শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো সংক্রান্ত কিছু সমস্যা ও সমাধান

শিশুর জন্মের পর প্রথম প্রথম বুকের দুধ খাওয়ানো অনেক মায়ের জন্য কষ্টকর হয়ে থাকে। এটা অনেক সময় না জানার ফলেও হয়। বাচ্চার মুখে স্তন ঠেসে ধরে রাখলেই দুধ খাওয়া হয়ে যাবে ব্যাপারটা এমন নয়। স্তন্যপানের কিছু বিশেষ নিয়ম মেনে দুধ খাওয়ালে মা এবং শিশু উভয়ের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে তা। নতুবা নানা ধরণের সমস্যা দেখা দেয়।

শিশু জন্মের পর প্রথম ৬ মাস তাকে শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো খুব দরকারি কারন প্রথম ৬ মাস মায়ের বুকের দুধ থেকেই শিশু যাবতীয় পুষ্টি উপাদান পেয়ে থাকে। কিন্তু অনেক মায়েরা কিছু সমস্যার জন্য সন্তান কে ব্রেস্টফিডিং বা বুকের দুধ খাওয়াতে চান না অথবা কিছু দিন বুকের দুধ পান করিয়ে তা বন্ধ করে দেন। বুকের দুধ পান করানোর প্রতি অনিহা বা হঠাৎ করে বুকের দুধ পান করানো বন্ধ করে দেয়ার পেছনে কিছু কমন সমস্যা থাকে। তেমনই কিছু সাধারণ সমস্যা এবং তার প্রতিকার নিয়ে আজকের আলোচনা।

 ব্রেস্টফিডিং পেইন/ ল্যাচিং পেইন

যারা প্রথম মা হয়েছেন তাদের এই ব্যথাটা বেশী হয়।প্রথমবার শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় স্তনে ব্যাথা করবে এটা খুব স্বাভাবিক। বাচ্চা দুধ খাওয়া শুরু করলেই ব্যাথা টের পাওয়া যায়।বাচ্চা দুধ খাওয়া শুরু করার মিনিটের ভিতরেই ব্যথা দূর হয়ে যায়।তবে ব্যাথা ১ মিনিটের বেশি সময় ধরে থাকলে বুঝতে হবে আপনার বাচ্চার মুখের পজিশন ঠিক নেই। সঠিক পজিশনে না থেকে যদি বাচ্চা দুধ টানতে থাকে তাহলে সাধারনত ব্রেস্টে পেইন বা ব্যাথা অনুভুত হয়।

সমাধানঃ

বাচ্চাকে সঠিক পজিশনে ধরতে হবে।বাচ্চার পজিশন যদি ঠিক না থাকে তবে বাচ্চার মুখে একটি আঙুল ঢুকিয়ে স্তন বের করে নিয়ে আবার স্তন মুখে দিতে হবে। বাচ্চা যখন পুরোপুরি হা করবে তখন স্তন তার মুখে দিন। খেয়াল করতে হবে স্তনবৃন্তের (নিপলের পাশের কালো অংশকে স্তনবৃন্ত বলে) নীচের দিকটা যেন বাচ্চার মুখে বেশী থাকে উপরের অংশের চেয়ে। বাচ্চার পজিশন যখন ঠিক থাকবে তখন বাচ্চা মায়ের বুকে লেগে থাকবে , মাথা ও শরীর সোজা থাকবে। নাক এবং থুতনি মায়ের স্তনে ছুঁয়ে থাকবে। মুখ সম্পূর্ণ হা করে নিচের ঠোঁট বাইরের দিকে উল্টে থাকবে। খেয়াল রাখতে হবে মায়ের বোঁটার চারপাশের কালো অংশের উপরিভাগই যেন বেশি দেখা যায়, নিচের ভাগ নয়।

আর যদি এমন হয় যে বাচ্চার পজিশন ঠিক আছে তবুও ব্যাথা হচ্ছে তাহলে বুঝতে হবে আপনার ব্রেস্ট যথেষ্ট শক্ত বা শুষ্ক। সেই ক্ষেত্রে একটু ঢিলেঢোলা পোশাক পড়া ভালো। সাবান ব্যবহার করা যাবে না স্তনে। স্তনকে হাইড্রেট রাখতে ল্যানোলিন বেজড ক্রীম বা লোশন ব্যবহার করতে পারেন।

শুষ্ক বা কর্কশ (ক্র্যাকড) নিপল

অনেক মায়ের দুধের নিপল ফেটে যায় যা থেকে এমনকি রক্ত পর্যন্ত বের হয়। স্তন্যপান করানোর সময় এই সমস্যাটা অনেক কষ্টকর হয়। বিশেষ করে শিশু যখন দুধ খায় তখন প্রচন্ড জ্বালাপোড়া বোধ হয়। রক্ত বের হলে ব্যথার পরিমাণটাও অসহনীয় হয়ে ওঠে। প্রথম সপ্তাহে যখন প্রথম আপনি ব্রেস্টফিডিং করাবেন প্রথমে কিছু রক্ত বের হতে পারে তবে এতে চিন্তিত হবার কিছু নেই। এমন সমস্যা হওয়ার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে- থ্রাশ হওয়া, শুষ্ক ত্বক বা বাচ্চার ঠিকমত চুষতে না পারা ইত্যাদি।

সমাধানঃ

স্তন যথাসম্ভব মশ্চারাইজড রাখতে হবে। পরিষ্কার তো বটেই। শিশু দুধ খাওয়ার সময় যদি কিছু রক্ত তার মুখেও চলে যায় তাতে ক্ষতির কিছু নেই, এটা মনে রাখতে হবে। ব্যথার জন্য ব্যাথানাশক ওষুধ খাওয়া চলতে পারে এ সময়। ব্যথার কারণে দুধ না খাওয়ানোর সিধান্ত ভুল হবে। কারণ বেশী দুধ জমে গেলে তাতে ব্যথা বাড়বে। বাচ্চা দুধ খাওয়ার পর বুকের কিছু দুধ নিপলে লাগিয়ে রাখলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। বুকের দুধেই এমন কিছু উপাদান আছে যা এই ফাটা সারিয়ে তুলতে পারে। এ ক্ষেত্রেও ল্যানোলিন বেজড ক্রীম লাগানো যাবে নিপলে। তবে বাচ্চার মুখে দুধ দেয়ার আগে সেটা হালকা গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে মুছে নিতে হবে। সাবান বা লোশন ব্যাবহার উচিৎ নয়। এছারাও খেয়াল রাখতে হবে দুধ খাওয়ানোর সময় যাতে বাচ্চার পজিশন ঠিক থাকে।

দুধ জমাট বাঁধা

এ সমস্যায় ভোগেন না এমন মা খুব কম আছেন। ঠিকমতো দুধ বের হতে না পারলেই দুধ জমাট বেঁধে যায়। হালকা জ্বর আসা বুক ভারি হয়ে যাওয়া এর লক্ষন। এতে মায়ের স্তনে ব্যথাও হয়। বাচ্চাকে দুধ দিতে গিয়েও পড়তে হয় ঝামেলায়। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর মাঝে অনেক সময়ের ব্যাবধান থাকলে এ সমস্যা হতে পারে। এছারাও টাইট অন্তর্বাস বা স্ট্রেস এর কারনেও এমনটা হতে পারে।

সমাধানঃ 

দুধ যেন ঠিকমতো বের হতে পারে সেজন্য সতর্ক থাকতে হবে। বুকের দুধ খাওয়ানোর নিয়ম মেনে বাচ্চাকে দুধ দিতে হবে। হালকা গরম কাপড়ের সেক নিলে আরাম পাওয়া যাবে। হালকা ম্যাসাজ করলেও দুধের জমাট বাঁধা দূর হয়ে যায় অনেক সময়। কোনোভাবেই টাইট ব্রা পড়া যাবে না এ সময়। তারপরও যদি জ্বর বাড়ে এবং স্তন জমাট বেঁধে ভারি হয়েই থাকে তবে তা ইনফেকশনের লক্ষন এবং সে ক্ষেত্রে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করাই উচিত। এছারাও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করুন।

