শিশুর টিকা । প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ

শিশুর জন্মের সাথে সাথেই পরিবারের সবার মুখে হাসি ফুটে উঠে। আত্মীয় স্বজন সবাই নতুন শিশুকে দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে। আর তার সাথে সাথে বিভিন্ন রোগ জীবাণুর আক্রমনের শঙ্কায় বাবা মায়ের চিন্তা বাড়ে। সবার একটাই কামনা, শিশুটি যেন সুস্থ থাকে। শিশুর সুস্থতার জন্য শিশুর টিকা দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

চিকিৎসা বিজ্ঞানে রোগ কে দুইটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে।

এক. যেসব রোগ বিভিন্ন জীবাণু দিয়ে হয়। এসব রোগ ঐ নির্দিষ্ট জীবাণু থেকে বেঁচে থাকতে পারলে প্রতিরোধ করা যায়। যেমন- ডায়রিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, পোলিওমায়েলাইটিস, নিউমোনিয়া ইত্যাদি।

দুই. যেসব রোগ সংক্রামক জীবাণু দিয়ে হয় না। এসব রোগ অনেক সময় বংশগত, আবার অনেক সময় ব্যক্তিগত অভ্যাস, স্বল্প পরিশ্রম ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবিত হয়।

শিশুদের  যেসব রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব সেগুলোকে প্রতিরোধের জন্য বিজ্ঞানীরা অনেক বছর আগে থেকেই কাজ করে আসছেন। তারা জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন যেন রোগ হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। আর এ জন্যই আমরা শিশুদের টিকা দিয়ে থাকি। টিকার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, শিশুকে ঐ রোগ গুলো থেকে দূরে রাখা।

কি কি রোগের বিরুদ্ধে টিকা দেয়া হয়

যে সকল রোগের বিরুদ্ধে আমাদের দেশে সরকারী ভাবে শিশুর টিকা দেয়া হয় সে রোগ গুলো নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ১০টি রোগ প্রতিরোধে বাচ্চাদের বিনামূল্যে টিকা দেয়া হচ্ছে। রোগগুলো হচ্ছে- যক্ষা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি, হেমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি, নিউমোনিয়া, পোলিওমায়েলাইটিস, হাম ও রুবেলা।

শিশুর টিকা কখন দিতে হবে ?

মনে রাখতে হবে, বাচ্চাকে সবগুলো টিকা দিতে হলে কমপক্ষে ৬ বার টিকাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।

শিশুকে টিকা দেওয়ার সময়সূচি
* ওপিভি টিকা মোট ৪ (চার) ডোজ দিতে হবে। ৪র্থ ডোজটি এমআর টিকার সাথে দিতে হবে। এছাড়াও জন্মের ১৪ দিনের মধ্যে ওপিভির অতিরিক্ত ডোজ দেয়া যেতে পারে।
রোগের টিকা
কোন রোগের কোন টিকা

প্রথমত, যে টিকা টি বাচ্চার জন্মের সাথে সাথেই দেয়া হয় তা হচ্ছে বিসিজি। এটি যক্ষা রোগের বিরুদ্ধে দেয়া হয়। বাচ্চার বাম হাতে চামড়ার ভিতরে এই টিকা দেয়া হয়। মনে রাখবেন, এই টিকা দিলে টিকার স্থানে সামান্য ঘা হয়ে পেকে যাবে। আর এই ঘা না হলে ধরে নিতে হবে, টিকা কার্যকর হয়নি। সেক্ষেত্রে এই টিকা বাচ্চাকে আবার দিতে হবে। টিকার দেয়ার পরে শিশুর সামান্য জ্বর আসতে পারে। এতে ভয়ের কিছু নেই। জ্বর ১০১ডিগ্রী এর বেশি হলে স্বাস্থ্যকর্মী অথবা ডাক্তারকে ফোন দিয়ে পরামর্শ গ্রহণ করুন। এছাড়াও জন্মের পর পর বা ১৪ দিনের মদ্ধে শিশুকে পোলিও টিকার ডোজ বা ওপিভি দেয়া হয়।

বাচ্চার বয়স ৪২ দিন বা ছয় সপ্তাহ হলেই তাকে ২য় ডোজ টিকা দেয়ার জন্য টিকা কেন্দ্রে নিয়ে আসুন। ৪২ দিন বয়সে বাচ্চাকে ২ ফোঁটা পোলিও টিকা বা ওপিভি  মুখে খাওয়ানো হয়। এর সাথে সাথে ডান পায়ে নিউমোনিয়ার টিকা পিসিভি দেয়া হয়। আর বাম পায়ে দেয়া হয় আর একটি টিকা যা পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন নামে পরিচিত।আসলে, বাম পায়ের টিকা টি একটি ইঞ্জেকশন হলেও এটি পাঁচটি রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে।রোগ গুলো হচ্ছে- ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, হেমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা- বি।

২য় ডোজ দেয়ার ২৮ দিন পর বাচ্চাকে ৩য় ডোজ টিকা দিতে হবে। ৩য় ডোজ টিকায় আসলে ২য় ডোজের টিকাগুলোই আবার দেয়া হয় রোগের বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রতিরোধ তৈরী করার জন্য।

৪র্থ ডোজ টিকা ৩য় ডোজ টিকা দেয়ার ২৮ দিন পর দিতে হবে। এক্ষেত্রেও ২য় ডোজের সেই টিকাগুলোই দেয়া হয়।

৫ম ডোজটি ৪র্থ  ডোজের অনেক পরে অর্থাৎ শিশুর বয়স যখন ৯ মাস তখন দেয়া হয়। এই সময়ে বাচ্চাকে হাম এবং রুবেলা রোগের (এমআর) বিরুদ্ধে একটি ইঞ্জেকশন দেয়া হয় এবং ওপিভি  এর চতুর্থ ডোজ দেয়া হয়। অনেকদিন পরে দেয়া হয় বলে অধিকাংশ মা এই টিকা টি তার বাচ্চাকে দিতে ভুলে যান। অথচ এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে মনে রাখা উচিত।

বাচ্চার ১৫ মাস বয়সে আবার হামের টীকা দেয়া হয়।

টিকা

উপরোক্ত টিকাগুলো সরকারি ভাবে টিকাদান কেন্দ্রগুলিতে নিয়মিত প্রদান করা হয়।

এ সব টিকা ছাড়া অন্যান্য রোগের জন্য আরও কিছু টিকা আছে, যেগুলো সরকারিভাবে দেওয়া হয় না। যেমন- রোটা ভাইরাস ডায়েরিয়া, টাইফয়েড, ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা ইত্যাদি।

রোটা ভাইরাস ডায়েরিয়ার দুই ডোজ টিকা শিশুর ২ মাস এবং ৪ মাস বয়সে (Rotarix) অথবা তিন ডোজ টিকা শিশুর ২ মাস, ৪ মাস এবং ৬ মাস বয়সে (Rota Teq) দিতে হয়।

টাইফয়েডের টিকা দিতে হয় ২ বছর বয়সে। এরপর প্রতি ২ বছর পর বুস্টার ডোজ দিতে হয়।

ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে ৮ বছরের কম বয়সী শিশুর জন্য ১ম বছরে দুই ডোজ (৬ মাসের ব্যবধানে) টিকা দিতে হয়। এরপর প্রতি বছর একটি করে ডোজ দিতে হয়।

হেপাটাইটিস এ প্রতিরোধে শিশুর ১ বছর বয়সের পর দুইটি টিকা দেওয়া যায় (৬ মাসের ব্যবধানে)।

মেনিঙ্গকক্কাল মেনিনজাইটিস, ভেরিসেলা, কলেরা রোগের টিকা তেমন একটা দেওয়া হয় না। তবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে এই সব টিকা দেওয়া যেতে পারে।

