শিশুর সঠিক খাদ্যাভ্যাস তৈরির ৭ টি টিপস (ছয় মাস থেকে ১৮ মাস বয়সী বাচ্চার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)

শিশুর সঠিক খাদ্যাভ্যাস

এমন একটা দিনও সম্ভবত নেই  যেদিন কোন বাচ্চার মা অভিযোগ করছেন না, “আমার বাচ্চা কিছুই খায় না। প্লীজ, একটা কিছু করুন”। সত্যি বলতে কি, বাচ্চাদের খাওয়া সংক্রান্ত প্রশ্নই সব থেকে সাধারন প্রশ্ন যা প্রায় সবার কাছ থেকে আসে, কিন্তু যার সন্তোষজনক উত্তর দেওয়া সবথেকে কঠিন। একজন কমবয়সী মা পরিবারের সদস্য, বন্ধু, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, সমবয়সী বন্ধুবান্ধব ইত্যাদি বিভিন্ন উৎস থেকে প্রচুর সংখ্যায় পরস্পরবিরোধী মতামত এবং উপদেশ পান এবং তাঁরা প্রভাবিতও হন গভীরভাবে প্রোথিত পরম্পরাগত অভ্যাস, প্রাচীন বিশ্বাস এবং বাচ্চাদের খাদ্যাভ্যাস সংক্রান্ত ভুল ধারণার দ্বারা। বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য ঘন্টা অতিক্রম করে চেষ্টা করে যাওয়া রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ব্যতিক্রম খুব কমই দেখা যায় এবং এই পদ্ধতির অনুসরণ অনেক অভিভাবকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদেরকে একটু চিন্তামুক্ত করার জন্য এটি আমার ছোট্ট প্রচেষ্টা।

টিপস- ১

বাচ্চা যখন প্রথম সলিড খেতে আরম্ভ করে, অনেক মা-বাবাই তার খাবার নিয়ে একটু অস্থির হয়ে পড়েন। আর এই অস্থিরতা সাধারণত বাচ্চার খাবারে অনীহা তৈরি করার পেছনে একটি অন্যতম ভুমিকা পালন করে। পাঁচ থেকে আট মাস বয়সী শিশুরা যথেষ্ট পরিমাণ মায়ের দুধ খেলে, বাড়তি খাবার খুব অল্প পরিমাণ খেলেও চলে। যেটুকু খায় তা যেন পুষ্টিকর এবং জীবাণুমুক্ত হয় সেটুকু খেয়াল রাখলেই যথেষ্ঠ। এক একটি বাচ্চার খাদ্য গ্রহনের পরিমাণ এবং রুচি সম্পুর্ন ভিন্ন হয়, সুতরাং তুলনামূলক এবং অযাচিত দুশ্চিন্তা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন।বাচ্চার খাবারের বাটিতে উচ্ছিষ্ট থাকলে সেটি শেষ করার জন্য খুব বেশি চাপ না নেয়াই ভাল। এতে পরবর্তীতে খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে।

টিপস- ২

বাচ্চার জন্য তৈরি প্রথম খাবার নরম এবং সহজ-পাচ্য হওয়া দরকার। তারপর আস্তে আস্তে খাবারে এবং খাবারের স্বাদে বৈচিত্র্য আনতে হয়। বাচ্চা যদি পছন্দ করে তাহলে তার খাবারে আমাদের দৈনন্দিন রান্নার মসলা ব্যাবহার করা যায়। কিংবা নিজেদের জন্য করা রান্না যদি স্বাস্থ্যকরভাবে রান্না হয় , তাহলে সাত থেকে আট মাস থেকে সেগুলোও শুরু করা যায়। তবে এক্ষেত্রে ঢালাওভাবে কাউকে উপদেশ দেয়াটা ঠিক হবে না, কারন এক এক পরিবারের রান্না এবং খাবারের অভ্যাস এক এক রকম। সুতরাং বাচ্চার প্রয়োজন এবং রুচি অনুযায়ী আস্তে আস্তে খাবারে বৈচিত্র্য যুক্ত করাই যুক্তিসঙ্গত। কোনো বাচ্চা কোনো বিশেষ খাবার পছন্দ না করলে তাকে তা জোর করে কিংবা প্রলোভন বা ভয় দেখিয়ে খাওয়ানো খুবই অনুচিত, এমনকি খাবারটি যদি খুবই পুষ্টিকর হয়-তাহলেও। এশব ক্ষেত্রে কয়েদিন সেই খাবারটি দেয়া বন্ধ করে দিন, এবং কয়েকদিন পর নতুন কোনভাবে পরিবেশন করতে পারেন , এতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাজ হয়।

টিপস- ৩

খাওয়ানোর সময় বিভিন্ন ডিভাইসে গান, ছড়া কিংবা টিভি ইত্যাদি চালু করে বাচ্চাকে খাওয়ানো অনেকটা বাধ্যতা-মূলক হয়ে গেছে আজকাল। যে কারনে বাচ্চারা অন্যমনস্ক ভাবে খেয়ে নেয়, এবং খাবার গ্রহন করা যে এক ধরণের উপভোগ করার বিষয় তা তারা কখনো উপলব্ধি করতেই পারে না।এতে খাবার পরিপাকক্রিয়াও ব্যাহত হয়। খাবার পাওয়া এবং খাওয়া যে কত উপভোগ্য হতে পারে তা একটু দরিদ্র পরিবারের বাচ্চাদের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাই। তাই বাচ্চা কীচ্ছু খেতে চায় না’ কথাটি শুধু আমাদের মতো উচ্চ-মধ্যবিত্ত/ উচ্চবিত্ত শহুরে পরিবার-গুলোতেই উচ্চারিত হয়।

টিপস- ৪

বাচ্চার খাবারে নির্ধারিত বিরতি দিন। একমাত্র মায়ের দুধ হল ‘অন ডিম্যান্ড’ একটি খাবার যা ১৮ মাস পর্যন্ত যত বার সম্ভব, যেকোনো সময়ে দেয়া যায়। কিন্তু অন্যান্য খাবার নির্দিষ্ট সময় পর বাচ্চাকে অফার করা উচিৎ – স্পষ্টভাবে বলতে গেলে বাচ্চাকে খিদে অনুভব করার সময় দিন। অন্ততপক্ষে full-meal /snacks এর ক্ষেত্রে ইন্টারভ্যাল কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার মতো হওয়া দরকার। এর মাঝে শিশু দুধ এবং অন্যান্য তরল খাবে। সুস্থ স্বাভাবিক যেকোনো মানুষই খিদে পেলে খাবার খাবে , সুতরাং একটু পর পর বাচ্চাকে এটা ওটা অফার না কর নির্ধারিত সময় পর কিংবা সে তার খিদে পাওয়ার কোন উপসর্গ দেখালে খাবার অফার করুন।

টিপস- ৫

টিনের / প্যাকেটজাত খাবার সম্পুর্নভাবে পরিহার করুন। প্রক্রিয়াজাত খাবারে প্রিযারভেটিভ এবং সোডিয়ামের আধিক্য থাকে , যা বাচ্চার স্বাস্থ্য এবং রুচি- উভয়কেই হুমকির মুখে ফেলে। রেস্টুরেন্ট কিংবা বাইরে গেলে, ‘একদিন খেলে কি আর হবে’ ভেবে চিপ্স , ব্রোস্ট, ফ্রেঞ্ছ ফ্রাই জাতীয় খাবার না খাওয়ানো উচিত কারণ , এসব খাবারের স্বাদ একবার পেলে বাচ্চাদের এগুলোর প্রতি উৎসাহ বেড়ে যায় এবং পরবর্তীতে তাদের নিয়মিত খাবারের প্রতি অনীহা জন্মায়। তাই দোকানের খাবার, প্যাকেটের খাবার, আইসক্রিম ইত্যাদি ট্রায়াল না দেয়াটাই ভালো অন্তত ২ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত ।

টিপস- ৬

বাচ্চাকে সবসময় উৎসাহ দিন, তাকে নিজে থেকে খেতে দিন, তবে অবশ্যই বড়দের উপস্থিতিতে। সে কিছু না খেলে বিরক্ত না হয়ে বরং যেটুকু খেয়েছে তার জন্য এপ্রেশিয়েট করুন। বাচ্চারা উৎসাহ পেলে সবচে বেশি খুশি হয়।

টিপস- ৭

অসুস্থতা পরবর্তী সময়ে বাচ্চারা খাবারের প্রতি বেশ কয়েকদিন অনীহা প্রকাশ করবে এটাই স্বাভাবিক। এটি এক সপ্তাহ থেকে ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, এবং বাচ্চার ওজন কমে যেতে পারে এই সময়। তবে, বাবা-মা কে এসময় বিশেষভাবে ধৈর্য রাখতে হয়। খাবার নিয়ে বকাঝকা করা , কিংবা জোর করে না খাইয়ে, বরং বেশী করে তরল জাতীয় খাবার , ফল ও ফলের রস ইত্যাদি খাওয়ানোর চেষ্টা করা দরকার। শরীর সুস্থ হওয়ার সাথে সাথে বাচ্চার রুচি এবং ওজন আগের অবস্থায় ফিরে আসে। তবে, অরুচি কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হলে এবং ক্রমাগত ওজন কমতে থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

সবার জন্য শুভকামনা

 

Related posts

Leave a Comment