সপ্তাহ ৩৩ । গর্ভকালীন প্রত্যেকটি সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার ৩৩ সপ্তাহ নাগাদ আপনার শিশুটির মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্রের(nervous system) পূর্ণ বিকাশ ঘটে যাবে। ৪ পাউন্ড ওজন আর ৪৫ সেমি দৈর্ঘ্যের শিশুটিকে এখন তুলনা করা যাবে একটি আনারসের সাথে। শিশুটির কুঁচকানো ভাব খুব দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে এবং তার কঙ্কাল আরও মজবুত হয়ে উঠছে। শিশুর খুলির হাড় গুলো এখন একসাথে জোরা লাগানো থাকেনা যার ফলে হাড়গুলো সামান্য নড়াচড়া করতে পারে এমনকি একটি আরেকটির উপর উঠে যেতে পারে। এমনটা হওয়ার কারণে প্রসবের সময় শিশুটির জন্মপথ দিয়ে বেড়িয়ে আসা সহজ হয়। খুলির হাড়গুলো শিশু সাবালক হওয়া পর্যন্ত অসংযুক্ত থাকে যাতে তা শিশুর বর্ধিষ্ণু মগজ ও অন্যান্য টিস্যুর জন্য জায়গা করে দিতে পারে।

আপনার গর্ভে এখন সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অ্যামনিওটিক তরল(amniotic fluid) জমা থাকবে, প্রায় ১ লিটার। কতটুকু অ্যামনিওটিক তরল পেটের ভেতর আছে তার পরিমাণ থেকেই আন্দাজ করা যাবে শিশুটির বৃক্ক(kidney) ঠিকভাবে কাজ করছে কি না। গর্ভাবস্থার এই পর্যায়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলি করে তরল উৎপাদিত হবে। বাইরের জগতের জন্য শিশুটির ফুসফুস আরো পরিপক্ব হয়ে উঠছে। আপনার শিশুটি যদি এ সপ্তাহেই ভূমিষ্ঠ হয় তাহলে তার হয়তো শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য একটু হলেও কৃত্রিম উপায়ের সাহায্য প্রয়োজন হবে। সে কারণেই, যদি আপনার সময়ের আগেই প্রসব বেদনা শুরু হয়ে যায়, কিংবা কোনো কারণে সম্ভাব্য তারিখের আগেই সিজারিয়ান সেকশন করিয়ে ফেলতে হয়, তাহলে প্রসবের আগের দুইদিন ডাক্তার আপনাকে কর্টিসোন ( Cortisone, এক প্রকার হরমোন। সাধারণত অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়) ইনজেকশন দেবেন। এই হরমোন শিশুটির ফুসফুসের বিকাশকে তরান্বিত করবে যাতে করে ভূমিষ্ঠ হবার পর তার ফুসফুস পর্যাপ্ত পরিমাণ surfactant ( শ্বাসপ্রশ্বাসের সময় ফুসফুসকে বিস্তৃত হতে সাহায্য করে এমন একধরনের তরল পদার্থ) উৎপাদন করতে পারে।

সে এখ মুখ দিয়ে কোনো কিছু চুষতে ও গিলতে পারবে। এর ফলে তার শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্ষমতাও আরো দৃঢ় হবে।গর্ভের শিশুটি ছেলে হলে এর মধ্যেই তার শুক্রাশয়(testicle) পেটের অবস্থান থেকে নেমে অণ্ডকোষের(scrotum) অবস্থানে চলে আসবে।

যেহেতু শিশুটি খুব দ্রুত বড় হয়ে উঠছে, আপনার জরায়ুতে তার নড়াচড়ার স্থান ও আস্তে আস্তে কমতে থাকবে। গর্ভকালীন এ সময়ে শিশুর নড়াচড়া কমে আসে। এ সময় খেয়াল করবেন শিশুর নড়াচড়া আপনার দৈনন্দিন অভ্যাস এর উপর নির্ভর করবে, যেমন আপনি কতটুকু বা কি খাচ্ছেন, আপনি কোন ভঙ্গিতে আছেন বা আপনার চারপাশের আওয়াজ- এ সব কিছুই তার নড়াচড়া তে প্রভাব ফেলবে।

 

 

গর্ভকালীন এ সপ্তাহে আপনি

এখন আপনার চলাফেরা আরো ধীর-স্থির হয়ে যাবে। কারণ, একে তো আপনার অতিরিক্ত ওজন আপনাকে অল্পতেই কাবু করে দেবে, তার ওপর পিঠের ব্যথাও শুরু হতে পারে। কোনোভাবেই আরাম পাওয়াটা একদমই মুশকিল হয়ে যাবে। আপনার হাঁটা দেখলে মনে হতে পারে হাঁসের মতো হেলেদুলে হাঁটছেন। শুধু তাই নয়, শরীরের বিপাক ক্রিয়ার(metabolism) উচ্চ মাত্রার কারণে আপনার এখন অতিরিক্ত গরমও লাগবে।

এখন পানি আসার কারণে আপনার হাত, পা ও আঙ্গুলগুলো ফুলে যেতে পারে, সেই সাথে ব্যথাও থাকতে পারে। অনেক মহিলারই এসময় কারপাল টানেল সিন্ড্রোম(carpal tunnel syndrome) হয়। হাতের কার্পাল টানেলে সঙ্কোচনের কারণে যদি প্রচণ্ড ব্যথা ও অবশ হয়ে থাকার মতো অনুভূতি হয়, সেই পরিস্থিতিকে বলা হয় কারপাল টানেল সিন্ড্রোম। স্প্লিন্ট(splint) ব্যবহার করে বা ঘুমানোর সময় হাতের নিচে বালিশ রেখে হাতকে স্থির ও আরামদায়ক অবস্থায় রাখার চেষ্টা করতে পারেন।

আরেকটা ছোটো সমস্যা যেটা হতে পারে তা হলো চোখের আকার বদলে যাওয়া। এ সময় কন্টাক্ট লেন্স(contact lens) পরা মুশকিল হয়ে যাবে। আপনার চোখের পাওয়ারেরও তারতম্য হতে পারে। তবে সে কারণে নতুন চশমা নেবার কথা ভাবতে হবে না মোটেই। কারণ, সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার পরে আবার এটা ঠিক হয়ে যাবে।

প্রচণ্ড মানসিক চাপ, পানিশূন্যতা কিংবা স্রেফ হরমোনজনিত কারণেই আপনার মাথা ব্যথা প্রকট হয়ে উঠতে পারে। সুস্থির থাকুন, প্রচুর পানি পান করুন এবং যখনই মনে হবে মাথা ব্যথা শুরু হচ্ছে তখনি একটু বিশ্রাম নিয়ে নিন।

সামান্য কাশি হলে কিংবা সামান্য ভারী কিছু ওঠানোর সময় প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা, বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষের দিকে এই সমস্যা দেখা দেয়। প্রস্রাবের এমন সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো প্রস্রাবের রাস্তা ও মলদ্বারের আশপাশের মাংসপেশির ব্যায়াম করলে উপকার পাওয়া যাবে।

এখন হয়তো আপনি একটু বেশিই আনমনা থাকবেন এবং জরুরি জিনিসটাও ভুলে যাবেন! এটা কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যা নয়, বরং গর্ভাবস্থার একটি সাধারণ ঘটনা। আপনি এটা নিয়ে বেশি বেশি চিন্তা করতে থাকলেই আনমনাভাব আরো বাড়তে পারে!

ব্রাক্সটন-হিকস কনট্রাকশন প্রেগন্যান্সির সময় খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। জরায়ুর পেশীর সংকোচনের কারণে পেটে চাপ অনুভূত হয়। গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ পর্যন্ত মাঝে মাঝেই এ রকম হতে পারে। ফলস পেইন বা “ব্রাক্সটন হিক্স” হলো আসল লেবার পেইন হওয়ার আগে ইউটেরাসের প্রস্তুত হওয়ার একটা প্রাকৃতিক প্র্যাকটিস। লাস্ট ট্রাইমেস্টারে ব্রাক্সটন হিক্স অনেকেই ফিল করে আবার কেউ কেউ করে না। কিন্তু সমস্যা হল কোনটা ফলস পেইন আর কোনটা আসল লেবার পেইন তা ফার্স্ট টাইম প্রেগন্যান্ট রা অনেক সময় বুঝতে পারে না।যদি খুব বেশি সমস্যা হয় তা হলে অবশ্যই চিকিত্সককে জানান।

গর্ভকালীন এ সময়ের কিছু টিপস

যদি হাসপাতালে বাচ্চা প্রসব করান তবে আগে থেকেই কাপড়-চোপড়, টাকা-পয়সা, সেবাদানকারীর ব্যবস্থা করে রাখুন। প্রসবব্যথা ওঠার আগে প্রয়োজনীয় টেলিফোন নম্বর সংগ্রহে রাখুন। গর্ভাবস্থার শেষ সপ্তাহগুলো অত্যন্ত দীর্ঘ মনে হয়। তাই এ সময় এমন কিছু করুন যেন একঘেয়েমি না লাগে।

ভাবতে শুরু করুন আপনার বাচ্চার জন্য আপনি কি কি করতে চান। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করুনআপনার আরও সন্তান থাকলে তাদের সঙ্গে সময় কাটান। একই রক্তের গ্রুপসম্পন্ন বন্ধু বা আত্মীয় ঠিক রাখুন যিনি প্রয়োজনে রক্ত দিতে পারবেন।

মায়ের খাবার যাতে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুষম হয় সেক্ষেত্রে পরিবারের সবাইকে নজর রাখতে হবে।এছাড়া মায়ের সারাদিনের খাবার ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিয়ে খাওয়াতে হবে। এতে এসিডিটির ভয় থাকবেনা।

মাকে সবসময় পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে সাহস দিতে হবে। কোনভাবেই তাকে ভয়ের কোন কথা বলে ভড়কে দেওয়া যাবেনা।একজন মা ও তার পরিবারের সঠিক প্রস্তুতি ও মানসিক সাহসই একটি সুস্থ, সুন্দর ও সবল শিশুর জন্ম দিতে পারে।

গর্ভবতী মা চাকরিজীবী মহিলা হলে, কী ধরনের কাজ এবং কতদিন ঐ কাজ আপনি করতে পারবেন তা নিয়ে আপনার চিকিত্‌সকের সঙ্গে পরামর্শ করুন৷ আপনার স্বাস্থ্য ও গর্ভকালীন আপনার শরীরের অবস্থার ওপর কাজ করা বা না করা নির্ভর করবে৷

এই সময় একবারে বেশি করে না খেয়ে অল্প অল্প করে একটু পর পর খেলে তা গর্ভবতী মায়ের জন্য বেশী উপকারী । এতে মায়ের বিপাক প্রক্রিয়ার উপর বেশী চাপ না পড়ায় তার অভ্যন্তরীন পরিপাক ক্রিয়া সহজেই কাজ করতে পারে । কিন্তু যদি একবারে বেশী পরিমানে খাওয়া হয় তবে তার বিপাক ক্রিয়াকে অনেক চাপ প্রয়োগ করে কাজ করতে হয় এবং এতে শরীরে অধিক পরিমানে তাপ উৎপাদিত হয় । তাই স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য এক সাথে অধিক পরিমানে খাওয়া থেকে বিরত থাকলে তা উপকারী হবে ।

 

আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

বাচ্চার সুন্দর আরবি বা বাংলা নাম ও নামের অর্থ জানতে Fairyland Baby Names Finder এর সাহায্য নিতে পারেন।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ৩২
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ- ৩৪>>

তথ্যসূত্রঃ
www.maya.com.bd/content/web/wp/1861/
babycenter.com
parents.com

Related posts

Leave a Comment