সপ্তাহ ৩০ । গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

আপনার শিশুর ওজন হবে এখন প্রায় ৩ পাউন্ড এবং লম্বায় সে প্রায় ৪০ সে.মি. হবে, একটা বাঁধাকপির মাথার অংশের মতো । সাদা , তৈলাক্ত ভারনিক্স ( Vernix ) এবং নরম, লোমশ লানুগো ( lanugo ) আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে শুরু করবে। শিশুটির ত্বকে এখন আর খুব বেশি ভাঁজ থাকবে না ।

তবে যেহেতু এখনো তার মস্তিস্কের তন্ত্রগুলোর ( tissue ) বিভাজন ঘটছে , তার মাথার ত্বকে sulci নামের গভীর ভাঁজ পড়তে থাকবে। ( sulci বা deep fissures এর মাঝামাঝি উঁচু অংশটাকে বলা হয় gyri ) । শিশুটির দৃষ্টি এখন যথেষ্ট স্পষ্ট হয়ে যাবে । তার পেশীর উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়বে ও একটা আঙ্গুল মুঠো করে ধরার মতো সবল থাকবে ।আপনার শিশুটি এখন প্রায় ১ লিটার পরিমাণ তরলের মধ্যে ভাসছে । সে এখন যতো বড়ো হবে আরও জায়গা নিতে থাকবে। একই সাথে অ্যামনিওটিক তরলের ( amniotic fluid ) ঘনত্ব তত কমতে থাকবে।

৩০ সপ্তাহের আরেকটি বড় পরিবর্তন হোল এ সময় শিশুর অস্থি মজ্জা থেকে রক্তের লোহিত কণিকা উৎপাদন শুরু হবে। বাবু এখন প্রায় পুরোপুরি বড় হয়ে গিয়েছে।তার নড়াচড়া বাইরে থেকেও এখন দেখা যাবে।  সে এখন বেশিরভাগ সময় মাথা নিচের দিকে দিয়ে রাখে।  এ সপ্তাহের শেষে শিশুর নখ পুরোটাই গঠিত। কিছু কিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে জন্মের কিছুদিনের মদ্ধেই নখ কেটে দিতে হয়।

 

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনি

অস্বস্তিবোধ আর দমবন্ধ লাগার পাশাপাশি এখন আপনার একটা নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে । এখন আপনার কেবল ঘুমের সমস্যাই হবে না , বরং যেটুকু সময় ঘুমাতে পারবেন তখনই হরমোনের অতিরিক্ত ক্রিয়াশীলতা অদ্ভুত অথচ পরিস্কার কিছু স্বপ্ন দেখাবে যার জন্য ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে। যদিও সবাই মনে মনে চায় যে শিশুটি জন্মের আগের কয়েকটা দিন অন্তত একটু আরাম করে ঘুমিয়ে নিবেন । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের বড়ো হয়ে ওঠা পেটের কারনে তৈরি হওয়া অস্বস্তি আর রাতে ঘন ঘন বাথরুমে যাবার জন্য উঠতে হবে বলে তাদের কেউই আরাম করে ঘুমানোর সুযোগ পান না। শিশুটির জন্মের পর মা হিসেবে সব কাজগুলো ঠিকভাবে করতে পারবেন কি না সে বিষয়েও এখন আপনি বেশি বেশি চিন্তিত থাকবেন। বিশেষ করে যদি এটা আপনার প্রথমবারের মতো মাতৃত্ববরণ হয়, তাহলে তো চিন্তা এবং আশঙ্কা আরো বেশি থাকবে। আপনার সন্তানটি সুস্বাস্থ্য নিয়ে জন্মাবে কি না, কিংবা প্রসবের সময় কোনো জটিলতা হবে কি না সেসব বিষয় নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকবে।

যাবতীয় বুক জ্বালাপোড়া, পায়ে খিল ধরা, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হওয়া আর সেই সাথে মা হিসেবে নিজের ভূমিকা নিয়ে ভয় আর দুশ্চিন্তার কারণে আপনার ইনসমনিয়া হয়ে যেতে পারে। আর তখন আপনার ক্লান্তিবোধও স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকবে।

যদি আপনার মৃগীরোগ ( Epilepsy ) থাকে, গর্ভাবস্থায় সেটা প্রকট হয়ে উঠতে পারে মাঝে মাঝে । আপনার ডাক্তারকে অবশ্যই সে সম্পর্কে জানিয়ে রাখুন এবং গর্ভাবস্থায় নিরাপদ এমন ওষুধ খান ।

এ সময় আপনার বুক জ্বালাপোড়া ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়তে পারে। এ সময় বেশি করে আঁশযুক্ত খাবার খেতে চেষ্টা করুন। আঁশযুক্ত খাবার আপনাকে এ সপ্তাহে আরো কয়েকটা সম্ভাব্য সমস্যা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করবে। যেমন, কোষ্ঠকাঠিন্যের সূত্র ধরে আপনার অর্শের মতো রোগ হতে পারে। অর্শ হচ্ছে গর্ভাবস্থার এমন এক প্রকার সমস্যা যেখানে পায়ুপথের রক্তনালীগুলো একসাথে ফুলে ওঠে। গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্যের মাত্রা বেশি হলে এই সমস্যা হতে পারে। আপনার যদি গর্ভাবস্থার প্রথম থেকেই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হয় তাহলে এ পর্যায়ে এসে সমস্যার মাত্রা বাড়তে পারে। এমনকি মলত্যাগের সময় মলের সাথে সামান্য রক্তও যেতে পারে।

গর্ভাবস্থার তৃতীয় তিন মাসে গর্ভবতী নারীর জরায়ু বড় হয়ে ডায়াফ্রামে চাপ সৃষ্টি করে (ডায়াফ্রাম হচ্ছে বুক ও পেটের মাঝামাঝি অবস্থিত পেশী যা শ্বাস নেয়া ও নিঃশ্বাস ছাড়ার সাথে জড়িত)। ফুসফুস পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রসারিত হতে পারেনা বলে শ্বাসকষ্ট হয়। গর্ভবতী নারীর গোড়ালি, হাত, পায়ের পাতা এবং মুখ ফুলে যায় তরল জমা হওয়ার কারণে। রক্ত সংবহন ও ধীর গতির হয়। মুখের ত্বকে কালো দাগ পড়তে পারে এবং পেট, উরু, ব্রেস্ট ও পেছনে স্ট্রেচ মার্ক দেখা দেয়।

এই সময় স্তন থেকে শাল দুধের নিঃসরণ হতে পারে। অনেকেই একে প্রসবের লক্ষন মনে করতে পারেন । এটি অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে করনীয়

যদি হাসপাতালে বাচ্চা প্রসব করান তবে আগে থেকেই কাপড়-চোপড়, টাকা-পয়সা, সেবাদানকারীর ব্যবস্থা করে রাখুন। প্রসবব্যথা ওঠার আগে প্রয়োজনীয় টেলিফোন নম্বর সংগ্রহে রাখুন। গর্ভাবস্থার শেষ সপ্তাহগুলো অত্যন্ত দীর্ঘ মনে হয়। তাই এ সময় এমন কিছু করুন যেন একঘেয়েমি না লাগে।

ভাবতে শুরু করুন আপনার বাচ্চার জন্য আপনি কি কি করতে চান। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করুনআপনার আরও সন্তান থাকলে তাদের সঙ্গে সময় কাটান। একই রক্তের গ্রুপসম্পন্ন বন্ধু বা আত্মীয় ঠিক রাখুন যিনি প্রয়োজনে রক্ত দিতে পারবেন।

ব্রাক্সটন-হিকস কনট্রাকশন প্রেগন্যান্সির সময় খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। জরায়ুর পেশীর সংকোচনের কারণে পেটে চাপ অনুভূত হয়। গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ পর্যন্ত মাঝে মাঝেই এ রকম হতে পারে। ফলস পেইন বা “ব্রাক্সটন হিক্স” হলো আসল লেবার পেইন হওয়ার আগে ইউটেরাসের প্রস্তুত হওয়ার একটা প্রাকৃতিক প্র্যাকটিস। লাস্ট ট্রাইমেস্টারে ব্রাক্সটন হিক্স অনেকেই ফিল করে আবার কেউ কেউ করে না। কিন্তু সমস্যা হল কোনটা ফলস পেইন আর কোনটা আসল লেবার পেইন তা ফার্স্ট টাইম প্রেগন্যান্ট রা অনেক সময় বুঝতে পারে না।যদি খুব বেশি সমস্যা হয় তা হলে অবশ্যই চিকিত্সককে জানান।

 

 

অনেক গর্ভবতী হয়ত লক্ষ্য করেছেন দাঁত ব্রাশের সময় মাড়ি থেকে রক্ত বের হয়। এটা অস্বাভাবিক কোনো কিছু নয়। গর্ভাবস্থায় দেহ হরমোনের পরিবর্তন হয় এবং তার প্রতিক্রিয়া মাড়িতেও দেখা দিতে পারে।ই অবস্থাকে বলা হয় গর্ভাবস্থার মাড়ির প্রদাহ বা (pregnancy gingivitis)। এই অসুবিধা মোকাবিলা করার জন্য সর্বাগ্রে যা করণীয় তা হলো গর্ভাবস্থার শুরু থেকে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ বা পরিষ্কার করা নিশ্চিত করা যাতে ডেন্টাল প্লাক সৃষ্টি না হয়। এ ক্ষেত্রে দন্ত চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে গর্ভাবস্থার পুর্বেই দাঁত স্কেলিং করা এবং সঠিক ব্রাশ চালনা পদ্ধতি জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

মায়ের খাবার যাতে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুষম হয় সেক্ষেত্রে পরিবারের সবাইকে নজর রাখতে হবে।এছাড়া মায়ের সারাদিনের খাবার ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিয়ে খাওয়াতে হবে। এতে এসিডিটির ভয় থাকবেনা।

২৮ সপ্তাহ অতিক্রান্ত হওয়ার পর শিশু ক’বার লাথি মারছে সেটা গুনতে শুরু করুন। মনে রাখবেন ২ ঘন্টার মধ্যে যদি শিশু ১০বারের কম লাথি মারে তাহলে অবিলম্বে আপনাকে আপনার চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

মাকে সবসময় পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে সাহস দিতে হবে। কোনভাবেই তাকে ভয়ের কোন কথা বলে ভড়কে দেওয়া যাবেনা।একজন মা ও তার পরিবারের সঠিক প্রস্তুতি ও মানসিক সাহসই একটি সুস্থ, সুন্দর ও সবল শিশুর জন্ম দিতে পারে।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা – সপ্তাহ ২৯
গর্ভাবস্থা – সপ্তাহ ৩১>> 

 

তথ্যসূত্রঃ
www.maya.com.bd/content/web/wp/language/bn/1931/
babycenter.com
parents.com

 

Related posts

Leave a Comment