৩ থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর ঘুমের ধরণ ও করণীয়

৩ থেকে ৬ মাস বয়সের শিশুদের ঘুমের ধরণ কেমন হতে পারে 

বেশিরভাগ শিশুরা ৩ থেকে ৬ মাস বয়সে রাতে এবং দিনে সব মিলিয়ে ১৫-১৬ ঘন্টা ঘুমায়।

সাধারণত,  ৪ মাস কিংবা তার কাছাকাছি সময়ে শিশুদের নিয়মিত ঘুম ও জেগে উঠার ধরন গড়ে উঠতে শুরু করে এবং সেই সময় তাদের রাতে দুধ খাওয়ার অভ্যাস কমে আসে। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, আপনি আপনার ৪ কিংবা ৫ মাসের শিশুর ঘুমের ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করবেন।  এরিমধ্যে হয়তো আপনার শিশুর এমন ঘুমের স্বভাব গড়ে উঠতে পারে যা আপনার পারিবারিক জীবনের জন্য মানানসই। কিন্তু যদি আপনি আপনার শিশুকে একটানা ও নিয়মিত ঘুমাতে সাহায্য করতে চান, এখনি ভালো সময় তাকে কিছু ঘুমের প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করার।

মনে রাখতে হবে প্রত্যেক শিশুর গড়ে ওঠার ধরন স্বতন্ত্র, লক্ষ্য রাখুন ঘুমের প্রশিক্ষণে আপনার শিশুর প্রতিক্রিয়া কেমন, যদি  মনে হয় সে এখনো প্রস্তুত নয় তবে প্রশিক্ষণ বন্ধ রাখুন এবং কিছু সপ্তাহ পর আবার চেষ্টা করুন।

 

পুরো রাতের ঘুম

৪ থেকে ৬ মাস বয়সের যে কোন সময়ে প্রায় শিশুরা রাতে টানা কয়েক ঘন্টা ঘুমাতে সক্ষম হয়। যদি একবার এমন হয় তবে আপনি তার ঘুমানোর ফাঁকে ফাঁকে কিছুটা সময় নিজে ঘুমিয়ে নিতে পারবেন। এর ফলে আপনার সকাল হবে অধিক আরামদায়ক।

যদি আপনার শিশু এখনো রাতব্যাপী  না ঘুমায় তবে সেক্ষেত্রে আপনি একা নন। ৪ থেকে ৫ মাস বয়সে অনেক শিশু রাতে দুধ পানের জন্য কয়েকবার জেগে ওঠে। ৬ মাস হতে হতে আপনার শিশু রাতে সলিড খাবার খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যেতে পারে।

 

রাতে বার বার জেগে উঠা

যদি আপনার শিশু ইতিমধ্যে রাতে দীর্ঘ সময় ঘুমাতে শুরু করে তবে তা উপভোগ করুন। কিন্তু যে শিশু সপ্তাহ কিংবা মাস খানেক ধরে রাতে দীর্ঘ সময় ঘুমাতে অভ্যস্ত তারা আবার রাতে জেগে উঠতে শুরু করতে পারে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যদি আপনাকে হঠাত  আবার রাতে ঘন্টা খানেক পরপর জেগে  উঠতে হয়।

ঘুমের এমন আচরণ শিশুর বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে খুব সাধারণ ব্যাপার। এবং এসব সাধারণত ক্ষণস্থায়ী। হয়তো চারপাশ সম্পর্কে তার সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে নতুবা সে জেগে উঠে কান্না করছে আপনাকে কাছে পাওয়ার জন্য কিংবা সে তার নতুন দক্ষতা গুলো আয়ত্ত করার  চেষ্টা করছে যেমন পাশ ফিরে শোওয়া, উঠে বসা ইত্যাদি। ঘুমের মাঝে তার এই চেষ্টা তার হঠাত ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার কারন।

 

কিভাবে আপনি বাচ্চার স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস শুরু করতে পারেন

 নিদিষ্ট ও নিয়মিত ঘুমের সময় তৈরি করুন এবং তাতে অটুট থাকুন

যখন আপনার শিশু নবজাতক ছিলো তখন ঘুম আসার কিছু লক্ষণ দেখে আপনি বুঝতে পারতেন এখন তার ঘুমানোর সময়(যেমন চোখ ঘষা, কান টানা ইত্যাদি)।   এখন যেহেতু সে কিছুটা বড়, আপনার উচিৎ রাত এবং দিনে  তার নিদিষ্ট ঘুমের সময় নির্ধারণ করা । এভাবে আপনি তার ঘুমের সূচী নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

স্বাভাবিকভাবে কিছু শিশুর সন্ধ্যা ৬ টার মধ্যেই ঘুমভাব আসে। আবার অন্যদের রাত ৮ টার পরেও সাবলীল ভাবে জেগে থাকতে দেখা যায়। এবং অবশ্যই আপনার গৃহস্থালি কাজের সময় সূচী আপনার শিশুর ঘুমের উপর প্রভাব বিস্তার করবে।

আপনি প্রয়োজন মতো এমন একটি ঘুমের সূচী বাছাই করুন যা আপনার পরিবারের জন্য মানানসই এবং তাতে অটুট থাকার চেষ্টা করুন। যদি দেখেন আপনার শিশু তার ঘুমের সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও ঘুমাতে চাচ্ছেনা তবে মনে রাখবেন গভীর রাতে অত্যাধিক চঞ্চল আচরণ কিন্তু আপনার শিশুর ক্লান্ত হওয়ার লক্ষণ। এ ধরণের আচরণ দেখলে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করুন এবং শুইয়ে দিন।

আপনি দিনের বেলা নির্ধারিত সময়ে ঘুম পাড়ানোর পরিকল্পনা করতে পারেন, যেমন সকাল ৯ এবং দুপুর ৩ টা। অথবা শেষবার ঘুম থেকে জাগার ২ ঘন্টা পর তাকে আবার শুইয়ে দিন। যতক্ষণ সে ঘুমের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ পায় যে কোন উপায় আপনি অবলম্বন করতে পারেন।

যদি বাচ্চার  রাতে বা দিনে ঘুমাতে অসুবিধা হয় বা বেশিক্ষণ ঘুমিয়ে থাকতে না পারে তবে তাকে আরও আগে বিছানায় শুইয়ে দিন।  কারন সে অধিক ক্লান্ত হলে তাকে শান্ত করা ও ঘুম পাড়ানো খুবই কঠিন হবে।

ঘুমানোর আগের একটি রুটিন তৈরি করতে শুরু করুন

যদি এখনো আপনি তা করে না থাকেন তবে এটি ভালো সময় ঘুমাতে যাওয়ার আগের একটি রুটিন তৈরি করার। ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছু কিছু কাজ নিয়ম মেনে করুন, যেমন বাচ্চাকে গোসল দেয়া, কাপড় পাল্টানো, আদর করা, গল্প বলা বা ঘুম পাড়ানি গান শোনান ইত্যাদি। ঘুমের আগে পরপর কয়েক দিন কাজগুলো করলে সে-ও বুঝতে পারবে এখন ঘুমের সময় হয়েছে এবং তাকে ঘুম পাড়ানো সহজ হবে। যে কোন বয়সের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই রুটিন প্রযোজ্য।

সূচী যাই হোক, যদি ঐ সূচী আপবার পরিবারের জন্য কাজ করে তবেই ভালো। যথা সম্ভব প্রতিরাতে একিভাবে একিসময়ে তা করতে থাকুন এতে বাচ্চার ঘুমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।

আপনার শিশুর দৈনন্দিন সময় স্থির করতে তাকে সকাল বেলা জাগিয়ে দিন

আপনার শিশুকে সকালবেলা জাগিয়ে দিন যদি সে তার স্বাভাবিক জেগে থাকার সময়ে ঘুমিয়ে থাকে। এটি তার দৈনন্দিন সময় সূচী নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে। শিশুর ঘুমানো ও জেগে উঠার একটি নিদিষ্ট ধরন অনুসরণ করা প্রয়োজন।  দিনে তার ক্লান্তি দুর করা জন্য কিছুক্ষণের ঘুম যথেষ্ট।  প্রতিদিন সকালে তাকে একি সময় ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়া তার নিদিষ্ট ঘুমের সূচী তৈরিতে সাহায্য করবে।

আপনার শিশুকে নিজে নিজে ঘুমিয়ে পড়তে উতসাহ দিন

শিশু কিংবা প্রাপ্ত বয়স্ক, আমরা সকলেই প্রতিরাতে অল্প সময়ের জন্য কয়েকবার জেগে উঠি(কখনো তা কয়েক সেকেন্ড হতে কয়েক মিনিট হতে পারে)। আমরা প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষেরা আবার নিজে নিজে ঘুমিয়ে পড়ি, যা আমাদের সকালে মনেও পড়ে না।

সারা রাত ঘুমিয়ে পার করার চাবিকাঠি হলো এভাবে ঘুমিয়ে পড়তে পারা। কিছু শিশুকে তা স্বাভাবিক ভাবেই করতে দেখা যায়।  কিন্তু যদি আপনার শিশু না পারে তাহলে তাকে এই দক্ষতা আয়ত্ত করতে হবে।

এক ভাবে আপনি তা শুরু করতে পারেন, যেমন- তার যখন ঝিমুনি আসে কিন্তু সে জাগ্রত থাকে তখনই তাকে শুইয়ে দিন। যদি রাতে আপনি তার জেগে উঠার শব্দ পান, তবে তাকে দুধ খাওয়ানো ও শান্ত করার আগে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। শিশুকে সুযোগ দিন যাতে সে পুনরায় নিজ চেষ্টায় ঘুমাতে পারে। যদি আপনার শিশুর আরো সাহায্যের প্রয়োজন হয় এবং আপনি মনে করছেন সে প্রস্তুত তবে ঘুম প্রশিক্ষণ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পদ্ধতি চেষ্টা করতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তিন মাস পর থেকে শিশুদের জন্য একটা নির্দিষ্ট ঘুমের সময় ঠিক করে ফেলা ভালো। কাজটি অবশ্যই কষ্টকর। কিন্তু একবার যদি শিশুর ঘুমের সময় ঠিক করে ফেলা যায়, তাহলে সেটা আপনার জন্য আনন্দের সংবাদ হবে।কোনটা আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ করবে তা নির্ভর করছে আপনার মাতৃত্বের ধরন, আপনার নিজস্ব বিশ্বাস ও আপনার শিশুর বিশেষ চাহিদার উপর।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment