৩১ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা | ভ্রূণের বৃদ্ধি, মায়ের শরীর এবং কিছু টিপস

Spread the love

গর্ভাবস্থার ৩১তম সপ্তাহে গর্ভের ভ্রূণ বেশ অ্যাক্টিভ থাকে। এখন তার  নড়াচাড়া হয়তো আগের চেয়ে বেশি হবে এবং কিছু সময় পরপরই আপনি তার মাথা, পা  কিংবা হাতের গুঁতো  অনুভব করবেন। হ্যাঁ, গর্ভের শিশুটি যে সুস্থ আছে এটা তারই লক্ষণ ।

গর্ভাবস্থার ৩১ তম সপ্তাহকে প্রেগন্যান্সির তৃতীয় ট্রাইমেস্টারের চতুর্থ সপ্তাহ হিসেবে ধরা হয়। এ সপ্তাহের অবস্থান গর্ভাবস্থার সপ্তম মাসে।

বিজ্ঞাপণ
৩১ সপ্তাহের গর্ভাবস্থা

গর্ভধারণের ৩১ তম সপ্তাহে গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি

৩১ তম সপ্তাহে ভ্রূণের চামড়ার নীচে চর্বির স্তর জমতে থাকার কারণে তার ত্বক অনেক মসৃণ হয়ে যায় । তার হাত – পা বেশ গোলগাল আর পুষ্ট হয়ে উঠবে এবং তার ওজনও খুব দ্রুত বাড়তে থাকে। মা প্রতি সপ্তাহে একবার করে নিজের ওজন মাপলেই এই পরিবর্তন টের পাবেন ।

ভ্রূণটি এসময় একটু লম্বা সময় ধরে ঘুমাতে শুরু করে। এ কারণে এ সময় থেকেই তার জেগে থাকা এবং নড়াচড়া করার একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন মায়েরা বুঝতে শুরু করবেন।

ভ্রূণ যেহেতু এখন বেশ অনেকটা বেড়ে উঠেছে তাই মায়ের জরায়ুতে জায়গা কিছুটা কমে আসে। এসময় তার পা দুটো ভাঁজ হয়ে বুকের কাছাকাছি  থাকতে পারে। এধরনের ভঙ্গিকে ক্লাসিক ফেটাল পজিশন (Classic Fetal Position) বলা হয়।

মায়ের জরায়ুতে জায়গা কমে যাওয়ায়  ভ্রূণের নড়াচড়া একটু কম বেশী  মনে হতে পারে তবে সাধারনত ভ্রূণের নড়াচড়ার প্যাটার্নে কোন পরিবর্তন হয় না । উদাহরণস্বরূপ, ভ্রূণটি যদি সন্ধ্যায় খুব বেশি অ্যাক্টিভ থাকে তবে সে সময়টাতে নিয়মিত তার নড়াচড়া টের পাবেন। এক্ষেত্রে যদি কোন অস্বাভাবিকতা খেয়াল করেন তবে অবশ্যই ডাক্তারকে জানাতে হবে।

গর্ভের ভ্রূণের  সারাদিনের কর্মকাণ্ডের ভেতর রয়েছে – বিভিন্ন মুখভঙ্গি করা, হেঁচকি তোলা, হাত পা ছোঁড়া এবং বুড়ো আঙ্গুল চোষা। মজার বিষয় হল কিছু কিছু ভ্রূণ তার আঙ্গুল এতোটাই জোরে চুষতে থাকে যে জন্মের সময় সে আঙ্গুলে ফোস্কা নিয়ে জন্মাতে পারে।

গর্ভাবস্থার ৩১ তম সপ্তাহকে ভ্রূণের খুব বেশি  প্রি-টার্ম ক্যাটাগরির শেষ সপ্তাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় শিশুটি জন্ম নিলে পর্যাপ্ত পরিচর্যার মাধ্যমে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় ৯৯ ভাগ। প্রতিটি সপ্তাহ অতিক্রম করার সাথে সাথে গর্ভের বাইরে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বাড়তে থাকবে এবং প্রি-ম্যাচিওর বার্থের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরণের জন্মগত ত্রুটির সম্ভাবনাও কমে আসতে থাকবে।

ভ্রূণের আকার ৩১ তম সপ্তাহে একটি বড় সাইজের আনারসের সাথে তুলনা করা যায়। এসময় ভ্রূণের উচ্চতা থাকে প্রায় ১৬.১৮ ইঞ্চি বা ৪১.১ সেমি এবং এর ওজন হয় আনুমানিক ৩.৩১ পাউন্ড  বা ১৫০২ গ্রামের মত।