শিশুর টিকার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং করনীয় 

বিসিজি টিকা
বিসিজি টিকা দেওয়ার ২ সপ্তাহ পর টিকার স্থান লাল হয়ে ফুলে যাবে এবং আরো ২/৩ সপ্তাহ পরে শক্ত দানা, ক্ষত বা ঘা হতে পারে। ধীরে ধীরে এই ক্ষত বা ঘা শুকিয়ে যাবে এবং দাগ থাকবে। কোনো ওষুধ বা তেল ক্ষতে দেয়া যাবে না। নিজ থেকেই ক্ষত শুকিয়ে যাবে। বিসিজি টিকা অনেক গভীরে প্রবেশ করলে এবং টিকা বেশি পরিমাণে দেয়া হলে বিসিজি টিকার জায়গায় পার্শ্ব – প্রতিক্রিয়া, প্রদাহ বা গভীর ফোড়া হতে পারে। শিশু বিসিজি টিকা নিয়েছে কিনা তা দাগ দেখে পরীক্ষা করা যায়। অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলে, মেডিকেল অফিসারের নিকট পাঠাতে হবে। কোনো প্রতিক্রিয়া না হলে অর্থাৎ টিকার দাগ না থাকলে ডিপিটি/ পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার ৩য় ডোজের সময় আবার বিসিজি টিকা দিতে হবে।

ওপিভি টিকা
ওপিভি টিকার কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া নেই।

পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন (ডিপিটি, হেপাইটাইটিস-বি এবং হিব ভ্যাকসিন)
এই টিকার সাধারণ পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামান্য জ্বর হতে পারে, টিকা দেয়ার স্থানে সামান্য লাল হতে পারে, ফুলে যেতে পারে ও অল্প ব্যথা হতে পারে। যা আপনা আপনি ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে সেরে যাবে। এই টিকার সাধারণত কোনো মরাত্মক প্রতিক্রিয়া নেই। তবে কদাচিৎ পারটসিস উপাদানের কারণে খিঁচুনি হতে পারে। যদি খিঁচুনি হয় তবে তাকে পুনরায় পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন না দিয়ে, ২৮ দিন পর ১ ডোজ টিটি টিকা দিতে হবে।

পিসিভি ভ্যাকসিন (নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন)
এই টিকার সাধারণ পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হিসাবে সামান্য জ্বর হতে পারে, টিকা দেয়ার স্থানে সামান্য লাল হওয়া, ফুলে যাওয়া ও অল্প ব্যথা হতে পারে। যা আপনা আপনি ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে সেরে যাবে। এই টিকার সাধারনত কোনো মারাত্মক প্রতিক্রিয়া নেই।

এমআর ভ্যাকসিন (হাম ও রুবেলা ভ্যাকসিন)
এমআর টিকার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হিসাবে টিকা দেয়ার ১-৩ দিন পর সামান্য জ্বর ও কোনো কোনো সময় শরীরে দানা উঠতে পারে। শরীরে প্রতিরোধক তৈরি ও সংরক্ষণের জন্যই এরকম হয়। এসময় বুকের দুধের পাশাপাশি প্রচুর পানি খাওয়াতে হবে এবং জ্বর কমানোর জন্য কাপড় পানিতে ভিজিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে।

হামের টিকা
হামের টিকার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হিসাবে টিকা দেওয়ার ১-৩ দিন পর সামান্য জ্বর ও কোনো কোনো সময় শরীরে দানা উঠতে পারে। শরীরে প্রতিরোধক তৈরি ও সংরক্ষণের জন্যই এরকম হয়। এসময় বুকের দুধের পাশাপাশি প্রচুর পানি খাওয়াতে হবে এবং জ্বর কমানোর জন্য কাপড় পানিতে ভিজিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে।

ইনজেকশনের স্থানে ফোঁড়া হলে করনীয় 

যদি ইনজেকশন দেওয়ার ৪-১০ দিন পরে ইনজেকশনের স্থান গরম, লালচে, অনেকটা জায়গা নিয়ে শক্ত হয়ে যায় ও ঐ স্থানে অনেক বেশি ব্যথা হয়, তাহলে মনে করতে হবে এটা ইনফেকশনের লক্ষণ এবং ফোঁড়া সৃষ্টি হচ্ছে। এই সময় টিকা গ্রহণকারীর জ্বর আসতে পারে।চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।ফোঁড়া হলেও পরবর্তী টিকার ডোজ ও পরবর্তী টিকা সময়সূচি অনুযায়ী অবশ্যই দিতে হবে।

 কখন টিকা দেওয়া যাবে?

প্রায় সকল অবস্থায়ই শিশুর টিকাদেয়া যায়। শিশুর টিকা দিলে যে সামান্য জ্বর বা ব্যথা হয় তার চেয়ে টিকা না দিয়ে রোগাক্রান্ত হওয়া অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ।অপুষ্টিতে ভুগছে এমন শিশুকে অবশ্যই টিকা দিতে হবে। এই সব শিশুর দেহে রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কম থাকে। সুতরাং তার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করার জন্যই টিকা দেয়া বেশি জরুরি।

পূর্বে শরীরে কোনো দানা উঠে থাকলে অথবা অতীতে হাম/রুবেলা হয়ে থাকলেও সেই শিশুকে ৯ মাস বা ২৭০ দিন পূর্ণ হলে ১ ডোজ এমআর টিকা এবং ১৫ মাস বয়স পূর্ণ হলে হামের ২য় ডোজ টিকা দিতে হবে।

কখন টিকা দেয়া যাবে না?

কেবলমাত্র নিম্নেউল্লেখিত কারণগুলোতেই টিকা দেয়া যাবে না

  • খুব বেশী অসুস্থ শিশুকে টিকা দেয়া যাবে না।
  • পূর্ববর্তী পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা দেয়ার পর শিশুর খিঁচুনি বা অজ্ঞান হলে পরবর্তী পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার ডোজ দেয়া যাবে না। এই ক্ষেত্রে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার বদলে ১ ডোজ টিটি টিকা দিতে হবে এবং শিশুকে অন্যান্য সকল টিকা (ওপিভি, এমআর, হাম) নিয়ম অনুযায়ী দিতে হবে।

পূর্ববর্তী টিকা দেয়ার পর কোনো মারাত্বক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হলে পরবর্তী টিকা দেয়ার পূর্বে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে

কোথায় টিকা দিবেন?

বাংলাদেশের সর্বত্র টিকাদান কার্যক্রম চলছে সরকারীভাবেই। আপনার নিকটস্থ সদর হাসপাতাল, উপজেলা হাসপাতাল,কমিউনিটি ক্লিনিক অথবা ক্ষেত্র বিশেষ কোন কোন প্রইভেট ক্লিনিকে খোঁজ নিলেই জেনে নিতে পারবেন কখন কখন সেখানে টিকা দেয়া হয়। টিকাদান কর্মসূচী সম্বলিত সাইনবোর্ড এ টিকাদান কর্মীর  নাম, মোবাইল নাম্বার ও টিকাদানের তারিখ লেখা থাকে।

শিশুদের টিকাসমূহের বিবরন

পোলিও  টিকাঃ- পোলিও একটি মারাত্মক ব্যাধি। এই ব্যাধি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় শিশুকে সঠিক সময়ে টিকা দেয়া। দুইভাবে পোলিও টিকা দেয়া যেতে পারে। যথা- ও. পি. ভি. এবং আই. পি. ভি. । ও. পি. ভি. হল ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন যা মুখে খাওয়ানো হয়ে থাকে এবং আই. পি. ভি. হল ইনএক্টিভেটেড পোলিও ভ্যাকসিন যা ইনজেকসান এর মাধ্যমে দেওয়া হয়।

বিসিজি টিকাঃ- বিসিজি টিকা হলো যক্ষ্মার প্রতিষেধক। শিশুর জন্মের ছয় সপ্তাহের মধ্যে এই টিকা দিতে হয়। বিসিজি টিকা দিলে মরণব্যাধি যক্ষ্ম থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এই টিকার শুধু মাত্র একটি ডোজ। বাম হাতের কাধের কাছের হাতের অংশের চামড়ার নিচে এটি দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে হালকা ক্ষত বাম লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়ার মত কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে।

