শিশুর সেপারেশান অ্যাংযাইটি । নিরাপত্তাহীনতা । প্রিয়জনকে হারাবার ভয়

আজকে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আপনাদের সাথে শেয়ার করব। বাবা মা বাইরে কোনো কাজে অথবা অফিসে গেলে ছোট শিশুদের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে সেটি নিয়ে খুব সুন্দর করে এক্সপার্টরা আলোচনা করেছেন BabyCenter – এ । সেখান থেকেই আমি যা শিখলাম তাই নিজের মতো করে লিখছি।

জন্মের পর থেকে শিশুর মানসিক বৃদ্ধি বা বিকাশ বিভিন্ন ধাপে হয়ে থাকে। ধাপে ধাপেই তারা পরিণত হয়।মানসিক বিকাশের শুরুর দিকে, অর্থাৎ জন্মের পরপরই অনেকের সাহায্য পেয়ে থাকলেও বিশেষ একজনের ওপরই তারা সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভর করার বিষয়টিকে, অন্যভাবে বলতে গেলে দুজনের ভেতর এই বোঝাপড়ার বিষয়টিকে মানসিক স্বাস্থ্যের ভাষায় বলা হয় ‘অ্যাটাচমেন্ট’। যার ওপর নির্ভরতা আসে, সেই মানুষটিকে বলা হয় ‘অ্যাটাচমেন্ট ফিগার’। সাধারণত শিশুদের মায়ের সঙ্গেই এই অ্যাটাচমেন্ট তৈরি হয়। তাই অ্যাটাচমেন্ট ফিগারটি হয়ে থাকেন ‘মা’। মা ভিন্ন বাবা কিংবা অন্য যে কেউই হতে পারে, যার সঙ্গে শিশুটির মানসিক বা ইমোশনাল সম্পর্ক তৈরি হয়।

শিশুটি যখন অ্যাটাচমেন্ট ফিগার থেকে কোনো কারণে দূরে যায় তখনই তাদের মধ্যে একধরনের ভীতি তৈরি হয়। কখনো পরিচিত পরিবেশের বাইরে গেলেও শিশুদের মধ্যে এমন উদ্বিগ্নতা দেখা যায়। এভাবে আলাদা বা সেপারেটেড হওয়ার জন্য যে অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগ তৈরি হয় সেটিকেই বলে সেপারেশান অ্যাংযাইটি।

এ ব্যাপারটি কম বেশী সব বাচ্চার মধ্যেই দেখা যায় আর এটি তাদের মানসিক বৃদ্ধির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিছু কিছু শিশুর ক্ষেত্রে এটি একটু অতিরিক্ত মাত্রায় হয়ে থাকে। বাবা মা কাজে গেলে বিশেষ করে চাকুরীজীবী মা হ’লে বেশিরভাগ বাচ্চাই এইধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে এবং তাদের বিভিন্ন আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। সেক্ষেত্রে যারা মায়ের অনুপস্থিতিতে বাচ্চার দেখাশোনা করছেন, তাদের জন্য বিষয়টি একটু কষ্টকর হয়ে পড়ে।

অনেক মা বাবাই লুকিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান বাচ্চা খুব কান্নাকাটি করবে দেখে, এতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিশুরা অনেক বেশী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, কারণ তারা বিষয়টি বুঝতে পারে না। তার সবচেয়ে আপনজন হঠাৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো বলে এই নিরাপত্তাহীনতা অনেক গুনে বেড়ে যায়। অনেক বাচ্চাই মা বাড়িতে ফিরলে কাঁদতে শুরু করে এবং মায়ের সঙ্গ উপভোগ না করে সারাক্ষণ মা-কে আঁকড়ে ধরে রাখে এবং অসম্ভব খিটখিটে আচরণ করে। একক পরিবারে এই সমস্যাটি তীব্রতর। অনেক বাচ্চা নতুন অথবা সল্প পরিচিত মানুষ দেখলে অস্বাভাবিক আচরণ করে, ভয় পায় অথবা কান্না করতে থাকে, এসব আচরনের পিছনে মুল কারণ বহির্জগতের প্রতি শিশুর নিরাপত্তাহীনতা এবং ভীতি। এসমস্ত ক্ষেত্রে মা বাবা এবং অন্যান্য যারা বাচ্চার দেখাশোনা করেন তাদের অনেকখানি ভুমিকা কাজ করে।

