শিশুর নাক ও গলার কফ কিভাবে পরিষ্কার করবেন ?

কফ কি এবং কেন হয়?

কফ হলো গলার অস্বস্তিকর পিচ্ছিল পদার্থ। এটা শ্বাস নালীতে তৈরি এবং সেখান থেকে নিঃসৃত রস যা কাশির মাধ্যমে শ্বাসনালী থেকে বের হয়ে আসে তাকেই কফ বলা হয়। বাইরের জিনিস শ্বাসনালীতে প্রবেশ করলে শরীরের Protective mechanism এর ফলে শ্বাসনালী তা কফের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়- এই প্রক্রিয়াকে কাশি বলা হয়। গলার গ্ল্যান্ডগুলো দিনে প্রায় এক থেকে দুই লিটার কফ তৈরি করে। কফ হলো আমাদের শ্বাসনালীর রস। শ্বাসনালীকে ভিজিয়ে রাখা কফের কাজ। শ্বাসনালী কোনো কারণে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কফ তৈরী করলে আমরা গলায় অস্বস্তিকর কফের অনুভুতি পাই। কফ হল কাশি সৃষ্টির জন্য অন্যতম একটি কারণ। যে কোনো কারণে শ্বাসনালীতে ইনফেকশন বা Stimulation হলে কফের সৃষ্টি হয়। যেমন- Viral Infection, Bacterial infection ইত্যাদি।

মনে রাখবেন কফ কোন অসুখ নয়, অন্য রোগের উপসর্গ – কফ হল শ্লেষ্মা যুক্ত মিউকাস । 

শীতকালে সর্দি কাশিতে আক্রান্ত হয় শিশুরা। বুকে জমে থাকা কফ ও কাশির কারণে ঘুমাতে পারে না। সর্দিতে নাক বন্ধ হয়ে যায়, নিঃশ্বাস নিতে ছটফট করতে থাকে, পরে কান্না জুরে দেয়। এসময় শিশুর সঙ্গে মা-বাবাকেও নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়।বাচ্চার কফ জমা সাধারন সর্দি কাশি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইনফেকশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। বাচ্চাদের নাসারন্ধ্র ছোট বলে কফ একটু বেড়ে গেলেই তাদের কষ্ট হয়।

অনেকেই বাচ্চার কফ বা কাশি হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই পাড়ার দোকান থেকে কিনে নেন কাশির ওষুধ। আর দিনে দু-একবার দু-তিন চামচ করে খাওয়াতে থাকেন। কিন্তু আমেরিকান অ্যাকাডেমী অব পেডিয়াট্রিকস এর মতে এ ধরনের কাশির ওষুধ ৬ মাসের নিচের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আর এসব ওষুধ বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কার্যকরীও নয়।

এর মানে অবশ্য এই নয় যে বাচ্চাকে কষ্ট পেতেই হবে। কিছু কিছু ঘরোয়া পদ্ধিতিতে আপনি বাচ্চার সাধারন সর্দি কাশি বা কফের সমস্যায় বাচ্চাকে আরাম দিতে পারেন। যদিও এ পদ্ধতিগুলোর কোনটাই বাচ্চার অসুস্থতা তাড়াতাড়ি সাড়িয়ে তুলবেনা কিন্তু এগুলো তাকে সুস্থবোধ করতে সাহায্য করবে। তবে কফ যদি খুব বেশীদিন থাকে এবং বাচ্চার শ্বাসপ্রশ্বাসে যদি খুব বেশী সমস্যা হয় তাহলে অবশ্যয় বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

আসুন এবার জেনে নেয়া যাক কিভাবে ঘরোয়া উপায়ে কফ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

বাচ্চার নাক ও গলার কফ কমাতে কিছু ঘরোয়া উপায়

বিশ্রাম

সর্দি কাশি বা কফ মানেই হলো ইনফেকশন। আর এর বিরুদ্ধে লড়তে হলে চাই শক্তি। এই কারনেই যে কোন বয়সের মানুষেরই এ সময় প্রচুর বিশ্রাম দরকার। শিশুরা যখন বিশ্রাম নেয় তখন তারা আরোগ্য লাভ করতে থাকে। তাই এসময় শিশুর যথেষ্ট বিস্রামের ব্যাবস্থা করুন।

