সপ্তাহ অনুযায়ী গর্ভাবস্থা । সপ্তাহ – ১০

আপনি এ সপ্তাহে মোটামুটি আপনার প্রথম তিন মাসের (First Trimester) শেষভাগে চলে আসবেন। দশম সপ্তাহে এসে গর্ভের শিশুটি দ্বিগুণ আকার ধারণ করবে. এখন তার আকার হবে একটা খেজুরের সমান। এ সপ্তাহে শিশুর হাড় ও কোমলাস্থি ( Cartilage) গঠিত হতে শুরু করবে। আপনি হয়তো অনুভব করতে পারবেন না, কিন্তু ইতিমধ্যেই শিশুর লাথি দেয়া ও হাত-পা নাড়ানো শুরু হয়ে যাবে।

এ সপ্তাহ নাগাদ শিশুটির গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো গঠিত হয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করে দেবে। এখন সে পরিপাক নালী দিয়ে খাবার ভেতরে নিতে পারবে, আবার মলত্যাগ করে বের করে দেয়ার জন্যও তার শরীর প্রস্তুত হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে তার যৌনাঙ্গও গঠিত হয়ে যাবে, কিন্তু এখনো সে হাত-পা ভাঁজ করে গুটি পাকিয়ে থাকবে বলে আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় এখনই তার লিঙ্গ বোঝা যাবে না।  এই সময়টাতে প্রতি মিনিটে শিশুর মস্তিষ্কে ২৫০০০০ নতুন নিউরন যোগ হচ্ছে এবং তার ছোট্ট আঙ্গুলগুলোতে নখ গজাতে শুরু করেছে।

আপনার শিশু আস্তে আস্তে সত্যিকারের মানব শিশু তে রুপান্তরিত হচ্ছে। সবচাইতে সঙ্কটপূর্ণ সময় টা শেষ। এখন থেকে টিস্যু এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দ্রুত বাড়তে থাকবে এবং পরিণত হতে থাকবে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে শারীরিক পরিবর্তন

আপনার জরায়ুটি এখন কমলালেবুর মতো বড় হয়ে যাবে যা আপনার শ্রোণিচক্রের (pelvis) ভিতরের প্রায় সবটুকু জায়গা দখল করে নিবে।আপনি এসময় হাত দিয়ে শ্রোণিচক্রের উপরে, মাঝামাঝিতে জরায়ুটাকে অনুভব করতে পারবেন। এখনই আপনাকে বড় সাইজের কাপড়-চোপড় পরা শুরু করতে হবে না, কিন্তু আপনি এখন থেকেই লক্ষ্য করবেন যে আপনার কোমর মোটা হতে শুরু করেছে।

গর্ভাবস্থায় মেজাজের পরিবর্তন একটি সাধারণ বিষয়, আংশিক ভাবে এর কারণ হরমোনের পরিবর্তন যা আপনার neurotransmitters (মস্তিস্কের রাসায়নিক বাহক) এর মাত্রা প্রভাবিত করে। প্রত্যেকেই এ পরিবর্তনে আলাদা ভাবে সাড়া প্রদান করে থাকে। মা-হতে-যাওয়া এমন অনেকে উচ্চমাত্রায় আবেগপ্রবণ হয়ে উঠতে পারেন, যা ভাল বা মন্দ উভয় রকমেরই হতে পারে, এবং অন্যেরা আরও একটু বেশী রকমের বিষণ্ণ বা চিন্তিত অনুভব করতে পারেন

  • নোটঃ যদি আপনি দুঃখিত বা নিরাশ বোধ করেন বা আপনার দৈনিক দায়িত্ব সমূহ যথাযথ ভাবে পালন করতে না পারেন, বা আপনি নিজেকে নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলতে পারেন বলে মনে করেন, তবে আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে অথবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে অনতিবিলম্বে যোগাযোগ করুন।

গর্ভাবস্থার প্রথম দিকের একটি চিহ্ন হল সংবেদনশীল, স্পর্শকাতর বক্ষ যা হরমোনের মাত্রার বৃদ্ধির কারণে হয়ে থাকে। আপনার পিরিয়ড শুরুর পূর্বে আপনি যেমন বোধ করেন আপনার বক্ষের স্পর্শকাতরতা এবং স্ফীতি তার চেয়ে বেশী ধরণের অনুভুত হতে পারে। গর্ভাবস্থার প্রথম তিনমাস অংশের পরে আপনার এ ধরণের অস্বস্থি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে, কারণ আপনার দেহ হরমোনের পরিবর্তনের সাথে ততদিনে তাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

গর্ভের মধ্যে বেড়ে ওঠা প্রাণের প্রচুর পরিমাণে রক্ত সরবরাহের প্রয়োজন হয়। আর সেই কারণে স্বাভাবিক ভাবেই শরীরের ভিতরের শিরা ও ধমনীগুলির স্ফীতি ঘটে। এই ধমনী স্ফীতি ঘটলে মহিলারা শরীরে অসম্ভব জ্বালা যন্ত্রণা অনুভব করতে পারেন।

এই সময় ত্বকের তারতম্য হতে পারে। ব্রণ, ফুসকুড়ি, কালচে দাগ, ছুলির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এই সময় বাজারের কেমিক্যাল দ্রব্যের চেয়ে বাড়ির ঘরোয়া টোটকার উপর ভরসা রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

গর্ভাবস্থায় যোনির নিঃসরণ বেড়ে যায়৷ কিন্তু অতিরিক্ত যোনি নিঃসরণ, দুর্গন্ধযুক্ত বা সঙ্গে চুলকানি থাকলে অথবা অন্য কোনও রোগ থাকলে তা চিকিত্‌সকের পরামর্শ নিয়ে প্রসবের আগেই সম্পূর্ণ সারিয়ে ফেলতে হবে৷ তা না হলে প্রসবের সময় যোনিপথের রোগ শিশুর চোখে, নাভিতে বা শরীরের অন্য কোনও জায়গায় আক্রমণ করতে পারে৷ যেমন – গনোরিয়া রোগ যোনিপথ থেকে শিশুর চোখে সহজেই সংক্রমিত হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে শিশুর চোখের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে৷

 

এ সপ্তাহে করনীয়

গর্ভাবস্থায় শিশুর বৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করে মায়ের ওপর৷ অর্থাত্‌ সুস্থ মা মানেই সুস্থ শিশু৷ শিশুর পরিপূর্ণ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রকার খাদ্যের যোগান দিতে হয় মাকে৷ মা যে খাবার খাবেন শিশুও সেই খাবার খেয়ে পুষ্টি লাভ করে৷ এ কারণে স্বাভাবিক মহিলাদের তুলনায় একজন গর্ভবতী মায়ের খাবারের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি৷ সঠিক পরিমাণে খাবার গ্রহণ না করলে সন্তান ঠিকমত বৃদ্ধি পাবে না৷ ফলে সন্তান অপুষ্টি নিয়ে জণ্মাবে৷ গর্ভবতী অবস্থায় কী খাবেন এবং কোন খাবার গর্ভের সন্তান এবং মায়ের জন্য প্রয়োজন তা জেনে নিন।

চা, কফির (যার মধ্যে ক্যাফেইন থাকে) অভ্যাস কমানোর জন্য আপনি ভেষজ চা খাওয়া শুরু করতে পারেন। তবে এই ভেষজ চা গর্ভাবস্থায় নিরাপদ কি না সে বিষয়ে আগে থেকেই নিশ্চিত হয়ে নিন। লেবু ও মধু মেশানো গরম পানিও চায়ের ভালো বিকল্প হতে পারে। দিনে আপনাকে অন্তত ৮ গ্লাস পানি বা পানীয় খেতেই হবে ( চা, কফি, কোলা এসব বাদে) । তবে, রাতের দিকে পানির পরিমান কমিয়ে দিন, যাতে ঘুমের মধ্যে একটু পর পর উঠে টয়লেটে যেতে না হয়। এমন পানীয় পান করুন যা আপনার গর্ভের শিশুর জন্য উপকারী হবে। এমন খাবার খান যেটা আপনার মেজাজ ফুরফুরে রাখবে। সুষম খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে পড়ুন। এ সপ্তাহে যেহেতু আপনার শিশুর হাড় ও দাঁতের গঠন শুরু হয়ে যাবে, সুতরাং আপনার খাবারেও যথেষ্ট পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকতে হবে।

ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ ছাড়া অন্য কোনো কারণে যদি আপনার ঘুম না হয়, তাহলে আপনি হয়তো ভাববেন যে ওষুধ খেয়ে সেটা ঠিক করে নেবেন। কিন্তু, গর্ভাবস্থায় প্রথমেই ওষুধ খাওয়ার চিন্তা মাথায় না আনাই ভালো। নিজের চেষ্টায় অনিদ্রা দূর করার জন্য আমাদের যে পরামর্শগুলো আছে সেগুলো আগে চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে আগে ব্যায়াম করবেন না। গর্ভাবস্থায় অনেক নারীই অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেন, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার জন্য সেটাও একটা কারণ হতে পারে।

সুস্থ পরিবেশ ই শুধু একটা সুস্থ বাচ্চার জন্ম দিতে পারে । এ সময় ধর্মীয় বই পুস্তক পাঠ করলে , সুন্দর সন্তানের স্বপ্ন দেখলে বাস্তবেও সুন্দর, সুস্থ বাচ্চার জন্ম দেয়া সম্ভব । এটা বর্তমানে বৈজ্ঞানিক ভাবেও প্রমানিত যে মায়ের সাথে সন্তানের আত্তিক সম্পর্ক থাকে । কাজেই মাকে আনন্দে থাকতে হবে, পরিবারকেও মাকে সাপোর্ট দিতে হবে ।

হালকা ব্যায়াম করতে হবে কিন্তু ভারি কাজ করা যাবে না । ঝুকে বা নুয়ে কাজ না করাই উচিত । হাঁটা চলায় সাবধান হতে হবে । এগুলো আমরা সবাই জানি কিন্তু ঠিক মত পালন করিনা। কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সচেতন থাকতে হবে ।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ৯
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ১১>>

তথ্যসূত্রঃ
maya.com.bd/content/web/language/bn/1871/
babycenter.com

 

Related posts

Leave a Comment