হামাগুড়ি দেয়া ও সদ্য হাঁটতে শেখা শিশুর নিরাপত্তা

ঘরের ছোট্ট শিশুর পেছন পেছন মায়ের চলে সারাদিন পাহারা। নতুন হাঁটতে শিখেছে ছোট্ট শিশুটি । চেয়ারের হাতল, টেবিল, খাট কিংবা দেয়াল ধরে ধরে ঘরময় হেঁটে চলে সে অবিরাম। এমন করে হাঁটতে গিয়ে কাঠের চেয়ার নিয়েই পড়ে গিয়ে ঘটে যায় নানা দুর্ঘটনা। এই বয়সের বাচ্চারা কোন কিছু বেয়ে উপরে উঠে যেতে পারে এবং বোতল বা কোন পাত্রের ঢাকনা খুলে ফেলার মত সাধারন কাজগুলো করতে পারে। এ সময় তারা যেকোনো জিনিস মুখে দিয়ে তার স্বাদ কেমন তা পরখ করতে চায়। এগুলো খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু আপনি সাবধান না থাকলে এমন করতে গিয়ে সে আঘাত পেতে পারে।

শিশুরা নিজের বিপদের সম্ভাবনা সে অনুভব করতে পারে না। জ্বলন্ত- আগুনকে তার ছুঁয়ে দেখার কৌতূহল, যে কোনো অখাদ্য মুখে দিয়ে স্বাদ গ্রহণ করার প্রবণতা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। শখ করে নতুন হাঁটতে শেখা শিশুকে নতুন জুতা কিনে দিয়ে তার টুকটুক করে হাঁটা দেখতে দেখতেও পড়ে গিয়ে শিশুর দুর্ঘটনা হতে পারে। কিংবা বেশি ঝুলের পোশাক পায়ের নিচে আটকে গিয়ে নতুন দাঁতে জিভ কেটে যেতে পারে। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই একটি শিশু দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে তার চেনাজানা আপন ঘরেই। তাই চেষ্টা করলে শিশুর জন্য নিরাপদ ঘর একটু সচেতন হয়েই আমরা সাজাতে পারি। যদিও সাবধানতার শেষ নেই। তবুও যতটা পারা যায় ততটাই করি না কেন।

বাইরে বের হতে হলে

হাঁটার সময় বাচ্চাকে বহন করার জন্য হারনেস (harness) বা বিশেষ ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করে ভালভাবে বেঁধে নিন অথবা তার হাত শক্তভাবে ধরে থাকুন। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এরা দৌড়ে রাস্তার মাঝখানে চলে যেতে পারে।

রাস্তা পার হওয়ার সময় নিরাপদ স্থান দেখে পার হন এবং আপনার বাচ্চাকে বুঝিয়ে বলুন আপনি কি করছেন এবং কেন করছেন, এতে তারাও তেমনটি করা শিখবে। পাঁচ বছরের কম বয়সি বাচ্চাদের রাস্তায় খেলা ঠিক নয়। বাড়ির বাইরে তাদের খেলার জন্য বাগান বা কোন মাঠের মত নিরাপদ একটা জায়গা ঠিক করুন।

হাঁটতে গিয়ে পড়ে গেলে

শিশুরা যখন হাঁটা শুরু করে তখন টলমল পায়েও অনেক দ্রুত চলতে পারে। এসময় তারা পায়ে পা বেধে বার বার পড়ে যায়।বাচ্চার বয়স কমপক্ষে দুই বছর হওয়া পর্যন্ত সব সিঁড়ির উপরে ও নিচে সেফটি গেট লাগিয়ে নিন, যাতে তারা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে গিয়ে পড়ে না যায়। প্রতিবার গেটগুলো দিয়ে যাতায়াতের পর সেগুলো ভালোভাবে বন্ধ করুন।

বাচ্চাকে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা শিখিয়ে দিন, কিন্তু তাকে কখনো একা একা ওঠানামা করতে দেবেন না। এমনকি ৪ বছর বয়সী বাচ্চারও সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় সাহায্য প্রয়োজন হতে পারে। বাঙ্ক বেড বা দোতলা বিছানার উপরের বাঙ্কে বাচ্চাকে ঘুমাতে দেবেন না, কারন সেখান থেকে সে সহজেই পড়ে যেতে পারে।

নিচু ধরনের ফার্নিচার জানালার কাছ থেকে দূরে রাখুন এবং জানলায় লক লাগিয়ে নিন বা ভালভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা করুন। জানালার লকের চাবি কোথায় রাখা আছে তা অবশ্যই বাড়ির বড়দের জানিয়ে রাখুন।

সামনে টেবিল লাগান চেয়ারে (Highchair) বসাতে হলে five-point harness (বিশেষ ধরনের সরঞ্জাম) দিয়ে বাচ্চাকে ভালোভাবে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে দিন।

আগুন লাগা, পুড়ে যাওয়া ও ছ্যাকা লাগা প্রতিরোধ করতে

বাচ্চারা হাতের কাছে যা পাবে তাই নিয়ে খেলা করবে। দেয়াশলাইয়ের বাক্স ও লাইটার বাচ্চার দৃষ্টিসীমা ও নাগালের বাইরে রাখুন।ছোট নলযুক্ত কেতলি ব্যবহার করুন, তাহলে সেটা যেখানে রেখে কাজ করবেন তার থেকে অনেকখানি ঝুলে থাকবেনা আর আপনার বাচ্চা সেটা ধরতে পারবেনা।

রান্নার চুলা যথাসম্ভব বাচ্চার নাগালের বাইরে রাখার চেষ্টা করুন এবং সসপ্যান বা অন্য রান্নার পাত্রের হাতল পিছনের দিকে ঘুরিয়ে রাখুন, যাতে আপনার বাচ্চা ধরতে না পারে। আপনার শিশুকে কেতলি, সসপ্যান আর গরম চুলা থেকে দূরে রান্না ঘরের বাইরে রাখাই ভাল। রান্নাঘরের দরজায় একটা সেফটি গেট লাগিয়ে নিতে পারেন।

যে কোন গরম পানীয় বাচ্চার কাছ থেকে যথেষ্ট দূরে রাখুন। কোন গরম পানীয় বানানোর পর ২০ মিনিট পর্যন্ত তা থেকে ছ্যাকা লাগতে পারে। ইস্ত্রি, চুল শুকানোর যন্ত্র অথবা হেয়ার স্ট্রেইটেনার (hair straightener) ব্যবহারের পর তা ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য বাচ্চার নাগালের বাইরে কোথাও রেখে দিন। সেগুলো ব্যবহারের সময় আপনার বাচ্চা যেন ধরতে না পারে সে দিকে খেয়াল রাখুন।

কোন কিছু গলায় আটকে যাওয়া ও শ্বাসরোধ ঠেকাতে

বাচ্চারা হাতের কাছে পেলে যে কোন জিনিস মুখে দিয়ে বসতে পারে। এ সবই শিশুর শিক্ষার অংশ, কিন্তু আঙ্গুরের সমান ছোট একটা জিনিসও তার গলায় আটকে যেতে পারে। খাবার ছোট ছোট টুকরো করে বাচ্চার মুখে দিন, যেন তার অসুবিধা না হয়।

ছোট বাচ্চাদেরকে গরম মিষ্টিজাতীয় কিছু দেবেন না। পাঁচ বছরের কম বয়সী বাচ্চদের মুখে গোটা বাদাম দেবেন না, গলায় আটকে যেতে পারে।

শিশুদেরকে খাওয়ার সময় একা রেখে যাবেন না। বাচ্চাকে স্থির হয়ে বসে খেতে উৎসাহিত করুন, কারন খাওয়ার সময় দৌড়াদৌড়ি করলে খাবার গলায় আটকে যেতে পারে।

পয়সা, বোতাম বা খেলনার ছোট ছোট অংশ সদ্য হাঁটতে শেখা বাচ্চদের কাছে থেকে দূরে রাখুন। সবধরনের প্লাস্টিকের ব্যাগ বাচ্চাদের চোখ ও হাতের নাগালের বাইরে রাখুন, যেন তারা সেগুলো নিয়ে খেলতে খেলতে তা দিয়ে মাথা ঢেকে ফেলতে না পারে।

নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া রোধ করতে

কোন ধরনের কর্ড বা দড়ি নিয়ে খেলা করার সময় তা ছোট বাচ্চাদের গলায় পেঁচিয়ে গিয়ে তার শ্বাসরোধ করে ফেলতে পারে। এছাড়া অল্প একটু ফাঁকা জায়গার ভেতর দিয়ে শরীর গলিয়ে দেয়ার সময় বাচ্চার মাথা সেই জায়গায় আঁটকে যেতে পারে। এসময় তার পা মাটিতে না থাকলে তা খুবই বিপদজনক হতে পারে।

জানালার পর্দা বা ব্লাইন্ডের কর্ড কেটে ছোট করে ফেলুন অথবা এমনভাবে বেঁধে রাখুন যেন আপনার নবজাতক বা সদ্য হাঁটতে শেখা বাচ্চা তার নাগাল না পায়।জামাকাপড়ের ফিতা বা অন্য কোন ধরনের দড়ি বা কর্ড যেখানে সেখানে ফেলে রাখবেন না। সিঁড়ি বা বারান্দার রেলিং দিয়ে বাচ্চারা শরীর গলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে তাদের তা থেকে বিরত করুন।

কাপড় শুকানোর রশি থেকে বাগানে খেলা করার বিভিন্ন জিনিস যথাসম্ভব দূরে রাখুন, যেন বাচ্চারা কিছুর উপর দাঁড়িয়েও সে দড়ির নাগাল পেতে না পারে।

ডুবে যাওয়া রোধ করতে

সদ্য হাঁটতে শেখা বাচ্চারা বাথটাব, বালতি বা পুকুরের খুব অল্প উচ্চতার পানিতেও ডুবে যেতে পারে। ডুবে গেলে কোন শব্দও হয়না, তাই আপনি হয়ত ছটফট করার আওয়াজও শুনতে পাবেন না।

গোসলের দেয়ার সময় বাচ্চাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা রেখে যাবেন না। গোসল করান হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বাথটাব বা বালতি খালি করে দিন।আপনার বাড়ির বাগানে বা আশেপাশে পুকুর থাকলে তার চারপাশে বেড়া লাগিয়ে দিন অথবা পুকুরটি ভরাট করে দিন।

সুইমিং পুল বা পানির কাছে খেলা করার সময় বাচ্চার দিকে বিশেষ নজর রাখুন। ব্যবহার করা হয়ে গেলে সুইমিং পুল বা বাচ্চাদের খেলা করার প্যাডলিং পুল (paddling pool) থেকে পানি বের করে দিন।

আপনার বাগানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন, আপনার শিশু যেন পাশের বাড়ির উঠোনে চলে যেতে না পারে সেটি নিশ্চিত করুন। সেখানে খোলা পুকুর বা অন্য কোন ধরনের বিপদ থাকতে পারে।

বিষক্রিয়া থেকে বাঁচাতে

সদ্য হাঁটতে শেখা বাচ্চারা স্বাদ কেমন তা জানার জন্য বিভিন্ন জিনিস মুখে দিয়ে দেখতে পছন্দ করে। এছাড়াও তারা যেনতেন প্রকারে মিষ্টি বা দেখতে লোভনীয় এমন যে কোন জিনিস মুখে দিতে পারে। সব ধরনের ঔষধ শিশুর চোখ ও হাতের নাগালের বাইরে রাখুন।

পরিস্কার করার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন দ্রব্য (ডেটল, হারপিক) নাগালের বাইরে রাখুন। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে যেখানে রাখবেন সেখানে তালা বা লক লাগিয়ে নিন। যখন ব্যবহার করবেন না, তখন বোতল বা জারের মুখ যেন ভালোভাবে লাগানো থাকে তা নিশ্চিত করুন।

বাড়ির আশেপাশে বা বাগানে কোন বিষাক্ত গাছ-গাছড়া আছে কিনা তা দেখে নিন। ছোটদেরকে ভালভাবে শিখিয়ে দিন যে তারা যেন বাড়ির বাইরের কোন কিছু বড়দের না দেখিয়ে না খায়।

কেটে যাওয়া, বাড়ি লাগা বা আঁচড় লাগা ঠেকাতে

শিশুরা কোন জিনিস কেন বিপদজনক সেটাই ভালোভাবে বোঝে না। সামান্য কেটে যাওয়া, বাড়ি লাগা বা আঁচড় লাগা শিশুর বেড়ে ওঠারই একটা অংশ, তবে আপনি তাদেরকে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাতে কয়েকটা কাজ করতে পারেন।

ঘরে কাঁচের দরজা জানালা থাকলে বিশেষ ধরনের সেফটি ফিল্ম (safety film) লাগিয়ে নিতে পারেন, এতে জানলার গ্লাস ভেঙ্গে গেলেও সেটি টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়বে না।

আজকাল চাইল্ড সেইফটির বিভিন্ন উপকরন পাওয়া যায় , যেমন ড্রয়ার/কেবিনেট লকার, ফোমি কুশন যেগুলো আসবাবের কোনায় লাগিয়ে দেয়া হয়, ডোর জ্যামার (যেন হঠাৎ দরজা বন্ধ হয়ে যায়) এবং ক্রলিং ম্যাট জাতীয় জিনিস এসময় খুব কাজে লাগে।

ছুরি, কেঁচি ও রেজার শিশুর নাগালের বাইরে রাখুন।বাচ্চার আঙ্গুল যেন দরজার ফাঁকে আঁটকে না যায় তার জন্য আপনি বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতে পারেন।  আসাবাপত্রের কিনারা ধারালো হলে সেখানে কোন নরম কিছু দিয়ে তৈরি কভার লাগিয়ে দিন, যাতে পড়ে গেলে আপনার আপনার বাচ্চার মাথায় আঘাত না লাগে।

পরিশিষ্ট

যত ভালভাবেই ঘরকে বাচ্চার জন্য নিরাপদ রাখুন না কেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জরুরি অবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকা। এই জন্য আপনি ঘরে সবসময় ফার্স্ট এইড বক্স সাথে রাখতে পারেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসাগুলো সম্পর্কে ধারনা নিয়ে রাখুন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোন নাম্বার যেমন- অ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতাল বা পড়শিদের নাম্বার হাতের নাগালে রাখুন, যাতে প্রয়োজনের সময় খুঁজতে না হয়। যদি আপনি ভাড়া বাসায় থাকেন এবং সেখানে কোন কারনে আপনার বাচ্চার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হন তাহলে আপনার বাড়িওয়ালা বা হাউজিং এসোসিয়েশনের লোকজনের সাথে কথা বলুন। অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বাচ্চাদের নিরাপদ রাখা। দুর্ঘটনা কখনো বলে কয়ে আসেনা। এর জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকতে হয়।

আরও পড়ুন- শিশুর প্রথম হাঁটতে শেখা।

সবার জন্য শুভকামনা

 

তথ্যসূত্র 

www.maya.com.bd/content/web/wp/1563/

Related posts

Leave a Comment