শিশুর প্রথম দাঁত ওঠা

প্রতিটি বাবা-মা ই কবে তার শিশুটির দাঁত উঠবে, কবে সেই সুন্দর দাঁতের হাসি দেখবে তা নিয়ে আকুল আগ্রহে থাকে। প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে এ নিয়ে সবার মাঝে অনেক আবেগ অনুভুতিও কাজ করে। মনে রাখতে হবে শিশুর দাঁত উঠার একটা নির্দিষ্ট সময় থাকলেও তা একদম ক্যালেন্ডার ধরা সময় নয়।এর কিছুটা এদিক ওদিক হতে পারে,এনিয়ে বেশী দুঃচিন্তা না করাই ভালো।

শিশুর প্রথম যে দাঁত উঠে তাকে বলা হয় দুধ দাঁত (Decidual teeth or primary teeth)। একেক স্থানের দাঁত একেক সময় উঠে, তেমনি একেক স্থানের দাঁত এক সময় পড়ে যায়। নীচের তালিকাতে এর বিস্তারিত উল্লেখ করা হল।

শিশুর দাঁত ওঠার সময়

বেশীরভাগ বাচ্চারই ৪-৭ মাসের মধ্যে প্রথম দাঁত দেখা যায়।কিছু কিছু বাচ্চার ৩ মাসের মাথায় দাঁত উঠতে পারে আবার কারও ১ বছর বা তার কিছু বেশী সময়ও লাগতে পারে।(অল্প কিছু ক্ষেত্রে বাচ্চার জন্মের সময়ই দাঁত দেখা যেতে পারে!)। শিশুদের দুধদাঁত ছয় মাস বয়স থেকে মুখে গজাতে শুরু করলেও এর মূল ভিত্তি তৈরি হয় মাতৃগর্ভে থাকার সময়ে, যখন মা ছয় থেকে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকেন।বাচ্চার দাঁত একটি একটি করে উঠতে পারে আবার বেশ কয়েকটি একসাথেও উঠতে পারে। বাচ্চার সব দাঁত সোজা হয়ে নাও উঠতে পারে। কিন্তু তাতে ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই। আস্তে আস্তে এটা ঠিক হয়ে যায়।

মানুষের দুধ দাঁত থাকে- ২০ টি।বাচ্চার তিন বছর বয়সের মধ্যে সাধারনত ২০ টি দুধ দাঁতই উঠে যায়।  সাধারণত ছয় বছর বয়সের দিকে এই দুধদাঁত পড়তে শুরু করে এবং এর জায়গায় নতুন স্থায়ী দাঁত ওঠে। মেয়েদের দাঁত সাধারণত ছেলেদের আগেই পড়ে। ১২ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে সব দাঁত পড়ে গিয়ে আবার ওঠার কথা।শিশুর বয়স ১৮ মাস হওয়ার পরও যদি দাঁত না ওঠে তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

শিশুর দাঁত ওঠার লক্ষন

বিশেজ্ঞরা দাঁত উঠার সাথে কোন উপসর্গের সম্পর্ক থাকার বিষয়ে একমত নন- যেমন অস্থিরতা, ডায়রিয়া, এবং জ্বর- অথবা এই লক্ষন গুলো শুধুমাত্র দাঁত ওঠার সময়ের সাথে মিলে গেছে কিনা সে সম্পর্কেও তাদের দ্বিমত রয়েছে। তারপরও অনেক বাবা মার অভিমত হলো যে তাদের শিশুরা দাঁত উঠার সময়ে কিছু অসুবিধার মুখোমুখি হয়েছেন। (যদিও এসময় কিছু সংখ্যক শিশুর তেমন কোন সমস্যায়ই পড়তে হয়না।)

দাঁত ওঠার সময় যে লক্ষনগুলো সবচেয়ে বেশী সমস্যায় ফেলে সেগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ

  • মুখ থেকে লালা পড়া ( এর থেকে মুখে লাল দাগ পড়ে যেতে পারে)
  • মাড়ী ফোলা এবং স্পর্শকাতরতা
  • কামড়ানো
  • অকারন রাগ অথবা অস্থিরতা। দাঁত ওঠার সময় বাচ্চাদের মুড একেবারেই ভালো থাকে না। সেই সময় তাদের বার বার মাথা চুলকাতে দেখা যায়। এমনকী, চোখ চুলকে নিজেদের অস্বস্তি প্রকাশ করে তারা
  • এই সময় বাচ্চাদের খাবার ইচ্ছে চলে যায়। তাদের দাঁতের মাড়িতে ব্যথা হয়। সেই কারণেই বাচ্চা খেতে চায়না।
  • ব্যথা আর শিরশিরানির জন্য বার বার ঘুম ভেঙে যায় বাচ্চাদের। সেই কারণে তাদের ঘুম খুব কম হয়। অনেক সময় দাঁত ওঠার আগে মাড়িতে ইনফেকশন হয়ে যাওয়ার ফলেও ব্যথা হয়। যার কারণে বাচ্চাদের ঘুম ভেঙে যায়।

নিচের মাড়িতে, মাঝের দাঁত প্রথমে ওঠে, এরপর ক্রমান্বয়ে অন্যান্য দাঁত ওঠা শুরু করে।  যেহেতু এটি মাড়ি ফুঁড়ে বের হয়, তাই দাঁত ওঠার সময় মাড়ি ফুলে যেতে পারে। কখনো কখনো কিছু দাঁত উঠার সময় তা বেশ যন্ত্রণাদায়ক হয়, বিশেষ করে পিছনের দাঁত ওঠার সময়। পিছনের দাঁত বেশি জায়গা নিয়ে ওঠে, তাই এই সময় শিশুরা বেশি কষ্ট পায়। এটি স্বাভাবিক, ঘাবড়াবার কিছু নেই। একে সহজভাবে নিতে হবে। অনেক শিশুর কোন সমস্যাই হয় না, আবার কারোর সামান্য সমস্যা হয়, আবার চলেও যায়।

দাঁত ওঠার সময় জ্বর আসা, ডায়রিয়া বা সর্দি কি স্বাভাবিক?

যদিও অনেক বাবা মা বলেন যে নতুন দাঁত ওঠার সময় তাদের শিশুদের পাতলা পায়খানা, সর্দি, অথবা জ্বর হয়েছিল, কিন্তু বেশীর ভাগ বিশেষজ্ঞ এগুলোর সাথে দাঁত ওঠার কোন সম্পর্ক খুজে পাননি। তবে দাঁত ওঠা ডায়রিয়ার কারন হতে পারে কারন শিশুর অতিরিক্ত লালা তার অন্ত্রে গিয়ে জমা হয় এবং পায়খানাকে নরম করে ফেলে।

আসলে দাঁত ওঠার সঙ্গে ডায়ারিয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু, দাঁত ওঠার সময় বাচ্চাদের মাড়ি খুব শিরশির করে। যার ফলে তারা বিভিন্ন জিনিস মুখে দেয়। আর এই কারণেই তাদের পেটে ইনফেকশন হয়। যার ফলে ডায়ারিয়ার সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু, অভিভাবকরা দাঁত ওঠার সঙ্গেই পেট খারাপ হওয়াকে ভুল করে জড়িয়ে ফেলেন।

মাড়ির যন্ত্রনার জন্য শিশু অল্প জ্বরে ভুগতে পারে ( ১০১ ডিগ্রি ফারেন হাইটের কম)। শিশুর তাপমাত্রা যদি ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট অথবা তার বেশী হয় ( ৩ মাসের কম বয়সী শিশুর জন্য ১০০.৪ ডিগ্রি অথবা তার বেশী) তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। ডাক্তার বলতে পারবেন তার লক্ষনগুলো কোন সংক্রমনের কারন কিনা যার জন্য ঔষধের প্রয়োজন পড়বে। আপনার শিশুর পায়খানা যদি নরম হয়, ডায়রিয়া না হলে, ঘাবড়াবার কিছু নেই। এটা এমনিতেই সেরে যাবে।

বাচ্চার দাঁত ওঠার সময় কিভাবে আরাম দেয়া যায়?

ওর জন্য নন টক্সিক মেটেরিয়ালের তৈরি টিদার কিনতে পারেন। অনেক টিদারের ভেতরে লিকুইড ভরা থাকে, এগুলো কিছু সময় ফ্রিজে রেখে ঠাণ্ডা হলে শিশুকে দিন। ঠাণ্ডা স্থানে কামড় বসালে শিশুর আরাম লাগবে।

পরিষ্কার আঙুল মুখে শিশুর মুখে দিতে পারেন  যাতে শিশু কামড় দিতে পারে।  মাড়িতে মৃদু চাপ দেয়া যেতে পারে, এতে শিশু আরাম বোধ করবে।অথবা পরিষ্কার কাপড়ের টুকরা ফ্রিজে রেখে ঠাণ্ডা করে মুখে দেয়া যেতে পয়ারে, যাতে শিশু তাতে কামড় দিতে পারে।

দাঁত ওঠার ব্যাথার জন্য বাচ্চাকে ওষুধ দেয়া কি নিরাপদ?

যদি উপরের পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করার পরও বাচ্চার সমস্যা হয় তবে ডাক্তাররা বাচ্চার জন্য উপযোগী  acetaminophen  বা ibuprofen দিতে পারেন (৬ মাস এবং তার বেশী বয়সী শিশুদের জন্য)। তবে যেকোনো ওষুধ দেয়ার আগেই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। বাচ্চাকে কখনো অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ দিবেন না। এতে  Reye’s syndrome এর মত মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

দাঁত ওঠার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত

দাঁত ওঠার সময় শিশুরা এটা-ওটা কামড়াতে চায় বলে অনেক মা শিশুর মুখে চুষনি দিয়ে রাখেন। এ ধরনের চুষনি বা খেলনা মুখে দেওয়া বিজ্ঞানসম্মত নয়। এতে সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তার ওপর শিশুর একটি বদভ্যাস গড়ে ওঠে, যা পরে ছাড়তে চায় না।

দাঁত ওঠার সময় মুখ শিরশির করে বলে শিশুরা হাত বা যেকোনো কিছু পেলেই মুখে দেয়। তাই জীবাণুর সংক্রমণ এড়াতে শিশুর হাত ও খেলনা সব সময় বিশুদ্ধ পানিতে পরিষ্কার করে রাখুন। দাঁত ওঠার সময় বাচ্চার মুখ থেকে লালা ঝরলে তা কিছুক্ষন পর পর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে দিন। কারণ এতে বাচ্চার মুখে র‍্যাশ হতে পারে।

দুধদাঁত উঠতে দেরি হলে (ছয়-সাত মাসের বেশি) উদ্বিগ্ন না হয়ে বিশেষজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শমতো একটি এক্স-রে করিয়ে দেখে নেওয়া ভালো। তাতে বোঝা যাবে দুধদাঁত বের হতে কত দিন বাকি আছে অথবা অনুপস্থিত কি না।

অনেক সময় শিশু দুধদাঁত নিয়েই জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু এগুলো আসলে দুধদাঁত না-ও হতে পারে। এ দাঁতের জন্য অনেক সময় শিশুদের বুকের দুধ খেতে কষ্ট হয় এবং দাঁতের ঘর্ষণে মুখে ঘা হয়। তাই এই অস্বাভাবিক দুধদাঁত ফেলে দেওয়াও প্রয়োজন হতে পারে।

আরও পড়ুন- শিশুর দাঁতের যত্ন 

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment