বাচ্চাদের অ্যাজমা চিহ্নিতকরণ ও তার চিকিৎসা

‘অ্যাজমা ’ বা হাঁপানি হল ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী এক ধরনের সমস্যা। আপনি হয়ত ভাবতে পারেন যে অ্যাজমা  বা হাঁপানি শিশুদের উপর তেমন কোন প্রভাব ফেলেনা। তবে অবাক করার মত ব্যাপার হল প্রায় ৮০% বাচ্চার ৫ বছর বয়সের আগেই অ্যাজমার লক্ষন দেখা দেয়।

অ্যাজমা  হল শ্বাসনালীর (bronchial tubes) এক ধরনের সমস্যা। আমরা যখন শ্বাস প্রশ্বাস আদান প্রদান করি তখন এই শ্বাসনালীর মাধ্যমে ফুসফুসে বাতাস আসা যাওয়া করে। অ্যাজমাই আক্রান্ত হলে রোগীর ব্রঙ্কিয়াল টিউব ফেঁপে ওঠে। ফলে শ্বাসনালির বাতাস চলাচলের পথ সংকীর্ণ হয়ে পড়ে, তার মানে, ফুসফুসে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। এতে রোগীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

৯ থেকে ১১ বছরের বাচ্চা ও প্রাপ্তবয়স্ক অ্যাজমা  আক্রান্তদের ক্ষেত্রে সাধারনত শ্বাস প্রশ্বাসের সময় এক ধরনের শো শো শব্দ করে।তবে শিশুদের এই শব্দ ছাড়াও অ্যাজমা থাকতে পারে।  তাই বলে আবার এমন না যে যেসব বাচ্চার শ্বাস প্রশ্বাসের সময় শব্দ করে তাদের সবারই অ্যাজমা আছে। অ্যাজমা আক্রান্ত প্রত্যেকটি মানুষের অবস্থা কিছু ভিন্ন হতে পারে।

অ্যাজমার লক্ষন

বাচ্চার অ্যাজমা  হওয়ার পেছনে প্রাথমিক যে লক্ষণগুলো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল শ্বাসযন্ত্রের ইনফেকশন। যদি আপনার বাচ্চার কখনো শ্বাসযন্ত্রের ইনফেকশন হয়ে থকে তাহলে খেয়াল করুন যে তার মাঝে হাঁপানির কোন লক্ষন দেখা যায় কি না। বাচ্চার শ্বাসনালী বড়দের তুলনায় অনেক ছোট, যার কারণে সল্প ইনফেকশনেও বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হতে পারে।

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অ্যাজমার প্রধান লক্ষন গুলো হলোঃ

  • শ্বাসকষ্টঃ বাচ্চার পেট অসাভাবিক ভাবে উঠা নামা করে এবং শ্বাস প্রশ্বাসের সময় নাক বেশী ফুলে ওঠে।
  • নরমাল হাঁটা চলাতেও জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিতে দেখা যায়।
  • শ্বাস প্রশ্বাসের সময় শো শো আওয়াজ করে যা অনেকটা বাঁশির শব্দের মত লাগে। তবে অনেক বাচ্চারই নাকে বিভিন্ন ধরণের শব্দ হতে পারে। স্টেথিস্কপ্ এর সাহায্যে এই আওয়াজ সঠিকভাবে বোঝা যায়।
  • ঘন ঘন কাশি।
  • খুব দ্রুত এবং গভীরভাবে নিশ্বাস নেয়।
  • অবসাদগ্রস্ত হওয়াঃ বাচ্চার খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ থাকেনা অথবা ক্লান্ত মনে হয়।
  • খাবার অথবা তরল কিছু (দুধ, পানি) পান করার ক্ষেত্রে কষ্ট হয়।
  • বাচ্চার মুখ, ঠোট ম্লান অথবা নীল হয়ে যায়। কখনো কখনো হাতের নখও নীল হয়ে যেতে পারে।

তবে অন্য কিছু রোগের ক্ষেত্রেও একই লক্ষন দেখা দিতে পারে যেমনঃ

  • ক্রুপ
  • ব্রংকিওলাইটিস
  • শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশন
  • অ্যাসিড রিফ্লাক্স
  • নিউমোনিয়া
  • শ্বাসনালীতে খাবার বা কোন কিছু আঁটকে যাওয়া।

মনে রাখতে হবে সব ধরণের শো শো শব্দ অথবা কাশি হওয়া মানেই বাচ্চার হাঁপানি আছে এমনটা ভাবা যাবেনা। আসলে অ্যাজমা  ছাড়াও অনেক বাচ্চারই শ্বাসযন্ত্রে নানা ধরনের সমস্যা থাকার কারনে শ্বাসক্রিয়ার সময় শব্দ করতে পারে। তাই বাচ্চার বয়স ২-৩ বছর না হওয়া পর্যন্ত বাচ্চার অ্যাজমা  আছে কি না তা বলা কঠিন।

আপনার বাচ্চার অ্যাজমা  থাকলে সব ধরণের কাশিই অ্যাজমা  ভেবে কোন ধরনের ওসুধ বা চিকিৎসা দিবেননা। অন্যথায় বাচ্চার অ্যাজমার সঠিক চিকিৎসায় বিভ্রান্তি ঘটাতে পারে। তবে বাচ্চার যদি অ্যাজমা হয় তবে ঘন ঘন কাশি হতে পারে।

অ্যাজমার কারণ ও ঝুঁকিসমূহ

চিকিৎসা বিজ্ঞানিরা এখন পর্যন্ত বাচ্চাদের অ্যাজমা  হওয়ার সঠিক কারণ বের করতে পারেনি। তবে বেশ কিছু কারণ আছে যা বাচ্চার অ্যাজমা  হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। তার মধ্যে অন্যতম হল বংশগত ভাবে অ্যাজমার বিস্তার। আপনার পরিবারের কারো অ্যালার্জি অথবা অ্যাজমা  থাকলে আপনার বাচ্চার ক্ষেত্রেও অ্যাজমা  হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।

গর্ভবতী অবস্থায় মা ধূমপান করলে ওই বাচ্চার ক্ষেত্রেও অ্যাজমা  হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

৬ মাসের নিচের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ভাইরাস জনিত ইনফেকশনের কারণে অ্যাজমার লক্ষন গুলো দেখা যায়।

কখন ডাক্তারকে দেখান উচিত?

বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে অথবা বাচ্চার ঠোট, মুখের রঙের পরিবর্তন হচ্ছে দেখলে যত দ্রুত সম্ভব বাচ্চাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। অ্যাজমার প্রকটতা অনেক সময় মেডিক্যাল ইমারজেন্সি হয়ে দাড়াতে পারে।

অ্যাজমা  চিহ্নিতকরণ

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অ্যাজমা  চিহ্নিত করা একটু কঠিন। তবে বড়দের ক্ষেত্রে ফুসফুস পরীক্ষা করে খুব সহজেই অ্যাজমা  নির্ণয় করা যায়। সাধারণত এই ধরণের পরীক্ষা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে করা যায়না।

বাচ্চারা অ্যাজমার কোন লক্ষন সম্পর্কে নিজের থেকে কিছু খুলে বলতে পারেনা। সেক্ষেত্রে ডাক্তার অ্যাজমার লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখবেন।

অ্যাজমা  সংক্রান্ত বাচ্চার কি কি ধরণের সমস্যা হয় তা ডাক্তারকে খুলে বলুন যেমন- অল্প হাঁটা চলাতেই হাঁপাতে থাকা, কোন কিছুতে তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া না দেখানো ও দিনের বিভিন্ন সময়ে অবসাদগ্রস্ত হয়ে থাকা ইত্যাদি।

বাচ্চার অ্যাজমা  হওয়ার অন্যান্য সম্ভাব্য কারণগুলো যেমন কোন খাবারের প্রতি অনিহা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ অথবা বাচ্চার অ্যালার্জি আছে কি না তা সম্পর্কে ডাক্তার কে খুলে বলুন। ডাক্তার হয়ত জানতে চাইবেন যে আপনার পরিবারের কারো অ্যালার্জি বা অ্যাজমা  আছে কিনা।

তারপর ডাক্তার যদি বুঝতে পারেন যে বাচ্চার অ্যাজমা  সমস্যা রয়েছে সেক্ষেত্রে ডাক্তার বাচ্চাকে অ্যাজমার ওষুধ দিয়ে বাচ্চার শ্বাসকষ্ট কমছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করবেন।

এছাড়াও প্রয়োজন হলে ডাক্তার বাচ্চার বুকের এক্স-রে অথবা রক্ত পরিক্ষা করার নির্দেশ দিতে পারেন। তারপরেও সন্দেহ থাকলে আপনি চাইলে বাচ্চাকে একজন শিশু অ্যাজমা বিশেষজ্ঞের কাছেও নিয়ে যেতে পারেন। তবে আবারো বলছি, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অ্যাজমা  চিহ্নিতকরণ বেশ কঠিন।

অ্যাজমার চিকিৎসা

অ্যাজমা  চিকিৎসার অধিকাংশ ওষুধই নিশ্বাসের সাথে গ্রহন করতে হয়। বড় ছোট উভয় বাচ্চার ক্ষেত্রে একই ধরণের ওষুধ হতে পারে তবে ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ওষুধের পরিমাণ কিছুটা কমানো হয়।

এই ধরণের ওষুধ সাধারণত তরল অবস্থায় থাকে যা নেবুলাইজারে ঢেলে নিয়ে মাস্কের মাধ্যমে বাচ্চাকে দেওয়া হয়। নেবুলাইজার এমন একটা মেশিন যা তরল ওষুধকে গ্যাসে রুপান্তর করে। নেবুলাইজারের এক পাশে পাইপের সাথে ফেস মাস্ক লাগান থাকে। উক্ত ফেস মাস্ক বাচ্চার মুখে পড়িয়ে দিয়ে রেখে নেবুলাইজার চালু করে দিয়ে গ্যাস নিশ্বাসের সাথে বাচ্চার ফুসফুসে যায়।

অনেক সময় বাচ্চারা মুখে এই ধরণের মাস্ক পড়তে ভয় পায় এক্ষেত্রে আপনি বাচ্চাকে গল্প শুনিয়ে অথবা তার পছন্দের খেলনা দিয়ে তাকে শান্ত রেখে ওষুধ দেওয়া যেতে পারে।এছাড়াও আপনি বাচ্চার মুখের আকার অনুযায়ী যথাযত মাপের মাস্কওয়ালা অ্যারোচেম্বারের সাহায্যে সহজেই ওষুধ দিতে পারেন।

বর্তমানে বাজারে নানা ধরণের ওষুধ পাওয়া যায় তাদের মধ্যে অন্যতম হল Albuterol যা বাচ্চার অ্যাজমা  খুব দ্রুত কমিয়ে দেয়। এটি এক ধরণের ড্রাগ যা Bronchodilators নামেও পরিচিত । এটি মূলত বাচ্চার শ্বাসনালী কে শিথিল রেখে বাচ্চার শ্বাসক্রিয়া সহজ করে তুলে।

দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসার ওষুধগুলোর মধ্যে Corticosteroids (Pulmicort) ও Ceukotriene modifiers (Singulair) অন্যতম। এইসব ওষুধ বাচ্চার লক্ষণগুলো কমাতে সাহায্য করে।

অনেক সময় বাচ্চার অ্যাজমার অবস্থা অনুযায়ী ডাক্তার একসাথে বিভিন্ন ধরণের ওষুধ দিতে পারেন।

চিকিৎসার পাশাপাশি সহজ কিছু পদক্ষেপ গ্রহনের মাধ্যমে বাচ্চার ভোগান্তি কিছুটা কমানো যেতে পারে। যেমন- বাচ্চার কি কারণে শ্বাসকষ্ট হয় তা ভালমতো জেনে ওইসব কিছু থেকে বাচ্চাকে দূরে রাখা। বাচ্চা কিভাবে শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছে  তা খেয়াল করা, যেন বাচ্চার অ্যাজমা  আক্রমন করলে তৎক্ষণাৎ বুঝে নিয়ে প্রয়োজন মত চিকিৎসা দেওয়া যায়।

বাচ্চার অ্যাজমা  প্রতিরোধে আরও কিছু বিষয়ের উপর সতর্ক থাকতে হবে, যেমন-

  • বাচ্চাকে ধুলো থেকে দূরে রাখা।
  • ছাঁচ বা ছত্রাক জাতীয় কোন কিছু যেন না স্পর্শ করে সে দিকে খেয়াল রাখা।
  • পরাগরেণু সহ ফুল ধরতে দেওয়া যাবেনা।
  • সিগারেটের ধোঁওয়া থেকে দূরে রাখা।

অ্যাজমার জটিলতা

বাচ্চার অ্যাজমা  নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে একসময় বাচ্চার শ্বাসনালী স্ফীত হয়ে যায়। ফলে তা বাচ্চার দীর্ঘ সময়ের শ্বাসকষ্টের কারণ হয়ে দাড়ায়। অ্যাজমা আক্রান্ত হলে বাচ্চার খুব উত্তেজিত হওয়া, দুর্বল ও নানা ধরণের অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে।

অনেক সময় অ্যাজমা  আক্রমনের ফলে এই ধরণের জরুরি অবস্থায় ওষুধও কাজ করেনা। সেক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব বাচ্চাকে হাসপাতাল অথবা ক্লিনিকে নিয়ে যেতে হবে। জরুরী অবস্থার ভিত্তিতে বাচ্চাকে হাসপাতালে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য থেকে যেতেও হতে পারে।

পরিশেষে

যদি মনে করেন যে আপনার বাচ্চার অ্যাজমা  আছে, সেক্ষেত্রে আপনাকে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে বাচ্চার চিকিৎসা দিতে হবে। তারপরেও বাচ্চার অবস্থার উন্নতি না হলে অন্য কোন ভালো শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

অনেক বাচ্চারই ছোট বেলায় অ্যাজমার বিভিন্ন লক্ষণ থাকলেও প্রাপ্তবয়সে আর অ্যাজমা  থাকেনা। প্রাপ্তবয়সে অ্যাজমা  না থাকলেও ডাক্তারের সাথে কথা না বলে তার চিকিৎসার কোন ধরণের পরিবর্তন করা যাবেনা।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.