শিশুর হ্যান্ড, ফুট এন্ড মাউথ ডিজিজ বা হাত,পা ও মুখের রোগ

হ্যান্ড, ফুট এন্ড মাউথ ডিজিজ বা হাত, পা ও মুখের রোগ (HFMD)  কি?

হাত, পা ও মুখের রোগ (HFMD) অত্যন্ত সংক্রামক একটি ব্যাধি। এন্টেরোভাইরাস পরিবারের কক্সাকি ভাইরাসের আক্রমণ এই রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। এই ভাইরাস ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সরাসরি ছড়িয়ে পরে অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে। এছাড়াও আক্রান্ত ব্যক্তির লালা, মল ও নিঃশ্বাসের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। HFMD  হলে মুখে ফুসকুড়ি বা ঘা হয় এবং হাত পায়ে র‍্যাশ হয়। যেকোন বয়সের মানুষেরই এই রোগ হতে পারে তবে ৫ বছরের কম বয়সের শিশুদের বেশি হয়।

এটি সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তবে খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে এ রোগ থেকে ভাইরাল মেনিনজাইটিস ভাইরাল মেনিনজাইটিস, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) বা পক্ষাঘাত (পোলিওর মত) হতে পারে।

শিশুদের হ্যান্ড ফুট এন্ড মাউথ ডিজিজের লক্ষণগুলো কি কি?

HFMD এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে ৩-৭দিন সময় নেয়। এই সময়টাকে ইনকিউবেশন পিরিয়ড বলে। লক্ষণগুলো যখন স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় তখন শিশুর যে অভিজ্ঞতাগুলো হতে পারে তা হল- জ্বর, খাওয়ার রুচি কমে যাওয়া, গলা ব্যথা, মাথা ব্যথা, মুখে লাল ও ব্যথাযুক্ত ফুসকুড়ি হওয়া, হাতের তালু ও পায়ের পাতার নীচে লাল র‍্যাশ হওয়া। HFMD এর প্রাথমিক লক্ষণ জ্বর ও গলাব্যথা আগে প্রকাশ পায়। ১/২ দিন পর ফুসকুড়ি ও র‍্যাশ দেখা দেয়।

লক্ষণগুলো হোল-

  • ভাইরাল সংক্রমণের সঙ্গে রোগীদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে জ্বর দেখা যায় ।
  • নবজাতক  এবং শিশু বদমেজাজী হয়ে যায়।
  • জিভ এবং কখনও কখনও গালের ভিতরে ফোসকা (প্রায়ই বেদনাদায়ক) হয়। ফলে, শিশুদের খেতে  অসুবিধা হয়।
  • গলায় ঘা হবার কারণে খিদে কমে যায়।

পায়ের উপর ,বেশিরভাগ পাতার নিচে, হাত, কোমর, হাঁটু এবং কখনও কখনও এমনকি যৌনাঙ্গ এলাকায় লাল লাল ফুসকুড়ি হতে পারে। তবে এগুলোতে চুলকানি থাকেনা। জ্বরের সাধারণত এক বা দুই দিন পরে ফুসকুড়ি দেখা যায়। যদি লাল লাল ফুসকুড়ি এবং ফোস্কা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে থাকে এবং খাওয়া, পান করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে শিশু অস্বস্তির সম্মুখীন হয়, তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

শিশুদের হ্যান্ড ফুট এন্ড মাউথ ডিজিজ কি ছোঁয়াচে?

এটি ছোঁয়াচে। এর ভাইরাস নাক এবং গলা থেকে নির্গত পদার্থ, ফুসকুড়ি বা মল থেকে ছড়াতে পারে। লক্ষণ দেখা দেয়ার প্রথম সপ্তাহে এটি দ্রুত ছড়াতে পারে। তবে এর পরেও ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।

শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা

প্রায়ই শারীরিক লক্ষণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই রোগটি শনাক্ত করে থাকেন ডাক্তার। এছাড়াও গলা থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে বা স্টুল পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাস শনাক্ত করা যায়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ইনফেকশন ৭-১০দিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়। এই রোগের প্রতিকারে ডাক্তারের তেমন কিছু করার নেই। তবুও চিকিৎসক উপসর্গ যেমন জ্বর ও ব্যাথা কমার জন্য ব্যবস্থাপত্র দিতে পারেন। ফুসকড়ি ও র‍্যাশ কমার জন্য সাময়িক মলম বা অয়েন্টমেন্ট, ব্যথার ঔষধ যেমন- অ্যাসিটামিনোফেন বা আইবুপ্রোফেন, গলা ব্যথার জন্য সিরাপ বা লজেন্স খাওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। মনে রাখতে হবে বাচ্চাকে কখনো এস্পিরিন দেয়া উচিত নয়।

ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখবেন বাচ্চার পানিশূন্যতার কোন লক্ষণ আছে কিনা। কারণ মুখের ঘা এর কারণে বাচ্চার দুধ বা পানি পান করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে। যদি আপনি বাচ্চার পানিশূন্যতার কোন লক্ষণ দেখেন, যেমন শুকনো মুখ বা স্বাভাবিকের চাইতে কম প্রস্রাব করা, তাহলে দ্রুত ডাক্তারকে জানান।

যদি বাচ্চার বয়স ৩ মাসের কম হয় এবং জ্বর ১০০.৪ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা তার বেশি হয় তবে দ্রুত ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। এই বয়সের বাচ্চার এই ধরনের জ্বরের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া দরকার। বাচ্চার এই রোগ হলে বাচ্চার শরীরের তাপমাত্রা খেয়াল রাখতে হবে এবং তার খাবার এবং তরল গ্রহণের দিকে নজর দিতে হবে।

কিছু ঘরোয়া পদ্ধতির মাধ্যমেও HFMD এর লক্ষণগুলোর উপশম করা যায় যেমন- বরফ চোষা বা আইসক্রিম খাওয়া, ঠাণ্ডা শরবত পান করা এবং লবণাক্ত ও মসলাদার খাবার বাদ দেয়া ও লেবু জাতীয় ফল কিছুদিনের জন্য না খাওয়া ইত্যাদি। উষ্ণ গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গার্গল করলে গলা ব্যথা কমবে। বাচ্চা যদি গার্গল করতে শেখে তবে দিনে কয়েকবার এটি করতে পারেন।

প্রতিরোধ

  • HFMD থেকে প্রতিরক্ষার প্রধান উপায় হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
  • নিয়মিত হাত ধুলে এই রোগের সংক্রমণ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
  • সাবান দিয়ে কিভাবে হাত পরিষ্কার করতে হয় তা আপনার সন্তানকে শিখিয়ে দিন।
  • অপরিষ্কার হাত যেন মুখে না দেয় সেটি আপনার সন্তানকে বুঝিয়ে বলুন।
  • আপনার সন্তান যেনো খাওয়ার পূর্বে, ওয়াশরুম ব্যবহারের পর ও বাহির থেকে ফিরে যাতে অবশ্যই হাত ধুয়ে নেয় সেদিকে খায়াল রাখুন। নবজাতকের ক্ষেত্রে আপনি এবং বাসার অন্যান্য সদস্যরা এসব নিয়ম মেনে চলুন।
  • আপনার ঘর ও এর চারপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন।
  • শিশুর মধ্যে HFMD এর লক্ষণ দেখা দিলে তাকে স্কুলে না পাঠানোই ভালো। এতে অন্যরা সংক্রমিত হবে না। বড়দের ক্ষেত্রেও কর্মক্ষেত্রে বা মানুষের সান্নিধ্যে  না যাওয়াই ভালো।
  • শিশুদের ভাইরাস সংক্রামিত হলে চুম্বন বা আদর করা এড়িয়ে চলুন।
  • সংক্রমিত শিশুর ডায়াপার পরিবর্তন করার পরে আপনার হাত ধুয়ে নিন। গ্লাভসও ব্যবহার করতে পারেন।
  • অপরিস্কার এবং হাত না ধুয়ে আপনার চোখ, মুখ এবং নাক স্পর্শ করবেন না।
  • কাশি এবং হাঁচি দেত্তয়ার সময় একটি রুমাল ব্যবহার।

HFMD এর লক্ষণগুলোর সাথে চিকেনপক্সের অনেক মিল আছে। তবে পার্থক্য হল HFMD  এর ক্ষেত্রে হাতে, পায়ে ও মুখে ফুসকুড়ি দেখা যায় এবং এটি একের অধিকবার হতে পারে।

সবার জন্য শুভকামনা।

 

 

 

Related posts

Leave a Comment