০-৩ মাস বয়সী শিশুর বিকাশে যেভাবে সাহায্য করবেন

০-৩ মাস বয়সী শিশুর বিকাশ

নতুন বাবা-মা হওয়া খুবই রোমাঞ্চকর এবং কষ্টকরও। প্রথম তিন মাস আপনার শিশুর সাথে সাথে আপনিও বাড়তে ও শিখতে থাকবেন। আপনার সাথে সময় কাটানোর চাইতে অন্য কিছু আর গুরুত্বপূর্ণ নয় আপনার শিশুর কাছে। আপনি যখন আপনার শিশুকে খাওয়ান, জড়িয়ে ধরেন, তার সাথে কথা বলেন ও খেলা করেন সে-সবের মাধ্যমে আপনি তার মনে মধ্যে আত্মবিশ্বাস, কৌতূহল ও কথা বলার বোধশক্তি সৃষ্টি করেন। আপনি তাকে অনুভব করতে দেন যে সে ভালবাসার পাত্র, তার যোগ্যতা আছে, এবং তার চারিদিকে বিরাট এই পৃথিবীর মাঝে সে নিরাপদ।

শিশুরা যদি কথা বলতে পারতো

বাচ্চার খিদে পেলে, ঠাণ্ডা লাগলে, কাপড় ভিজিয়ে ফেললে কিংবা আপনাকে দেখতে না পেলে সে কান্না করে। প্রথম প্রথম আপনাকে প্রত্যেকবারই তার কাছে যেতে হবে। সে মুখে কিছু চোষার শব্দ করেও কিছু বলতে চাইতে পারে যার থেকে বুঝে নিতে পারেন যে সে আদর চায় বা কিছু খেতে চায়। খেতে খেতে সে ক্লান্ত হলে বা পেট ভরে গেলে অন্যদিকে মুখ ঘুড়িয়ে নিতে পারে। তার জীবনে সে নির্ভরযোগ্য এবং সোহাগপূর্ণ অন্তত একজনকে চায়, যদিও পুরো পরিবারই তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সে দাদা-দাদি, নানা-নানী, সেবাপ্রদানকারী ও যারা তার দেখাশোনা করে তাদের সঙ্গ পেতে পছন্দ করে। তার পরবর্তী জীবনের চলার পথের অনেক কিছু সে তাদের কাছ থেকে শিখতে পারবে। তার ডায়াপার আপনাকে ঘন ঘন বদলাতে হবে। সেটা করার সময় দুজনে হালকা মজাও করতে পারেন। বাচ্চা আপনার গান শুনতে এবং তার পেটে শুরশুরি দেয়া পছন্দ করতে পারে। বাচ্চা ঘুঘুধ্বনি করতে পারে এবং আপনার সাথে অবোধ্য ভাষায় কথা বলতে পারে, তবে সে বেশী পছন্দ করে যখন আপনি তার সাথে বড়দের মত করে কথা বলেন। এ থেকে শব্দ ও ভাষা শিখতে তার সুবিধা হয়।

স্বাস্থ্যবান  শিশু গঠনে করণীয় (০-৩) মাস

নিরাপত্তা

নিশ্চয়তা

  • যত ঘন ঘন পারেন শিশুকে কোলে নেবেন, বিশেষ করে যখন তাকে খাওয়াবেন।
  • শিশুকে খাওয়াবার সময় তার সাথে ধীরে ধীরে আদুরে গলায় কথা বলবেন।
  • আপনার শিশুকে আপনি নষ্ট করতে পারেন না। সে কেঁদে উঠলে তাকে কোলে তুলে নেবেন। তাকে শান্ত করার জন্য বিভিন্ন উপায় বেছে নেবেন যেমন দুধ খাওয়ানো, জড়িয়ে ধরা, দোল খাওয়ানো, তাকে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করা।

স্বাস্থ্য

  • যদি সম্ভব হয় শিশুকে আপনার বুকের দুধ খাওয়ান। বুকের দুধ অ্যালার্জি ও অন্যান্য রোগ-এর স্বাভাবিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।
  • আপনার শিশুকে নিয়মিত চেক-আপ করাতে নিয়ে যান এবং নিশ্চিত করুন যেন জন্মের প্রথম তিনমাসের ভেতর তার প্রয়োজনীয় টিকা তাকে দেয়া হয়।

জ্ঞান অর্জন

  • শিশু দেখতে পায় এমন সীমার দূরত্ব থেকে ধীরে ধীরে সামনে-পিছে একটা খেলনা দোলাতে থাকুন যেন শিশু তার চোখের মণিও এদিক ওদিক করে এবং তার মাথাও সাথে সাথে নাড়তে পারে।
  • শিশুর সাথে ঘন ঘন কথা বলে ও তার সামনে গান করে তার কথা বলার দক্ষতা বাড়িয়ে তুলুন।
  • আপনার বাচ্চা জন্মানোর সাথে সাথেই সে আপনার গলার আওয়াজ চিনবে এবং সেদিকে মুখ ঘোরাবে। জন্মের মুহূর্ত থেকেই আপনার বাচ্চা সব কিছু শুনছে, সুতরাং তার সাথে কথা বলে যান।

সমন্বয়সাধন

  • আপনার শিশু যখন কেঁদে ওঠে তাকে কোলে তুলে নিন ও সান্তনা দিন। বিজ্ঞানীদের মতে শিশুর কান্নাকে অবহেলা করা মোটেও উচিত নয়। কেননা, এমন অবহেলা শিশু বিকাশে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
  • কোলে দুলিয়ে, জড়িয়ে ধরে, খাইয়ে বা হেঁটে আপনার শিশুকে শান্ত করুন।
  • একজন মা কিংবা বাবা হিসাবে আপনিই হলেন আপনার বাচ্চার ভালো খেলার সাথী, সুতরাং তার সঙ্গে খেলা করার জন্য প্রতিদিনই সময় দেওয়ার চেষ্টা করুন।
  • নবজাতক বাচ্চারা শারীরিক খেলাধুলা পছন্দ করে, বিশেষ করে যখন আপনি তাদের মুখে হালকাভাবে সুড়সুড়ি দেবেন বা তাদের হাত-পায়ের আঙ্গুলগুলি গুনে খেলা করবেন।
  • মাত্র কয়েক মিনিট বয়সের বাচ্চারা, যদি তারা পরিতৃপ্ত ও সচেতন থাকে, চারপাশের লোকজনের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। ধীরে ধীরে আপনার মুখ হা করার কিংবা জিভ বের করার চেষ্টা করে দেখুন- আপনার বাচ্চা হয়তো আপনার নকল করবে।

কি আশা করতে পারেন

মনে রাখবেন প্রত্যেক শিশু আপনাপন গতিতে বিকাশ লাভ করে। এগুলো শুধু নীতিসম্পর্কিত নির্দেশাবলী। আপনার শিশুর বিকাশলাভ সম্পর্কে আপনার যদি কোন উদ্বেগ থাকে, তাহলে আপনার ডাক্তার বা অন্য কোন বিশ্বাসভাজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করুন।

  • নবজাতক শিশুরা দিনে ১৪-১৮ ঘণ্টা ঘুমায়।
  • নবজাতক শিশুরা ২০ থেকে ৩০ সে.মি. (৮ থেকে ১২ ইঞ্ছি) দূরত্ব পর্যন্ত দেখতে পায়। তাই আপনি যখন তার সাথে কথা বলেন বা তার উদ্দেশ্যে গান করেন, তাকে আপনার মুখের কাছাকাছি রাখবেন।
  • চার সপ্তাহ বয়সে আপনার শিশু বুঝতে পারবে কোন শব্দ কোথা থেকে আসে।
  • তার প্রিয় শব্দ হচ্ছে আপনার গলার স্বর
  • দুটো নরম জায়গা ও দুর্বল গলাসহ নবজাতক শিশুর মাথা সাধারনত বড় হয়। খুব যত্নের সাথে তাদের মাথা ও ঘাড় ধরবেন যখন তাদের তুলবেন বা বহন করবেন।
  • ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে শিশু দৈনিক গড়পড়তা তিন ঘণ্টা করে কান্না করে থাকে।
  • বেশী খাওয়ানোর কারণে কোন শিশু উগরে ফেলতে বা মুখে থুথু উঠাতে পারে। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। বমি করা ভিন্ন ব্যাপার। আপনার শিশু যদি এমন জোরে বমি করে যার ফলে এদিক ওদিক ছিটকে পরে তাহলে ডাক্তার দেখাবেন।

নবজাতক শিশু জন্মের পর প্রথম একমাস প্রায় ঘুমিয়েই কাটায়। একমাত্র ক্ষুধা, আকষ্মিক চমকে ওঠা অথবা অন্য কোনো অসুবিধাজনক কারণ ছাড়া সে সহজে সজাগ থাকে না। অনেক শিশু দিনে বেশি ঘুমায় ও রাতে সজাগ থাকে। ক্রমে ক্রমে তার ঘুমের পরিমাণ কমে যায়। এই বয়সে শিশু শোয়া অবস্থায় হাত-পা একসঙ্গে নাড়তে থাকে। এই বয়সে শিশু ক্ষুধা পেলে কান্না করে মোচড়াতে থাকে, হাতের কাছে যা পায় যেমন- কাপড়, চুল ইত্যাদি দৃঢ় মুষ্টিতে আঁকড়ে ধরে মুখে দিতে চায়। প্রথম মাসে শিশুকে শূন্যে উপুড় করে ধরলে মাথা সামান্য উঁচু করতে পারে, উচ্চ শব্দ হলে কাঁদে বা ভয় পায়, হাসতে পারে, শব্দের দিকে তাকায়।

দুই মাস বয়সে শিশুরা মাথা বা ঘাড় সোজা করতে পারে, মাথা সামান্য উঁচু করে কোনো কিছুর দিকে তাকাতে পারে, শিশু নিজের মনেই ‘ও’, ‘ও’, ‘আ’, ‘আ’ শব্দ করে। এই বয়সে শিশুর শ্রবণশক্তি বৃদ্ধি পায়। শিশুর সঙ্গে খেলা করলে আনন্দ প্রকাশ করে, প্রিয় ব্যক্তির কোলে উঠতে চায়। বকুনি, ধমক ও হাসি এসব বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিশু বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া করে। গোসলের সময় নিজে হাত-পা দিয়ে পানি নাড়তে ভালোবাসে।

এই  বয়সে বাচ্চাদের পর্যাপ্ত যত্নের প্রয়োজন। বাচ্চাকে অনেক যত্নের সাথে নাড়াচাড়া করানো, সব সময় পাশে থাকা, নির্দিষ্ট সময় পর পর বুকের দুধ খাওয়ানো, হালকা গান গেয়ে ঘুম পাড়ানো ইত্যাদি বাবা-মায়ের খুব সতর্কতার সাথে করতে হয়।

মাস অনুযায়ী শিশুর বেড়ে ওঠা সম্পর্কে জানতে পড়ুন-

আপানার নিজের যত্ন নেবেন

বাচ্চা জন্ম নেয়ার পর প্রথম কয়েকমাস আপনি হয়তো বেশ আবেগপ্রবণ বা ক্লান্ত বোধ করবেন। সন্তান প্রসবের পর শরীরের কোন অংশে যন্ত্রণা বোধ করতে পারেন, এবং সেই সাথে আপনার হরমোন পরিবর্তন হতে পারে যার ফলে গভীর আবেগপ্রবনতা সৃষ্টি হতে পারে। কোনো কোনো মহিলা সন্তান প্রসবের পর বিষণ্ণতায় ভুগতে থাকেন। সময়ের সাথে এটা চলে যায়। কিন্তু আপনি যদি দু সপ্তাহের পরও এরকম অবস্থা নিয়ে মনমরা হয়ে থাকেন, তাহলে আপনার ডাক্তারকে জানান। প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা একটি গুরুতর সমস্যা। এটা আপনার দোষ নয় এবং এর চিকিৎসায় সাহায্য পাওয়া যায়।

নতুন বাবাও অতিমাত্রায় আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে, যেমন মাত্রাতীত কমনীয়তা ও দায়িত্বজ্ঞানপূর্ণ মনোভাব। প্যাটার্নিটি ছুটি নিন কিংবা কিছুদিনের জন্য কাজ থেকে অবসর গ্রহন করুন। আপনার শিশুকে ভালোভাবে চিনতে জানতে পারার সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে তার দেখাশোনা করার জন্য তার সাথে সময় কাটানো।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment