সপ্তাহ ২৮ । গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার ২৮ সপ্তাহে আপনার শিশুর ওজন প্রায় ২.২২ পাউনড এবং দৈর্ঘ্য ৩৮ সে.মি.। এ সপ্তাহ নাগাদ শিশুর যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ সম্পূর্ণ হবে, তবে আকারে সে এখনো অনেক ছোটো। তার অঙ্গ-প্রতঙ্গ এখন স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম । সে এখন বাইরের জগতে সদর্পে বেঁচে থাকতেও প্রস্তুত । আপনার রক্ত থেকে এতদিনে অ্যান্টিবডিও (জীবদেহে কোনো বিশেষ ক্ষতিকর পদার্থ প্রবেশের প্রতিক্রিয়ায় জাত বিশেষ প্রোটিনজাতীয় পদার্থ যা ঐ ক্ষতিকর পদার্থকে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে) তার শরীরে চলে যাবে।

শিশুটি এখন হয়তো ঘুমাবার এবং জেগে থাকার সময়ের একটা নিদিষ্ট প্যাটার্ন তৈরি করে ফেলবে । প্রায় সময়ই আপনার নৈমিত্তিক প্যাটার্নের চেয়ে এই প্যাটার্ন ভিন্ন হয়। ফলে , আপনি যখন রাতে ঘুমাতে যাবেন, তখন হয়তো সে জেগে থাকবে এবং তার যাবতীয় শারীরিক ক্রিয়া শুরু করবে । স্টেথোস্কোপ ( stethoscope ) এর সাহায্যেই এখন শিশুটির হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শোনা যাবে। আপনার পেটে কান পেতে অন্য কেউ হয়তো সরাসরিই এই হৃদস্পন্দন টের পাবেন , তবে শিশুটির সঠিক অবস্থান ঠাহর করা মুশকিল হবে ।

শিশুটির চোখে এখন পূর্ণ বিকশিত পাপড়ি (eyelash) আছে । তার দৃষ্টি ক্ষমতাও ইতিমধ্যে পরিষ্কার হয়ে উঠবে এবং মস্তিষ্কও আরো দ্রুত বিকশিত হতে থাকবে। বাইরে থেকে আলো জ্বালালে পেটের ভেতর থেকেও সে হয়তো অস্পষ্ট হলেও তা দেখতে পারবে। তার ত্বকের নিচে পুরো মাংস ও চর্বি জমেছে, ফলে তাকে এখন বেশ স্পষ্ট দেখাবে। জন্মের পর প্রথম যখন তাকে কোলে নেবেন তাকে দেখতে মোটেও অসুন্দর লাগবে না ।

সবচাইতে সুসংবাদ হচ্ছে শিশুর শ্বাসযন্ত্র এখন অনেকটাই বিকশিত এবং সে এখন শ্বাস প্রশ্বাস নিতে সক্ষম। তাই এ সময়ে যদি শিশু ভূমিষ্ঠ হয় তাহলে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট। এ সপ্তাহে শিশুর মস্তিষ্কের তরঙ্গ রেপিড আই মুভমেন্ট (REM) স্লিপ দেখাবে তার মানে এই যে এখন আপনার শিশুর হয়ত স্বপ্ন দেখতে পারছে।

 

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনি

স্বাভাবিকভাবেই এই সময়ে মায়ের তলপেট শিশুর বৃদ্ধির সাথে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে। শিশু যেহেতু ধীরে ধীরে পূর্নাঙ্গ হতে থাকে তাই এই সময় মায়ের ওজনেও আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। আগামী তিন মাসে আপনার আরও ১১ পাউন্ডের মতো ওজন বাড়বে । এখন থেকে প্রতি ২ সপ্তাহে একবার আপনার ডাক্তারের কাছে যেতে হবে এবং ৩৬তম সপ্তাহ থেকে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার রুটিন হবে প্রতি সপ্তাহেই একবার।

এ সপ্তাহে ডাক্তার আরেকবার আপনার রক্তে শর্করার (Blood Sugar) মাত্রা পরীক্ষা করে দেখবেন। এর আগে যখন ডায়াবেটিসের জন্য রক্ত পরীক্ষা করিয়েছিলেন, তখন যদি রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি এসে থাকে তাহলে এখন ডাক্তার আপনাকে আরেকবার পরীক্ষার জন্য oral glucose tolerance test দিতে পারেন ।

যদি আপনার রক্তের গ্রুপ রেসাস নেগেটিভ (Rh Negative) হয়ে থাকে তাহলে এ সপ্তাহে ডাক্তার আপনাকে Rh Antibody (immunoglobulin) ইনজেকশনের প্রথম ডোজ দেবেন । আপনার বর্তমান গর্ভাবস্থা বা ভবিষ্যৎ গর্ভধারণের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে এমন কিছু ঝুঁকিপূর্ণ উপসর্গ থেকে এটা আপনাকে এবং আপনার গর্ভের শিশুকে রক্ষা করবে। এটাকে বলা হয় নবজাতকের Rh incompatibility reaction যেসব মায়ের রক্তের গ্রুপ Rh Negative এবং গর্ভের শিশুর রক্তের গ্রুপ Rh positive , তাদের ক্ষেত্রেই এই সমস্যা হয়ে থাকে। আপনার দেহের রোগ প্রতিরোধক প্রোটিনগুলো তখন গর্ভস্থ শিশুকে মায়ের শরীরে অনুপ্রবেশকারী ক্ষতিকর কোনো বস্তূ (Foreign Substance) হিসেবে গণ্য করে এবং শিশুর রক্তকণিকাসমূহকে আক্রমণ করে। যদি এমন হয় যে আপনার রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ কিন্তু গর্ভের শিশুর রক্তের গ্রুপ পজিটিভ, এবং গর্ভের শিশুটি যদি প্রথম সন্তান হয়, তাহলে জন্মের পর তার মৃদু জন্ডিসের ভাব থাকতে পারে। কিন্তু, গর্ভের শিশুটি যদি আপনার দ্বিতীয় সন্তান হয় তাহলে সে যথেষ্ট দুর্বল একজন শিশু হবে যার জন্ডিস হবার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকবে, সেই সাথে তার রক্তশূন্যতাও থাকতে পারে।শিশুটির জন্মের পর আপনাকে Rh Antibody’র দ্বিতীয় ডোজটি দেয়া হবে।

এ সময় আপনার রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম ( Restless Leg Syndrome) এর সমস্যাও হতে পারে। এই রোগে আপনার পা প্রচণ্ড শিরশির করবে এবং সেটা থেকে আরাম পাওয়ার জন্য আপনার ক্রমাগত পা, বিশেষ করে পায়ের গোড়ালি নাড়াতে ইচ্ছা করবে। এরকম কেন হয় সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই, তবে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পা লম্বা করে টান টান করা এবং মাসাজ এরকম সমস্যার ক্ষেত্রে অনেক উপকারী হবে। ক্যাফেইন ( Caffein) আছে এরকম খাবার বা পানীয় পরিহার করুন, কারণ ক্যাফেইন গ্রহণ এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তবে, আপনি যদি বাড়তি আয়রন সাপ্লিমেন্ট ( Iron Suppliment) নেন, তাহলে সেটা চালিয়ে যান। কোনো কোনো গর্ভবতী মহিলা এই অবস্থায় আয়রন সাপ্লিমেন্টের কারণে আরাম বোধ করেন।

গর্ভবতী মায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ন সমস্যা পায়ে পানি আসা। একনাগারে একই জায়গায় অনেকক্ষন বসে থাকলে বা পা ঝুলিয়ে বসলে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই কিছুক্ষন পরপর বসার ধাঁচ পরিবর্তন করুন কিন্তু খেয়াল রাখবেন কোনভাবেই যেন তা পেটের উপর প্রভাব না ফেলে।

২০তম সপ্তাহ থেকেই হঠাৎ হঠাৎ আপনার জরায়ুর পেশী কুঁচকে যাওয়ার মতো অনুভূতি শুরু হতে পারে, তবে এতে কোনো ব্যথা থাকবে না। এটাকে বলা হয় Braxton hicks contraction ( এটাকে practice contractions ও বলা হয়) । কিন্তু যদি পেশীর এই সঙ্কোচনভাব বেশি বেশি হয় এবং সাথে ব্যথাও থাকে, তাহলে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিৎ কারণ এটা সময়ের আগেই প্রসব যন্ত্রণা শুরু হবার পূর্বলক্ষণ হতে পারে।

