সপ্তাহ ৩৮ । গর্ভধারনের প্রত্যেকটি সপ্তাহ

গর্ভধারণের এ সপ্তাহে আপনার গর্ভের শিশুটি একটা মিষ্টিকুমড়ার মতোই বড়সড় হয়ে উঠবে। এখন তার ওজন হবে প্রায় ৬-৯ পাউন্ড আর তার মাথা আর পেটের পরিধিও সমান হবে। অনেক নবজাতকের মাথায়ই জন্মের সময় ১ থেকে ১.৫ ইঞ্চি লম্বা চুল থাকে, আবার অনেক শিশুর মাথায় চুলই থাকে না।

এ অবস্থায় শিশুটি পুরো জরায়ু জুড়ে রয়েছে। এ সময়ে মায়ের শরীরের এন্টিবডি শিশুর শরীরের চলে যাচ্ছে। এই এন্টিবডিগুলো শিশুকে তার জীবনের প্রথম ছয় মাস সুরক্ষা দিবে। ততদিনে বাচ্চার নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়ে যাবে। এসময় থেকে শিশু ধীরে ধীরে নিচে নামা শুরু করবে। তার নাড়ি এখন ২০ সপ্তাহ আগের তুলনায় ৪ গুন মোটা।  তার অঙ্গপ্রত্তঙ্গগুলো এখন পুরোপুরি সুগঠিত এবং সে এখন জরায়ুর বাইরে বেঁচে থাকার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।

শিশুটির শরীরে এখন চর্বির স্তর পুরু হবে এবং তার ওজনও বাড়তে থাকবে। পেটের ভেতর জায়গা কমে যাবার কারণে এখন আর সে আগের মতো নড়াচড়া করতে পারবে না। তবে আপনার যদি মনে হয় শিশুটি একদমই নড়ছে না, তাহলে তৎক্ষণাৎ ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

শিশুটি ভূমিষ্ঠ হবার আগে শেষ সপ্তাহগুলোতে তার মাথা শ্রোণীচক্র বরাবর নেমে আসতে পারে এবং এটাকে বলা হয় ‘নিযুক্তি’ ( engaged) । তবে কখনো কখনো প্রসব বেদনা শুরু হবার আগে এই নিযুক্তি ঘটে না।

আপনার শিশু যদি ছেলে হয় তবে এ সময় থেকে তার অণ্ডকোষ আস্তে আস্তে নিচের দিকে নেমে যেতে থাকবে। কিছু কিছু শিশুর ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ উপরের দিকে উঠানো থাকে যা জন্মের এক বছরের মদ্ধে স্বাভাবিক জায়গায় ফিরে যায়। জন্মের পর ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ এবং মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে তার ভালভা সামান্য ফোলা থাকে যা জন্মের সপ্তাহ খানেক এর মদ্ধেই স্বাভাবিক হয়ে যায়।

৩৮ তম সপ্তাহে আপনার শিশুকে ফুল টার্ম ধরা হয়। যদিও আপনার অফিশিয়াল due date আর সপ্তাহ দুয়েক পরে। সাধারণত ৮৫ ভাগ শিশুই due date এর দু সপ্তাহের মদ্ধেই জন্মগ্রহন করে। সুতরাং এখন থেকে আগামী চার সপ্তাহের যে কোন সময় আপনি সন্তান প্রসব করতে পারেন।

 

গর্ভধারণের এ সপ্তাহে আপনিঃ

মায়েদের  পিঠে ব্যথা করবে এবং ঘন ঘন প্রস্রাব হবে। ফলস পেইন ওঠার সম্ভবনাও আছে কারণ মায়ের শরীরের নিচের অংশ এখন সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছে। এসময় ডাক্তার আবার পরীক্ষা করে দেখবে বাবুর অবস্থান, প্রশবপথের অবস্হা এবং মায়ের শরীরের অবস্থা। মা এখন পুরো প্রস্তুত সন্তান জন্ম দিতে।

এখন আপনাকে দেখতে যেমন বিশাল লাগবে, তেমনি আপনার নিজেরও নিজেকে বিশালবপু বলে মনে হবে। আপনি চলার সময় সবসময় সামনে এগিয়ে থাকবে আপনার বিশাল ‘গর্ভবতী’ পেট। শোয়ার জন্য একটা আরামদায়ক ভঙ্গী পাওয়া এখন নিতান্তই অসম্ভব ব্যাপার বলে মনে হবে। চিত হয়ে শোয়ার তো কোনো উপায়ই নেই। কারণ সোজা হয়ে শোবার কারণে আপনার প্রধান রক্তনালীগুলোর (vena cava) ওপর ভারী জরায়ুর চাপ পড়বে, তাতে করে দেহের রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হবে।

ইতিমধ্যে আপনার স্তনদ্বয়ে colostrum উৎপাদিত হয়ে যাবে। আপনার স্তনদ্বয় ভারী আর অস্বস্তিদায়ক লাগে ঠিকই, কিন্তু একই সাথে নবজাতকের পুষ্টির যোগানের জন্যও তারা প্রস্তুত হয়ে যাবে। Braxton Hicks Contaction এর স্থায়িত্ব এখন আগের চেয়ে বেশি হবে এবং আপনাকে আরো অস্বস্তিতে ফেলবে। যদি দেখেন যে যোনিপথ দিয়ে মিউকাস প্লাগ ( Mucus Plug, রক্ত ও স্রাবের একটি চাকা) বের হচ্ছে, তাহলে ধরে নিতে পারেন যে প্রসব যন্ত্রণা শুরু হবার পূর্ব লক্ষণ। এসময় আপনি অবশ্যই সুস্থ এবং রোগমুক্ত থাকতে চাইবেন, আর সেজন্য আপনাকে অসুস্থ ব্যক্তিদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। যদি পা ফুলে গোড়ালি আর বিশালকায় হয়ে ওঠা পায়ের পাতা মিশে যায়, তাতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার পর ডিউরেসিস ( duresis, অতিরিক্ত মূত্র উৎপাদন) আপনার শরীর থেকে অতিরিক্ত ফ্লুয়িড বের করে নেবে।

পরিপাক তন্ত্রের (Digestive system) ওপর চাপ বাড়ার কারণে আপনার বুক জ্বালাপোড়ার সমস্যা আরও অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। বুক জ্বালাপোড়ার সাথে সাথে আপনার সঙ্কোচনের মতো অনুভূতিও হতে পারে। আপনার যদি মনে হয় যে প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেছে, তাহলে নিশ্চিত হবার জন্য ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিন। যেহেতু শিশুটি এখন শ্রোণীচক্রের (pelvis) একদম ওপরে অবস্থান করছে, আবারো আপানর মুত্রথলির (bladder) ওপর চাপ বাড়বে এবং প্রচণ্ড চাপের কারণে মুত্রথলি এখন খুব বেশি পরিমাণ প্রস্রাব ধরে রাখতে পারবে না। ফলে, এখন একটু পর পরই আপনাকে বাথরুমে যেতে হবে।

গর্ভের শিশুর অন্ত্র (intestine) এখন মেকোনিয়াম (meconium) নামে কালচে সবুজ আঠালো পদার্থ তৈরি করবে। জন্মের পর প্রথম কয়েকদিন সে মল হিসেবে এই পদার্থ ত্যাগ করবে । যখন শিশুটি পেটে থাকা অবস্থায় অ্যামনিওটিক তরল গিলে তখনই এই পদার্থ আস্তে আস্তে তৈরি হতে থাকে । প্রসব বেদনার সময় মায়ের যদি সমস্যা হয় তাহলে শিশুটি এই মেকোনিয়াম জরায়ুর ভেতরেই বের করা শুরু করে দিতে পারে। যা অবশ্যই খারাপ লক্ষন। যদি আপনার পানি ভেঙে যায় এবং আপনি দেখেন যে পানির মধ্যে সবজেটে ভাব রয়েছে , তাহলে সাথে সাথে ডাক্তারকে জানাতে হবে।

গর্ভধারণের এ সপ্তাহের কিছু টিপসঃ

আপনার প্রসব পরিকল্পনা ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে যাওয়া উচিত । প্রসবের সময় আপনি কি কি চান , কীভাবে এবং কোথায় প্রসব করাতে চান সেটা তো অবশ্যই ঠিক করে ফেলা জরুরী । যদি আপনার আরও সন্তান থাকে, তাহলে আপনি না থাকা অবস্থায় তার / তাদের দেখাশুনার জন্য কে থাকবে সেটাও ঠিক করে ফেলতে হবে। হাসপাতালে যাবার জন্য ব্যাগ গুছাতে শুরু করে দিন যাতে করে যে কোনো সময়ই প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেলে সাথে সাথে কেবল ব্যাগটা তুলে নিয়ে যেতে পারেন ।হাসপাতালে থাকার সময় নানা ধরনের খরচ হতে পারে। আর সে জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান আগেই করুন। প্রয়োজনে আত্মীয়-স্বজনকে বলে রাখুন।আপনার আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে যাদের সঙ্গে আপনার রক্তের গ্রুপ মিলে যায় তাদের বলে রাখুন। রক্তের প্রয়োজনে তাদের ডাকার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন।

এমন হতে পারে যে এটাই আপনার গর্ভাবস্থার শেষ সপ্তাহ! এ সপ্তাহেই ডাক্তারের সাথে শেষবারের মতো আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকবে, যদি না সন্তান ভূমিষ্ঠ হতে আরেকটু দেরি হয়। ডাক্তারের কাছে যা যা প্রশ্ন করতে চান সব আগেই কাগজে লিখে রাখুন যাতে কোনো একটা প্রশ্ন ভুলে যাবার কারণে বাদ না পড়ে। হাসপাতালে পৌঁছানোর রাস্তাগুলোয় দিনের বিভিন্ন সময় টেস্ট ড্রাইভ দিয়ে আসতে পারেন, যাতে করে আগে থেকেই জানা থাকে কখন কোন রাস্তায় গেলে সময় কম লাগবে, এঁর কোন রাস্তায় একেবারেই যাওয়া যাবে না। যদি এটা আপনার প্রথম গর্ভধারণ হয়, তাহলে সন্তান প্রসবের সময়গুলোতে সাথে থাকার জন্য স্বামী ছাড়াও আরেকজন কাউকে সাথে রাখুন। হয়তো দেখা যাবে আপনার চাইতে আপনার স্বামীই বেশি নার্ভাস হয়ে পড়েছেন। তাকে সামলানোর জন্যও তো কাউকে চাই!

বাথরুমে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। যে ধরনের স্যান্ডেলগুলোতে পা স্লিপ করার সামান্যতম আশঙ্কাও থাকে, সেগুলো দ্রুত বাতিল করে ‘নিরাপদ’ প্যাটার্নের স্যান্ডেল ব্যবহার করতে হবে। আপনার বাথরুম যেন ব্যবহারের সময় শুকনো থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

প্রেগন্যান্ট অবস্থায় কখনোই সহবাস করা যাবে না এটিও একধরনের ভ্রান্ত ধারণা। বিশেষ কোনো শারীরিক সমস্যা বা ঝামেলা না থাকলে কনসিভ করার পর প্রথম দুই মাস এবং শেষের মাস ছাড়া পুরোটা সময়েই সহবাস নিরাপদ। গর্ভাবস্থায় শারীরিক মিলনের ক্ষেত্রে সব সময় কনডম ব্যবহার করা উচিত। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর সংক্রমণ থেকে ইউটেরাস নিরাপদ থাকে। একই সঙ্গে ইউটেরাইন কন্ট্রাকশান বা হঠাৎ ব্লিডিং হওয়ার আশঙ্কা অনেক কম থাকে।

অনেকে প্রেগন্যান্সির গোটা সময়টাই শুয়ে বসে কাটিয়ে দেন। এটা একেবারেই উচিত্ নয়। যদি চিকিত্সক আপনাকে বেড রেস্টে থাকতে না বলেন, এবং অন্য কোনও জটিলতা না থাকে তাহলে সচল থাকুন। বাড়ির হালকা কাজকর্ম করুন। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে যোগাসন বা হালকা ব্যয়াম করুন। সকাল, সন্ধে হাঁটতে যান। এতে ওজন কম থাকবে, শরীর সুস্থ থাকবে, নরমাল ডেলিভারির চান্সও বাড়বে।

নিরাপদ প্রসব সম্পর্কে চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। মা হওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও থাকা প্রয়োজন। সন্তান জন্মের পর মায়ের করণীয় সম্পর্কে জেনে রাখুন গর্ভাবস্থায়ই। প্রসবের পরেও মায়ের পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের প্রয়োজন। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই সন্তানকে মায়ের দুধ দিতে হবে। এ ছাড়া সন্তানের চোখের যত্ন, টিকা দেওয়ার নিয়ম এবং প্রসবের পর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে জেনে নিন।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

মাকে সবসময় পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে সাহস দিতে হবে। কোনভাবেই তাকে ভয়ের কোন কথা বলে ভড়কে দেওয়া যাবেনা।একজন মা ও তার পরিবারের সঠিক প্রস্তুতি ও মানসিক সাহসই একটি সুস্থ, সুন্দর ও সবল শিশুর জন্ম দিতে পারে।


“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”


<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ৩৭
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ৩৯ >>

তথ্যসূত্রঃ
maya.com.bd/content/web/wp/1817/
babycenter.com
parents.com

Related posts

Leave a Comment