শিশুর জন্মগত ত্রুটি | জানুন, সচেতন হোন, প্রতিরোধ করুন

শিশুর জন্মগত ত্রুটি কি

মায়ের গর্ভে থাকাকালীন সময়ে শিশুর জন্মগত ত্রুটি হতে পারে। গর্ভকালীন (Pregnancy) অবস্থার প্রথম ৩ মাসে অধিকাংশ জন্মগত ত্রুটির সৃষ্টি হয়।জন্মগত ত্রুটি মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ অথবা উভয়কেই প্রভাবিত করতে পারে। জন্মের পূর্বে, জন্মের সময়, অথবা জন্মের পর যেকোন সময়ে এই ত্রুটি দেখা দিতে পারে। অধিকাংশ জন্মগত ত্রুটি জন্মের প্রথম বছরের মধ্যেই দেখা যায়। কিছু ত্রুটি সহজেই চোখে ধরা পড়ে, আবার কিছু ত্রুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে। শিশুর জন্মগত ত্রুটি অল্প থেকে মারাত্মক হতে পারে। জন্মগত ত্রুটির ফলে অনেক শিশু মারাও যায়।

বহু শিশু ত্রুটিযুক্ত শরীর নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে। এর মধ্যে কিছু ত্রুটি স্থায়ীভাবে থেকে যায়। কিন্তু বেশির ভাগই নিরাময়যোগ্য। এসব ত্রুটি হতে পারে শারীরিক গঠনগত, অঙ্গের কার্যাবলিসংশ্লিষ্ট কিংবা মেটাবলিজম বা বিপাক সম্পর্কিত। প্রতিরোধযোগ্য, চিকিৎসাযোগ্য আর চিকিৎসার অযোগ্য ত্রুটি মিলে সংখ্যাটি চার হাজারেরও বেশি। আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ান অ্যান্ড গাইনোকলজির গবেষণামতে, প্রতি হাজারে অন্তত তিনটি শিশু কোনো না কোনো ত্রুটি নিয়েই জন্মগ্রহণ করে।

জন্মগত ত্রুটির ধরন

জেনেটিক বা জিনগত, এনভায়রনমেন্টাল বা পরিবেশগত কারণেই সবচেয়ে বেশি ত্রুটি হয়। এ ছাড়া কিছু ত্রুটির কারণ এখনো জানা যায়নি। এগুলো আননোন ফ্যাক্টর বা অজানা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, অর্ধেক জন্মগত ত্রুটির কারণই অজানা।

শারীরিক ত্রুটির মধ্যে আছে –

  • হার্ট ডিফেক্ট বা হার্টে ত্রুটি
  • স্পিনা বাইফিডা বা স্পাইনাল কর্ডের ত্রুটি
  • ক্লেফট প্যালেট বা বিভক্ত তালু
  • ক্লেফট লিপ বা বিভক্ত ঠোঁট
  • ক্লাবফুট বা বাঁকানো পা
  • কোমরের হাড়ের ত্রুটি বা কনজেনিটাল ডিসলোকেটেড হিপ।

 বিপাকীয় ত্রুটির মধ্যে আছে

  • হরমোনগ্রন্থির অনুপস্থিতি বা কম হরমোন নিঃসরণ
  • টে স্যাচ ডিজিজ, ফিনাইলকিটোনইউরিয়া

মেটাবলিক ত্রুটিগুলো সাধারণভাবে বোঝা যায় না বলে বহু ক্ষেত্রে তা মা-বাবা ও অভিভাবকের চোখ এড়িয়ে যায়। কিন্তু এ কারণগুলো বহু ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের অসুখ টে স্যাচ ডিজিজ কিংবা ফিনাইলকিটোনইউরিয়া।

কেন হয় জন্মগত ত্রুটি?

কিছু শিশুর জন্মগত ত্রুটি হয় মায়ের কাছ থেকে। কিছু ইনফেকশন আছে, যাতে গর্ভকালীন বা জন্মদানের সময় যদি মা আক্রান্ত হন, তাহলে শিশুটি জন্মগত ত্রুটির শিকার হতে পারে। এ ধরনের ইনফেকশনের মধ্যে আছে রুবেলা বা জার্মান মিসেলস, সাইটোমেগালো ভাইরাস বা সিএমভি, সিফিলিস, টক্সোপ্লাজমোসিস, ভেনিজুয়েলান ইকুয়াইন এনকেফালাইটিস এবং পারভোভিরাস। তবে এ ধরনের ইনফেকশনে মা আক্রান্ত হলেই যে গর্ভের শিশুও হবে, শতভাগ ক্ষেত্রে তা হয় না। যেমন গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসে যদি মা রুবেলা ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তবে গর্ভের শিশুর ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকি থাকে। তবে সিএমভি আক্রান্ত মায়েদের সন্তানদের শারীরিক (যেমন কানে শুনতে না পাওয়া) ও মানসিক প্রতিবন্ধিতার শিকার হওয়ার হার এর চেয়ে বেশি।

কিছু কিছু ওষুধ সেবনও গর্ভের শিশুর জন্মগত ত্রুটির কারণ হতে পারে। যেমন মৃগীরোগের ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক টেট্রাসাইক্লিন ইত্যাদি।

জেনেটিক বা জিনগত কারণে বহু শিশুর জন্মগত ত্রুটি হয়। কিন্তু মা-বাবার মধ্যে এ ধরনের ত্রুটি আছে, তা আগে থেকে জানা যায় না। ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রেই জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশুর মা-বাবা কোনো ধরনের শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত থাকেন না। তাই অনাগত শিশুটি জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে, তা অনুমান করা যায় না।

আমাদের দেশে থ্যালাসেমিয়া একটি মারাত্মক জিনবাহিত রক্তরোগ। মা-বাবা এ রোগের বাহক হলে সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে জন্মাতে পারে। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের সারা জীবন অন্যের রক্ত গ্রহণ করে বেঁচে থাকতে হয়। তাদের আয়ু পরিসীমাও কম। বিশ্বের অনেক দেশে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর বা গর্ভধারণের আগে স্বামী-স্ত্রীর থ্যালাসেমিয়া আছে কি না, তা পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব হচ্ছে।

কাদের জন্মগত ত্রুটিযুক্ত সন্তান জন্মদানের সম্ভাবনা রয়েছে ?

যাদের জন্মগত ত্রুটিযুক্ত সন্তান জন্মদানের সম্ভাবনা রয়েছে তারা হলেন :

  • অল্প বয়সে সন্তান ধারণ করলে
  • পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের বেশি বয়সী মহিলাদের
  • গর্ভকালীন সময়ে কিছু ঔষধ এই ঝুঁকি বাড়াতে পারে
  • বংশগত কারণে
  • গর্ভকালীন সময়ে হাম, মামস, ছোঁয়াচে ইত্যাদি রোগ হলে
  • যারা ধূমপান ও মদপান করেন

প্রসূতি মায়ের ত্রুটিযুক্ত শিশু জন্ম নেয়ার ঝুঁকি  নির্নয় পরীক্ষা :

অনেক ত্রুটি শিশুর জন্মের আগেই নির্ধারণ করা যায় এবং অল্পসংখ্যক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব। কারণ যা-ই হোক, নতুন এ প্রিনেটাল ডায়াগনোসিস বা গর্ভস্থ অবস্থায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শতকরা ৯৩ ভাগ সমস্যা নির্ণয় করা যায়। গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসের মধ্যেই গর্ভস্থ শিশুর কোনো শারীরিক সমস্যা আছে কি-না অথবা আপাতত না থাকলেও পরবর্তী সময়ে ঝুঁকি আছে কি-না, তা নির্ণয় করা যাবে দ্বিতীয় তিন মাসে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্তর তিনটি। অতি আধুনিক আলট্রাসাউন্ড স্ক্যান, মায়ের রক্তরস স্ক্রিনিং ও জেনেটিক পরীক্ষা।

প্রথমত, প্রয়োজন নিখুঁত ছবি তোলার উপযোগী হাইরেজুলেশন আলট্রাসাউন্ড স্ক্যানার এবং অবশ্যই গর্ভস্থ শিশু চিকিৎসাবিজ্ঞানে অভিজ্ঞ চিকিৎসক।

দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন মায়ের রক্তরসের বায়োকেমিক্যাল কিছু পরীক্ষা। এই দুই স্তরের সমন্বয়ে প্রায় ৯৩ শতাংশ জটিলতা নির্ণয় করা যায়। এই দুই স্তরে সমস্যা পেলেই কিছু ইনভেসিভ পরীক্ষা তৃতীয় ও শেষ স্তরে করতে হয়। আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর ঘাড়ের পেছনে পরীক্ষা (নিউক্যাল ট্রান্সলুসেন্সি) অথবা শিশুর মাথার বেড় (বিপিডি) এবং মায়ের রক্তরসের বিশ্লেষণের মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর প্রায় ১০০টির ওপর গঠনগত শারীরিক ত্রুটি নির্ণয় করা অথবা ধারণা পাওয়া যায়।

তৃতীয়ত, যেসব গর্ভস্থ শিশুকে আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ত্রুটিযুক্ত হিসেবে নির্ণয় করা যায় অথবা নির্ণয় করা না গেলেও (মাইনর অথবা অকাল্ট ত্রুটি) গর্ভস্থ শিশুর ঝুঁকি হিসেবে নির্ণয় করা যায়। অর্থাৎ প্রথম স্তরের ত্রুটি অথবা দ্বিতীয় স্তরে ঝুঁকিযুক্তদের তৃতীয় স্তরে জেনেটিক টেস্টের মাধ্যমে চূড়ান্ত সমস্যা নির্ণয় করা সম্ভব।

উল্লেখযোগ্য, শিশুর জন্মগত ত্রুটির মধ্যে অন্যতম একটি ডাউনস সিনড্রোম। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০ বছর বয়সী মায়েদের ক্ষেত্রে প্রতি ৮০০ শিশুর মধ্যে একজন এবং ৩৫-ঊর্ধ্ব বয়সী মায়েদের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে একজন এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাসে এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা মাকে দুশ্চিন্তামুক্ত করতে সাহায্য করে।

এসব পরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভাবস্থায়ই বিভিন্ন ঝুঁকি ও ত্রুটি সম্পর্কে জেনে নিয়ে প্রয়োজনীয় আগাম ব্যবস্থা নেওয়া যায়। মেরামতযোগ্য কিছু ত্রুটি সারিয়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব।ইতিপূর্বে এ ধরনের পরীক্ষার জন্য গর্ভবতী মাকে বিদেশে যেতে হতো। বর্তমানে মাতৃজঠরে শিশুর জন্মগত রোগ নির্ণয়ের ডিএনএ পরীক্ষা বাংলাদেশেই সম্ভব হচ্ছে।

জন্মগত ত্রুটি কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়?

  • গর্ভধারণের পূর্বে পরিকল্পনা থাকা জরুরি
  • গর্ভধারণের আগে নিজের শারীরিক অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখা
  • গর্ভধারণের আগে অস্বাভাবিক মোটাত্ব, বহুমূত্র/ডায়াবেটিস ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে আনা
  • গর্ভধারণের পূর্বে এবং গর্ভকালীন সময়ে প্রতিদিন একটি করে 400 মিলি.গ্রামের ফলিক এসিড ঔষধ সেবন
  • ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া গর্ভকালে কোন ঔষধ সেবন না করা
  • প্রচুর বিশ্রাম করা
  • হালকা ব্যায়াম করা
  • সুষম খাদ্য গ্রহণ
  • রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার বা নাড়াচাড়া থেকে বিরত থাকা
  • ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সংক্রামক প্রতিষেধক গ্রহণ
  • ধূমপান, মদপান থেকে বিরত থাকা

 

উন্নত বিশ্বে সন্তান ধারণক্ষম সব মহিলাদেরকে রুবেলা ভ্যাক্সিন দিয়ে রুবেলাজনিত জন্মগত ত্রুটিকে প্রতিরোধ করা হয়েছে। আমাদের দেশে বেসরকারি পর্যায়ে এই ভ্যাক্সিন পাওয়া গেলেও এ বিষয়ে সচেতনতার অভাব রয়েছে। শিক্ষার প্রসার, চিকিৎসকের তত্বাবধানে থাকার কারণে আমাদের দেশে মাতৃমৃত্যু কমেছে। কিন্তু শিশুর জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা নেই । গর্ভবতী মাকে সেবা দানের ক্ষেত্রে অনাগত শিশুর জন্মগত ত্রুটির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।  আশার কথা, মায়ের গর্ভে ডাউন শিশু নির্নয়ের যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখন দেশেই হচ্ছে। চাই শুধু সচেতনতা।

সবার জন্য শুভকামনা

 

 

Related posts

Leave a Comment