৩১ তম সপ্তাহের দিকে এসে ভ্রূণের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক বিকাশের মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। সেগুলো নিম্নরূপঃ

মস্তিষ্ক

ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশ এসময় খুব দ্রুত গতিতে হতে থাকে। শরীরের প্রত্যেকটি স্নায়ু কোষের সাথে মস্তিষ্কের সংযোগ তৈরি হতে থাকে যার ফলে ভ্রূণটির মস্তিষ্ক এখন পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের সিগন্যাল গ্রহণ ও এবং বিভিন্ন ইনফরমেশন প্রসেস করতে পারে। শিশুটির জন্মের আগে তার মস্তিষ্কের সাথে এধরনের বিলিয়ন বিলিয়ন স্নায়ুকোষের সংযোগ তৈরি হয়।

চোখ

এসময় আলট্রাসাউন্ডে ভ্রূণের চোখের পাতা খোলা বাধা বোঝা যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে ৩১ তম সপ্তাহে ভ্রূণটি ঘণ্টায় ৬-১৫ বার চোখ খোলা বাধা করে। চোখের বিকাশ এখনো চলমান এবং মায়ের জরায়ু ভেদ করে কোন আলো তার চোখে পড়লে সে তার প্রতিক্রিয়া দেখায়।

হাঁড়

ভ্রূণের শরীরের সবগুলো হাঁড় ধীরে ধীরে শক্ত হতে থাকলেও  তার মাথার খুলির হাড়গুলো নমনীয় থাকে। এতে প্রসবের সময় শিশুর মাথা সহজে জন্মনালী দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। জন্মের সময় শিশুর মাথায় কিছু নরম অংশ থাকে যেগুলোকে ফন্টানেল বলা হয়। এগুলো জন্মের পর ১৮ মাস নাগাদ স্বাভাবিক হয়ে যায়।

কান

ভ্রূণের শ্রবণ যন্ত্র এসময় প্রায় পুরোপুরি বিকশিত থাকে। সে এখন জরায়ুর বাইরের কণ্ঠস্বর বুঝতে শুরু করে। তাই বাবা এবং অন্যান্য ভাই বোন থাকলে তাদের কথা বলতে উৎসাহ দিন। এতে অনাগত সন্তানের সাথে তাদের বন্ধন বৃদ্ধি পাবে।

যদিও ভ্রূণের মধ্যকর্ণ তরলে পূর্ণ থাকায় সে স্পষ্ট সব শুনতে পাবেনা। এই তরল পুরোপুরি সরে যেতে জন্মের পর কয়েক মাস সময় লাগে।

মাথা

ভ্রূণের গলার পেশীগুলো এসময় শক্তিশালী হতে থাকে। তাই এখন সে মাথা নাড়তে পারে এবং এপাশ ওপাশ মাথা ঘোরাতে পারে।

মুখ

ভ্রূণের মুখের স্বাদগ্রন্থিগুলো (Taste bud) এবং তার মস্তিষ্ক এখন এতোটাই বিকশিত যে এ সময়ে ভ্রূণটি মায়ের খাওয়া বিভিন্ন খাবারের কণা যা অ্যাম্নিওটিক ফ্লুয়িডে জমা হয়, সেগুলো গ্রহন করতে শুরু করতে পারে।

গবেষকরা যদিও নিশ্চিত নন যে গর্ভের ভ্রূণ এসব খাবারের স্বাদ বুঝতে পারে কিনা তবে, বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে গর্ভাবস্থায় মায়ের খাদ্যাভ্যাস পরবর্তীতে শিশুর খাদ্যাভ্যাসেও বেশ প্রভাব ফেলে।

৩১ তম সপ্তাহে মায়ের শারীরিক পরিবর্তন

গর্ভের ভ্রূণ  এবং অ্যাম্নটিক ফ্লুয়িড, দুটোই বাড়তে থাকার কারণে এসময় মায়ের ওজনও দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই সময় মায়ের ওজন সাধারণত ২১ থেকে ২৭ পাউন্ডের (৯.৫-১২.২ কেজি) মত বেড়ে যেতে পারে। তবে এটি একটি গড়পড়তা হিসেব এবং এর চাইতে কিছু কম বেশি হলে খুব বেশি চিন্তার কারণ নেই। এছাড়াও প্রতিটি সাক্ষাতকারেই ডাক্তার আপনার ওজন মেপে দেখবেন এবং অস্বাভাবিক কিছু থাকলে আপনাকে জানাবেন। তাই ওজন নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।

