জন্ম থেকে ৩ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর ঘুমের ধরণ ও করণীয়

জন্ম থেকে ৩ মাস বয়স পর্যন্ত সাধারণত নবজাতকের ঘুমের ধরণ কেমন হয়? 

জন্ম থেকে ৩ মাস বয়স পর্যন্ত নবজাতকরা দীর্ঘসময় ঘুমায়- সাধারণত দিনে ১৬-১৭ ঘন্টা ঘুমাতে পারে। তবে জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহে বেশিরভাগ শিশু দিনে কিংবা রাতে একবারে দুই থেকে চার ঘন্টার বেশি ঘুমায় না।

শিশুদের দীর্ঘসময় ও অনিয়মিত ঘুমের ফলে আপনার সময় সূচি হয়ে উঠে ক্লান্তিকর এবং অনিয়মিত। একজন সদ্য মা হিসেবে আপনাকে হয়তো রাতে বারবার উঠতে হতে পারে শিশুর কাপড় বদলানো, দুধপান ও তাকে শান্ত করার জন্য।

 

কেন নবজাতকের ঘুমের ধরণ অনির্দিষ্ট

শিশুদের নিয়মিত ঘুমের সাইকেল বড়দের চেয়ে অনেক কম এবং শিশুরা বেশিরভাগ সময় এভাবে অগভীরভাবে এবং সল্পসময়ের জন্য ঘুমিয়ে কাটায় যাকে র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) বলে। এ ধরনের ঘুম শিশুদের মস্তিষ্কের বিশেষ বিকাশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।এসব অনির্দিষ্টতা শিশুদের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। এটা ক্ষণস্থায়ী, যদিও আপনার নিদ্রাহীন রাত্রিগুলোতে আপনার কাছে তা অনন্তকাল বলে মনে হতে পারে।

কখন আপনার শিশু দীর্ঘসময় ঘুমাতে আরম্ভ করে

৬ থেকে ৮ সপ্তাহ বয়সে, বেশিরভাগ শিশুরা দিনে স্বল্পসময় ও রাতে দীর্ঘসময় ঘুমাতে শুরু করে। যদিও বেশিরভাগ রাতে দুধপানের জন্য জেগে উঠে । একই সাথে তাদের অগভীর ঘুমের (REM SLEEP) পরিমাণ কমতে থাকে এবং গভীর ও দীর্ঘসময়ের ঘুমের পরিমাণ ( NON REM SLEEP) বাড়তে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ৪-৬ মাস বয়সের মধ্যে বেশিরভাগ শিশু রাতে টানা ৮-১২ ঘণ্টা ঘুমাতে শুরু করে। কিছু নবজাতক শিশু ৬ সপ্তাহ বয়সের পূর্বেই এমন দীর্ঘসময় ঘুমাতে পারে । কিন্তু বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে ৫-৬ মাস বয়সে এভাবে ঘুমানো সম্ভব হয়না । তারা রাতে বারবার জেগে উঠে। আপনি আপনার শিশুকে ভালো ঘুমের প্রশিক্ষণ দিয়ে শীঘ্রই তাকে এই অভ্যাস গড়ে তুলতে সহযোগিতা করতে পারেন, যদি এটা আপনার লক্ষ্য হয়।

 

কিভাবে বাচ্চাদের ভালো ঘুমের অভ্যাস করানো যায়

আপনার শিশুকে বারবার ঘুমানোর সুযোগ দিন- প্রথম ৬-৮ সপ্তাহ বয়সে বেশিরভাগ শিশু টানা ২ ঘণ্টার বেশি জেগে থাকতে পারেনা। যদি আপনি শুইয়ে দিতে তার চেয়ে বেশি সময় অপেক্ষা করেন, তবে হয়তো সে অতিরিক্ত ক্লান্ত বোধ করতে পারে ও ঘুমাতে অসুবিধা অনুভব করবে।

আপনার শিশুকে দিন ও রাতের পার্থক্য শেখান- কিছু নবজাতক রাতজাগা প্যাঁচার মত(এর কিছু ইঙ্গিত আপনি হয়তো গর্ভকালীন সময়ে পেয়েছেন) যখন আপনার ঘুমানোর সময় তখন সে সাবলীল ভাবে জেগে থাকবে। প্রথম কিছুদিন আপনি এই ব্যাপারে খুব বেশি কিছু করতে পারবেন না। কিন্তু যদি আপনার শিশুর বয়স ২ সপ্তাহের বেশি হয় তবে তাকে দিন ও রাত্রের পার্থক্য শেখাতে শুরু করুন।

দিনের বেলায় যখন সে সজাগ ও সতেজ থাকে, তখন তার সাথে যত বেশি সম্ভব গল্প ও খেলাধুলা করুন। শিশুর রুম আলোকিত ও উজ্জ্বল রাখুন, দিনেরবেলায় গৃহস্থের টুকিটাকি শব্দ যেমন ফোনের শব্দ, গান কিংবা থালা বাসন পরিস্কারের শব্দ কম করার ব্যপারে চিন্তিত হবেন না। যদি দুধ পানের সময় তার ঘুমানোর প্রবনতা থাকে তবে তাকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করুন।

রাতের বেলা যখন সে জেগে যায় তখন তার সাথে খেলাধুলা  করবেন না, ঘরের আলো ও শব্দ কমিয়ে রাখুন এবং তার সাথে কথা বলা কমিয়ে দিন। এভাবে সে বুঝতে শুরু করবে রাতের সময় হলো ঘুমানোর সময়।

আপনার শিশুর ক্লান্ত হওয়ার চিহ্নগুলো লক্ষ্য করুন- আপনার শিশুর ক্লান্ত হওয়ার চিহ্নগুলো লক্ষ্য করুন। সে কি তার চোখ ঘষছে, নিজের কান টানছে কিংবা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কান্নাকাটি  করছে? যদি আপনি এসব চিহ্ন কিংবা ঘুম ভাবের অন্যান্য  বিষয়সমূহ বুঝতে পারেন, তবে তখন তাকে ঘুমানোর জন্য শুইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন। আপনার শিশুর ছন্দ ও ধরন সম্পর্কে শীঘ্রই আপনি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন এবং আপনি সহজাতভাবে বুঝতে পারবেন কখন আপনার শিশু ঘুমের প্রয়োজন।

আপনার শিশুর একটি সুনির্দিষ্ট ঘুমের রুটিন তৈরি করুন- যতদ্রুত সম্ভব শিশুর একটি ঘুমের সূচি তৈরির চেষ্টা করার উচিত এবং ঘুমানোর আগে কিছু কাজের রুটিন তৈরি করুন। এটা হতে পারে আপনার শিশুর কাপড় বদলানো, ঘুমপাড়ানি গান করা এবং রাতের বেলায় তাকে আদর করা ইত্যাদি।

যখন আপনার শিশুর ঘুমভাব আসে তখন তাকে শুইয়ে দিন- ছয় থেকে আট সপ্তাহ বয়সে আপনার শিশুকে নিজ থেকে ঘুমিয়ে পড়ার সুযোগ দিন। কিভাবে? যখন তার ঘুমভাব আসে তখন তাকে বিছানায় শুইয়ে দিন। বিশেষজ্ঞ জডি মিন্ডেল( ফিলাডেলফিয়া শিশু হাসপাতালের ঘুম ব্যাধি নিরাময় কেন্দ্রের সহকারি পরিচালক ও ” Sleeping Through the Night.” প্রবন্ধের লেখক) এই উপদেশ দেন।

মিন্ডেল শিশুকে ঘুমের জন্য দোলনা বা কোলে দুলিয়ে ঘুম না পাড়ানোর পরামর্শ দেন, এমনকি খুব কম বয়সেও। তিনি বলেন ” পিতা মাতারা মনে করেন, যা তারা শিশুর অল্প বয়সে অভ্যাস করান পরবর্তিতে তার কোন প্রভাব থাকে না , বস্তুত তা ভুল”। “ শিশরা তাদের ঘুমের অভ্যাসে অভ্যস্ত হতে থাকে। আপনি যদি প্রথম আট সপ্তাহ প্রতি রাতে আপনার শিশুকে দোলনায় দোলান তবে কেন সে পরবর্তিতে ভিন্ন কিছু আশা করবে?”

তবে সকলেই এই কৌশল সম্পর্কে সহমত পোষন করেন না। কিছু পিতা মাতা তাদের শিশু ঘুমানোর আগে দোলানো ও পরিচর্যার ব্যাপারে আগ্রহী, তারা মনে করেন এটাই স্বাভাবিক। তারা তা উপভোগ করেন এবং বিশ্বাস করেন এতে তাদের শিশুর বিকাশ ও ঘুম ভালো হয়।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment