সপ্তাহ ৩১ । গর্ভকালীন প্রত্যেকটি সপ্তাহ

গর্ভকালীন  সপ্তাহে বাচ্চার ওজন ১৭০০-১৮০০ গ্রামের মত হয় ও ৪২ সে. মি. লম্বা হয়। শিশুটিকে এ সপ্তাহে তুলনা করা যাবে একটা আনারসের সাথে । সে এখন এতো বড়ো হয়ে উঠবে যে আপনার ফুসফুসের উপর চাপ বাড়বে এবং আপনার দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অনুভূতি হবে। তার  নাড়াচাড়াও আগের চেয়ে বেশি হবে এবং কিছু সময় পর পরই আপনি তার লাথি- গুঁতো অনুভব করবেন। আপনার শিশুটি যে সুস্থ আছে এটা তারই লক্ষণ । সুতরাং সে যদি আপনাকে সারা রাত ঘুমাতে নাও দেয়, আপনার বরং খুশিই হওয়া উচিত । সে এখন REM ( Rapid Eye Movement ) স্তরে অনেক বেশি সময় কাটাবে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । কারণ এ সময়ই তার মস্তিস্কের বিকাশ ঘটবে , এবং বাইরের জগতের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য তার স্নায়ুগুলু আরও সবল ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে ।

এতদিনে শিশুটির চামড়ায় চর্বি আর মাংসের স্তর লেগে যাওয়ার কারণে তার ত্বক এখন অনেক মসৃণ হয়ে যাবে । তার হাত – পা বেশ গোলগাল আর পুষ্ট হয়ে উঠবে ।এই সপ্তাহ থেকে শিশুটি দ্রুত বাড়তে শুরু করবে। আপনি প্রতি সপ্তাহে একবার করে ওজন মাপলেই এই পরিবর্তন টের পাবেন ।

৩১তম সপ্তাহে শিশুর স্নায়ুতন্ত্র এমন পর্যায়ে আসে যখন সে শরীরের তাপমাত্রাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে ।শিশুটির অস্থি মজ্জা এখন শরীরের লোহিত রক্ত কণিকা উৎপাদন করে যা আগে যকৃত করত।

গর্ভাবস্থার ৩১ সপ্তাহে আপনি

যদি এটা আপনার প্রথম সন্তান হয়, তাহলে ৩১তম সপ্তাহে ডাক্তার আপনার পেটের মাপ নেবেন এবং দেখবেন শিশুটি কতটা উপরে অবস্থান করছে ।এটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ- যদি আপনার শিশুর মাথা সঠিক দিকে অবস্থান না করে তাহলে প্রসবের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে ।

এ সপ্তাহে ডাক্তার আপনার রক্তচাপ পরীক্ষা করবেন, প্রোটিনের ভারসাম্য ঠিক আছে কি না দেখবেন, মূত্র পরীক্ষা করবেন এবং আপনার বিগত অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর সময় যেসব পরীক্ষা করানো হয়েছে তার ফলাফল নিয়ে আলোচনা করবেন।

এখন হয়তো আপনি একটু বেশিই আনমনা থাকবেন এবং জরুরি জিনিসটাও ভুলে যাবেন! এটা কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যা নয়, বরং গর্ভাবস্থার একটি সাধারণ ঘটনা। আপনি এটা নিয়ে বেশি বেশি চিন্তা করতে থাকলেই আনমনাভাব আরো বাড়তে পারে!

আপনার স্তন থেকে এখন অল্প পরিমাণে দুধের মতো তরল ( Pre-Milk/ colostrum) নিঃসৃত হবে। বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য উপযোগী দুধ তৈরি হবার আগে প্রথম কয়েকদিন হলুদ, দুধজাতীয় এই তরল উৎপাদিত হয়। কোনোরকম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে যাতে পড়তে না হয় সেজন্য ব্রা’র নিচে টিস্যু বা নার্সিং প্যাড এর একটা পরত দিয়ে রাখুন।

দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অনুভূতি হচ্ছে? গর্ভাবস্থায় দম বন্ধ হয়ে যাবার মতো অনুভূতি খুব স্বাভাবিক ঘটনা। আপনার ক্রমশ স্ফীত হতে থাকা পেট ডায়াফ্রামকে ( পেট ও বুকের মাঝখানের পর্দা) চাপ দেয় বলেই এমন হয়।গর্ভাবস্থায় নখের পরিবর্তন হতে পারে। নখ ভেঙ্গে যাওয়া বা রুক্ষ হয়ে যাওয়ার মত সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু কেন এমন হয় তা জানা যায়নি।

ব্রাক্সটন-হিকস কনট্রাকশন প্রেগন্যান্সির সময় খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। জরায়ুর পেশীর সংকোচনের কারণে পেটে চাপ অনুভূত হয়। গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ পর্যন্ত মাঝে মাঝেই এ রকম হতে পারে। ফলস পেইন বা “ব্রাক্সটন হিক্স” হলো আসল লেবার পেইন হওয়ার আগে ইউটেরাসের প্রস্তুত হওয়ার একটা প্রাকৃতিক প্র্যাকটিস। লাস্ট ট্রাইমেস্টারে ব্রাক্সটন হিক্স অনেকেই ফিল করে আবার কেউ কেউ করে না। কিন্তু সমস্যা হল কোনটা ফলস পেইন আর কোনটা আসল লেবার পেইন তা ফার্স্ট টাইম প্রেগন্যান্ট রা অনেক সময় বুঝতে পারে না।যদি খুব বেশি সমস্যা হয় তা হলে অবশ্যই চিকিত্সককে জানান।

গর্ভাবস্থায় জরায়ু বড় হয় এবং প্রস্রাবের থলিতে বাড়তি চাপ প্রয়োগ করে। এ কারণে প্রস্রাবের থলি পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রস্রাবের চাপ অনুভূত হয়। সে কারণে ঘন ঘন প্রস্রাব হয়, এ জন্য দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। ঘন ঘন প্রস্রাব হয় বলে পানি কম খাওয়া উচিত নয় বরং পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শমতো প্রস্রাব পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে কোনো ইনফেকশন আছে কি-না কিংবা ডায়াবেটিস আছে কি-না তা দেখে নেওয়ার জন্য। থাকলে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে।

সামান্য কাশি হলে কিংবা সামান্য ভারী কিছু ওঠানোর সময় প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা, বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষের দিকে এই সমস্যা দেখা দেয়। প্রস্রাবের এমন সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো প্রস্রাবের রাস্তা ও মলদ্বারের আশপাশের মাংসপেশির ব্যায়াম করলে উপকার পাওয়া যাবে।

গর্ভাবস্থার শেষের দিকে পায়ে কিছু পানি আসতে পারে। তবে অতিরিক্ত পা ফোলা বা পা ফোলার সঙ্গে রক্তচাপ বেশি থাকলে প্রি-একলামশিয়ার চিন্তা করা হয়, তখন ডাক্তারের পরামর্শমতে চিকিৎসা নিতে হবে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহের কিছু টিপস

গর্ভাবস্থায় শরীরের ওজন বেড়ে যায়। তা ছাড়া অস্থিসন্ধির লিগামেন্টগুলোও কিছুটা নরম ও নমনীয় হয়, এসব কারণে পিঠে ও কোমরে ব্যথা হতে পারে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। দাঁড়ানো বা বসার সময় মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হবে। একটানা বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে বা বসে না থেকে মাঝেমধ্যে শুয়ে বিশ্রাম নিতে হবে। উঁচু হিলের জুতা ব্যবহার না করে নিচু হিলের জুতা ব্যবহার করতে হবে।সাধারণত ক্যালসিয়ামের অভাবে এ ধরনের ব্যথা হয়, কাজেই ক্যালসিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার খেলে উপকার হবে। প্রয়োজন অনুসারে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে।

অন্য মহিলাদের তুলনায় গর্ভবতী মহিলাদের মূত্রপথে সংক্রমণ হওয়ার প্রবণতা খুব বেশি দেখা যায় না। তবে গর্ভবতী মহিলাদের মূত্রপথে সংক্রমণ হলে সেই সংক্রমণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কিডনিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বেশ কিছু রিপোর্ট অনুযায়ী গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবের সংক্রমণ রোধে আক্রান- হন প্রায় দু-চার শতাংশ গর্ভবতী মহিলা। বিজ্ঞানীদের ধারণা, গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তন হয় বলে এবং মূত্রপথের অবস্থান সরে যায় বলে ব্যাকটেরিয়া সহজে বৃক্কনালী পথে কিডনিতে পৌঁছে। এ কারণে গর্ভাবস্থায় প্রতি মাসে অন্তত একবার প্রস্রাবের পরীক্ষা করে কোনো সংক্রমণ আছে কি না তা দেখা উচিত।

এসিডিটি বা বুক জ্বালাপোড়া হলে অল্প অল্প করে ঘন ঘন খাবার খেতে হবে। তৈলাক্ত খাবার, ভাজাপোড়া খাবার ও বেশি মসলাযুক্ত খাবার না খেলেও উপকার পাওয়া যায়। খাওয়ার সময় পানি কম পান করতে হবে। খাওয়ার পরপরই উপুড় হওয়া বা বিছানায় শোয়া উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শমতো অ্যান্টাসিড-জাতীয় ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। পরামর্শ ছাড়া কোনো রকম গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার জন্য ওষুধ খাবেন না।

গর্ভাবস্থায় ধূমপান করলে গর্ভের সন্তান কম ওজনের হয়। পরোক্ষ ধূমপানেও একই ক্ষতি হয়। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ পরিহার করুন :ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় গর্ভের সন্তানের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হতে পারে। তাই রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন করা যাবে না।

একেবারে শুয়ে-বসে থাকাও নয়, আবার দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনিও নয়। কাজের ফাঁকে চাই পর্যাপ্ত বিশ্রাম। স্বাভাবিক কাজকর্ম করবেন। তবে ভারী কাজ, যেমন কাপড় কাচা, ভারী জিনিস তোলা, দ্রুত চলাফেরা এসব এড়িয়ে চলবেন। পরিশ্রমের ব্যাপারে প্রথম তিন মাস ও শেষ দু’মাস খুবই সতর্ক থাকবেন। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা ধীরে করবেন।

খাবারে থাকতে হবে একটু বাড়তি ক্যালরি। এ ছাড়া গর্ভের সন্তানের জন্য বাড়তি খাবার প্রয়োজন। কোষ্ঠকাঠিন্য যেন না হয়, সে জন্য খাবারে থাকতে হবে পর্যাপ্ত আঁশ। খাবারের আঁশ ডায়াবেটিসও প্রতিরোধ করবে। খাবারে থাকতে হবে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ লবণ। শাকসবজি, ফলমূলে পাওয়া যাবে এগুলো। মাছ খাওয়া ভালো। যথেষ্ট পানিও পান করতে হবে প্রতিদিন।

গর্ভাবস্থায় কিছু আসন, প্রাণায়াম ও ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ দূরে রাখতে পারে বমি বমি ভাব, গ্যাস্ট্রিক, পা ব্যথা, কোমর ব্যথা ও আবেগীয় চাপকে। এ সময় শরীরে উৎপন্ন হয় রিলাক্সিন হরমোন, যা অস্থিসন্ধিগুলোকে নমনীয় করে তোলে। গর্ভকালীন সময়ে শরীরে বাড়ে অস্বস্তি। তলপেট স্ফীত হয়ে মেরুদণ্ডে চাপ পড়ে, ফলে পিঠে ব্যথা বাড়ে, আর কমতে থাকে রাতের ঘুম। তবে এসব সমস্যায় আরাম পাবেন গর্ভকালীন শরীর ও সময়োপযোগী কিছু ব্যায়াম চালিয়ে গেলে।

গর্ভবতী মা চাকরিজীবী মহিলা হলে, কী ধরনের কাজ এবং কতদিন ঐ কাজ আপনি করতে পারবেন তা নিয়ে আপনার চিকিত্‌সকের সঙ্গে পরামর্শ করুন৷ আপনার স্বাস্থ্য ও গর্ভকালীন আপনার শরীরের অবস্থার ওপর কাজ করা বা না করা নির্ভর করবে৷

 

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা – সপ্তাহ ৩০
গর্ভাবস্থা – সপ্তাহ ৩২>> 

 

তথ্যসূত্রঃ
www.maya.com.bd/content/web/wp/1897
babycenter.com
parents.com

 

Related posts

Leave a Comment