কোন বাচ্চা নতুন কারো কোলে যেতে না চাইলে কখনো জোর করা উচিৎ নয়, বাসায় অতিথি এলেও অনেক সময় এ ব্যাপারটি ঘটে। এই বয়সি বাচ্চারা খুবই আদরের হয়, কোনও সন্দেহ নেই- তবে জোর করে কোলে নিলে অথবা বাচ্চা যার কাছে থাকতে চাইছে না জোর করে তার সাথে থাকতে বাধ্য করলে বাচ্চার নাজুক মনে অনেক গভীর প্রভাব পড়তে পারে।

চাকরিজীবি মা/ বাবা যখন অফিসে যান, বাচ্চাকে বিদায় দিন দরজায় দাঁড়িয়ে, তাকে বুঝিয়ে বলতে থাকুন যে মা/বাবা কাজে যাচ্ছেন এবং আবার ফিরে আসবেন, বাচ্চারা ভাষা বুঝতে না পারলেও ‘টোন’ বুঝতে পারে, এবং গলার স্বরে যতদুর সম্ভব আন্তরিকতা মিশিয়ে বলতে থাকুন। বাচ্চা কাঁদলেও আপনি তাকে আদর করে হাসি মুখে বিদায় দিন। কয়েকদিনের মধ্যেই সে বুঝতে পারবে তার মা/বাবাকে এই সময় যেতে হয়।

আপনি বেরুবার সময় সে একটু অসন্তোষ প্রকাশ করলেও বাকি দিনটি অনিরাপদ মনে করবে না, কারণ সে বুঝতে শিখবে আপনি নির্ধারিত সময়ে ফিরে আসবেন। একটু ধৈর্য ধরে আপনার মুখে হাসি এবং কণ্ঠস্বরে ভরসা অক্ষুন্ন রাখুন। তবে এক্ষেত্রে যা একেবারেই করবেন না তা হলো, কান্না শুনে পিছনে ফিরে আসা, আবার তাকে কোলে নিয়ে বিদায় জানানো, এক্ষেত্রে বাচ্চা বিভ্রান্ত হয়ে যাবে এবং ভাবতে পারে কাঁদলে হয়তো আপনি ফিরে আসবেন। বিদায় জানান, কিন্তু বিদায় জানানো প্রলম্বিত করবেন না কোনোভাবেই। অফিস থেকে ফিরলে যদি বাচ্চা কান্নাকাটি করে, আপনি ফেরার পরপরই তার সাথে দেখা না করে একটু ফ্রেশ হয়ে তার সাথে দেখা করতে পারেন, এতে আপনি তার সাথে দীর্ঘক্ষণ কাটাতে পারবেন। এটি স্বাস্থ্যসম্মতও ।

বাচ্চাকে নানি-দাদি, ম্যাইড, অথবা ডে-কেয়ার –যার কাছেই রাখুন না কেন, তাদের কাছে দীর্ঘক্ষণ ছাড়ার আগে তার সাথে বাচ্চাকে টানা কয়েকদিন পরিচিত করান । যেসব বাচ্চা সহজে অন্য কারো সাথে সহজ হ’তে পারে না, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে এই নিয়ম রক্ষা করুন, অন্যাথায় হিতে বিপরীত হতে পারে। কোনো ভাবেই বাচ্চার উপর মানসিক চাপ দিয়ে কিছু অভ্যাস করানো উচিৎ নয়। এক্ষেত্রে সবসময় মনে রাখবেন এক একটি বাচ্চা এক এক জন আলাদা মানুষ এবং আলাদা মানসিক গঠন ও ব্যাক্তিত্ব নিয়ে জন্মায়। মিসেস মলির মেয়ে যা করে, মিসেস ডলির ছেলে তা করবে এমন কোন কথা নেই। অমুকের ছেলে মেহমান দেখলে কোলে ঝাপিয়ে পড়ে, আর আপনার বাচ্চা নতুন মানুষ দেখলে কান্না করে- এতে এতো ভাবনার কিছু নেই- যেটি করবার আছে- তা হলো – সেই বাচ্চাকে কিছুদিন/মাস/বছর সময় দেয়া এটি বোঝার জন্য যে তার ভয়ের কিছু নেই। ছয়/সাত মাস বয়স থেকে শুরু করে দেড়/দুই বছর বয়স পর্যন্ত সেপারেশান অ্যাংযাইটি কম বেশী মাত্রায় থেকে থাকে, এর পর আস্তে আস্তে কেটে যায়।

সবার জন্য শুভ কামনা।

 

Related posts

Leave a Comment