৯ থেকে ১২ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর ঘুমের ধরণ ও করণীয়

৯-১২ মাস বয়সে শিশুর ঘুমের ধরন কেমন হতে পারে

৯ থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুরা সাধারণত দিনে ২-১ ঘন্টার  হালকা ঘুম সহ প্রায় ১৪ ঘন্টা ঘুমায়। কিছু শিশু বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেছেন যে, এই বয়সের শিশুদের  ঘুমের  ধরনগুলি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। এটা হতে পারে, তাদের ক্রম ধারাবাহিক পরিবর্তনের জন্য অথবা বাচ্চারা সলিড খাবার হতে বেশী পরিমান ক্যালোরি গ্রহণ করে বলে।

ঘুম প্রশিক্ষণের জন্য আপনার শিশু কি প্রস্তুত? 

যদি আপনার বাচ্চা একটি ঘুমের ধরনে অভ্যস্ত না হয়, যা আপনার পরিবারিক জীবনের সাথে খাপ খায়, তাহলে ঘুম প্রশিক্ষণের এখনি সঠিক সময়। ঘুম প্রশিক্ষণ পদ্ধতি আপনার বাচ্চাকে সাহায্য করবে সহজে ঘুমিয়ে পড়তে, রাতে দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমাতে, এবং দিনে আরও কয়েকবার নিয়মিত ঘুমাতে ।

পুরো রাত জুড়ে ঘুমানো

আপনার শিশু যদি রাতে নয় বা দশ ঘন্টা ধরে ঘুমায়, তবে সে হয়তো শিখে গেছে কিভাবে ঘুমিয়ে পড়তে হয়। এটা নির্দেশ করে যে আপনি তাকে ভালভাবে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস করিয়েছেন।এই বয়সে বাচ্চারা সাধারণত রাতে একবার সলিড খেয়ে ঘুমায় তাই রাতের বেলা ক্ষুধার কারণে তাদের জেগে ওঠার সম্ভাবনা কম।

আমরা সবাই প্রতি রাতে স্বল্প সময়ের জন্য ঘুম থেকে জেগে উঠি। এবং প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে আমরা প্রতি বার জেগে উঠে আবার ঘুমিয়ে পড়ি কিন্তু এটি এত দ্রুত ঘটে যে তা সকাল বেলা আমাদের মনেই থাকে না। আপনার বাচ্চা যদি এই দক্ষতা এখনো আয়ত্ব করতে না পারে তবে সে রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে কান্না করবে এমনি কি তার ক্ষিধে না পেলেও।

 

রাতে জেগে ওঠা

নিয়মিত ঘুমানো বাচ্চা যদি হটাৎ করে আবার রাত জাগা প্যাঁচা হয়ে উঠে বা ঘুম পাড়ানো কষ্টকর হয়ে পড়ে তবে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কেন? কারণ শিশুদের চিন্তা-ভাবনা এবং মস্তিষ্কের ক্রমবিকাশ এবং রাতের বেলায় মা থেকে আলাদা হওয়ার দুশ্চিন্তার  সাথে সাথে ঘুমের ব্যাঘাতও প্রায়ই ঘটে থাকে।

৯ থেকে ১২ মাস বয়সের মধ্যে আপনার বাচ্চা হামাগুড়ি দিতে, কোন কিছু তুলে ধরতে, এবং হাঁটতে শেখে। এবং সে তার দক্ষতা বার বার ঝালিয়ে নিতে চায়, সে রাতে ঘুম থেকে জেগে তা অনুশীলন করে বা বেশী উত্তেজনার কারণে নাও ঘুমাতে পারে । সে যদি নিজে নিজে হয়ে ঘুমিয়ে না পড়ে তবে সে কান্নাকাটি করতে থাকবে।

আলাদা হওয়ার (Separation anxiety) দুশ্চিন্তার কারণে আপনার বাচ্চা ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং আপনাকে খুজে না পেলে সে অশান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু আপনাকে রুমে ডুকতে দেখলে এবং তাকে আদর করলে করলে সে শান্ত হয়ে যায়।

 

কিভাবে ভাল ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলবেন

প্রথম নয় মাস, আপনি বাচ্চার ঘুমের প্রশিক্ষণের জন্য যেসব পদ্ধতি শিখেছেন এখন তার প্রয়োগ করার সবচাইতে আদর্শ সময়। যদি আপনার বাচ্চা একটা ভাল ঘুমের পদ্ধতিতে থিতু না হয়, তবে শিখুন কি ভাবে ভাল ঘুমের অভ্যাস প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা আপনার পারিবারিক জীবনের সাথে মিলে যাবে।

একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ঘুমানোর সময় নির্দিষ্ট করা

ঘুমের সময়সূচী আপনার শিশুকে রাতে শান্ত হতে সাহায্য করবে ও ঘুমের জন্য প্রস্তুত করবে। এই পর্যায় এসে বেশিরভাগ শিশু বাবা মায়ের সাথে সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করতে শুরু করে। তাই তাদের এই সময়টাতে প্রশিক্ষণ দেয়াটা অনেক সহজ হয়।

আরামদায়ক ঘুমানোর নিয়ম চালু করুন। ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছু কিছু কাজ নিয়ম মেনে করুন। যদি আপনার শিশুর ঘুমাতে যাওয়ার আগের রুটিন হয় -গোসল করানো, তার সাথে খেলা-ধুলা করা, তাকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করা, এক দুটো গল্প শোনানো, ঘুম পাড়ানি গান করা,  তবে নিশ্চিত করবেন তা যেন প্রতিরাতে একিভাবে একিসময়ে হয়। ঘুমের আগে পরপর কয়েক দিন কাজগুলো করলে সে-ও বুঝতে পারবে এখন ঘুমের সময় হয়েছে এবং তাকে ঘুম পাড়ানো সহজ হবে। যে কোন বয়সের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই রুটিন প্রযোজ্য। শিশুরা এমন ধারাবাহিক রুটিন পছন্দ করে।

আপনার বাচ্চাকে রুটিনে স্বাচ্ছন্দ হতে দিন। উদাহরণ স্বরূপ, যদি সে গোসল করতে পছন্দ না করে তবে তা দিনের শুরুতে করান। অথবা গান শোনান, বা যদি সে কোন বই পছন্দ করে তবে তাকে তা পড়ে শোনান। শুধু খেয়াল রাখতে হবে প্রতিদিন রাতে একি রুটিন যেন অনুসরণ করা হয়। বাচ্চারা ধারাবাহিকতা পছন্দ করে এবং অনেক নিশ্চিন্ত হয়, যখন বুঝতে পারে কখন কি প্রত্যাশা করতে হবে।

উপরন্তু, ঘুমানোর সময়টা নির্ধারন করতে হবে ভাল সময় দেখে তাহলে সে অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়বে না, তা নাহলে তার ঘুমিয়ে পড়া সহজ হয়ে উঠে না।

ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই হচ্ছে লক্ষ্য। আপনার শিশুর দিনের ঘুমের যথাসম্ভব একটি সময়সূচি অবলম্বন করুন। যদি আপনি আপনার শিশুকে একদিন ৩টায় ঘুম পাড়ান এবং পরের দিন ১ টায় ঘুম পাড়ান, তাহলে তার একটি নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস গড়তে সমস্যা হবে।

নিশ্চিত করুন আপনার বাচ্চার সারাদিনের একটি নিয়মিত রুটিন আছে

ঘুমানোর কাজটা সহজ হয়ে যায় যদি আপনার বাচ্চার সারা দিনের অন্য কাজগুলো নিয়মিত করে রাখেন। সে যদি প্রতিদিন একি সময়ে ঘুম, খাওয়া, খেলাধূলা এবং বিছানায় ঘুমিয়ে পড়ে, তবে সে কোনো ওজর-আপত্তি ছাড়াই ঘুমিয়ে পড়বে।

আপনার শিশুকে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিন

আপনার বাচ্চাকে যদি স্বাধীনভাবে ঘুমিয়ে পড়তে দেন, সেক্ষেত্রে সুযোগ দিতে হবে এই দক্ষতা রপ্ত করার। যত্ন করে বা দুলিয়ে ঘুম না পাড়িয়ে, তাকে আপনি আপনি তার বিছানায় ঘুমিয়ে পড়তে দিন যখন সে শান্ত হয়ে যায় বা ঘুমঘুম ভাব আসে। অন্যথায় রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল সে কান্নাকাটি করবে এবং আপনাকে আবার কোলে বা দোলনায় দুলিয়ে ঘুম পাড়াতে হবে।

বাচ্চাকে অনেক রাত পর্যন্ত জাগিয়ে রাখবেন না 

আপনি হয়তো শিশুকে অনেক রাত পর্যন্ত খেলতে ব্যস্ত রাখেন, কারণ আপনি কাজের শেষে তাকে সময় দিতে পারেন না। বা আপনি আপনার রাতের কাজ শেষ করার আগে শিশুকে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস করাচ্ছেন না। এটি একটি সমস্যা, কারণ, দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাসের কারণে শিশুরা অতিরিক্ত  ক্লান্ত হয়ে পরে। এতে শিশুরা খিটখিটে হয়ে ওঠে এবং ঘুমাতে অনীহা প্রকাশ করে।

সুনির্দিষ্ট একটা ঘুমানোর সময় নির্ধারন করুন। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, শিশুর ক্লান্ত হওয়ার লক্ষণগুলোর দিকে নজর রাখা। শিশু শান্ত এবং ধীরস্থির হয়ে গেলে, চোখ কচলালে, হাই তুললে বা কান্না করলে বুঝতে হবে এগুলো ঘুমের ইঙ্গিত। ঘুমের এই ধরনের ইঙ্গিত পেলে শিশুদের ঘুম পাড়িয়ে দিন।বাচ্চার ঘুমের লক্ষণ দেখা দেয়ার সাথে সাথে তাকে বিছানায় শুয়ে দিলে সে নিজে নিজে ঘুমিয়ে পরা শিখবে।

বাচ্চা যখন বড় হয়ে ওঠে তখন ঘুমানোর সময়ের আগে করে তার খেলাধুলা বা অন্যান্য কাজ করতে দিন। এতে তার ঘুম ভালো হবে এবং সহজেই ঘুমিয়ে পড়বে।

ঘুমানোর জন্য বাচ্চাকে জোর করা বকাঝকা করবেন না 

যদি আপনি নিজের বাচ্চাকে ঘুম পাড়াতে ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দেন (যখন বাচ্চা আরও গান বা গল্প সোনার আবদার করতে থাকে), সেক্ষেত্রে আপনি একা নন। বাচ্চারা যখন বাড়তে থাকে, প্রায়শ তারা ঘুমোতে যাওয়ার আগে চেষ্টা করে কতক্ষণ না ঘুমিয়ে থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে বাচ্চাকে বকা দিয়ে বা জোর করে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করলে হিতে বিপরীতে হতে পারে।

নবজাতকের ঘুম এর  এসব পদ্ধতি অবলম্বনের সময় খুব কঠোর হওয়া যাবে না। জোর করাও উচিত নয়। মুল কাজটা হবে দিনের বেলায় শিশুকে জাগিয়ে রাখতে তাকে উদ্দীপ্ত ও উৎসাহিত করা আর রাতে শিশুর ঘুমের জন্য শব্দহীন, আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা। এতসব করতে গিয়ে নবজাতকের খাওয়া-দাওয়া যেন অপর্যাপ্ত না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

সবশেষে আবারো বলবো, আপনার শিশুর ঘুমের যথাসম্ভব একটি সময়সূচি অবলম্বন করুন। এধরনের রুটিন আপনার শিশুকে রাতে ভাল ঘুম যেতে সাহায্য করে এবং সে সতেজ অনুভূতি নিয়ে সকালে জেগে উঠে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তিন মাস পর থেকে শিশুদের জন্য একটা নির্দিষ্ট ঘুমের সময় ঠিক করে ফেলা ভালো। কাজটি অবশ্যই কষ্টকর। কিন্তু একবার যদি শিশুর ঘুমের সময় ঠিক করে ফেলা যায়, তাহলে সেটা আপনার জন্য আনন্দের সংবাদ হবে।

আরও পড়ুনঃ বাচ্চার ঘুমের বিষয়ে যে সব ভুল বাবা মায়েরা করে থাকেন এবং তা শোধরানোর উপায় ।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment