সপ্তাহ ৩৯ । গর্ভধারনের প্রত্যেকটি সপ্তাহ

যদিও আমরা বার বারই বলে যাচ্ছি যে শেষ দিকে এসে আপনার জরায়ুতে আর জায়গা অবশিষ্ট থাকবেনা, আপনার শিশুটি তবুও এর মধ্যেই বাড়তে বাড়তে এ সপ্তাহ নাগাদ একটা বড়সড় তরমুজের সমান হয়ে যাবে। শিশুটিকে এখন ফুল টার্ম ধরা হয় এবং সে পৃথিবীতে আগমনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। শিশুটির ফুসফুসের সীমানায় এখন সারফাকটেন্ট (surfactant) পূর্ণ থাকবে। এই পদার্থটি নবজাতক শিশুকে জন্মের পড় শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ফুসফুসকে প্রশস্ত হতে সাহায্য করবে। শিশুটির শরীরে এখনো চর্বির স্তর জমছে যাতে পৃথিবীতে আসার পর সে তার শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রন করতে পারে।

শিশুটি এখন আগের চেয়ে অনেক সবল হবে এবং তার হাড়ও এতদিনে শক্ত (ossified ) হয়ে যাবে। জন্মের পর শিশুটি যখন তার ছোট্ট মুঠি দিয়ে আপনার একটা আঙ্গুল ধরে রাখবে এবং সহজে ছাড়বে না, তখনই আপনি তার শক্তি টের পেয়ে যাবেন। মস্তিষ্ক এখনো নতুন নতুন স্নায়বিক সংযোগ (neural connection) ঘটাতে থাকবে, এবং জন্মের কয়েক মাস পর্যন্তও এটা চলতেই থাকবে।

সব ঠিক থাকলে এ সপ্তাহের শেষ নাগাদই শিশুটি আপনার কোল জুড়ে থাকবে। কিংবা আপনাকে হয়তো আরেকটু সময় অপেক্ষা করতে হবে। মাত্র ৫% ক্ষেত্রে একদম সম্ভাব্য তারিখেই সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়।

 

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনি

এখন সবাই একবার করে হলেও আপনার পেট ধরে বাচ্চার অস্তিত্ব বুঝতে চাইবে আর এই প্রশ্নও আপনাকে বার বার শুনতে হবে যে ‘বাচ্চা কবে হচ্ছে?’ । এই পর্যায়ে এসে যে কোনো সময়ই আপনার বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হয়ে যেতে পারে। আর আপনার পেঙ্গুইনের মতো হাঁটা দেখে আশেপাশের মানুষ তো ‘ এভাবে না’ ‘ওভাবে না’ এসব বলতেই থাকবে।

ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত হেঁটে আসতেই যদি মনে হয় দম ফেটে যাচ্ছে, তাতে আতঙ্কিত হবার কিছুই নেই। আপনার বিশাল জরায়ু এখন জায়গার অভাবে শ্বাসঝিল্লীতে (diaphram) চাপ দেবে, ফলে অল্পতেই আপনি হাঁপিয়ে উঠবেন আর দম বন্ধ হবার মতো অনুভূতি হবে।

জরায়ুর পেশী সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে মানেই যে এটা প্রসব যন্ত্রণা শুরু নয়, সে পার্থক্যটা বুঝতে হবে। আপনার পেটের সামনে থেকে শুরু হয়ে পেছন পর্যন্ত গিয়ে যদি সঙ্কোচনের মতো মৃদু ব্যথা শেষ হয়,তার মানে এটা প্রসব যন্ত্রণা নয়। আপনি যে ভঙ্গিতে বসে থাকবেন বা শুয়ে থাকবেন তা পাল্টে ভিন্ন কোনো ভঙ্গি করে নিলেই হয়তো আরাম পাবেন। এবং আসল প্রসব যন্ত্রণা শুরু হবার আগের এই সঙ্কোচন কিন্তু নিয়মমাফিক কোনো সময় ধরে হবে না। কিন্তু যখন সত্যি সত্যি আপনার প্রসব যন্ত্রণা শুরু হবে তখন একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর এই সঙ্কোচন হবে, কিছুক্ষণ থাকবে, তারপর আবার মিলিয়ে যাবে। এই অবস্থা থেকে আস্তে আস্তে সঙ্কোচনের মাত্রা এবং স্থায়িত্ব বাড়তে থাকবে এবং একসময় আসল প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়ে যাবে।

বেশিরভাগ ডাক্তারই ঐচ্ছিকভাবে প্রসব বেদনা ( induced labour) শুরু হবার জন্য ইনজেকশন দেবার আগে ১০/১৪ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। যদি এটা আপনার প্রথম সন্তান হয় তাহলে হয়তো প্রসবযন্ত্রণা দীর্ঘায়িত এবং শ্লথ গতির হবে। এ পর্যায়ে এসে আপনি নিশ্চয়ই যৌন মিলনের কথা ভাববেনই না। কিন্তু প্রসব যন্ত্রণাকে তরান্বিত করার জন্য এটাও একটা উপায় হতে পারে।

বাচ্চা যেহেতু এই সময় ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তাই সে হয়তো এখন জরায়ুর একেবারে নিচের দিকে নেমে আসবে যার ফলে তল পেট ভারী ভারী এবং অস্বস্তিদায়ক লাগতে পারে। এছারাও এখন বাচ্চার নড়াচড়ার কারণে হঠাত করে চিনে চিনে ব্যাথা অনুভব হতে পারে।

 এ সপ্তাহে করনীয়

আপনার প্রসব পরিকল্পনা ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে যাওয়া উচিত । প্রসবের সময় আপনি কি কি চান , কীভাবে এবং কোথায় প্রসব করাতে চান সেটা তো অবশ্যই ঠিক করে ফেলা জরুরী । যদি আপনার আরও সন্তান থাকে, তাহলে আপনি না থাকা অবস্থায় তার / তাদের দেখাশুনার জন্য কে থাকবে সেটাও ঠিক করে ফেলতে হবে। হাসপাতালে যাবার জন্য ব্যাগ গুছাতে শুরু করে দিন যাতে করে যে কোনো সময়ই প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেলে সাথে সাথে কেবল ব্যাগটা তুলে নিয়ে যেতে পারেন ।হাসপাতালে থাকার সময় নানা ধরনের খরচ হতে পারে। আর সে জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান আগেই করুন। প্রয়োজনে আত্মীয়-স্বজনকে বলে রাখুন।আপনার আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে যাদের সঙ্গে আপনার রক্তের গ্রুপ মিলে যায় তাদের বলে রাখুন। রক্তের প্রয়োজনে তাদের ডাকার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন।

এ সপ্তাহে বাচ্চার নড়াচড়া খেয়াল রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি নড়াচড়া কম মনে হয় দেরী না করে আপনার ডাক্তারকে জানান। জন্মের আগ পর্যন্ত বাচ্চার নড়াচড়া করে এবং এই নড়াচড়া কমে যাওয়া কোন বিপদের লক্ষন হতে পারে।

অনেক নারীর প্রসবের সময় পানি ভাঙ্গে, তবে প্রসবের পূর্বেও অনেকের পানি ভাঙতে পারে। মায়ের জরায়ুর ভেতর ‘এ্যামনিওটিক স্যাক’ নামে একটি থলেতে বাচ্চা বড় হতে থাকে। বাচ্চা প্রসবের পূর্ব মুহুর্তে এই থলেটি ভেঙ্গে যায় আর এর মধ্যের এ্যমনিওটিক পানি বের হয়ে আসে। একেই সোজা বাংলায় ‘পানিভাঙ্গা’ বলে।পানি ভাঙলে তা চুইয়েও পড়তে পারে বা হঠাৎ অনেক পানি বের হতে পারে।যেটাই হোক তখন সাথে সাথে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।অধিকাংশ মায়েদের পানি ভাঙ্গার আগেই প্রসব বেদনা শুরু হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রসব ব্যথার আগেই পানি ভেঙ্গে যেতে পারে। তবে পানি আগে ভেঙ্গে গেলেও তার একটু পরেই মায়ের ব্যথা উঠে যায়। তবে পানি ভাঙ্গার পর কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যথা না উঠলে, তাহলে ব্যথা ডাক্তার কৃত্রিম উপায়ে লেবার পেইন তুলে দিবেন(Induced Labor)। এটার কারণ থলিটার সুরক্ষা ছাড়া শিশু খুব অল্প সময়ের মধ্যে জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।

স্বাস্থ্যকর এবং সুষম খাবার খেতে থাকুন। গর্ভাবস্থার শেষ দিকে দৈনিক অতিরিক্ত ২০০ ক্যালরি বেশী প্রয়োজন। তবে এক সাথে বেশী না খেয়ে অল্প অল্প করে বেশীবার খেলে উপকার হবে।

সন্তান জন্মদানের আগের কিছুদিন নারীদের জন্য খুবই কষ্টকর। এ সময় ঘুমের সমস্যা, খাওয়ায় সমস্যা ইত্যাদি লেগেই থাকে। আর এ সময়টির যন্ত্রণা কমাতে পারে ভালোভাবে শ্বাস নেওয়ার অনুশীলন। এ ক্ষেত্রে ভালোভাবে শ্বাস নেওয়ার অনুশীলন করতে হবে। এটি দেহ শিথিল হতে সহায়তা করবে। এ ক্ষেত্রে ভালোভাবে শ্বাস নেওয়ার জন্য আরামদায়ক কোনো স্থানে বসে বড় করে শ্বাস টানতে হবে। এরপর তা ধীরে ধীরে ছাড়তে হবে। এ সময় মনও যেন শান্ত থাকে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। এতে দেহ রিলাক্স হবে এবং ভালো অক্সিজেন পাওয়ায় শারীরিক কিছু সমস্যা দূর হবে।

বাথরুমে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। যে ধরনের স্যান্ডেলগুলোতে পা স্লিপ করার সামান্যতম আশঙ্কাও থাকে, সেগুলো দ্রুত বাতিল করে ‘নিরাপদ’ প্যাটার্নের স্যান্ডেল ব্যবহার করতে হবে। আপনার বাথরুম যেন ব্যবহারের সময় শুকনো থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

অনেকে প্রেগন্যান্সির গোটা সময়টাই শুয়ে বসে কাটিয়ে দেন। এটা একেবারেই উচিত্ নয়। যদি চিকিত্সক আপনাকে বেড রেস্টে থাকতে না বলেন, এবং অন্য কোনও জটিলতা না থাকে তাহলে সচল থাকুন। বাড়ির হালকা কাজকর্ম করুন। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে যোগাসন বা হালকা ব্যয়াম করুন। সকাল, সন্ধে হাঁটতে যান। এতে ওজন কম থাকবে, শরীর সুস্থ থাকবে, নরমাল ডেলিভারির চান্সও বাড়বে।

নিরাপদ প্রসব সম্পর্কে চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। মা হওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও থাকা প্রয়োজন। সন্তান জন্মের পর মায়ের করণীয় সম্পর্কে জেনে রাখুন গর্ভাবস্থায়ই। প্রসবের পরেও মায়ের পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের প্রয়োজন। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই সন্তানকে মায়ের দুধ দিতে হবে। এ ছাড়া সন্তানের চোখের যত্ন, টিকা দেওয়ার নিয়ম এবং প্রসবের পর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে নিন।

মাকে সবসময় পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে সাহস দিতে হবে। কোনভাবেই তাকে ভয়ের কোন কথা বলে ভড়কে দেওয়া যাবেনা।একজন মা ও তার পরিবারের সঠিক প্রস্তুতি ও মানসিক সাহসই একটি সুস্থ, সুন্দর ও সবল শিশুর জন্ম দিতে পারে।


“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”


<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ৩৮
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ৪০>>

 

তথ্যসূত্রঃ

maya.com.bd/content/web/wp/1857/
babycenter.com
parents.com

 

Related posts

Leave a Comment