এনগর্জড ব্রেস্ট বা অধিক দুধ

শিশু জন্মানোর পর চতুর্থ দিনে যখন দুধ বেশি আসে তখন বেশি ক্ষরণ ও সঞ্চয়ের জন্য কখনো কখনো বুকে অতিরিক্ত ব্যথা হয়। এতে মায়ের খুবই কষ্ট হয়। মায়ের বুকে অতিরিক্ত দুধ অনেক সময় বাচ্চার দুধ না খাওয়ার কারন হয়ে দাড়াতে পারে। অতিরিক্ত দুধের কারন বাচ্চা ঠিক মত দুধ খেতে পারে না সে ক্ষেত্রে বাচ্চা দুধ থেকে মুখ সরিয়ে নেয়।এটি মারাত্মক আকার ধারণ করলে স্তনে তীব্র ব্যথা হতে পারে ও স্তন ফুলে যেতে পারে। এ অবস্থায় শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। স্তন ফুলে যাওয়ার ফলে বাচ্চার মায়ের স্তন মুখে নিতেও সমস্যা হয়।

সমাধানঃ 

এই ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে মায়ের উচিত হবে বাচ্চা কে দুধ খাওয়ানোর আগে হাত দিয়ে ব্রেস্ট কে একটু প্রেস করে নিতে যাতে দুধের ফ্লো ঠিক থাকে এবং ব্রেস্ট একটু নরম হয়ে যায় যা বাচ্চার জন্য খুব আরামদায়ক ও বটে। দরকার হলে হাতে করে কিছুটা দুধ বার করে দিতে হবে।তবে এ সমস্যা সাধারণত ২-১ দিনের বেশি থাকে না। আর মায়ের আরামের জন্য এ সময় স্তনকে খুব ভালো সাপোর্ট দেয়ার জন্য সঠিক অন্তর্বাস ব্যবহার করতে হবে।

হরমোনাল কারণে দুধ কম বেশী হতে পারে। তাই দুধ বেশী হলে এটা কমানোর চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই। প্রবল গতিতে দুধ যেন শিশুর গলায় গিয়ে না লাগে সেজন্য সতর্কতার সাথে শিশুকে স্তন্যপান করানোর পরামর্শই দিয়ে থাকেন শিশু বিশেষজ্ঞরা।

ম্যাস্টাইটিস বা  ব্যাক্তেরিয়াল ইনফেকশন

অনেক সময় শিশুর জন্মের বেশ কিছু দিন পরে স্তন বা এর কিছু অংশ লাল হয়, খুব ব্যথা হয়, যেন ভেতরে কিছু আছে এমন অনুভব হয় এবং জ্বর আসে। এসব স্তনে পুঁজ জমার লক্ষণ।ম্যাস্টাইটিস একটা ব্যাকটেরিয়া জনিত ইনফেকশন যেটা বাচ্চা কে দুধ খাওয়ানো শুরু করার প্রথম সপ্তাহে দেখা যেতে পারে। তবে কিছু লক্ষন দেখেই সেটা সহজে বোঝা যায় যে এটা ম্যাস্টাইটিস কিনা। সব চেয়ে সহজ লক্ষন টি হল বাচ্চা কে ব্রেস্ট ফিডিং করানোর প্রথম সপ্তাহে জ্বর এবং ব্রেস্টে ব্যাথা অনুভত হলে প্রাথমিক ভাবে ধরে নেয়া যায় ম্যাস্টাইটিস আর লক্ষন।

সমাধানঃ

যদিও অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই ঠিক হয়ে যায়, তবে অনেক সময় কেটেও পুঁজ বার করতে হয়। এ সময় মায়েরা চায় শিশুকে দুধ দেয়া একবারে বন্ধ করতে। কিন্তু অন্য স্তনে দুধ দেয়া চলতে পারে। পুঁজ হওয়া স্তনে চাপ দিয়ে দুধ বার করে ফেলে দিতে হবে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রিত হবার পর আবার ওই স্তনে দুধ দিতে পারেন।ম্যাস্টাইটিস হয়ে থাকলে অবশ্যই অতি দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহন করুন।

থ্রাশ বা ইস্ট ইনফেকশন

থ্রাশ হলো বাচ্চার মুখের একধরনের ইস্ট ইনফেকশন যা মায়ের স্তনে ছড়িয়ে পড়তে পারে। থ্রাশ হলে স্তনে চুলকানি, ব্যাথা এবং র‍্যাশ হতে পারে।