বিশ্রাম মানে আবার এটা নয় যে বাচ্চাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে বা ঘুমাতে হবে। বাচ্চার রিলাক্স করার ব্যাবস্থা করুন। তার জন্য এমন কোন খেলার ব্যাবস্থা করুন যেটাতে তার দৌড়ঝাপ করতে হবেনা। বাচ্চাকে হয়ত টিভি থেকে দূরে রাখতে চাইছেন। কিন্তু এ সময় তার প্রিয় কোন চ্যানেল বা কার্টুন বা মুভি দেখতে দিন। বাচ্চাকে কোলে নিয়ে তাকে বই পড়েও শোনাতে পারেন।

বাষ্প

নিঃশ্বাসের সাথে বাষ্প নিলে তা নাসারন্ধ্রের কফ পাতলা করতে সাহায্য করে। যদি বাসায় হিউমিডিফায়ার থাকে তবে বাচ্চার রুম আদ্র রাখার চেষ্টা করুন। আর তা হলে বাচ্চাকে বাথরুমে নিয়ে বাথরুমের দরজা জানালা বন্ধ করুন, গীজার থাকলে গরম পানি ছেড়ে দিন বা তাও যদি না থাকে তবে কয়েকটি বালতিতে গরম পানি ঢেলে দিন যাতে পানির বাষ্প বাথ্বরুমের বাইরে যেতে না পারে। বাষ্প ভর্তি বাথরুমে ১৫ মিনিটের মত বসে থাকুন। গরম পানিতে গোসলও এসময় অনেক আরাম দেয়। তবে এ সময় প্রতিটি মুহূর্তে বাচ্চাকে আগলে রাখুন যাতে সে গরম পানির সংস্পর্শে যেতে না পারে।

একটি পাত্রে গরম পানি নিয়ে সেটি দিয়ে শিশুটিকে ভাপ দিন। এভাবে শিশুটিকে কিছুক্ষণ রাখুন।গরম বাষ্প শিশুর বুকে জমে থাকা সর্দি, কফ বের করে দিতে সাহায্য করে। নবজাতক শিশুদের ক্ষেত্রে নেবুলাইজার ব্যবহার করা হয়। ঘরে নেবুলাইজার  না থাকলে শিশুকে কুসুম গরম পানিতে গোসল করাতে পারেন। কিংবা একটি কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে তা দিয়ে শিশুর শরীর মুছে দিতে পারেন। এইরকম কয়েকবার করুন।

স্যালাইন ড্রপ ও বাল্ব সিরিঞ্জ

বাচ্চার যদি কফের কারনে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় তাহলে এ পদ্ধতিতে তার নাক পরিষ্কার করে তাকে আরাম দিতে পারেন। বাচ্চারা সাধারন ৪ বছরের আগে ঠিকভাবে নাক ঝারতে পারেনা। কিছু কিছু শিশু হয়ত এর আগেই তা শিখে যায়। বাচ্চা যদি নাক ঝারতে পারে তবে তার প্রতি নাকে দু এক ফোঁটা স্যালাইন পানি দিয়ে তার নাকের কফ পাতলা করে দিন। এবং এর পর পরিষ্কার টিস্যু বা কাপড় দিয়ে নাক ঝেরে নিন।

বাচ্চা যদি ছোট হয় এবং নাক ঝারতে না পারে তবে বাচ্চার মাথা সামান্য পেছনের দিকে ঝুঁকিয়ে বাচ্চার দু নাকে কয়েক ফোঁটা নরসল বা স্যালাইন পানি দিন। ৩০ সেকেন্ড বাচ্চার মাথা এভাবে রাখুন। এতে নাকের মিউকাস পাতলা হবে। এর পর ন্যাসাল অ্যাসপিরেটরের সাহায্যে বাচ্চার নাকের মিউকাস সাকশন করে বের করে আনতে পারেন। ন্যাসাল অ্যাসপিরেটর আজকাল সব বেবি শপেই কিনতে পাওয়া যায়।

বাচ্চা যদি এ পদ্ধতি পছন্দ না করে তবে বাচ্চাকে চিৎ করে শুয়ে দু নাকে কয়েক ফোঁটা করে স্যালাইন ড্রপ দিন। এর পর ৩০ সেকেন্ড অপেক্ষা করুন। তারপর বাচ্চাকে উপুড় করে পেটের উপর ভর দিয়ে শুইয়ে দিন। এতে স্যালাইন পানির সাথে কফ আপনা আপনি নাক থেকে গড়িয়ে পড়বে। পাতলা কাপড় দিয়ে তা মুছে নিন। বাচ্চা এ সময় হাঁচি বা কাশির মাধ্যমেও কফ বের করে দিতে পারে। কাপড় দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাচ্চার নাকের সামনের অংশ থেকে পানিগুলো মুছে দিন। নাকে তুলা বা কটন বাড ব্যবহার করা উচিত নয়।

বাচ্চাকে যদি সর্দিতে দুধ খাওয়াতে সমস্যা হয় তবে দুধ খাওয়ানোর ১৫ মিনিট আগে এটা করতে পারেন। এতে বাচ্চার জন্য দুধ খাওয়ার সময় নিঃশ্বাস নিতে সুবিধা হবে। তবে দিনে তিন চার বারের বেশী এটা করা উচিত নয়। এতে বাচ্চার নাক আর বেশী শুকিয়ে যেতে পারে।

পর্যাপ্ত তরল

শিশুর বয়স ছয় মাসের কম হলে, তাকে বারবার বুকের দুধ খাওয়ান। আর যদি বয়স হয় ছয় মাসের বেশি, তাহলে অল্প অল্প করে পানি, তরল ও নরম খাবার বারবার খাওয়ানো যেতে পারে।শিশুর বয়স ছয় মাসের বেশি হলে শিশুকে গরম স্যুপ দিতে পারেন। হজম করতে পারে এমন সবজি যেমন আলু, গাজর, পেঁয়াজ, আদা দিয়ে তৈরি করে নিতে পারেন স্যুপ। এটি শিশুর অভ্যন্তরীণ ইনফেকশন দূর করার সাথে সাথে শিশুর পেট ভরিয়ে দেবে। ২ বছরের বেশী বয়সী শিশুদের তুলসী চা, আদা চা ইত্যাদিও দেয়া যেতে পারে। এরসাথে দুই ফোঁটা বিশুদ্ধ মধু মেশাতে ভুলবেন না। এটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল হিসেবে কাজ করবে।

বাচ্চার মাথা সামান্য উঁচু রাখুন

বাচ্চা ঘুমানোর সময় তার মাথার নিচে বালিস বা কিছু দিয়ে সামান্য উঁচু করে দিন। এতে করে তার শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া অনেকটা সহজ হবে। তবে বাচ্চা যদি বেশী ছোট হয় এবং ঘুমের ভেতর নড়াচড়া করে তবে তার মাথার নিচে বালিশ না দিয়ে সরাসরি ম্যাট্রেসের নিচে বালিশ দিয়ে সামান্য উঁচু করে দেয়া নিরাপদ। এতে সিডস (সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোমের) ঝুঁকি কমানো যায়।

মধু

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা বলছে, দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের প্রতিদিন রাতে দুই চামচ মধু খাওয়ানোর পর রাতের বেলা তাদের কাশি অনেকটাই কমে গেছে। তবে এক বছরের নিচে শিশুদের মধু না দেওয়াই ভালো। কাশি উপশমে এক কাপ হালকা গরম পানিতে বা এক কাপ গরম চায়ের সঙ্গে ১ চামচ মধু মিশিয়ে পান করাটা সবচেয়ে ভালো। মধু বন্ধ শ্বাসনালী খুলে দেয় ও প্রদাহ কমায়। এছাড়া মধুতে বেশ খানিকটা ক্যালোরি মেলে, যা শিশুদের বাড়তি শক্তি যোগায়। ২ বছরের বেশী বয়সী শিশুদের তুলসী চা, আদা চা ইত্যাদিও দেয়া যেতে পারে।

কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?

যদি বাচ্চার কফের সাথে নিচের লক্ষনগুলো দেখা যায় তবে অবশ্যয় তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে-

  • জর থাকলে
  • গায়ে র‍্যাশ হলে।
  • নাকে বন্ধের সাথে সাথে কপাল, চোখ,নাক ও গাল ফুলে গেলে।
  • দু সপ্তাহের বেশী নাক বন্ধ থাকলে।
  • বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হলে বা দ্রুত শ্বাস নিলে।
  • বাচ্চা কিছুই না খেলে বা খেতে না চাইলে।
  • যদি বাচ্চা বেশী খিটখিটে হয়ে যায় এবং বাচ্চাকে অসুস্থ মনে হয়।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment