সপ্তাহ ২৯ । গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

আপনার গর্ভের শিশুটি এ সপ্তাহে ৩৮ সে.মি. লম্বা হবে, একটা বড়সড় শসার সমান বলা যেতে পারে। তার ওজন হবে ২ ১/২ পাউন্ড।শিশুটির পেশীসমূহ এখন আরো সবল হয়ে উঠবে এবং বাইরের জগতের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য তার ফুসফুস এখন আরো ভালোভাবে প্রস্তুত থাকবে। ফুসফুসের গঠন সম্পূর্ণ না হলেও বাচ্চা শ্বাস প্রশ্বাস নিতে শুরু করে। বাচ্চার চোখ আলো সনাক্ত করতে পারে ও হাড়ের গঠন সম্পূর্ণ হয়।মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ অব্যাহত থাকার সাথে সাথে শিশুটির মাথার খুলিও মজবুত হতে থাকবে।

শিশুটির চোখে এখন পূর্ণ বিকশিত পাপড়ি (eyelash) আছে । তার দৃষ্টি ক্ষমতাও ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়ে উঠবে এবং মস্তিষ্কও আরো দ্রুত বিকশিত হতে থাকবে। বাইরে থেকে আলো জ্বালালে পেটের ভেতর থেকেও সে হয়তো অস্পষ্ট হলেও তা দেখতে পারবে। তার ত্বকের নিচে পুরো মাংস ও চর্বি জমেছে, ফলে তাকে এখন বেশ স্পষ্ট দেখাবে।

প্রতিটি সপ্তাহ অতিক্রম করার সাথে সাথে আপনার শিশুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ছে যদি সে আগাম জন্ম গ্রহন করে। এ সপ্তাহে জন্ম নিলে তার জন্য হয়তো কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাস এর ব্যাবস্থা ও করতে হবেনা।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনি

আপনার পেটের ভেতর শিশুটি যত বড় হতে থাকবে, ততই জায়গা কমতে থাকবে এবং অন্যান্য অঙ্গগুলোর ওপর চাপ বাড়তে থাকবে। যেমন, এখন ফুসফুসের ওপর চাপ পড়বে, ফলে ফুসফুসও খুব বেশি বিস্তৃত হতে পারবে না। আর সে কারণে আপনারও দম বন্ধ হবার মতো অনুভূতি হবে এবং কোনোভাবেই আপনি আরাম পাবেন না।

এ সময় আপনার বুক জ্বালাপোড়া ও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়তে পারে। এ সময় বেশি করে আঁশযুক্ত খাবার খেতে চেষ্টা করুন। আঁশযুক্ত খাবার আপনাকে এ সপ্তাহে আরো কয়েকটা সম্ভাব্য সমস্যা প্রতিরোধ করতে সাহায্য করবে। যেমন, কোষ্ঠকাঠিন্যের সূত্র ধরে আপনার অর্শের মতো রোগ হতে পারে। অর্শ হচ্ছে গর্ভাবস্থার এমন এক প্রকার সমস্যা যেখানে পায়ুপথের রক্তনালীগুলো একসাথে ফুলে ওঠে। গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্যের মাত্রা বেশি হলে এই সমস্যা হতে পারে। আপনার যদি গর্ভাবস্থার প্রথম থেকেই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হয় তাহলে এ পর্যায়ে এসে সমস্যার মাত্রা বাড়তে পারে। এমনকি মলত্যাগের সময় মলের সাথে সামান্য রক্তও যেতে পারে।

বুক জ্বালা-পোড়া করা, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা অর্শ – তিনটা উপসর্গেরই উৎস হতে পারে পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা। কারণ এখন শিশুটি বড় হতে থাকার কারণে আপনার পরিপাক তন্ত্রের ওপর চাপ বাড়বে, আবার হরমোনের নিঃসরণও আপনার পরিপাক তন্ত্রের পেশীগুলোকে শিথিল করে দেবে। সবকিছু থেকে স্বস্তি পাবার উপায় – প্রচুর পরিমাণ সবজি খান, প্রচুর পরিমাণ পানি পান করুন, নিয়মিত হাঁটুন কিংবা হাল্কা কোনো ব্যায়াম করুন। যদি কোনো কারণে রক্তস্রাব হয় কিংবা কোনো একটি উপসর্গ প্রকট হয়ে ওঠে তাহলে দেরি না করে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

অনেক গর্ভবতী মা-ই শেষের দিকে এসে আরেকটি সমস্যায় ভোগেন। সেটি হচ্ছে Postural hypotension. রক্তচাপ হ্রাস পাওয়ার এই সমস্যায় গর্ভবতী মা’র মাথা ঝিমঝিম করার মতো অনুভূতি হয়। কোনো একটা ভঙ্গিতে লম্বা সময় ধরে শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে থাকার কারণে রক্তচাপ কমে গিয়ে এমনটা হয়। বিশেষ করে যদি তিনি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকেন কিংবা বসা অবস্থা করে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়ান।

স্বাভাবিকভাবেই এই সময়ে মায়ের তলপেট শিশুর বৃদ্ধির সাথে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে। শিশু যেহেতু ধীরে ধীরে পূর্নাঙ্গ হতে থাকে তাই এই সময় মায়ের ওজনেও আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। শিশুর ওজনভেদে এই ওজন ছয় থেকে দশ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।

অনেক গর্ভবতী হয়ত লক্ষ্য করেছেন দাঁত ব্রাশের সময় মাড়ি থেকে রক্ত বের হয়। এটা অস্বাভাবিক কোনো কিছু নয়। গর্ভাবস্থায় দেহ হরমোনের পরিবর্তন হয় এবং তার প্রতিক্রিয়া মাড়িতেও দেখা দিতে পারে।ই অবস্থাকে বলা হয় গর্ভাবস্থার মাড়ির প্রদাহ বা (pregnancy gingivitis)। এই অসুবিধা মোকাবিলা করার জন্য সর্বাগ্রে যা করণীয় তা হলো গর্ভাবস্থার শুরু থেকে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ বা পরিষ্কার করা নিশ্চিত করা যাতে ডেন্টাল প্লাক সৃষ্টি না হয়। এ ক্ষেত্রে দন্ত চিকিত্সকের পরামর্শ নিয়ে গর্ভাবস্থার পুর্বেই দাঁত স্কেলিং করা এবং সঠিক ব্রাশ চালনা পদ্ধতি জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

বর্ধিষ্ণু শিশুটিকে জায়গা করে দিতে পেট বাড়ছে, চামড়াতেও টান পড়ছে। ফলে এখন থেকে চামড়ায় স্ট্রেচ মার্কও (Stretch mark) পড়তে শুরু করবে। আপনার পেট, স্তন এবং উরুতে এই দাগ বেশি দেখা যাবে। প্রথম প্রথম এই দাগগুলো লাল রেখার মতো থাকবে, তারপর আস্তে আস্তে রূপালী ছাই বর্ণ ধারণ করবে। অবশ্য এটা আপনার ত্বকের রঙের ওপরও নির্ভর করবে। যদিও অ্যান্টি-স্ট্রেচ মার্ক লোশন বা তেল পুরোপুরিভাবে কাজ করে এমন প্রমাণ নেই, তারপরও অনেকটা হলেও দাগ দূর হয় এবং চুলকানি থেকে আরাম পাওয়া যায়।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহের কিছু টিপস

গর্ভাবস্থার শেষ তিনমাসেই শিশুর হাড়ের গঠন সবচেয়ে মজবুত হবে। সুতরাং আপনার খাবারের তালিকায় প্রতিদিন যথেষ্ট পরিমাণ দুধ বা দই থাকতেই হবে। গর্ভজাত শিশুটির প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম সরবরাহের জন্য প্রতিদিন অন্তত দুই কাপ সমান দুধ বা দই খেতে হবে আপনাকে। ক্যালসিয়ামের আরো দুইটি ভালো উৎস হচ্ছে চিজ এবং ছোটো মাছ ( যেমন কাঁচকি)। যদি আপনার দুধ বা দুধ জাতীয় খাবারে সমস্যা থাকে তাহলে ডাক্তারকে সে কথা জানান। এমনকি অন্য আর কোনো সমস্যার কারণে যদি আপনি খাবারের তালিকায় পর্যাপ্ত ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার না রাখতে পারেন, তাহলে সে ব্যাপারেও ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। সেক্ষেত্রে ডাক্তার হয়তো আপনাকে নিয়মিত খাবারের সাথে ট্যাবলেট আকারে বাড়তি ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট নিতে বলবে।

খাবারের সাথেই হোক, আর বাড়তি সাপ্লিমেন্ট হিসেবেই হোক, ক্যালসিয়ামের পর্যাপ্ত চাহিদা তো পূরণ করছেন। সেই সাথে প্রচুর ভিটামিন সি-ও যেন আপনার শরীর পেয়ে থাকে। কমলা, লেবু, জাম্বুরা কিংবা আমলকীর মতো ভিটামিন সি ভরপুর ফল বা ফলের জুস বেশি বেশি খান।

গর্ভবতী মায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ন সমস্যা পায়ে পানি আসা। একনাগারে একই জায়গায় অনেকক্ষন বসে থাকলে বা পা ঝুলিয়ে বসলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই কিছুক্ষন পরপর বসার ধাঁচ পরিবর্তন করুন কিন্তু খেয়াল রাখবেন কোনভাবেই যেন তা পেটের উপর প্রভাব না ফেলে।

আমাদের পেটের ডান দিকে থাকে বৃহৎ শিরা ইনফিরিয়র ভেনাকাভা, যা শরীরের নিচের অংশ থেকে রক্ত হূৎপিণ্ডে চালান করে। গর্ভকালে ভারী পেট নিয়ে ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকলে এই শিরার ওপর চাপ পড়ে ও রক্ত সংবহন ব্যাহত হয়। তার চেয়ে বাঁ দিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকলে রক্ত সংবহন বাড়ে, ফলে শিশুর শরীরেও রক্ত বেশি সঞ্চালিত হতে পারে, তাছাড়া পায়ে পানি জমাটাও কমে। তাই পাঁচ মাসের পর থেকে মাকে অন্তত কয়েক ঘণ্টা বাঁ দিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকতে বলা হয়।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

গর্ভাবস্থায় নানা শারীরিক সমস্যা হয়। এ সময় হতে পারে পিঠে ব্যথা, রাতে ঘুম না হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি। ব্যায়ামের উপকারিতা এখানেই। নিয়মিত ব্যায়াম করলে পিঠে ব্যথা কমে যায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। স্ট্রেস ও অ্যাংজাইটি কমিয়ে ব্যায়াম রাতে ঘুম আনতে সাহায্য করে। শরীরের রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে উজ্জ্বলতা নিয়ে আসে চেহারায়।হরমোনাল পরিবর্তনের জন্য এ সময় জয়েন্ট শিথিল হয়ে যায়। তাই হাত, পায়ে ব্যথা হতে পারে। ব্যায়াম করলে জয়েন্টের ভেতর যে লুব্রিকেটিং ফ্লুইড থাকে, তার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে হাত, পায়ের ব্যথা কমায়।ব্যায়াম শরীরের নিম্নাংশের মাসল টোন করে শরীরকে ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত করে। মাসলকে শক্তিশালী করে ডেলিভারির সময় লেবার পেইন কমায়।গর্ভধারণের পর শরীরে অনেক পরিবর্তন হয়। এগুলো অনেক সময় মেনে নিতে কষ্ট হয়; তাই মন-মেজাজ ভালো থাকে না। ব্যায়াম করলে ব্রেনে এক ধরনের কেমিক্যাল নিঃসৃত হয় যা মন ভালো রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া শরীরের এনার্জি লেভেল বাড়িয়ে মুড ভালো রাখে। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ব্যায়াম করলে বাচ্চা হওয়ার পর দ্রুত বেড়ে যাওয়া ওজন কমে যায়।তবে যে ধরনের ব্যায়ামই করুন না কেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজ থেকে কোনো ব্যায়াম শুরু করবেন না।

মায়ের খাবার যাতে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুষম হয় সেক্ষেত্রে পরিবারের সবাইকে নজর রাখতে হবে।এছাড়া মায়ের সারাদিনের খাবার ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিয়ে খাওয়াতে হবে। এতে এসিডিটির ভয় থাকবেনা।

২৮ সপ্তাহ অতিক্রান্ত হওয়ার পর শিশু ক’বার লাথি মারছে সেটা গুনতে শুরু করুন। মনে রাখবেন ২ ঘন্টার মধ্যে যদি শিশু ১০বারের কম লাথি মারে তাহলে অবিলম্বে আপনাকে আপনার চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

মাকে সবসময় পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে সাহস দিতে হবে। কোনভাবেই তাকে ভয়ের কোন কথা বলে ভড়কে দেওয়া যাবেনা।একজন মা ও তার পরিবারের সঠিক প্রস্তুতি ও মানসিক সাহসই একটি সুস্থ, সুন্দর ও সবল শিশুর জন্ম দিতে পারে।

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২৮
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ৩০>>

তথ্যসূত্রঃ
www.maya.com.bd/content/web/wp/1903/
babycenter.com
parents.com

 

Related posts

Leave a Comment