সপ্তাহ ৩৫ । গর্ভকালীন প্রত্যেকটি সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনার শিশুটির আকার বড়সড় একটি নারিকেলের সমান। এই সপ্তাহ থেকে জন্মের আগ পর্যন্ত তার ওজন বাড়তে থাকবে , কিন্ত লম্বায় সে আর বাড়বে না । লম্বায় এখন সে প্রায় ১৮ ইঞ্ছি এবং ওজন প্রায় ৫.৫ পাউন্ড।

তার ইন্দ্রিয়সমূহ এখন আরও শক্তিশালী হবে এবং প্রতিদিনই তার নতুন নতুন নিউরনাল ( neuronal ) সংযোগ তৈরি হতে থাকবে, সুতরাং এখন থেকে omega-3 fatty acid গ্রহণের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে হবে । বাদাম, মাছের তেল ইত্যাদি খাবারে এই ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি থাকে। যেহেতু পেটে এখন জায়গা কম তাই শিশুটি এখন আর তেমন গড়াগড়ি দিয়ে নড়বে না। কিন্তু আপনার যদি মনে হয় শিশুটির নড়াচড়া খুবই কম বা একেবারেই নেই তাহলে সাথে সাথে ডাক্তারকে জানান । আপনার শিশুর হাড়গুলোও আরও মজবুত হইয়ে উঠবে, যদিও প্রসব প্রক্রিয়া সহজতর করার জন্য শিশুটির মাথার খুলির হাড়সমূহ এখনো নরম আর অসংযুক্ত থাকবে ।

শিশুটির কিডনি এখন পুরোপুরি সুগঠিত এবং যকৃত ও কাজ শুরু করেছে। তার শারীরিক গঠনের প্রক্রিয়া ৩৫ সপ্তাহের মধ্যে প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে যায়।বাকি সময়টুকু তার ওজন বাড়তেই ব্যয় হবে। এ সময় শিশুটির শরীর এ ১৫% ফ্যাট থাকে যা জন্মের সময় বেড়ে ৩০% এর কাছাকাছি থাকে। শিশুটি এখন আস্তে আস্তে জরায়ুর আরও নিচের দিকে নামতে থাকবে। শিশুর নড়াচড়ার সময় পেটে সামান্য ব্যাথা অনুভব হতে পারে। এতে ভয়ের কিছু নেই, কিন্তু ব্যাথা যদি অনেক বেশী থাকে বা অনেক লম্বা সময় ধরে চলতে থাকে তাহলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনি

আপনার এখন সুস্থির হয়ে থাকবার সময় হবে , কারন অতিরিক্ত ওজন আপনাকে ক্লান্ত করে দিবে আর পিঠের ব্যথা পরিস্থিতিকে আরও খারাপই করবে কেবল । এখন আপনার জরায়ুতে থেকে থেকে যে সঙ্কোচন হবে সেটা প্রসব যন্ত্রণার কোনো উপসর্গ নয়, বরং আসল প্রসব যন্ত্রণার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য জরায়ুর মহড়া মাত্র !

প্রথম ও শেষ তিন মাসে ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আসা খুব সাধারণ ঘটনা। আপনার গর্ভাবস্থা যত এগুতে থাকে, আপনার শিশুর যত বিকাশ হতে থাকে ততই আপনার শরীরে মূত্রের উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে থাকে অথচ এ সময় মূত্রথলি আকারে সংকুচিত হতে থাকে। আপনার মূত্রথলি খালি থাকলেও চাপের কারণে আপনার মনে হবে মূত্রথলি ভর্তি হয়ে আছে। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে যখন বাচ্চার মাথা নিচের দিকে চেপে আসবে, তখন এই অনুভূতি আরো বেশি হবে।

গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য একটি সাধারণ সমস্যা। বেশির ভাগ মহিলাই সাধারণত এ সময় কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগেন। এমনিতেই গর্ভাবস্থায় নানা ধরনের সমস্যা থাকে। তারপর যদি পেট পরিষ্কার না হয় তাহলে ভাবী মায়ের শরীর ও মন ভালো থাকে না। পেটে সব সময় একটা অস্বস্তিভাব বিরাজ করে। কখনো আবার তলপেটে ও কোমরে ব্যথা অনুভূত হয়।

ব্রাক্সটন-হিকস কনট্রাকশন প্রেগন্যান্সির সময় খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। জরায়ুর পেশীর সংকোচনের কারণে পেটে চাপ অনুভূত হয়। গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ পর্যন্ত মাঝে মাঝেই এ রকম হতে পারে। ফলস পেইন বা “ব্রাক্সটন হিক্স” হলো আসল লেবার পেইন হওয়ার আগে ইউটেরাসের প্রস্তুত হওয়ার একটা প্রাকৃতিক প্র্যাকটিস। লাস্ট ট্রাইমেস্টারে ব্রাক্সটন হিক্স অনেকেই ফিল করে আবার কেউ কেউ করে না। কিন্তু সমস্যা হল কোনটা ফলস পেইন আর কোনটা আসল লেবার পেইন তা ফার্স্ট টাইম প্রেগন্যান্ট রা অনেক সময় বুঝতে পারে না।যদি খুব বেশি সমস্যা হয় তা হলে অবশ্যই চিকিত্সককে জানান।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

জরায়ূতে শিশু ধারণের কারণে এবং রক্তের প্রবাহমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় প্রধান রক্তনালীগুলোতে চাপ পড়ে। ফলে চিকন নালীতে রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এতে পেটের নিচের দিকে রক্তপ্রবাহ সম পরিমানে হয় না বলে পায়ের রক্তনালীগুলো স্ফীত হয়ে ওঠে ও পানিপূর্ণ হয়ে যায়। যোনির আশে পাশেও এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর ফলে গর্ভবতী  অস্বস্তি বোধ করেন। এই ধরনের উপসর্গ প্রতিরোধ করতে ডাক্তারের পরামর্শের চেয়ে বেশি দরকারি বাড়তি ওজন কমানো। সংকোচনশীল  টাইটস প্যান্ট পরিধান এক্ষেত্রে কিছুটা আরাম দেবে। প্রসবের পরে এই সমস্যা নিজে থেকেই দূর হয়ে যায়। যোনির আশেপাশে বরফের স্যাক কিছুটা আরাম দিতে পারে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহের কিছু টিপস

আপনার প্রসব পরিকল্পনা ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে যাওয়া উচিত । প্রসবের সময় আপনি কি কি চান , কীভাবে এবং কোথায় প্রসব করাতে চান সেটা তো অবশ্যই ঠিক করে ফেলা জরুরী । যদি আপনার আরও সন্তান থাকে, তাহলে আপনি না থাকা অবস্থায় তার / তাদের দেখাশুনার জন্য কে থাকবে সেটাও ঠিক করে ফেলতে হবে। হাসপাতালে যাবার জন্য ব্যাগ গুছাতে শুরু করে দিন যাতে করে যে কোনো সময়ই প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেলে সাথে সাথে কেবল ব্যাগটা তুলে নিয়ে যেতে পারেন ।হাসপাতালে থাকার সময় নানা ধরনের খরচ হতে পারে। আর সে জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান আগেই করুন। প্রয়োজনে আত্মীয়-স্বজনকে বলে রাখুন।আপনার আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে যাদের সঙ্গে আপনার রক্তের গ্রুপ মিলে যায় তাদের বলে রাখুন। রক্তের প্রয়োজনে তাদের ডাকার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন।

এই অবস্থায় এসে গর্ভাবস্থাকে একটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি হিসেবে ভাবা সত্যই কঠিন । আপনি প্রচণ্ড ক্লান্ত, দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অবস্থা আপনার , যেভাবেই বসেন বা দাঁড়ান না কেন আরাম পান না । কিন্তু এগুলোকেই আপনার অনাগত শিশুর সাথে আপনার বন্ধনের একটা পূর্বসূত্র হিসেবে দেখতে চেষ্টা করুন না ! এই শিশুটিই একদিন যখন কৈশোরে পা দেবে , তাকে তো নাগালেই পাবেন না !

দিন যতই কাছে আসবে Varicose veins ততই প্রকট হতে থাকবে। অনেক্ষন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা পরিহার করুন এবং পা ক্রস করে বসবেন না ।

সন্তান জন্মদানের আগের কিছুদিন নারীদের জন্য খুবই কষ্টকর। এ সময় ঘুমের সমস্যা, খাওয়ায় সমস্যা ইত্যাদি লেগেই থাকে। আর এ সময়টির যন্ত্রণা কমাতে পারে ভালোভাবে শ্বাস নেওয়ার অনুশীলন। এ ক্ষেত্রে ভালোভাবে শ্বাস নেওয়ার অনুশীলন করতে হবে। এটি দেহ শিথিল হতে সহায়তা করবে। এ ক্ষেত্রে ভালোভাবে শ্বাস নেওয়ার জন্য আরামদায়ক কোনো স্থানে বসে বড় করে শ্বাস টানতে হবে। এরপর তা ধীরে ধীরে ছাড়তে হবে। এ সময় মনও যেন শান্ত থাকে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। এতে দেহ রিলাক্স হবে এবং ভালো অক্সিজেন পাওয়ায় শারীরিক কিছু সমস্যা দূর হবে।

গর্ভবতী মা চাকরিজীবী মহিলা হলে, কী ধরনের কাজ এবং কতদিন ঐ কাজ আপনি করতে পারবেন তা নিয়ে আপনার চিকিত্‌সকের সঙ্গে পরামর্শ করুন৷ আপনার স্বাস্থ্য ও গর্ভকালীন আপনার শরীরের অবস্থার ওপর কাজ করা বা না করা নির্ভর করবে৷

এই সময় একবারে বেশি করে না খেয়ে অল্প অল্প করে একটু পর পর খেলে তা গর্ভবতী মায়ের জন্য বেশী উপকারী । এতে মায়ের বিপাক প্রক্রিয়ার উপর বেশী চাপ না পড়ায় তার অভ্যন্তরীন পরিপাক ক্রিয়া সহজেই কাজ করতে পারে । কিন্তু যদি একবারে বেশী পরিমানে খাওয়া হয় তবে তার বিপাক ক্রিয়াকে অনেক চাপ প্রয়োগ করে কাজ করতে হয় এবং এতে শরীরে অধিক পরিমানে তাপ উৎপাদিত হয় । তাই স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য এক সাথে অধিক পরিমানে খাওয়া থেকে বিরত থাকলে তা উপকারী হবে ।

গর্ভাবস্থায় কিছু আসন, প্রাণায়াম ও ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ দূরে রাখতে পারে বমি বমি ভাব, গ্যাস্ট্রিক, পা ব্যথা, কোমর ব্যথা ও আবেগীয় চাপকে। এ সময় শরীরে উৎপন্ন হয় রিলাক্সিন হরমোন, যা অস্থিসন্ধিগুলোকে নমনীয় করে তোলে। গর্ভকালীন সময়ে শরীরে বাড়ে অস্বস্তি। তলপেট স্ফীত হয়ে মেরুদণ্ডে চাপ পড়ে, ফলে পিঠে ব্যথা বাড়ে, আর কমতে থাকে রাতের ঘুম। তবে এসব সমস্যায় আরাম পাবেন গর্ভকালীন শরীর ও সময়োপযোগী কিছু ব্যায়াম চালিয়ে গেলে।

মাকে সবসময় পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে সাহস দিতে হবে। কোনভাবেই তাকে ভয়ের কোন কথা বলে ভড়কে দেওয়া যাবেনা।একজন মা ও তার পরিবারের সঠিক প্রস্তুতি ও মানসিক সাহসই একটি সুস্থ, সুন্দর ও সবল শিশুর জন্ম দিতে পারে।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ৩৪ 
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ৩৬>>

তথ্যসূত্রঃ
maya.com.bd/content/web/wp/1883/
babycenter.com
parents.com

 

Related posts

Leave a Comment