সমাধানঃ

থ্রাশ হলে ডাক্তার মায়ের নিপলে এবং বাচ্চার মুখে লাগানোর জন্য এন্টি ফাঙ্গাল ওষুধ দেবেন। এক্ষেত্রে মা এবং শিশু দুজনেরই একসাথে চিকিৎসা করতে হবে।

পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ না থাকা

এটি একটি অতি পরিচিত সমস্যা। অনেক নতুন মায়েরই শিশুর প্রয়োজনের তুলনায় বুকে কম দুধ আসতে পারে। মায়ের বুকে পর্যাপ্ত দুধ না থাকার আরেকটি অন্যতম কারন হল সার্জারি। যদি মায়ের আগে কখনো ব্রেস্ট সার্জারি হয়ে থাকে তাহলে ব্রেস্ট এ দুধের পরিমাণ কম থাকতে পারে। আবার কিছু সময় মায়ের শরীরে হরমোনের ভারসাম্য এর অভাবেও মায়ের বুকের দুধের ঘাটতি হতে পারে।

সমাধানঃ 

সেক্ষেত্রে সুষম আহার ও পূর্ণ বিশ্রাম আবশ্যক। মায়ের বুকের দুধের পর্যাপ্ততা না থাকলে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দেয়া অনেক বড় একটা বোকামি। যদি পর্যাপ্ত দুধ বুকে না থাকে তাহলে একজন অভিজ্ঞ ডক্টরের সাথে কন্সাল্ট করে এর বিজ্ঞানসম্মত সমাধান খুজে নিতে হবে কিন্তু দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা উচিত হবে না কারণ দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দিলে আপনার বুকের দুধের পরিমান আরো কমে যাবে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুনঃ বুকের দুধ বাড়ানোর কিছু পরামর্শ 

ব্রেস্টফিডিং এর সময় বাচ্চা ঘুমিয়ে পড়া

অনেক মা এই ব্যাপারটায় খুব বেশি বিরক্ত থাকেন এই জন্য যে বাচ্চা দুধ খেতে খেতে অনেক সময় ঘুমিয়ে পরে বা মুখে ব্রেস্ট ফিক্স করে কিছু সময় খেয়ে ঘুমিয়ে পরে। আসলে বাচ্চা জন্মের পর প্রথম কিছু মাস একটু বেশিই ঘুমিয়ে থাকে তাই এটা নিয়ে চিন্তিত হবার কিছু নেই।

সমাধানঃ

বাচ্চা ঘুম থেকে উঠলে তাকে আবার খাওয়ানোর চেষ্টা করুন  অথবা বাচ্চা কে একটি ব্রেস্ট কিছুক্ষণ খাওয়ানোর পর বাচ্চাকে ঢেকুর তুলিয়ে বা পায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে বা তার সাথে আদর করে কথা বলে আবার অন্য ব্রেস্ট খাওয়ানো হলে তাহলে বাচ্চা ঘুমিয়ে পড়ার সুযোগ কম থাকে আর একই সাথে দুধের ভারসাম্য বজায় থাকে। আবার  অনেক সময় দেখা যায় শিশুকে দুধ দিতে দিতে মায়ের ক্লান্তি চলে আসে। মাকে পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে। কখনো শিশু বেশি বেশি দুধ চায়। তাই ক্লান্তিটা অনেকাংশেই স্বাভাবিক। ২-১ দিনের মধ্যে ব্যাপারটি ঠিক হয়ে যায়। তাই অযথা উদ্বিগ্ন না হয়ে মাকে বিশ্রাম ও উপযুক্ত আহার গ্রহণ করতে হবে। বাচ্চা বড় হওয়ার সাথে সাথে এ সমস্যা কমে আসে। তাই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

 

শিশুর জন্য মায়ের দুধের বিকল্প নেই এই কথাটা সব সমস্য মাথায় রাখতে হবে। নিতান্তই অপরাগ না হলে কোনোভাবেই যেন শিশু এই দুধ খাওয়া থেকে বঞ্চিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মায়ের সুস্বাস্থ্য,  সন্তানের সুস্বাস্থ্য বুকের দুধ খাওয়ানোর উপর অনেকাংশে নির্ভর করে। প্রতিটি শিশুই মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বেড়ে উঠুক!

 

Related posts

Leave a Comment