ডিপিটি টিকাঃ- ডি তে ডিপথেরিয়া, পি তে পারটোসিস বা হুপিং কাশি ও টি তে টিটেনাস। তিনটি মারাত্নক ঝুঁকিপূর্ণরোগের নাম। ডিপিটি টিকাটি এই তিনটি রোগের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। তাই শিশুর জন্য এই টিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ ।পারটুসিস টিকা দেয়ার সময় অনেকে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। যাদের এ প্রবণতা বেশি বা শরীর দুর্বল তাদের শুধু ডিপথেরিয়া ও টিটেনাসের টিকা দেয়া হয়।

হেপাটাইটিস-বি টিকা (হেপ বি):হেপাটাইটিস-বি লিভারের একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ, যা হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়। ইপিআই কার্যক্রমে হিমোফাইলাস ইনফ্লয়েঞ্জা-বি অন্তর্ভুক্তির পরে ডিপিটি এবং হেপাটাইটিস-বি টিকা আলাদা আলাদা না দিয়ে সমন্বিতভাবে ১টি টিকার মাধ্যমে ৫টি রোগের (ডিফথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি এবং হিমোফাইলাস ইনফ্লয়েঞ্জা-বি) বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কার্যক্রম নেয়া হয়েছে। এই টিকাকে পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন বলা
হয়েছে। তিন ডোজ পেন্টাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন দিয়ে শিশকে এ রোগ থেকে রক্ষা করা যায়।

হামের টিকাঃ-  হামের টিকা শিশুদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি টিকা। হাম একটি খুব মারাত্নক কষ্টদায়ক একটি রোগ। এই রোগ থেকে বাঁচার জন্য শিশুদের অবশ্যই হামের টিকা দেয়া উচিত। শিশুর ১৫ মাস বয়সে এ টিকা দিতে হয়।

টাইফয়েড টিকাঃ- টাইফয়েড একটি মারাত্নক ঘাতক ব্যাধি যা শিশুর যে কোনো অঙ্গ বিকল করে দিতে পারে এবং শিশু হারিয়ে ফেলতে পারে তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা। এই রোগ জীবন পর্যন্ত নিয়ে নিতে পারে। তাই সময়মত শিশুদের টাইফয়েড এর টিকা দিতে হয়। দুই বছর বয়সের পর শিশুদের এই টিকাটি তিন বছর পর পর দিতে হয়।

রোটাভাইরাস টিকাঃ- ডায়রিয়া বাচ্চাদের জন্য একটি হুমকি স্বরূপ। বাংলাদেশের বেশির ভাগ বাচ্চা ছোট বয়সে ডায়রিয়াতেভোগে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক পরিচর্যা করা হলে ডায়রিয়া থেকে বাচ্চা সুস্থ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু রোটা ভাইরাস জনিত ডায়রিয়া প্রাণঘাতক হতে পারে। তাই ডায়রিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে বাচ্চাদের রোটা ভাইরাস এর প্রতিষেধক রোটাভাইরাস ভ্যাকসিন বা আরভি দিতে হবে। ডায়রিয়ার প্রতিষেধকের টিকা তিনটি ডোজে নিতে হয়। প্রথম ডোজ ৬ থেকে ১২ সপ্তাহের বয়সের মধ্যে দিতে হবে। পরবর্তী ডোজ  ১০ সপ্তাহ/৪মাসের মাঝে দিতে হবে।

নিউমোক্কাল ভ্যাকসিনঃ-  বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানে নিউমোনিয়া বা অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনকে শিশু মৃত্যুহারের অন্যতম কারন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নিউমোনিয়ার জন্য দায়ী ভাইরাস হল নিউমোকক্কাস (স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনি) ও হেমোফাইলাস ইনইয়ুযেকি। এই দুই ভাইরাস এর প্রতিষেধক হিসেবে এই টিকার কোন বিকল্প নেই। এর জন্য সিজনাল অ্যান্টি ভাইরাল ভ্যাকসিন বা নিউমোক্কাল ভ্যাকসিন যে কোনটি দিলেই হয়। সাধারনত অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের শিশুদের এই টিকা দিতে হয়। নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন দিলে ফুসফুসের সংক্রমণ কম হয় এবং ঝুঁকি কম থাকে।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিনঃ- ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি ছোঁয়াচে ব্যাধি। এই ভাইরাস প্রধানত মানুষের শ্বসনতন্ত্রকে আক্রমণ করে, ফলে রোগীর হাঁচি, কাশি ও নির্গত মিউকাসের মাধ্যমে ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগ সুস্থ মানুষের দেহে সংক্রমিত হয় । এই রোগে প্রথমে অনবরত হাঁচি হয় ও নাক দিয়ে জল পড়ে, পরে প্রচন্ড গা, হাত, পা বেদনা সহ তীব্র জ্বর হয় । তাই  বাচ্চাদের এই রোগের টিকা দেয়া অত্যন্ত জরুরী। এই রোগের জন্য সাধারণত দুই ধরনের টিকা আছে- টিআইবি ও এএআইভি। এর মধ্যে টিআইবি ছয় মাস বয়সে এবং এএআইভি দুই বছর বয়সের পর দিতে হয়।

চিকেন পক্স টিকাঃ- চিকেন পক্স বা জল বসন্ত একটি ভাইরাস সংক্রমক রোগ। জন্মের ৫ দিনের মাঝে এই রোগ হলে মারাত্মক ভাইরেমিয়া-এ জনিত কারণে বাচ্চার মৃত্যুও হতে পারে। জল বসন্ত প্রতিরোধ করতে শিশুর জন্মের ১২ মাস পরে এবং ৪-১২ বছরের মাঝে দুই ডোজে টিকা দিতে হয়।

এম এম আর টিকাঃ- এম এম আর মূলত মাম্পস, মিজলস এবং রুবেলা রোগের টিকা। ৯ মাস বা ২৭০ দিন বয়স পূর্ণ হলে এক ডোজ এমআর (হাম-রুবেলা) টিকা দিয়ে শিশুকে রুবেলা রোগ থেকে প্রতিরোধ করা যায়। ১৫ বৎসর বয়স পূর্ণ হলেই সকল কিশোরীদের ১ ডোজ এমআর (হাম-রুবেলা) টিকা, ১ ডোজ টিটি  টিকার সাথে দিতে হবে। পরবর্তীতে টিটি টিকার সময়সূচী অনুযায়ী ৫ ডোজ টিটি টিকা দেয়া শেষ করতে হবে।

প্রয়োজনীয় তথ্য:

  • একই টিকার দুই ডোজের মধ্যে কমপক্ষে ২৮ দিনের বিরতি থাকতে হবে।
  • একই দিনে একাধিক টিকা দিলে কোনো সমস্যা নেই।
  • কোনো কারণে তারিখ পার হয়ে গেলে পোলিও, ডিপিটি, হেপাটাইটিস বি তারিখের অনেক পরে এমনকি এক বছর পরে দিতেও সমস্যা নেই।
  • পোলিও টিকা মুখে খেতে হয় বলে ডায়রিয়া থাকলে শিডিউলের ডোজ খাওয়ানোর পর ২৮ দিন   বিরতিতে একটি অতিরিক্ত ডোজ খাওয়ানো হয়।
  • বিসিজি টিকা দেয়ার এক মাসের মধ্যে টিকার স্থানে ক্ষত হয়, এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
  • ছোটখাটো সামান্য অসুস্থতা যেমন: জ্বর, বমি, ডায়রিয়া ইত্যাদি কারণে টিকাদান স্থগিত করার কারণ নেই। তবে মারাত্মক অসুস্থ শিশু, খিঁচুনি হচ্ছে এমন শিশু এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল শিশুর টিকা দেয়া উচিত নয়।

নবজাতকের সুস্থতার জন্য ই পি আই থেকে অত্যাবশ্যকীয় টিকাগুলো দেয়ানোর পাশাপাশি বাকি টিকাগুলোও বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সময়মতো দিয়ে দেয়া উচিত। আদরের সন্তান ভালো থাকুক সচেতনতায় আর সুস্থতায়।

 

তথ্যসূত্রঃ 

http://www.dghs.gov.bd

Related posts

Leave a Comment