গর্ভাবস্থায় স্তনের পরিবর্তন এবং তা থেকে স্বস্তির উপায়

গর্ভাবস্থায় শরীরের স্বাভাবিক সব প্রক্রিয়ার একটি বিরাট পরিবর্তন ঘটে। যার প্রভাবে স্তনবৃন্ত বা নিপল আকারে বড়, সংবেদনশীল এবং গাঢ় রং ধারণ করে। আপনি যদি গর্ভবতী হন তাহলে তার প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্তন অতি সংবেদনশীল হয়ে যাওয়া, ব্যথা করা ও শিরশির করা। গর্ভাবস্থার তৃতীয় বা চতুর্থ সপ্তাহ থেকে আপনার এই অনুভূতিগুলো শুরু হবে।

গর্ভাবস্থায় স্তনের পরিবর্তন কেমন হতে পারে?

গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক কারনেই স্তনের আকৃতিগত পরিবর্তন দেখা দেয়। এটিই প্রকৃতির নিয়ম। ৬-৮ সপ্তাহের দিকে স্তন এর আকার বৃদ্ধি পাওয়া শুরু হতে পারে যা পুরো গর্ভকালীন সময় ধরে চলে।

এসময় স্তনের স্নেহ গ্রন্থি গুলো ক্রমশ পুরু হতে থাকে এবং দুগ্ধ গ্রন্থিতেও অতিরিক্ত রক্তও যোগ হয়। কিছুটা অস্বস্তিদায়ক হলেও এই পরিবর্তন গুলি তাৎপর্যময়। এর ফলে শিশুকে বুকের দুধ দেওয়ার জন্য আপনার স্তন প্রস্তুত হয়ে ওঠে।

গর্ভাবস্থার পুরো সময়জুড়ে আপনার স্তন বড় হতে থাকবে। আপনার কাছে এই পরিবর্তন বেশ নাটকীয় মনে হতে পারে, বিশেষ করে যদি আপনি প্রথমবারের মতো গর্ভবতী হয়ে থাকেন। সাধারণ হিসেবে সন্তান ভূমিষ্ট হবার সময় পর্যন্ত আপনার স্তনের আকার স্বাভাবিক সময়ের চাইতে দুই কাপ সাইজ বড় হতে পারে। স্তনের আকার বাড়ার কারণে সেখানে স্ট্রেচ মার্কস দেখা দিতে পারে এবং চুলকানি হতে পারে।

এই সময় আপনার স্তনের চামড়ার নীচের শিরা উপশিরা বাইরে থেকে দৃশ্যমান হতে পারে। এবং প্রথম কয়েক মাস পর নিপলের চারদিকের কালো অংশ অর্থাৎ এরিওলাও তুলনামূলকভাবে বড় হয়ে যায়।

গর্ভাবস্থায় এরিওলার সেবাসিয়াস গ্রন্থিগুলো বেশি সক্রিয় হবার ফলে সেখানে ১৫/২০টি বড় বড় দানা দেখা যায়, যাকে ডাক্তারি ভাষায় মন্টগোমেরী’স টিউবারকল বলে এবং স্তনকে breast feeding এর জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। এগুলোকে চাপবেন না বা দূর করার চেষ্টা করবেন না। মুখের ব্রন এর মত এগুলো অপ্রয়োজনীয় নয়।

এ সময় আপনার স্তন এতই সংবেদনশীল হয়ে যাবে যে সামান্য কাপড়ের ঘষাও আপনার কাছে অসহ্য লাগবে। আপনার স্তনে হাত দিলেও এখন আর আপনার ভালো লাগবে না। এ অবস্থা অবশ্য ঠিক হয়ে যাবে। প্রথম তিন মাস পার হয়ে গেলেই এই অসহ্য ব্যাথার অনুভূতি কমে যাবে।

মাঝের তিন মাসে আপনার গর্ভাবস্থায় কার্যকরী হরমোনের ক্ষরণও স্থিতিশীল হবে। তবে তাতে যে আপনার স্তনের ব্যথা হওয়ার ভাব একেবারে কমে যাবে তা নয়। আর গর্ভাবস্থার পুরো সময় জুড়েই কম-বেশী স্পর্শকাতরতা থাকবে।

গর্ভবতী মহিলাদের স্তন থেকে তরল নিঃসৃত হতে পারে। পুরু, চটচটে, হলদেটে কমলা রঙের যে তরল পদার্থ বেরিয়ে আসে তা আসলে দুধ নয়, সেটি প্রকৃতপক্ষে কোলোস্ট্রাম। কোলোস্ট্রাম শিশুর জন্য পুষ্টিগুণ সম্পন্ন একটি তরল।

গর্ভবতী অবস্থায় কোলোস্ট্রাম চুঁইয়ে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে আপনার বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত নয়। এটি গর্ভাবস্থার অতি সাধারণ একটি উপসর্গ। কিছু মহিলার গর্ভধারণের ১৪ সপ্তাহের মধ্যে এমন হতে পারে, অন্যরা অনেক পরে এটি অনুভব করতে পারে বা আদৌ নাও করতে পারে।  কখনও কখনও আপনার একটি স্তন থেকে নিঃসরণ হতে পারে য়াবার কখনও উভয় স্তন থেকে।  একই সময়ে কিছু নারীর বেশী পরিমাণে নিঃসরণ হতে পারে এবং কারো খুব কম হতে পারে।  যাই হোক না কেন, এটি নবজাতককে মাতৃদুগ্ধ যোগাবার জন্য শুধু মাত্র একটি দৈহিক প্রস্তুতি।

উপরন্তু, যদি পুরো গর্ভাবস্থায় আপনার একবারও স্তন থেকে নিঃসরণ না হয়, তবুও চিন্তার কিছু নেই কারণ সেটিও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং কোনোভাবেই শিশুর জন্মের পর বুকে দুধ আসা না আসা কে প্রভাবিত করে না। তবে, যদি আপনার কাছে পুঁজের মতন মনে হয় অথবা ব্যাথা অনুভব হয়, নিজের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় তবে দ্রুত আপনার চিকিৎসকের সাথে সাক্ষাত করবেন।

কখনো কখনো গর্ভবতী মায়েদের স্তনে মাংসপিণ্ডের মত কিছু অনুভূত হতে পারে। এগুলো সাধারণত তেমন ভয়ের কারণ নয়। দুধ জমে যাওয়ার জন্য এমন হতে পারে। গর্ভাবস্থায় সাধারণত স্তনে তেমন কোনও জটিলতা দেখা দেয়না, যেমন- স্তন ক্যান্সার। তবু এধরনের কিছু দেখা গেলে একবার ডাক্তারের কাছ থেকে চেক আপ করিয়ে নেয়া দরকার।

গর্ভাবস্থায় স্তনের অস্বস্তির সাথে মোকাবিলা করা

স্তনের পরিবর্তন কিছু অস্বস্তি এবং কোন কোন সময়ে যন্ত্রণার সাথে সম্পর্কিত হতে পারে। নীচে কিছু পরামর্শ দেওয়া হল যেগুলি হয়তো আপনাকে স্তনের পরিবর্তনের সাথে যুক্ত অস্বস্তি নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করতে পারে:

সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে একটা ভালো আর মাপসই ব্রা পরা। কিন্তু সেটা যেন কাপের নিচে তার দেয়া ব্রা না হয়। আপনার পরিবর্তনশীল স্তনের জন্য সেগুলো এখন উপযোগী নয় এবং আপনি আরামও পাবেন না।

ডিপার্টমেন্টাল স্টোর বা মেটারনিটি শপে বিশেষজ্ঞ কারো সাহায্য নিয়ে মাপসই ব্রা কিনুন। যদি সেরকম কাউকে না পান তাহলে ফিতা দিয়ে স্তনের নিচে এবং সবচেয়ে ফোলা অংশের মাপ নিয়ে আপনার ব্রা এর মাপ এবং কাপ-এর মাপ বের করে নিন।গর্ভাবস্থায় আপনার একাধিকবার ব্রা-এর মাপ বদলাতে হতে পারে। স্তনের আকার বদলানোর সাথে সাথে মাপসই ব্রা পরার চেষ্টা করুন।

আপনি যখন ব্যায়াম করবেন তখন আপনার ক্রমাগত ভারী হয়ে ওঠা স্তনদ্বয়কে আরামদায়কভাবে ধরে রাখার মতো একটা মাপসই ব্রা পরা খুব জরুরি।

আপনার ব্রা আপনার স্তনবৃন্তে অস্বস্তি সৃষ্টি করছে না তা নিশ্চিত করুন। সিন্থেটিক ব্রায়ের পরিবর্তে সুতির ব্রা বেছে নিন কারন ওগুলি বেশি আরামদায়ক।

আপনি বুঝতে পারবেন আপনার ব্রা সঠিক মাপের হয়েছে যদি:

  • আপনি বুঝতে পারেন এটি অত্যন্ত আঁটসাঁট অথবা অত্যন্ত ঢিলে নয়
  • ব্রাটি নীচে, ওপরে অথবা পাশে কোন স্ফীতি ছাড়াই সমস্ত স্তন আচ্ছাদন করে থাকে।

মাতৃত্বকালীন ব্রা পড়ার চেষ্টা করুন, যা আরও বেশি অবলম্বন প্রদান কর। এরকম ব্রাগুলিতে বোতামের আরও অধিক সারি থাকে যাতে আপনার শরীর পরিবর্তনের সাথে সাথে আপনি তা মানিয়ে নিতে পারেন। আরামদায়ক অনুভূতি এবং অতিরিক্ত অবলম্বন প্রদান করার কারণে, ঘুমনোর সময় বেশিরভাগ মহিলারা মাতৃত্বকালীন ব্রা পছন্দ করেন।

যদি আপনার স্তন থেকে ক্ষরণ হয় তবে ফেলে দেওয়ার মত অথবা ধুয়ে ফেলা যায় এমন স্তনপটি (ব্রেস্ট প্যাড) হল ভালো বিকল্প। আরও ভালো ফলের জন্য, গোসলের আগে এবং পরে প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্য আপনার স্তন বাতাসে শুকিয়ে নিন।

আপনার স্তনবৃন্ত ও তার চারপাশের অংশে সাবান ব্যবহার করা এড়িয়ে চলুন কারন সাবানের ত্বক শুষ্ক করে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। স্তনের বোঁটা বা নিপল যাতে ফেটে না যায় এবং গঠন সুঠাম হয় সেজন্য গ্লিসারিন মাখতে পারেন অথাব বোঁটা সামনের দিকে একটু টেনে আঙুলে তেল (অলিভ ওয়েল হলে ভালো হয়) নিয়ে বুড়ো আঙুলের সাহায্যে আস্তে আস্তে ম্যাসেজ করতে পারেন৷ এতে পরে নবজাতকের স্তন্যপানের সুবিধা হয়৷

স্তনে যদি মাংস পিণ্ড দেখা যায় তাহলে গরম পানি ব্যাবহার করতে পারেন। গোসলের সময় স্তনের উপর গরম পানি ঢালুন বা গরম পানিতে কাপড় চুবিয়ে তা স্তনের উপর দিয়ে রাখুন। এতে কয়েকদিনের মধ্যে নিরাময় হতে পারে। যদি না যায় বা কোন সন্দেহ হয় তবে ডাক্তারকে জানাতে হবে।

যদি এই সমস্ত সবাধানতা অবলম্বন করার পরেও আপনি অস্বস্তি অথবা যন্ত্রণা অনুভব করেন, আপনার চিকিৎসকের সাথে কথা বলার ব্যাপারে ভাবুন। গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের সাথে আলোচনা না করে নিজে নিজে ওষুধ গ্রহণ করবেন না।

গর্ভাবস্থায় স্তনে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য না করা কি খারাপ কিছু ইঙ্গিত করে?

গর্ভাবস্থায় অনেকেই স্তনের পরিবর্তন লক্ষণ করেন ঠিকই তবে অনেকের আবার কোন পরিবর্তন নাও হতে পারে। এটা খুবই স্বাভাবিক। এতে ভয়ের কোন কারণ নেই বা এর মানে এই নয় যে আপনি বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন না। তবে বাচ্চার জন্মের পড় যখন বুকে দুধ আসা শুরু হয় তখন আপনি বিভিন্ন পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারেন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment