শিশুকে বোতলে বা ফীডারে খাওয়ানো সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা

যদি আপনি ঠিক করে থাকেন যে আপনি আপনার শিশুকে বোতলে করে খাওয়াবেন, তবে এই আর্টিকেলটি আপনাকে সাহায্য করবে সম্ভাব্য নিরাপত্তা পেতে, আপনি হয়ত আপনার বুকের দুধ বোতলে করে খাওয়াতে চাইতে পারেন কিংবা আপনি হয়ত ঠিক করতে পারেন যে কেবল ফর্মুলা দুধই শিশুকে খাওয়াবেন। যদি আপনি একই সাথে শিশুকে বুকের দুধ এবং ফর্মুলা খাওয়াতে চান তবে যতটা সম্ভব বেশি বেশি করে বুকের দুধই দেয়া ভাল কারণ তা ফর্মুলা দুধ থেকে শিশুর জন্য বেশি উপকারী।  ব্রেস্ট ফিডিং করালে প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ কম হয়, ডেলিভারির ৬ সপ্তাহের মধ্যে  জরায়ু তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়, অনেক বেশি ক্যালোরি খরচ হয়, ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়, ব্রেস্ট ও ওভারিয়ান ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কমে এবং অস্টিওপোরোসিস হওয়ার ঝুঁকি কমে।

কোন দুধটি ব্যাবহার করবেন?

সবসময়ই নবজাতকের জন্য ইনফ্যান্ট দুধটি জন্মের প্রথম বছরে ব্যাবহার করুন। কারণ এটাই আপনার শিশুর চাহিদা মেটায়। শিশুর বয়স এক বছর হয়ে গেলে পূর্ণ ননী যুক্ত গরুর দুধ দেয়া শুরু করুন।  তাছাড়াও বাচ্চাকে যদি ডাক্তার বিশেষ কোন ফর্মুলা দিয়ে থাকেন, তবে তা খাওয়ানোর পরিমাণ সর্ম্পকে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

বোতলে খাওয়ানোর জন্য উপকারী পরামর্শ

শিশুর জন্মের প্রাথমিক সপ্তাহগুলোতে আপনি ও আপনার সঙ্গী শিশুকে খাওয়ানোই বেশি ভাল। এতে শিশু নিরাপদ ও সুরক্ষিত বোধ করবে, আপনার খাওয়ানোর ধরনের সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে এবং তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ ও ভালবাসাময় বন্ধন গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

  • শিশুকে সামান্য উঁচু করে আপনার কাছাকাছি চেপে ধরুন।
  • ফিডারে দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুর প্রতি বিশেষ মনযোগী হন। শিশুর খাওয়ার মাঝে মাঝে বিরতি দিন, তাকে ঢেঁকুর তোলার সময় দিন, তা না হলে শিশু অস্বস্তি বোধ করবে ও বমি করতে চাইবে।
  • শিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে কথা বলুন।
  • প্রথম অবস্থায় শিশু ফিডারে খেতে না চাইতেই পারে, তাতে মাকে হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। ধীরে সুস্থে চেষ্টা করলেই শিশু আস্তে আস্তে এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে।
  • বোতলের নিপল শিশুর ওপরের ঠোটে হাল্কা করে ঘষুন যাতে সে মুখ খুলে জিভ সামান্য বের করতে উৎসাহী বোধ করে।
  • শিশুর মুখে নিপলটি ধরুন যাতে সে নিজেই তা মুখের ভেতর ঢুকিয়ে নেয়।
  • শিশুকে বিশ্রাম নেবার সুযোগ দিতে মাঝে মাঝে নিপলটি বের করে আনুন।
  • শিশুকে পুরো দুধটুকু খেয়ে ফেলার জন্য জোর করবেন না, যদি সে খেতে না চায়।
  • এক ঘণ্টার মাঝে শেষ না হলে বাড়তি দুধ ফেলে দিন।

বোতল ও অন্যান্য খাওয়ানোর উপকরণ বিশুদ্ধকরন

বিশুদ্ধ করার পূর্বে পরিষ্কার করুন এবং ধুয়ে নিন।

  • প্রথমে নিজের হাত সাবান ও পানি নিয়ে ধুয়ে নিন। তারপর পরিষ্কার করার স্থানটি সাবান ও গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
  • খাওয়াবার বোতল এবং নিপল গরম সাবান পানি দিয়ে বোতল পরিষ্কার করার ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করুন।
  • আপনার সকল সরঞ্জাম পরিষ্কার ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলে তারপর বিশুদ্ধ করুন।

বিশুদ্ধকরন পদ্ধতি

ঠাণ্ডা পানি দিয়ে বিশুদ্ধকরন 

  • প্রতি ২৪ ঘণ্টায় বিশুদ্ধকরন ট্যাবলেটের সাহায্যে বিশুদ্ধকরন তরল তৈরি করুন।
  • পরিষ্কার সরঞ্জামাদি বিশুদ্ধকরন আধারে রাখুন।নিশ্চিত করুন যে বোতলের ভেতরে কোন বাতাসের বুদবুদ নেই।
  • বিশুদ্ধকরন তরলে খাওয়ানোর সরঞ্জামাদি অন্তত ৩০ মিনিট রাখুন এবং খাওয়ার তৈরির পূর্বে ভালমত খাবার পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।

বাষ্পে বিশুদ্ধকরন (বৈদ্যুতিক বিশুদ্ধকরন বা মাইক্রোওয়েভ)

যেহেতু নানান ধরনের বিশুদ্ধকরন যন্ত্রপাতি পাওয়া যায় তাই এটা জরুরী যে প্রস্তুতকারকের নিয়মাবলী মেনে চলুন।

সেদ্ধ করে বিশুদ্ধকরন

  • একটি বড় পাত্রে পরিষ্কার করা খাওয়ানোর সরঞ্জামাদি নিয়ে তা পানি পূর্ণ করুন। পানি ফুটিয়ে নিন এবং ফুটন্ত পানিতে অন্তত ১০ মিনিট রাখুন।ফিডার ফুটানোর আগে অবশ্যই পরিষ্কারক দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। দুধ লেগে থাকা ফিডার পানিতে ফুটাবেন না।
  • সবচেয়ে ভাল হয় যদি ফোটানোর পর পরই বোতল ব্যাবহার করা যায়। কিন্তু যদি তা না হয়, তবে বোতলের মুখে নিপল এবং ধাকনা ভাল করে লাগিয়ে বোতল রাখুন যাতে নিপল এবং বোতলের ভেতর জীবাণু না ঢোকে।
  • নিয়মিত লক্ষ রাখুন যাতে বোতলের নিপল ভাঙ্গা, ফাটা বা খতিগ্রস্থ না হয়।

কিভাবে দুধ তৈরি করতে হয়?

  • আপনার হাত ভাল করে ধুয়ে নিন। এবং যেখানে খাবার তৈরি করা হবে তাও পরিষ্কার করুন।
  • কেটলিতে কল থেকে অন্তত ১ লিটার পরিমান ঠাণ্ডা পানি ভরে নিন। পূর্বে ফোটানো, কৃত্রিম ভাবে বিশুদ্ধ করা বা বোতলের পানি ব্যাবহার করবেন না। কারণ তা শিশুর জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে।
  • পানি ফুটিয়ে নিন এবং এটা ৩০ মিনিটের বেশি ঠাণ্ডা করবেন যাতে এর তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি সেঃ এর মত থাকে।
  • বোতলটি একটি পরিষ্কার স্থানে রাখুন তবে নিপল এবং ধাকনা বিশুদ্ধকারক বা সস প্যানেই রাখুন যাতে তা পরিষ্কার থাকে।
  • প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী বোতলে সঠিক পরিমানে পানি ঢালুন।
  • ফর্মুলা দুধের কৌটাই সরবরাহকৃত চামচের সাহায্যে দুধ নিয়ে তা পরিষ্কার ছুরি বা লেভেলারের সাহায্যে সমান করে নিন।
  • বোতলের পানিতে পাউডার ঢালুন। প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী পানির পরিমানের জন্য প্রযোজ্য চামচের পরিমানে পাউডার যোগ করুন।
  • নিপলের কোনায় ধরে তা বোতলে লাগান। তারপর চারপাশের খাঁজগুলো আঁটকে দিন। ঢাকনা দিয়ে নিপল ঢাকুন এবং পাউডার গুলে যাওয়া পর্যন্ত তা ঝাঁকান।
  • ঠাণ্ডা পানির ধারার নিচে বোতলের নিচের অর্ধেক অংশ ধরে বানানো ফর্মুলা ঠাণ্ডা করুন। শিশুকে খাওয়ানোর আগে নিজের হাতের ভেতরের তালুতে সামান্য তরল ঢেলে এর তাপমাত্রা পরীক্ষা করে নিন, যার মানে হল এটা কুসুম গরম বা ঠাণ্ডা হতে হবে, তবে গরম নয়।

নিরাপত্তা বিশয়ক পরামর্শ

  • প্রতিবার খাওয়ানোর পূর্বে নতুন করে দুধ তৈরি করে নিন। খাবার জমিয়ে রাখা এমনকি ফ্রিজের ভেতরেও হয়ত দুধে ব্যাক্টেরিয়া তৈরি করতে পারে যা আপনার শিশুকে অসুস্থ করতে পারে।
  • ঠাণ্ডা পানির কল থেকে নতুন পানি নিয়ে সিদ্ধ করে ব্যাবহার করুন। আগে সেদ্ধ পানি, কৃত্রিম উপায়ে বিশুদ্ধ করা পানি বা বোতলজাত পানি ব্যাবহার করবেন না, কারণ তা শিশুর জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে।
  • ফিডার ও নিপল দুটোই পরিষ্কার করার জন্য আলাদা ব্রাশ পাওয়া যায়। নিপল কখনোই খোলা রাখবেন না। ভালোভাবে পরিষ্কার করে পানি ঝরিয়ে, নিপলের ওপরে ঢাকনা দিয়ে রাখুন।
  • মায়েরা সাধারনত ফিডার পরিষ্কারের ব্যাপারেই সচেতন থাকেন, কিন্তু একথা ভুলে গেলে চলবে না যে ফিডারের পাশাপাশি ব্রাশগুলোও প্রায়ই পরিষ্কারক দিয়ে ধুয়ে পানি শুকিয়ে রাখতে হবে। দুধের গন্ধ লেগে থাকলে এতে ক্ষুদ্র পোকামাকড় বা তেলাপোকাও লাগতে পারে। ফিডার ও নিপলের ব্রাশ পরিষ্কার করার পরে শুকিয়ে ঢাকনাওয়ালা বক্সে ভরে রাখুন। এতে পোকামাকড়ের ভয় থাকবে না।
  • সব সময় কৌটাই দেয়া চামচটিই ব্যাবহার করুন এবং প্রস্তুত প্রনালী মেনে চলুন যাতে আপনার শিশুর জন্য প্রযোজ্য পানি ও পাউডারের মিশ্রণেই ফর্মুলাটি তৈরি করা যায়।
  • বোতলে অন্য কিছু যোগ করবেন না যেমন চিনি, সিরিয়াল, চকলেট পাউডার ইত্যাদি।
  • এক ফিডারেই বারবার দুধ খাওয়ালে তা পরিষ্কার রাখা মুশকিল। তাই এক সাথে কয়েকটি ফিডার ব্যবহারে রাখুন। এক বেলা একটি ফিডারে দুধ খাওয়ালে পরের বেলা জীবাণুমুক্ত পরিষ্কার অন্য একটি ফিডারে দুধ খাওয়ান। প্রতিটি ফিডারের নিপল তিন থেকে চার মাস পরেই বদলে ফেলুন। আর ফিডার ব্যবহার করুন সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত। খেয়াল রাখুন, ফিডারের গায়ে ছেপে দেওয়া দুধ পরিমাপের দাগগুলো যাতে মুছে না যায়। কারণ, দুধের কৌটাতে যে চামচ থাকে, তার সঙ্গে ফিডারের পরিমাপক দাগগুলোর যথেষ্ট যোগাযোগ রয়েছে। তাছাড়া,একেক বয়সের শিশুর জন্য একেক পরিমাপের দুধ বানাতে হয়। দুধ বানানো জানার জন্য দুধের কৌটার গায়ে নির্দেশাবলি ভালোভাবে পড়ুন। নির্দিষ্ট বয়সের শিশুর জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণে গুঁড়া দুধ ও পানি ব্যবহার করতে হয়। তা না হলে শিশুর পানিশূন্যতা বা পেট খারাপ হতে পারে।
  • ইনফ্যান্ট ফর্মুলা কখনই মাইক্রোওয়েভে গরম করবেন না কারণ তা সমানভাবে ছড়িয়ে নাও যেতে পারে ফলে হট স্পট তৈরি হতে পারে এবং আপনার শিশুর মুখের ভেতর পুড়ে যেতে পারে।

বাড়ি থেকে বাইরে গিয়ে খাওয়ানো

যদি আপনার বাড়ি থেকে বাইরে গিয়ে শিশুকে খাওয়ানোর প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে তৈরি থাকা একটি ইনফ্যান্ট ফর্মুলা দুধ একটি খালি পরিষ্কার বোতলে নিয়ে খাওয়ানোই ভাল। যদি তা সম্ভব না হয় তবে আগে তৈরি করা দুধ একটি ঠাণ্ডা করার ব্যাগে বরফসহ রেখে সর্বোচ্চ ৪ ঘন্টা পর্যন্ত রাখতে পারেন। যদি আগে তৈরি করা ফর্মুলাটি কক্ষ তাপমাত্রায় রাখা হয় তবে ২ ঘণ্টার মাঝে ব্যাবহার করুন, তবে এটি অভ্যাসে পরিনত করবেন না।

মা চাকরিজীবি হবার কারণে অথবা মায়ের স্বাস্থ্যগত কারণে বাচ্চা যথেষ্ট পরিমাণ বুকের দুধ না পেলে ডাক্তাররা কৌটার দুধ দেবার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এছাড়া কখনই নিজ থেকেই আগ বাড়িয়ে বাচ্চাকে ফিডার খাওয়ানো শুরু করবেন না। মনে রাখবেন, মায়ের দুধের কোন বিকল্প নেই।

সবার জন্য শুভকামনা

Related posts

Leave a Comment