খাওয়ার পর পরই বুক জ্বালা-পোড়া করা বা বদহজমের সমস্যা হতে পারে এবং পেট ফুলে যেতে পারে। এসময় অনেকের মাড়ি ফুলে যাওয়ার সমস্যাও হয়ে থাকে, ফলে দাঁত ও মাড়ির যত্ন নেয়া জরুরি।আপনার কোষ্ঠকাঠিন্যের ভাব এখনই দূর হয়ে যাবে না। এ সময় প্রচুর পানি খাওয়া আপনার জন্য উপকারী হবে। এতে করে মূত্রনালির কোনো সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে তাও কমে যাবে।

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে করনীয়

মায়ের শরীর যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এসময় বেশি হাঁটা চলা না করাই শ্রেয় হবে। তবে একেবারে শুয়ে বসে থাকাও মা ও শিশুর কারো স্বাস্থের জন্য মঙ্গলজনক নয়। হালকা ব্যায়াম, হাঁটা চলা করা যাতা পারে। তবে তা কখনোই যেনো মাত্রাতিরিক্ত না হয়।

কর্মজীবি মায়েরা এই সময় থেকে কাজে বিরতি দিন। অফিসে আসা যাওয়া, যানবাহনে চড়ার ধকল শরীরের জন্য ক্ষতিকর হবে। তাছাড়া ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোন দূরবর্তী স্থানে ভ্রমন এই সময়ের জন্য একেবারেই নিষিদ্ধ

মায়ের খাবার যাতে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুষম হয় সেক্ষেত্রে পরিবারের সবাইকে নজর রাখতে হবে।এছাড়া মায়ের সারাদিনের খাবার ছোট ছোট অংশে ভাগ করে নিয়ে খাওয়াতে হবে। এতে এসিডিটির ভয় থাকবেনা।

আপনি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে আপনার ওজন অতিরিক্ত বেড়ে যাক। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন থাকলে পুরোটা সময় তো বটেই, বিশেষভাবে সন্তান প্রসবের সময় অনেক ধরণের জটিলতা তৈরি হবার ঝুঁকি থাকে। আপনার ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা তা আমাদের pregnancy weight gain calculator এর সাহায্যে জেনে নিন।

বাচ্চাদের জন্য একই সাথে সুন্দর এবং উপযোগী একটা নাম খুঁজে বের করা খুবই কঠিন কাজ কারণ আপনার দেয়া নামটিই সারাজীবন তার পরিচয় বহন করবে। আপনি কি আধুনিক কোনো নাম খুঁজছেন? নাকি পরিবারিকভাবে সব সদস্যদের যে ধরনের নাম চলে আসছে সেরকম কিছু রাখবেন? নাকি আপনার পছন্দ একেবারেই প্রচলিত, ক্ল্যাসিক কোনো নাম? একটা ধারণা পাবার জন্য আপনি অন্য মায়েদের সাথে আলাপ করে দেখতে পারেন তারা বাচ্চার নামের ব্যাপারে কি ভাবছে, কিংবা কি ধরণের নাম এখন বেশি চলছে। এমনকি, আপনি আমাদের ওয়েবসাইটেও বাচ্চার নাম বিভাগটি দেখে নিতে পারেন। আপনার অনাগত অতিথির একটা সুন্দর নাম রাখার প্রক্রিয়ায় এই তালিকাটিও সহায়ক হতে পারে।

যেহেতু এটি গর্ভাবস্থার শেষ দিক, মা ও তার পরিবারকে মানসিক ও আর্থিকভাবে প্রসবকালীন সময়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে, প্রয়োজনীয় রক্তের যোগার রাখতে হবে।

মাকে সবসময় পরিবারের সদস্যদের মানসিকভাবে সাহস দিতে হবে। কোনভাবেই তাকে ভয়ের কোন কথা বলে ভড়কে দেওয়া যাবেনা।একজন মা ও তার পরিবারের সঠিক প্রস্তুতি ও মানসিক সাহসই একটি সুস্থ, সুন্দর ও সবল শিশুর জন্ম দিতে পারে।

 

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা- সপ্তাহ ২৭
গর্ভাবস্থা- সপ্তাহ ২৯>> 

তথ্যসূত্রঃ 
www.maya.com.bd/content/web/wp/1929/
babycenter.com
parents.com

 

Related posts

Leave a Comment