শিশুর বেড়ে ওঠা । ১২ মাস

বাবা মায়ের জন্য খুব উত্তেজনাকর একটি সময় হলো বিশেষ করে প্রথম বাচ্চার ক্ষেত্রে  শিশুর প্রথম বছরে পদার্পন। কম বেশি সব বাবা-মাই ভাবেন আরে! এই তো সেদিন এইটুকুন বাবুর আজকে একবছর হয়ে গেলো! সদ্য নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখা বাবুর দুষ্টু মিষ্টি কাণ্ড-কারখানা দেখে স্মৃতি থেকে, গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে শিশুর জন্মের প্রথম কয়েকমাস মায়ের উপর যাওয়া ধকল গুলো আস্তে আস্তে হালকা হতে শুরু করে।

শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি

বেশীরভাগ বাচ্চাই ১২ মাসে নিজের পায়ে ভর করে উঠে দাঁড়াতে পারে, কেউ কেউ ভালোভাবে হাঁটাও শিখে যায়, আবার অনেক বাচ্চারই কোন অবলম্বন ছাড়া পুরোপুরি নিজের পায়ে হাঁটতে ১৪ মাস থেকে ১৮ মাস লাগতে পারে।

এই বয়সে বাচ্চা সবকিছুই ধরতে চাইবে, বই খাতা ছিঁড়তে চাইবে। তাকে নিরাপদ কোন স্থানে রেখে বড়দের উপস্থিতিতে নিজের মত খেলতে দিন। গোছানো কাপড় এলোমেলো করা , জিনিস পত্র ছুঁড়ে মারা কিংবা ফিল্টারের পানি ফেলে দেয়া – যেন এই ক্ষুদে দস্যিদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ। মায়েদের ছোটাছুটি বেড়ে গেলেও, সুখবর হল এগুলো সবই এই বয়সী বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির এক একটি ধাপ।

এখন বাচ্চা আরো সহজে বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে ছোটখাটো জিনিস তুলতে পারে। সে হয়তো মেঝেতে পড়ে থাকা জিনিস তুলে মুখে দেবে। মেঝেতে কী আছে খেয়াল রাখুন যাতে ওর কোনো ক্ষতি না হয়।

বয়স অনুযায়ী শিশুর ওজন ও উচ্চতা কেমন হতে পারে তা জেনে নিন। 

শিশুর মানসিক বৃদ্ধি 

এসময় বাচ্চা অন্যের সাথে ইন্টার‍্যাক্ট করেতে খুব পছন্দ করবে, কেউ তার সাথে কথা বললে উত্তর দেবে কিংবা দেয়ার চেষ্টা করবে। ব্যাক্তি বিশেষে আচরণ নির্ভর করবে এবং কোন ব্যাক্তির প্রতি বিশেষ অনুরাগ কিংবা ভীতি প্রকাশ পেতে পারে। এসময়টি বাচ্চার মানসিক বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত এই বয়সী বাচ্চারা বাবা-মায়ের সান্নিধ্য এবং মনোযোগ পেলে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়। তাই যতখানি সম্ভব বাচ্চার সাথে খেলা, কথা বলা, কথার উত্তর দেয়া ইত্যাদি ধৈর্য সহকারে চালিয়ে যেতে হবে।

বাচ্চাকে তার বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চিহ্নিত করতে দেয়া যায়, যেমনঃ “নাক কই ?” বললে হাত দিয়ে নাক ধরে দেখাতে পারে। কিংবা, “নানু কই? বাবা কই?” ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তরে হয়তো আঙুল কিংবা চোখ-মুখের ইশারায় সঠিক ব্যাক্তির দিকে নির্দেশ করতে পারে।  এসময় তাকে প্রচুর রঙ্গিন ছবির বই দিতে পারেন, এবং ছবি দেখে বিভিন্ন শব্দ এবং জিনিসের নাম বলতে পারেন।

এ বয়সী বাচ্চাদের পার্ক কিংবা খোলামেলা জায়গায় নিয়ে যাবেন। প্রতিদিন সম্ভব না হলেও অন্তত সপ্তাহে এক দুই দিন। বাচ্চাদের সামাজিকতা মানসিক ও  বিকাশে বাচ্চার সাথে এধরণের যোগাযোগ বিশেষ ভুমিকা রাখে। sorry/ Thank you –ইত্যাদির সঠিক প্রয়োগ করুন পরিবারের সকলের সাথে এবং বাচ্চার সাথেও।

বাচ্চা ঠিকঠাক শব্দ বলতে শুরু করলে দারুণ লাগে। কিন্তু এখনও সে কী চায় বা তার কেমন লাগছে তা কথা বলে বোঝাতে পারবে না। কিছুদিন সে শরীরের ভাষা ব্যবহার করবে। ও হয়তো “ওপরে” বোঝাতে হাত ওপরে তুলতে পারে বা “ওটা কী?” বলার জন্য আঙুল দেখাতে পারে।

