সপ্তাহ ২৭ । গর্ভাবস্থার প্রত্যেকটি সপ্তাহ

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে অনেকটা ফুলকপির আকারের শিশুটির ওজন  পুরোপুরি ২ পাউন্ড হবে। দৈর্ঘ্যও সে গত সপ্তাহের চাইতে আধা ইঞ্চি বাড়বে । অর্থাৎ এ সপ্তাহে তার দৈর্ঘ্য হবে ১৪ ১/২ ইঞ্চি ।এ সপ্তাহ নাগাদ যদিও তার ফুসফুস পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হবে না, তারপরও যদি শিশুটি এই সপ্তাহেই জন্মগ্রহণ করে তাহলে প্রয়োজনীয় মেডিকেল সাপোর্টের মাধ্যমে সে শ্বাস নিতে পারবে।এই সময় বাচ্চার অধিকাংশ অঙ্গ প্রত্যঙ্গের গঠন সম্পূর্ণ হয় ও শ্রবন শক্তির বিকাশ ঘটে।

এ সপ্তাহেও তার মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কোষসমূহ বিভাজিত হতে থাকবে এবং পরিপক্ব হতে থাকবে। ফলে , আপনার গর্ভে থাকা অবস্থায়ও সে যথেষ্ট সক্রিয় থাকবে।

শিশুটি এখন ভারনিক্স (Vernix) নামক সাদা , তৈলাক্ত এক প্রকার পদার্থ দ্বারা আবৃত থাকবে। ধারণা করা হয় যে , এই পদার্থটি অ্যামনিওটিক তরলের (Amniotic Fluid) ভেতর শিশুর ত্বককে সুরক্ষিত রাখে ।জন্মের পর পর এই vernix মিলিয়ে যাবে । শিশুটি যেহেতু এখন কিছু সময় ঘুমিয়ে থাকে আবার কিছু সময় জেগে থাকে, তাই সে এখন ইচ্ছেমত চোখ খুলতে ও বন্ধ করতে পারবে। সে হয়তো এখন তার আঙ্গুলও চুষবে। যদি আপনি পেটের ভেতর শিশুটির আকস্মিক এবং ছন্দময় নড়াচড়া অনুভব করেন তাহলে ধরে নিতে পারেন সে ঢেকুর তুলছে। এটা তার জন্য মোটেও ক্ষতিকর নয় , সুতরাং আপনিও নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।

 

গর্ভাবস্থার এ সপ্তাহে আপনি

আপনার এখন থেকে পায়ে খিল ধরার মতো অনুভূতি হতে পারে। যে সকল রক্তনালী এবং স্নায়ু পায়ে রক্ত সরবরাহ করে , শিশুটির কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ওজন সেই রক্তনালীগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করে বলেই এমন অনুভূতি হয় । এই পর্যায় থেকে গর্ভাবস্থার যতোদিন পার হতে থাকবে , পায়ে খিল ধরার এই অনুভূতিও ততই পীড়াদায়ক হতে থাকবে। বিশেষ করে রাতে আরও অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। যখনি পায়ের মাংসল অংশে (calf) খিল ধরার মতো অনুভব করবেন, তখনি পা টান টান করে সামনে মেলার চেষ্টা করুন এবং পা সোজা করে শিন (shin) বরাবর কাত করার চেষ্টা করুন। calf –এ ম্যাসাজ করে কিছুক্ষণ হাঁটার চেষ্টা করুন।

বর্ধিষ্ণু শিশুটিকে জায়গা করে দিতে পেট বাড়ছে, চামড়াতেও টান পড়ছে। ফলে এখন থেকে চামড়ায় স্ট্রেচ মার্কও (Stretch mark) পড়তে শুরু করবে। আপনার পেট, স্তন এবং উরুতে এই দাগ বেশি দেখা যাবে। প্রথম প্রথম এই দাগগুলো লাল রেখার মতো থাকবে, তারপর আস্তে আস্তে রূপালী ছাই বর্ণ ধারণ করবে। অবশ্য এটা আপনার ত্বকের রঙের ওপরও নির্ভর করবে। যদিও অ্যান্টি-স্ট্রেচ মার্ক লোশন বা তেল পুরোপুরিভাবে কাজ করে এমন প্রমাণ নেই, তারপরও অনেকটা হলেও দাগ দূর হয় এবং চুলকানি থেকে আরাম পাওয়া যায়।

Nipple আকৃতি বাড়তে পারে এবং গাঁড় বর্ণ ধারন করতে পারে। nipple এর আশেপাশে (areola) ছোট ছোট ব্রন হতে পারে। এগুল Montgomery’s Tubercles নামে পরিচিত এবং স্তনকে breast feeding এর জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। এগুলোকে চাপবেন না বা দূর করার চেষ্টা করবেন না। মুখের ব্রন এর মত এগুলো অপ্রয়োজনীয় নয়।

এ সময় দুটো জিনিস নিয়ে ভাববার আছে। সেগুলো হলো স্পাইডার ভেইন ( Spider Vein) এবং ভেরিকোজ ভেইন (Varicose Vein) । এই দুটোই রক্তনালীর প্যাঁচ সংক্রান্ত সমস্যা যেগুলো এমনিতে তেমন জটিল নয়।

স্পাইডার ভেইন ত্বকের ওপর দেখতে বেশ প্রকট লাগে, তবে সাধারণত এতে কোনো ব্যথা থাকে না। সন্তান প্রসবের পর পর এটা মিলিয়ে যায়। গোড়ালি, পা, এমনকি মুখের ত্বকের একদম নিচের শিরাগুলো এমনভাবে পেঁচিয়ে যায় যে দেখতে একটা মাকড়সার মতো মনে হয়।

ভেরিকোজ ভেইন -এর ক্ষেত্রে পায়ের ও যোনিদ্বারের( vulva) ত্বকের একদম নিচের রক্তপ্রবাহী শিরাগুলো ফুলে যায় এবং সেগুলো নীল বা বেগুনি রেখার মতো দেখায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেবলমাত্র বিশ্রীভাবে শিরাগুলো ফুলে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই হয় না। তবে, কখনো কখনো সামান্য ব্যথা আর চুলকানি হতে পারে, পা ভারী লাগতে পারে, এমনকি মনে হতে পারে যে শিরাগুলো ভেতরে কাঁপছে। যদি কেউ এ অবস্থায় সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে সন্ধ্যা নাগাদ শিরাগুলোর ফোলাভাব প্রকট চেহারা ধারণ করতে পারে। এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পাবার জন্য যতটুকু সম্ভব পা উঁচিয়ে বসুন বা পা- কে বিশ্রাম দিন, বাম কাতে শোন এবং টাইট স্টকিং পরুন।

গর্ভাবস্থায় শেষের দিকে মায়েদের পাইলসে আক্রান্ত হওয়া একটি সাধারণ ঘটনা, অনেকের হয়, এ সমস্যা আগে থেকে ছিল কিন্তু এখন এটির তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে৷ আবার গর্ভাবস্থার কারণে অনেকের এ সমস্যা নতুন করে শুরু হতে পারে৷ এ অবস্থায় পাইলস হওয়ার উলেখযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে কোষ্ঠকাঠিন্য, হরমোনের পরিবর্তন, জরায়ুর স্ফীতির জন্য পেটের ভেতরের চাপ বৃদ্ধি পাওয়া যার কারণে রক্তচলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়৷

এ সপ্তাহের কিছু টিপস

আপনি আপনার ডাক্তার বা ধাত্রীর সাথে কথা বলে সন্তান প্রসবের ব্যাপারে সব কিছু জেনে নিতে পারেন। তারা আপনাকে প্রসবের লক্ষণ বুঝতে ও কতটা সময় বাদে বাদে সংকোচন হলে হাসপাতাল বা জন্ম কেন্দ্রে যাওয়া উচিত সে সম্পর্কে বুঝিয়ে দেবেন। এছাড়া কোন শিশু বিশেষজ্ঞকে দিয়ে আপনার শিশুর চিকিৎসা করাবেন, কোথায় আপনি সন্তান জন্ম দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, সেখানে রেজিসট্রেশান করা ইত্যাদির ভাবনাচিন্তা শুরু করে দিতে পারেন।

গর্ভাবস্থায় উঁচু হিলের জুতা ব্যবহার করা উচিত নয়৷ জুতা নরম এবং ঠিক মাপমতো হওয়া উচিত৷ জুতা পরে স্বাচ্ছন্দো চলাফেরা করতে যেন কোন রকম ব্যাঘাত না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে৷ এসময় শরীরের ওজন ক্রমশ বাড়তে থাকে৷ তাই ভারসাম্য রক্ষার জন্য নিচু অথবা মাঝারি ধরনের হিলওয়ালা জুতা পরাই ভাল৷

গর্ভাবস্থায় দাতের যত্ন নেয়া খুবই প্রয়োজন৷ এসময় দাঁতের পরিষ্কার রাখতে হবে৷ গর্ভাবস্থায় অনেক সময় মাড়ি ফুলে রক্তপাত হয়৷ তাই এ সময়ে মাড়ির যত্ন প্রথম থেকেই নেওয়া উচিত৷ প্রতিদিন সকালে ও রাতে শোয়ার আগে দঁাত ব্রাশ করা প্রয়োজন৷ দঁাত বা মাড়ির কোনও সমস্যা থাকলে দন্ত চিকিত্‌সকের পরামর্শ নিন৷ দাত  খারাপ থাকলে ক্যালশিয়ামযুক্ত খাবার যেমন – দুধ, ঘি, মাখন, ছোট মাছ (কাটামাছ) ইত্যাদি খেলে ক্যালশিয়ামের অভাব পূরণ হয়৷ প্রয়োজনে চিকিত্‌সকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যালশিয়াম ট্যাবলেট ব্যবহার করা যায়৷ মাড়ি থেকে রক্তপাত হলে ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার খেলে ভালো ফল পাওয়া যায়৷

গর্ভাবস্থায় গর্ভের প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত স্তনের বিশেষ যত্ন নেওয়া উচিত৷ সাবান ও কুসুম গরম পানির সাহায্যে পরিষ্কার করে পরে ঠাণ্ডা পানিতে ভেজানো কাপড় দিয়ে মুছে ফেলে শুকনো নরম তোয়ালে দিয়ে মোছা উচিত৷ তা ছাড়া স্তনের বেঁাটা বা নিপল যাতে ফেটে না যায় এবং গঠন সুঠাম হয় সেজন্য গ্লিসারিন মাখতে পারেন অথাব বেঁাটা সামনের দিকে একটু টেনে আঙুলে তেল (অলিভ ওয়েল হলে ভালো হয়) নিয়ে বুড়ো আঙুলের সাহায্যে আস্তে আস্তে ম্যাসেজ করতে পারেন৷ এতে পরে নবজাতকের স্তন্যপানের সুবিধা হয়৷

গর্ভাবস্থায় সঠিক খাবার গ্রহণ করলে কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা দূর করা যায়। এ সময় প্রচুর পানি পান করতে হবে। দিনে অন্তত সাত-আট গ্লাস পানি পান করা উচিত। টাটকা সবুজ শাকসবজি বেশি বেশি খেতে হবে।টাটকা ফল যেমনÑ আম, পেয়ারা, আমড়া, পেঁপে, কলা, অর্থাৎ ঋতু অনুযায়ী প্রাপ্য ফল খেতে হবে। সহনীয় শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে।গর্ভাবস্থায় কিছু বিশেষ ব্যায়াম রয়েছে, যা শিখে নিয়ে প্র্যাকটিস করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।

গর্ভাবস্থায় মায়েরা নানারকম দুঃস্বপ্ন দেখতে পারেন যা নিয়ে তারা বিষণ্ণ থাকেন। এসব মানসিক পরিবর্তন সব নারীর ক্ষেত্রেই কম বেশী ঘটে। তবে এটি “ক্লিনিকাল বিষন্নতা” রোগ নয়, তাই এর কোন ধরণের চিকিতসার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু পরিবার ও আশেপাশের মানুষ দের ভালোবাসা। তবে এই যত্ন টুকু যদি আপনি তার না করেন, তাহলে সে আস্তে আস্তে সে বিষন্নতা রোগের দিকে অগ্রসর হতে পারে। তখন তা গর্ভের সন্তানের ঝুকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাছড়া এই সময়টাতে এখন আরেকজ কে সাপোর্ট দেয়ার মাধ্যমে সম্পর্ক একটা নতুন মোড় পায়।

আমাদের পেটের ডান দিকে থাকে বৃহৎ শিরা ইনফিরিয়র ভেনাকাভা, যা শরীরের নিচের অংশ থেকে রক্ত হূৎপিণ্ডে চালান করে। গর্ভকালে ভারী পেট নিয়ে ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকলে এই শিরার ওপর চাপ পড়ে ও রক্ত সংবহন ব্যাহত হয়। তার চেয়ে বাঁ দিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকলে রক্ত সংবহন বাড়ে, ফলে শিশুর শরীরেও রক্ত বেশি সঞ্চালিত হতে পারে, তাছাড়া পায়ে পানি জমাটাও কমে। তাই পাঁচ মাসের পর থেকে মাকে অন্তত কয়েক ঘণ্টা বাঁ দিকে কাত হয়ে শুয়ে থাকতে বলা হয়।

সময় কাটানোর অংশ হিসেবে বাচ্চার নাম এখন থেকেই খুজতে পারেন। বাচ্চার সুন্দর আরবি বা বাংলা নাম ও নামের অর্থ জানতেFairyland Baby Names Finder এর সাহায্য নিতে পারেন।

 

“প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, নিরাপদ হোক মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্ত ”

<<গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২৬
গর্ভাবস্থা সপ্তাহ ২৮ >>

তথ্যসূত্রঃ
www.maya.com.bd/content/web/wp/1823/
babycenter.com
parenting.com

 

Related posts

Leave a Comment