শিশুর অতিরিক্ত রাগ ও বদমেজাজ (Temper Tantrum) কিভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন

আপনি হয়ত শিশুকে নিয়ে একটা ব্যস্ত ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে শপিং করতে বের হয়েছেন। আর এদিকে আপনার শিশুর নজর পড়েছে এমন একটা খেলনা দিকে যেটা এই মুহূর্তে কিনে দিতে আপনি মোটেও ইচ্ছুক নন। ঠিক এই কারণেই হুট করে আপনাকে মুখোমুখি হতে হল আপনার শিশুর বদ মেজাজের। আর এদিকে সবাই তাকিয়ে আছে একদম আপনার দিকে! 

এই সময়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিৎ? আর কেনই বা হুট করে শিশুর মধ্যে এই মানসিক পরিবর্তন আসে? আপনি কি এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন?

এই সমস্ত অবস্থায় পড়লে, শিশুর বদমেজাজ বা ট্যানট্রাম নিয়ন্ত্রণের জন্য নিচের টিপসগুলো অনুসরণ করতে পারেন। 

শিশুর কেন অতিরিক্ত রেগে যায়?

ট্যান্ট্রাম শব্দটির বাংলা অর্থ “খেয়ালি বদমেজাজের ঘোর” বা “দুর্বার ক্রোধ”। শিশুদের মাঝে ট্যান্ট্রাম বৈশাখী ঝড়ের মত, হঠাৎ শুরু হয় এবং সেটা ভয়ঙ্কর ও হতে পারে আবার খুব দ্রুতই সেটা কেটে যেতে পারে। দেখা গেল আপনি আপনার ছোট বাচ্চাটির সাথে খেলছেন হঠাত সে হাত পা ছোড়াছুড়ি এবং চিৎকার শুরু করে দিল সে এখন খেলবে না বলে! এতে আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাই ট্যান্ট্রাম।

শিশুরা তাদের নিজস্ব হতাশা, ক্ষোভ বা চাহিদা প্রকাশ করে জেদ বা ট্যানট্রামের মাধ্যমে। আমরা বড়রা যেভাবে নিজেদের এইসব অনুভুতিগুলোকে সম্বরণ (সেল্ফ কনট্রোল) করতে পারি বাচ্চারা তা মোটেই পারে না। তার ফলে তাদের আচরণে বাহ্যিক হতাশার প্রকাশ এভাবেই ঘটে।

হয়ত কোন কিছু বোঝার ক্ষেত্রে অথবা নির্দিষ্ট কোন কাজ শেষ করতে আপনার শিশুর সমস্যা হচ্ছে। আবার হয়ত আপনার শিশু তার মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য যথাযথ শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না অথবা তার সেই শব্দ জানাই নেই। আর এই হতাশা ধীরে ধীরে রাগ—এবং বদমেজাজে রূপ নিতে পারে। 

ক্ষুধা, একঘেয়েমি, ক্লান্তি, বিষণ্ণতা ও অতিরিক্ত উত্তেজনা, এগুলোর কারণেও এই ধরণের বদমেজাজ দেখা দিতে পারে।

ছোট শিশুদের এই বদমেজাজ কি উদ্দেশ্যমূলক?

না, শিশুরা ইচ্ছে করে এমন হতাশ হয়না এবং বাবা মা’দেরকেও বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ফেলে না। বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত রাগ হল তার হতাশার বহিঃপ্রকাশ।

আমাদের মানবিক আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ ও সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (prefrontral cortex) নামের অংশ থেকে। এই অংশটি আমাদের ব্রেইনের অন্যান্য অংশের চাইতে সবচেয়ে দেরিতে ডেভেলপ হয়, এটি চার বছর বয়স থেকে পরিপূর্ণতা লাভ করতে শুরু করে। ঠিক একারণেই চার বছরের আগে শিশুদের সামাজিকতা আর মানবিক আবেগ প্রকাশের ক্ষেত্রে ইম্যাচিওর্ড ধরা হয়। আর তাই এই বয়সে ওরকম জেদ অথবা অসামাজিক আচরণ করাটাই স্বাভাবিক।

তবে একটু বড় শিশুদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত রাগটা সাধারণত অভ্যাসের একটা ফলাফল। যেমন, শিশু যদি অতিরিক্ত রাগ বা জেদ দেখিয়ে কোন খেলনা চায় অথবা কোন কিছু করতে চায় এবং আপনিও তাকে সেই খেলনাটা এনে দিলেন। এতে তার মনের মধ্যে একটা সুপ্ত ধারনা সৃষ্টি হবে যে, রাগ দেখালেই তো বরং আমি সবকিছু করতে পারছি নিজের মত। আর এই ধরনের ধারনা তৈরি হয়ে গেলে সেটা শিশুর অভ্যাসে পরিনত হয়।

৩ বছর বয়স পার হয়ে গেলেই বাচ্চারা নিজেদের ট্যান্ট্রাম আগের তুলনায় ভাল কন্ট্রোল করতে পারে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা হয় ২ বছর বয়সীদের ,এ জন্যই এই সময়টাকে বলা হয় “টেরিবল – টু”।

শিশুর বদমেজাজ বা ট্যান্ট্রাম কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে

সাধারণত অতিরিক্ত রাগের কোন সুনির্দিষ্ট প্রতীকার নেই, তবে এক্ষেত্রে শিশুর রাগ কমানোর জন্য এবং ভালো আচরণের উৎসাহ দেয়ার জন্য আপনি চাইলে অনেক কিছুই চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

কিছু উদাহরনঃ

সবসময় একটা নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থাকুন। প্রতিদিনকার একটা রুটিন করে ফেলুন যাতে করে কোনটার পর কোনটা করতে হবে  এ সম্পর্কে আপনার শিশুর আগে থেকেই ধারনা তৈরি হয়। প্রতিদিনের খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম, খেলার একটা প্রাত্যহিক রুটিন সেট করে ফেলুন। সবকিছুর ক্ষেত্রেই একটা সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক সীমারেখা তৈরি করুন এবং প্রতিনিয়ত সেটা মেনে চলুন।

দিনের প্রত্যেকটা কাজ সময়মত হলে বাচ্চার মেজাজ ঠিক থাকে। মাথা ঠান্ডা রাখতে পারলে অহেতুক জেদ করবে না, অল্পতে কষ্ট পেয়ে অসামাজিক আচরণও করবে না। যৌথ পরিবারে রুটিন মেনে চলা মুশকিল, তবে একটু চেষ্টা করলেই কিন্তু সম্ভব।

সবকিছু আগে থেকেই প্ল্যান করে রাখুন। আপনার কোন কাজ সেরে নেয়ার সময় শিশু যাতে ক্ষুধার্ত অথবা খুব বেশি ক্লান্ত না হয়ে পরে এদিকে খেয়াল রাখুন। যদি এমনটা মনে হয় যে আপনাদের কোথাও বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে তাহলে শিশুকে ব্যস্ত রাখার জন্য ছোট খেলনা অথবা সামান্য কিছু খাবার সাথে রাখুন।

ব্যস্ত রাখুন, সময় দিন। আপনার শিশুর ক্ষুধা, একঘেয়েমি, ক্লান্তি, বিষন্নতা ও অতিরিক্ত উত্তেজনা এড়াতে তার প্রয়োজনগুলো যথাসময়ে পূরণ করুন। এমন রুটিন সেট করবেন না যা বাচ্চার জন্য মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। বাসায় সবসময় হেলদি স্ন্যাকস, ফল ইত্যাদি রেডি রাখুন, বাচ্চার সময় কাটানোর প্রয়োজনীয় উপকরণও (খেলনা, বই ইত্যাদি) যেন হাতের কাছেই থাকে।

ঘুমানোর আগের সময়টা উত্তেজনাকর খেলাধুলা থেকে দূরে রাখুন। ওইসময় বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়লে (যেমন দৌড়ঝাঁপ করা, অতিরিক্ত দুষ্টুমি, খিলখিল করে হাসা..) সহজে বিছানায় যেতে চাইবে না।

শিশুকে কথা বলার জন্য উৎসাহ প্রদান করুন। শিশুরা সাধারণত অনেক কথাই বুঝতে পারে যেগুলো তার বলতে পারে না। আপনার শিশু যদি ইতোমধ্যে কথা বলা শুরু না করে থাকে অথবা কথা বলতে পারে তবুও তাকে বেশ কিছু শব্দ কীভাবে ইশারায় প্রকাশ করতে হয় সেটা শিখিয়ে দিন। যেমনঃ ‘আমি চাই’ , ‘আরো’, ‘পানি’, এবং ‘ক্লান্ত’ এই শব্দগুলোকে ইশারায় প্রকাশ করতে শিখিয়ে দিন। আপনার শিশু যত বড় হতে থাকবে, তাকে প্রতিনিয়ত শব্দ শিখিয়ে মনে ভাব বহিঃপ্রকাশের জন্য সাহায্য করুন।

আপনার শিশুকে নিজ থেকে সিদ্ধান্ত নিতে দিন। সবকিছুর ক্ষেত্রেই শিশুকে না বলা থেকে বিরত থাকুন। আপনার শিশুকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখানোর জন্য তাকে তার নিজের সম্পর্কে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে দিন। যেমন তাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, ‘তুমি কি এই লাল শার্ট পরবে নাকি এই নীল শার্ট পরবে?’ অথবা খাওয়ার সময় তাকে জিজ্ঞেস করুন, ‘তুমি কি কলা খেতে চাও না আপেল খেতে চাও?’ অথবা অবসর সময়ে তাকে জিজ্ঞেস করুন, ‘তুমি কি এখন বই পড়তে চাও নাকি তোমার খেলনা ব্লকগুলো দিয়ে টাওয়ার বানাতে চাও?’

তার ভালো আচরণের জন্য প্রশংসা করুন। যখনই আপনার শিশু ভালো কোন আচরণ করবে তখন তার প্রতি একটু বেশি মনযোগী হন, তাকে তখন একটু বেশি প্রাধান্য দিন। আপনার শিশু যদি আপনার কথামত কাজ করে অথবা তার কোন খেলনা শেয়ার করতে রাজি হয় তখন তাকে জড়িয়ে ধরুন এবং বলুন তার এই কাজটাতে আপনি খুব খুশি হয়েছেন।

যে সমস্ত কাজ আপনার শিশুকে বেশি রাগান্বিত করে সেই সব অবস্থাগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। এছাড়া সবসময় আপনার শিশুকে তার বয়স অনুযায়ী খেলনা দিন ও তার বয়স অনুপাতে বড়দের খেলনা দেয়া থেকে বিরত থাকুন।

বাড়ীর বাইরে বাচ্চারা অনেকসময় জেদের প্রকাশ ঘটায়। এখনকার বাচ্চাদের গন্তব্যস্থল বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় শপিং মল। সেখানে সার সার সুন্দর করে সাজানো খেলনা দেখে তাদের সেগুলো পেতে ইচ্ছে হয়। ফলে তারা সেগুলো পাওয়ার জন্য জেদ ধরে। এক্ষেত্রে দুটি সমাধান আছে। প্রথমত শপিং মল জাতীয় জায়গায় বাচ্চাদের যতটা কম নিয়ে যাওয়া যায় ততই ভালো। বাচ্চাদের বিনোদনের জায়গা হল খেলার মাঠ, শপিং মল নয়। যদি একান্তই নিয়ে যেতে হয় তাহলে তাকে আগে থেকেই বুঝিয়ে বলুন তারপর নিয়ে যান।

নিজেকে শান্ত রাখুন, উত্তেজিত হবেন না। শিশু কেন জেদ করছে বা ওকে জেদ করতে দাও কিংবা বাচ্চারা তো জেদ করেই থাকে এই ধরণের মন্তব্য না করাই ভালো অর্থাৎ শিশুর জেদ নিয়ে মা-বাবা বা পরিবারের অন্যদের মধ্যে মতের অমিল হলে চলবে না আর হলেও তা কোনও ভাবেই বাচ্চাটির সামনে প্রকাশ করবেন না।

অনেক সময় বাড়ীর গুরুজনেরা শিশুর জেদের অভিব্যক্তি মেনে নিতে না পেরে স্নেহবশত শিশুটির সব দাবী মেনে নেন। এটা একেবারেই ভুল। বাচ্চারা খুব সহজেই পরিবারের মেরু করন বুঝতে পারে এবং সেই পরিস্থিতির সুযোগ নেয়।

কর্মরত মায়েদের মধ্যে অনেকসময় একটা অকারণ অপরাধবোধ কাজ করে। তাঁদের সবসময় মনে হয়, সন্তানকে তিনি বোধহয় অযত্ন করছেন। তাই বাড়ী ফেরার সময় প্রায়ই সন্তানের জন্য চকোলেট, চিপস বা নানা খেলনা নিয়ে যান। এতে স্বভাবতই বাচ্চার মনে চাহিদার মাত্রা বাড়তে থাকে। এই ধরণের ‘পেরেন্টিং ব্রাইবিং’ বাচ্চাদের জেদ বা ট্যানট্রামের অন্যতম কারণ।

বাচ্চাকে সহজভাবে বোঝান আপনার কাজ করাটা প্রয়োজন। বাচ্চার এক্সপেক্টেশন ম্যানেজ করুন যতটা সম্ভব। দেখবেন ও অনেক সহজভাবে বড় হচ্ছে। বাড়ী ফিরতে দেরী হলে চকোলেট নিয়ে বাড়ীতে আসার প্রয়োজন নেই বরং ফেরার পথে ওর সঙ্গে ফোনে প্ল্যান করে ঠিক করুন আজ রাতে ওকে কোন গল্পটা বলবেন। দেখবেন জেদ উধাও হয়ে যাবে এবং ও অনেক বেশী উৎসুকভাবে আপনার জন্য অপেক্ষা করবে।

জেদ যখন কমে আসে সেই সময়টা পেরেন্টিং-র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেই সময় বাচ্চাকে স্নেহ দিয়ে বোঝাতে হবে সে যা ব্যবহার করছে তা পরিবারের কারোও কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। যদি সে আবার ওরকম ব্যবহার করে তাহলে বাড়ীর কেউ তার সঙ্গে কথা বলবে না। তার নিজস্ব চাহিদা নিশ্চয়ই থাকতে পারে, কিন্তু তা প্রকাশ করতে হবে সংযতভাবে। এইভাবে তার মধ্যে সেল্ফ কন্ট্রোল বোধ তৈরি  হবে।

শিশু যখন রেগে যায় তখন আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিৎ?

সাধারণত এসব ক্ষেত্রে সবচাইতে ভালো উপায় হল, আপনি শান্ত থাকুন এবং তার এই হুট করে রেগে যাওয়া ইগনোর করুন। এছাড়াও তার মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। আপনি যদি শিশুর রাগ দেখে নিজেকে শান্ত রাখতে না পারেন, তাহলে কিছুক্ষণের জন্য রুম থেকে বের হয়ে যান। 

আপনার সোনামণির টেম্পার ট্যান্ট্রামের সময় কখনোই উলটো রাগ দেখাবেন না। গায়ে হাত তোলা বা বকাঝকা তো কখনোই নয়। ওর উপর চিৎকার না করে কোলে তুলে নিন, নরম স্বরে কথা বলুন। জানি এটা বলা যত সহজ করা ততই কঠিন। বাচ্চা যখন মাটিতে পড়ে হাত পা ছুড়তে থাকে, প্রতিবাদ করতে শ্বাস আটকে রাখে, এমন কি কোলে নিলে আপনাকে মারতে থাকে – জেনে নিন ওর বয়সির জন্য এসব স্বাভাবিক ট্যান্ট্রাম। ওই সময়টা যুক্তি-তর্ক কোন কাজে লাগবে না, ওর সাথে রাগারাগি করেও লাভ হবে না। বরং এতে জেদ আরো বাড়বে।

যদি আপনার শিশু রেগে গিয়ে কাউকে আঘাত করে তাহলে শিশু শান্ত হওয়া পর্যন্ত তাকে ধরে রাখুন। এরপর যখন আপনার শিশু পুরোপুরি শান্ত হয়ে যাবে তখন তাকে বলুন যে এইভাবে রাগ দেখালে তুমি আমার থেকে কোন মনোযোগ পাবে না। তুমি যদি আমাকে কিছু বলতে চাও তাহলে অবশ্যই তোমাকে কথা বলতে হবে, এমন রাগ দেখিয়ে কোন লাভ হবে না।

আপনার শিশু যদি ধংসাত্বক ও বিপজ্জনক হয়ে পরে তখন কি করবেন?

