ্বালা-পোড়া করে তাহলে ডাক্তার দেখানো জরুরি। গর্ভাবস্থায় অনেক মেয়েরই ইউরিনারি ইনফেকশন ( Urinary Infection) হয় এবং তার যথাযথ চিকিৎসা না হলে বৃক্কের (Kidney) ক্ষতি হতে পারে।

যেহেতু এখন শরীরে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যাবে, আপনার গরম লাগার অনুভূতিও বেশি হবে। এ সময় নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে। কারো কারো নাক বন্ধ হয়ে যায়। খাওয়ার পর পরই বুক জ্বালা-পোড়া করা বা বদহজমের সমস্যা হতে পারে এবং পেট ফুলে যেতে পারে। এসময় অনেকের মাড়ি ফুলে যাওয়ার সমস্যাও হয়ে থাকে, ফলে দাঁত ও মাড়ির যত্ন নেয়া জরুরি।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে করনীয়

যেহেতু এখন ক্রমাগত বড় হতে থাকা জরায়ুকে জায়গা করে দেয়ার জন্য আপনার পেশী এবং লিগামেন্টগুলোতে টান বাড়বে, আপনি সামান্য ব্যথা অনুভব করতে পারেন। যদি আপনি এখনো ব্যায়াম শুরু না করেন, তাহলে এ পর্যায়ে এসে এক-আধটু ব্যায়াম করতে পারেন। এতে করে আপনার পেশী সবল থাকবে। তবে হ্যাঁ, সক্রিয় থাকতে পারা যেমন ভালো, তেমনি আপনাকে এটাও জানতে হবে যে কতটুকু পর্যন্ত আপনি শরীরকে পরিশ্রম করাতে পারবেন। জেনে নিন, কোন ব্যয়ামগুলো আপনাকে সবল রাখবে, আর কোন ব্যয়ামগুলো গর্ভাবস্থায় বাদ দিতে হবে

আপনার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অন্য সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণে প্রোটিন, ফলিক এসিড ও অয়রন সমৃদ্ধ খাবার যোগ করুন। আপনার উদরে বেড়ে উঠা শিশুর বৃদ্ধির জন্য এই উপাদানগুলো অনেক বেশি প্রয়োজন। প্রচুর পরিমানে ভিটামিন- সি খাওয়ার চেষ্টা করুন।

যেহেতু আপনার শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাবে তাই চেষ্টা করুন নরম ও ঢিলে ঢালা জামা পরার। সিনথেটিক কাপড় না পরায় ভালো।

গর্ভাবস্থায় দঁাতের যত্ন নেয়া খুবই প্রয়োজন৷ এসময় দঁাত পরিষ্কার রাখতে হবে৷ গর্ভাবস্থায় অনেক সময় মাড়ি ফুলে রক্তপাত হয়৷ তাই এ সময়ে মাড়ির যত্ন প্রথম থেকেই নেওয়া উচিত৷ প্রতিদিন সকালে ও রাতে শোয়ার আগে দঁাত ব্রাশ করা প্রয়োজন৷ দঁাত বা মাড়ির কোনও সমস্যা থাকলে দন্ত চিকিত্‌সকের পরামর্শ নিন৷

গর্ভাবস্থায় শিশুর বৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করে মায়ে ওপর৷ অর্থাত্‌ সুস্থ মা মানেই সুস্থ শিশু৷ শিশুর পরিপূর্ণ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রকার খাদ্যের যোগান দিতে হয় মাকে৷ মা যে খাবার খাবেন শিশুও সেই খাবার খেয়ে পুষ্টি লাভ করে৷ এ কারণে স্বাভাবিক মহিলাদের তুলনায় একজন গর্ভবতী মায়ের খাবারের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি৷ সঠিক পরিমাণে খাবার গ্রহণ না করলে সন্তান ঠিকমত বৃদ্ধি পাবে না৷ ফলে সন্তান অপুষ্টি নিয়ে জণ্মাবে৷ গর্ভবতী অবস্থায় কী খাবেন এবং কোন খাবার গর্ভের সন্তান এবং মায়ের জন্য প্রয়োজন তা জেনে নিন।

সময় কাটানোর অংশ হিসেবে বাচ্চার নাম এখন থেকেই খুজতে পারেন। বাচ্চার সুন্দর আরবি বা বাংলা নাম ও নামের অর্থ জানতে Fairyland Baby Names Finder এর সাহায্য নিতে পারেন।

সবশেষে মনে রাখা উচিত, গর্ভবতী মাকে সব সময় হাসিখুশি ও দুশ্চিন্তা মুক্ত থাকতে হবে। কারণ গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক অবস্থা পরবর্তী কালে শিশুর বিকাশে প্রভাব ফেলে, যা গবেষণায় প্রমাণিত।

ডাক্তারের কাছে যাবার সময় আপনার সঙ্গীকেও সম্ভব হলে সঙ্গে নিয়ে যান। তাহলে গর্ভাবস্থার বিভিন্ন খুটিনাটি বিষয় সম্পর্কে দু’জনে একসাথেই জানতে পারবেন।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ১৮
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২০>>

 

তথ্যসূত্রঃ

maya.com.bd/content/web/language/bn/1837/
babycenter.com
parenting.com

 

 

Related posts

Leave a Comment