বাচ্চা হয়তো অনেক জিনিসের জন্য একটাই শব্দ ব্যবহার করতে পারে। গলার স্বরটা মন দিয়ে শুনুন। সে একই শব্দ নানা রকম সুরে নানা রকম ভঙ্গি করে বলবে। আপনি যা কিছু করছেন সব ও লক্ষ্য করছে। বাচ্চারা বড়দের নকল করতে ভালোবাসে, বিশেষ করে বাবা-মাকে। এইভাবেই ওরা শেখে। সে আপনার কথা, এবং ভাষার শব্দগুলোকেও নকল করবে।

কথা বলা চালিয়ে যান কারণ এই সময় শিশু কথা বলা শিখবে। যেকোন কিছু নিয়ে কথা বলুন যেমন: কোন একটা কাজের জন্য কি করবেন কিভাবে করবেন। বই পড়ুন, লুকোচুরি খেলুন। ধরে ধরে হাঁটা শিখানোর চেষ্টা করুন। খেলনা দিয়ে খেলতে দিন। ভাল ব্যবহার বা কাজের প্রশংসা করুন এবং অতিরি্ক্ত দুষ্টামিতে না করুন। এতে করে বুঝতে শিখবে কোনটা করা উচিত বা কোনটা করা উচিত নয়।

বাচ্চার দাঁত

কোন কোন বাচ্চার হয়তো এখনো দাঁত ওঠেনি । চিন্তা নেই, প্রথম জন্মদিনের কেক অনেকেই দাঁত ছাড়াই খায় । আশা করা যায়, সামনের দুই-এক মাসের মধ্যেই দেখা মিলবে আলসে দাঁত মহাশয়দের। যেসব বাচ্চার এর মধ্যেই দাত উঠে গেছে, আবার কারো কারো বেশ কয়েকটি উঠে গেছে, তাদের মায়েদের ‘আউক’ কিংবা ‘ঊফ’ চিৎকারে মাঝে মাঝেই পরিবারের সকলে চমকে উঠতে পারেন। মায়ের দুধ খেতে গিয়ে মাঝে মাঝে একটু কামড় তো দেয়াই যায়, নতুন দাঁত বলে কথা।

বাচ্চার দাঁত এর যত্ন আরো আগেই শুরু করা উচিত, যদি এখনো তেমনভাবে করা না হয়, তাহলে শুরু করার জন্য এখনই উপযুক্ত সময় । একটি পরিষ্কার পাতলা নরম কাপড় বিশুদ্ধ পানিতে ধুয়ে নিয়ে  বাচ্চার মারি ও দাঁত আলতোভাবে পরিষ্কার করাতে হবে।

খাওয়া ও ঘুম

খাবার এবং ঘুমের সময়ে এখন একটু নিয়ম কানুন আনতে হবে। এর মধ্যে যদি নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া কিংবা রাতের ঘুমের রুটিন ঠিক না হয়, তাহলে এই বিষয়টিতে একটু মনোযোগ দেয়া দরকার। বিকেল বা সন্ধ্যায় বাচ্চাকে ঘুম না পারালেই ভালো। এতে রাতের শুরুর দিকে বাচ্চারা ঘুমিয়ে যায়। বাচ্চার স্বার্থে, পরিবারের অন্যদের দেরিতে শোবার অভ্যাস থাকলে, সেটাতেও পরিবর্তন আনা উচিৎ।

এক বছরে পদার্পণের সাথে বাচ্চার খাবারে কিছু নতুন মাত্রা যুক্ত করতে পারেন। যেমন মধু , শাক , ডিমের সাদা অংশ ইত্যাদি ।

কৃমি: কিভাবে বাচ্চাকে সুরক্ষিত রাখবেন?

এই বয়সে বাচ্চাদের পেটে পায় কৃমি হয়।মাটি থেকে বা অসুরক্ষিত পানির মাধ্যমে আপনার শিশুর কৃমি হতে পারে, এবং এর ফলে সে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে৷আপনার শিশু মেঝেতে শোওয়া, হামাগুড়ি দেওয়া বা খেলার আগে মেঝে সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে দিন৷ এটা তাকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করবে৷ যদি আপনি মেঝে পরিষ্কার করতে না পারেন তাহলে একটা বড় পরিষ্কার চাদর বা মাদুর পেতে দিন৷

আপনার শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে, সে হয়ত বাইরে গিয়ে খেলতে চাইবে, তবে কয়েকটা জায়গায় কৃমির সমস্যা থাকে৷ মাটি ও কাদা থেকে কৃমি সংক্রমণ হয় এবং এর ফলে পেটে যন্ত্রণা, কাশি ও জ্বর হতে পারে৷

আপনার শিশু যখন বাইরে হাঁটতে শুরু করবে তখন মোটা মোজা, স্যান্ডেল বা জুতো তাকে সুরক্ষিত রাখতে পারে৷ সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ওর হাত ধুয়ে দিন৷ নিয়মিত ওর নখ পরিষ্কার করাও জরুরি৷ সে যখন মুখে হাত দেয় তখন এটা মাটি থেকে কৃমির ডিম ওর শরীরে প্রবেশ করায় বাধা দেবে।

যদি আপনার শিশুর কৃমির সংক্রমণ থাকে তাহলে আপনি হয়ত জানতেও পারবেন না৷ আপনার শিশুর কোনোরকম কৃমির সংক্রমণ হলে কৃমিনাশক ওষুধ সেগুলোকে মেরে দেয়। যদি আপনার শিশুর কৃমি নাও থাকে তাহলেও এগুলি তার জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ৷ আপনার শিশুর বয়স ১ বছর হওয়ার পরে প্রতি ৬ মাসে তাকে এই কৃমিনাশক ওষুধ দিন৷

আগামী দিনগুলোর জন্য শুভেচ্ছা রইল।

শিশুর মাইলস্টোন – ১২ মাস 

  • দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে, কিছু ধরে নিজেকে টেনে তুলতে পারবে  এবং  সাহায্য নিয়ে দাঁড়াতে পারবে বা হাঁটতে পারবে।
  • হামাগুড়ি দিবে, নিজে নিজে বসতে শিখবে।
  • কোন জিনিষ হতবদল করতে পারবে।
  • হাত থেকে কিছু পড়ে গেলে তা খোঁজার চেষ্টা করবে।
  • হাত থেকে খেলনা নিয়ে নিলে প্রতিবাদ জানাবে।
  • কোন জিনিষের দিকে নির্দেশ করতে পারবে।
  • খেলনা নাগালের বাইরে থাকলে তার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে।
  • দু আঙ্গুলের সাহায্যে কিছু তুলতে পারবে।
  • ছোট ছোট শব্দ বলার চেস্টা করবে যেমন দাদা, বাবা, মা ।
  • নিজের মতামত দিতে চেস্টা করবে- যেমন কি চায় বা কি চায় না ।
  • নিজে নিজে খাবার খাওয়ার চেস্টা করবে।
  • বড়দের অনুকরণ করতে শিখবে যেমন: মোবাইলে কথা বলা বা চিরুনি দিয়ে মাথা আচঁড়ানো।
  • হাত নেড়ে বিদায় জানাতে পারবে।
  • নাম ধরে ডাকলে সাড়া দিতে পারবে বা ফিরে তাকাবে।
  • “না” বললে বুঝতে পারবে। যদিও সবসময় তা পালন করবে না।

বিপদ চিহ্ন:

  • হামাগুড়ি না দেয়া।
  • সাহায্য ছাড়া দাঁড়াতে না পারা।
  • কথা না বলা।
  • কোন কিছুর প্রতি আগ্রহী না হওয়া।
  • কোন কিছু মতামত দিতে না পারা যেমন পছন্দ বা অপছন্দ।
  • কারও দিকে তাকিয়ে না হাঁসা।
  • আকর্ষনীয় কিছু দেখলে আগ্রহী না হওয়া
  • কোন ধরনের শব্দ না করা
  • দাঁর করিয়ে দিলে পায়ে ভর দিতে না পারা।
  • কোন কিছু হাত দিয়ে মুখের কাছে আনতে না পারা
  • যিনি সর্বাধিক যত্ন নেন (খাবার খেতে দেন) তার প্রতি কোন আগ্রহ না দেখানো
  • কোন শব্দে প্রতিক্রিয়া না দেখানো।
  • কোন কিছু মতামত দিতে না পারা যেমন পছন্দ বা অপছন্দ

এ সময় কি কি  মাইলস্টোন আপনার শিশু অর্জন করতে যাচ্ছে তা জানার সাথে সাথে ভুলে যাবেন না যে এট শুধু মাত্র একটা গাইডলাইন। প্রতিটি শিশুই ইউনিক ( স্বকীয় ) এবং তার বেড়ে ওঠার গতিও ভিন্ন।যে শিশুটি অন্যদের থেকে প্রথমে বসতে শিখেছে সে হয়ত সবার শেষে হামাগুড়ি দিতে শিখবে। অথবা ১৮ মাস বয়সী যে শিশুটি শব্দ ও অঙ্গাভঙ্গির মাধ্যমে এখনো ভাবের আদান প্রদান করছে সে হটাৎ করেই দুই বছর বয়সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাক্য বলা শুরু করতে পারে।এই টাইমলাইন সিরিজ যেন আপনার কোন রকম দুঃশ্চিন্তার কারন না হয় খেয়াল রাখবেন। প্রতিটি টাইমলাইনকে একটি গাইড হিসেবে ধরে নিতে হবে ।নবজাতক এর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোন আশঙ্কা বা জিজ্ঞাসা থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।

সব বাবা-মায়েদের এবং তাদের বেড়ে উঠতে থাকা ছোট্ট সোনার জন্য শুভকামনা।

<<শিশুর বেড়ে ওঠা – ১১ মাস

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.