যদি এটা আপনার প্রথম সন্তান হয়, তাহলে ৩১তম সপ্তাহে ডাক্তার আপনার পেটের মাপ নেবেন এবং দেখবেন শিশুটি কতটা উপরে অবস্থান করছে ।এটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ- যদি আপনার শিশুর মাথা সঠিক দিকে অবস্থান না করে তাহলে প্রসবের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে ।

কিছু কিছু ভ্রূণ এসময় প্রসবের জন্য উপযোগী অবস্থানে চলে আসে। অর্থাৎ তার মাথা থাকে নীচের দিকে। যদি শিশুর মাথা এখনো উপরের দিকে থাকে তবে ঘাবড়ে যাওয়ার কারণ নেই। ৩৬ সপ্তাহ পর্যন্ত সে নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করে। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রসব শুরুর আগ মুহূর্তেও গর্ভের শিশু প্রসবের নির্দিষ্ট অবস্থানে আসতে পারে।

বিজ্ঞাপণ

গর্ভাবস্থার এ সময় যেসব উপসর্গ বেশি দেখা দিতে পারে তা হলো-

চুলকানি

গর্ভাবস্থায় হালকা চুলকানি হওয়া নিয়ে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই চিন্তার কিছু নেই। এটা খুব স্বাভাবিক। প্রায় ২০ ভাগ গর্ভবতী মহিলার চুলকানির সমস্যা থাকে। এ সময় মায়েদের পেট এবং ব্রেস্টের আশেপাশে চুলকানি বেশী হতে পারে, কারণ দুটো স্থানের চামড়াই এ সময় প্রসারিত হয়। শুষ্ক ত্বক ও হরমোনের পরিবর্তনের কারণেও এ সময় চুলকানি দেখা দিতে পারে।

চুলকানি হলে যথাসম্ভব কম চুলকানোর চেষ্টা করুন। এতে ত্বক আরও ফেটে যেতে পারে এবং ত্বকের ইনফেকশন দেখা দিতে পারে। ত্বক আদ্র রাখতে ময়শ্চারাইজার ব্যাবহার করতে পারেন। এগুলো সুগন্ধিযুক্ত না হলেই ভালো। একজিমা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শকৃত ক্রীম বা লোশন ব্যাবহার করতে হবে।

সাধারণত হালকা চুলকানি সম্পর্কে চিন্তা করার কিছুই নেই, কিন্তু যদি চুলকানি তীব্র হয়ে উঠে, তবে এটি অবস্টেট্রিক কোলেস্টাসিস (ওসি)নামক একটি সমস্যার লক্ষণ হতে পারে, যা দ্বারা লিভারের একটি অবস্থাকে বোঝানো হয়। এই রোগ ১০০ জনের মধ্যে ১ জন গর্ভবতীর হতে পারে এবং এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

ঘন ঘন প্রস্রাব

এসময় মায়ের বর্ধিত জরায়ু সরাসরি ব্লাডারের উপরে চাপ প্রয়োগ করে যাতে মায়ের ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ পেতে পারে। এটি গর্ভাবস্থার একটি স্বাভাবিক উপসর্গ।

ঘন ঘন প্রস্রাব হয় বলে পানি কম পান করা উচিত নয়। বরং পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ইউরিন টেস্ট করিয়ে নিতে হবে কোনো ইনফেকশন আছে কিনা কিংবা ডায়াবেটিস আছে কি না তা দেখে নেওয়ার জন্য। থাকলে সে মোতাবেক চিকিৎসা  নিতে হবে।

ব্লাডারের উপর জরায়ুর চাপের কারণে অনেক সময় মায়ের ইউরিন লিক করতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে এই লিক করা তরল প্রস্রাব নাকি অ্যাম্নিওটিক ফ্লুইড। যদি নির্গত তরল পাতলা ও গন্ধহীন হয় তবে অ্যাম্নিওটিক ফ্লুইড হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পানি ভাঙ্গা বা অ্যাম্নিওটিক ফ্লুইড নির্গত হচ্ছে মনে হলে কিংবা যদি অনবরত ফোঁটা ফোঁটা তরল নির্গত হতে দেখা যায়  অথবা একসাথে অনেকটুকু তরল বেরিয়ে আসছে বলে মনে হয় সেক্ষেত্রে সিম্পটম জানিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।   

ভুলে যাওয়ার প্রবণতা

প্রায় ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ গর্ভবতী নারীরাই বলে থাকেন যে গর্ভধারণকালে  তারা কিছুটা ভুলোমনা এবং অমনোযোগী হয়ে পড়ছেন। প্রেগন্যান্ট অবস্থায় এটি ঘটতে পারে হরমোনজনিত কারণে। সবকিছু ভুলে যাওয়ার এই উপসর্গটিকে সাধারণভাবে বলা হয় অ্যামনেশিয়া (Amnesia)। কিন্তু যখন নতুন মা বা হবু মায়েদের এ ধরণের সমস্যা দেখা দেয় তখন তাকে “মমনেশিয়া” (Momnesia) নামেও অভিহিত করা হয়।

সাধারণত গর্ভাবস্থার কিছু সময় পর পর্যন্ত এই অবস্থা থাকে,  তারপর হরমোনের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসলে এই উপসর্গও আস্তে আস্তে দূর হয়ে যায়।

গর্ভাবস্থায় ভুলে যাওয়ার সমস্যা রোধে আপনার খুব বেশী কিছু একটা করার নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো যাতে ভুলে না যান, সেগুলো মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারেন, যেমন – গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে পারেন, প্রয়োজনীয় মিটিং থাকলে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে পারেন, বিভিন্ন বিষয় টুকে রাখতে ছোট নোটবুক ব্যবহার করতে পারেন। 

সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো, আপনার কাজকর্মের জটিলতা কমিয়ে ফেলুন। যেমন,  একই সাথে অনেক কাজ করা থেকে বিরত থাকুন৷ প্রথমে ঠিক করুন কোনটা বেশী জরুরি কোনটা কম, সে অনুযায়ী কাজ আগে পরে করুন। মনে রাখবেন, এই সময়ে আপনার নিজের শরীরে শক্তি থাকাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। দরকারী কাজের জন্যে শক্তি জমিয়ে রাখুন।

ব্যাক পেইন

গর্ভাবস্থায় অন্যান্য বিভিন্ন সমস্যার মত ব্যাক পেইনের কারণ হিসেবেও হরমোনকে দায়ী করা যেতে পারে। গর্ভাবস্থায় হরমোনের নিঃসরণের কারণে সন্তান জন্মদানের প্রস্তুতি হিসেবে পেলভিক এরিয়ার লিগামেন্টগুলো নরম হয়ে যায় এবং জয়েন্টগুলো শিথিল হয়ে যায়। এর ফলে মায়ের শরীর অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে এবং হাঁটার সময়, অনেকক্ষণ বসে থাকলে কিংবা চেয়ার থেকে ওঠার সময়, বা কোন কিছু তোলার সময় ব্যাথা অনুভূত হয়।

গর্ভাবস্থায় জরায়ুর আকার বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে মায়ের শরীরের ভর-কেন্দ্রও পরিবর্তিত হয় এবং পেটের পেশীগুলো সম্প্রসারিত ও দুর্বল হয়ে যায়। এর ফলে মায়ের Posture আক্রান্ত হয় এবং পিঠের উপর অতিরিক্ত চাপ পরে।

আপনি যখন বসে বসে কাজ করবেন, সোজা হয়ে বসে থাকার চেষ্টা করুন। এতে আপনার ভাল Posture বা ভঙ্গিমা বজায় থাকবে, যা আপনার ব্যাথা উপশম করতে কাজে দেবে। ।

সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। গর্ভবতী মায়েরা সাধারণত ঝুঁকে থাকেন। এতে মেরুদণ্ডের উপর আরও চাপ পড়ে। যদিও  সোজা হয়ে দাঁড়ানোটা এসময় একটু কঠিন হবে তারপরও চেষ্টা করুন যাতে দাঁড়ানোর সময় ঘাড় পেছনের দিকে থাকে। একটানা বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে না থাকার চেষ্টা করুন। দাঁড়িয়ে থাকতে হলে কিছুক্ষন পর পর বসে বিশ্রাম নিন।

এসব ছাড়াও গর্ভকালীন সময়ে মায়েরা আরও অনেক ধরণের উপসর্গ অনুভব করতে পারেন। গর্ভকালীন সব ধরণের উপসর্গ নিয়ে জানতে আমাদের আর্টিকেলটি পড়ুন।

গর্ভধারণের এ সপ্তাহে করনীয়

মায়ের পেটের আকার ও ওজন বাড়ার কারণে এসময় মায়ের ভরকেন্দ্রের পরিবর্তন হয়। এতে মায়ের শরীরের ব্যাল্যান্স রাখা একটু কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। এছাড়াও মায়ের শরীরের জয়েন্টগুলোও এসময় একটু শিথীল হয়ে যায়। তাই চলাফেরায়  একটু সাবধান হতে হবে।

কখনো যদি হোঁচট খান বা একটু পিছলে যান  তবে খুব বেশি আতঙ্কিত হবেন না। গর্ভের শিশু জরায়ুর ভেতর অ্যাম্নিওটিক স্যাকে সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে। তারপরও ছোট খাটো কোন দুর্ঘটনায়ও, নিশ্চিন্ত হবার জন্য আপনার ডাক্তারের কাছ থেকে চেকআপ করিয়ে নিতে পারেন।

বিজ্ঞাপণ

নিজের শরীরকে বোঝার চেষ্টা করুন এবং গর্ভাবস্থায় কিভাবে শরীরকে শিথিল বা রিলাক্স করা যায় তা শিখে নিন। এর ফলে যখন আপনার প্রসব বেদনা উঠবে তখন আপনি এ পদ্ধতিগুলো  ব্যাবহার করতে পারবেন।এগুলো আপনার দুশ্চিন্তা দূর করতে, জরায়ুকে আরো ভালো কাজ করতে এবং আপনাকে শক্তি সংরক্ষন করে রাখতে  সাহায্য করবে।

এসময় মায়ের শরীরে আয়রনের চাহিদা খুব বেশি থাকে। Institute Of Medicine (IOM) এর মতে, গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন ২৭ মিলিগ্রাম আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া দরকার। এই সময় যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন গ্রহণ করা না যায় তাহলে এনেমিয়া বা রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে

রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করার জন্য গর্ভবতী মাকে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে৷ গরু কিংবা খাসির কলিজা, দেশি বাচ্চা মুরগি, ডিম, মাছ, কলা, বিট, ডালিম, কচু, কচুশাক, পালং শাক ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন আছে৷ ভিটামিন সি শরীরে আয়রন শোষণে সাহায্য করে। তাই এই সময়টাতে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের চেষ্টা করুন।

গর্ভাবস্থায় ইউরিন ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যায় কারণ বর্ধিত জরায়ু ব্লাডারের উপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে যার ফলে মূত্রত্যাগের সময় মায়েদের ব্লাডার পুরোপুরি খালি হয়না। এতে ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তার করার অনেক সময় পায়। এর ঝুঁকি কমাতে নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত। দিনে অন্তত ১০ গ্লাস পানি খাওয়ার চেষ্টা করুন যাতে প্রস্রাব পরিষ্কার বা হালকা হলুদ বর্ণের থাকে। এটি শরীর হাড্রেটেড থাকার লক্ষণ।

প্রস্রাব আটকে রাখবেন না। এতে ইনফেকশনের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায় কারণ প্রস্রাবের সাথে আমাদের শরীরের ব্যাকটেরিয়া বেরিয়ে যায়। প্রস্রাব করার সময় ব্লাডার পুরোপুরি খালি করে ফেলার চেষ্টা করুন।

সেইসাথে গর্ভাবস্থা ও সন্তান লালন পালনের বিভিন্ন দিক ও মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একটু পড়াশোনা করে নিন। এতে আপনার আত্ববিশ্বাস বাড়বে এবং কিছু সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারবেন।  বিভিন্ন কাজে প্রায়োরিটি ঠিক করতে শেখা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিছু কাজ কিংবা কথা যেগুলো আপনার মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়, তা সাময়িক ভাবে এড়িয়ে চলুন।

সবশেষে মনে রাখা উচিত, গর্ভবতী মাকে সব সময় হাসিখুশি ও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে হবে। গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক অবস্থা পরবর্তীকালে শিশুর বিকাশে প্রভাব ফেলে, যা গবেষণায় প্রমাণিত। নতুন মায়েরা অনেক কিছুই জানেন না এবং অনেক ব্যাপারে নার্ভাস থাকেন। হাজার হাজার উপদেশের ভিড়ে কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল সেটিও বুঝে উঠতে পারেন না। গর্ভকালীন সময়ে যুগোপযোগী বিভিন্ন লেখা পড়ে ও এক্সপার্টদের কাছ থেকে করণীয় কি ইত্যাদি  জেনে নিতে হবে। এবং সামনের কঠিন পথ পাড়ি দেয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে । 

সবার জন্য শুভকামনা।

<<গর্ভাবস্থা – সপ্তাহ ৩০
গর্ভাবস্থা – সপ্তাহ ৩২>> 


Spread the love

Related posts

Leave a Comment