যদি শিশুর বদমেজাজ খুব বেড়ে যেতে থাকে তাহলে তাকে সেই অবস্থা থেকে নিয়ে আসুন এবং কিছু সময়ের জন্য তাকে একা রাখুন।

তাকে একা রাখার জন্য একটা আলাদা জায়গা রাখুন। শিশুকে কোন বোরিং একটা জায়গায় জোর করে চুপচাপ বসিয়ে রাখুন এবং তার শান্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করুন। শিশুর বয়স অনুপাতে প্রতি বছরের জন্য এক মিনিট করে আলাদা রাখবেন। যেমন আপনার শিশুর বয়স যদি দুই বছর হয় তাহলে তাকে দুই মিনিট আলাদা রাখুন, যদি তিন বছর হয় তাহলে তাকে তিন মিনিট আলাদা করে রাখুন। 

সবসময় এই অভ্যাস পালন করবেন। যদি নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার আগেই আপনার শিশুর তার জায়গা থেকে সরে যায় তাহলে তাকে আবার সেখানে নিয়ে বসিয়ে রাখুন। এই আলাদা রাখার সময়ে শিশুর কোন কথায় বা কাজে সাড়া দিবেন না। 

এই বিরত রাখার সময় কখন শেষ করতে হবে তা ভালোমতো খেয়াল রাখুন। যখন আপনার শিশু শান্ত হয়ে যাবে তখন তাকে এটা ভালোভাবে বুঝিয়ে বলুন তাকে কেন আলাদা করে একা রাখা হয়েছে এবং তার আচরণ অশোভন। এরপর আপনার নিজের কাজে মনোযোগ দিন।

আপনার শিশুটি যদি জেদ করে অন্যকে মারতে থাকে বা জিনিসপত্র ছুড়তে থাকে, সাথে সাথে থাকে নিয়ে অন্য ঘরে চলে যান। কিছু না বলে শান্ত হতে সময় দিন। বিয়ের দাওয়াত বা রেস্টুরেন্টে এমন হলে সাথে নিয়ে বের হয়ে যাবেন। জড়িয়ে ধরে আদর করে শান্ত করুন। তারপর আবার ভেতরে নিয়ে যান।

চার বছরের নিচের শিশুদের ট্যান্ট্রামের জন্য শাস্তি দেবেন না কখনোই। আর রেগে মারধোর করলে আপনি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারেন। পরে মাথা ঠান্ডা হলে নিজেরই আফসোস হবে। মনে রাখবেন, শারীরিক আঘাত করলে বাচ্চারা মানসিকভাবেও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। শারীরিক আঘাত ক্ষণস্থায়ী হলেও মানসিক আঘাত দীর্ঘস্থায়ী।

আপনার শিশু যদি জনসম্মুখে এমন রেগে যায়, তাহলে কি করবেন?

জনসম্মুখে যদি আপনার শিশু রেখে যায় তাহলে যতটা সম্ভব তার রাগ ইগনোর করুন। তবে আপনার শিশু যদি খুব বেশি পরিমাণেই রেগে যায় তাহলে সবার সামনে থেকে সরিয়ে আলাদা কোন জায়গায় নিয়ে তাকে রাখুন। এরপর সে শান্ত হলে আবার তাকে পূর্বের জায়গায় নিয়ে আসুন। তাকে অবশ্যই আগের জায়গায় নিয়ে আসবেন তা না হলে আপনার শিশুর মনে ধারনা চলে আসতে পারে যে এমন বদমেজাজ দেখালে সেই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসা যায়।  

কখন আপনার প্রফেশনাল কারো সাহায্য লাগবে?

আপনার শিশুর মধ্যে যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে, তার সাথে সাথে বদমেজাজও ধীরে ধীরে কমে আসবে। বেশিরভাগ শিশুরই তিন থেকে সাড়ে তিন বছরের দিকে এই বদমেজাজ কমে আসতে থাকে। যদি আপনার শিশু কথা বলার মত বয়স হওয়ার পরেও ঠিকমত নিজেকে প্রকাশ করতে না পারে এবং রেগে গেলে অন্যদের আঘাত করে এমনকি নিজেকেও আঘাত করে বা মেজাজের কারণে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মূর্ছা যাওয়ার অবস্থা হয় অথবা এই হুট করে বদমেজাজ দেখানো যদি চার বছর পার হওয়ার পরেও বন্ধ না হয় তাহলে একজন শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করুন। 

ডাক্তার শিশুর রেগে যাওয়ার মানসিক ও শারীরিক কারণগুলো চিহ্নিত করবেন। কোন কোন ক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞ আপনার শিশুকে মানসিক ডাক্তারের কাছে অথবা বিশেষ কোন স্কুলে নিয়ে যেতে বলতে পারেন। শিশুর অল্প বয়স থাকতেই আপনার যথাযথ এবং কার্যকরী হস্তক্ষেপ শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

সবার জন্য শুভকামনা।   

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.