শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় যেসব বিষয়ে লক্ষ্য রাখা উচিৎ

শিশুর যথাযথ পুষ্টির জন্য মায়ের বুকের দুধের কোন বিকল্প নেই।শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা,বুদ্ধি- বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশের জন্য মায়ের দুধ হচ্ছে শিশুর শ্রেষ্ঠ খাদ্য।তাছাড়া বুকের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে মা ও শিশুর মধ্যে গড়ে উঠে এক স্বর্গীয় নিবিড় সম্পর্ক। শিশুকে দুধ খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে মা তার মাতৃত্ব পুরোপুরি উপভোগ করেন।শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করা একান্ত জরুরি। মা শিশুকে নিয়ে কীভাবে বসেছেন, কী পদ্ধতিতে খাওয়াচ্ছেন তা সঠিক হওয়া দরকার। মায়ের বুকে শিশুর সঠিক স্থাপন এবং মা ও শিশুর সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় যেসব বিষয়ে লক্ষ্য রাখা উচিৎ

মায়ের আরামদায়ক অবস্থান

বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মাকে কোন আরামদায়ক স্থানে বসা উচিত। ঘরে যদি কোনো সোফা-কুশন না থাকে, তবে কোনো চৌকি বা ইজি চেয়ারে বসেও মা শিশুকে দুধ  খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে পারেন। এছাড়া দেয়ালে বা বালিশে হেলান দিয়ে বসে অথবা শুয়ে বুকের দুধ  খাওয়ানো যেতে পারে।যদি মা বসা অবস্থায় থাকেন, তাহলে পিঠ সোজা রাখতে হবে, কাঁধ উঁচু করে রাখা যাবে না। মায়ের আরাম নিশ্চিত হলে এক ধরনের শিথিলতা আসে যাতে দুধ  নিঃসরণে সুবিধা হয়।

শুয়ে খাওয়াতে চাইলে মা শিশুকে নিজের দিকে যথাসম্ভব বুকের কাছাকাছি টেনে নেবেন যেন শিশুর পেট, বুক মায়ের পেট ও বুকের সঙ্গে লাগানো থাকে এবং শরীরের পেছন অংশ সরলরেখায় থাকে। বসে খাওয়ানোর সময় মা  সোজা হয়ে পিঠের পেছনে একটি বালিশ নিয়ে বসবেন, যাতে কোমর বাঁকা না হয় এবং হাতের নিচে একটি বালিশ দেবেন, যাতে হাত ঝুলে না থাকে।পিঠে বালিশ না দিলে কোমর বাঁকা করে সামনে বা পেছনে ঝুঁকে বসলে মা বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারবেন না, তাতে দুধ আসতে বাধা পাবে।

দুধ খাওয়ানোর সময় শিশুকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রাখা

মা শিশুকে যে পদ্ধতিতে বা ভঙ্গিতে দুধ খাওয়ান না কেন, সবসময় খেয়াল রাখতে হবে যেন শিশুর দৃষ্টি মায়ের মুখের দিকে থাকে। শিশুর ঘাড় যেন গুঁজে না থাকে। ঘাড় বাঁকানো অবস্থায় শিশু আরাম করে পেট ভরে খেতে পারে না বলে সে আগেই স্তন ছেড়ে দেয়। মা ইচ্ছে করলে শিশুর ঘাড়ের নিচে হাত দিতে পারেন। কিন্তু কখনোই মাথায় হাত দেওয়া যাবে না।

মায়ের দিকে শিশুকে এমনভাবে রাখতে হবে যেন স্তনের বোঁটার দিকে শিশুর মুখ থাকে। শিশুর মাথাটি থাকতে হবে মায়ের হাতের ভাঁজের উপর। শিশুর শরীর ও মায়ের বুকের মাঝে কোনো ফাঁক যেন না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। শিশুর শরীর যেন মায়ের বুকের সঙ্গে মিশে থাকে । শিশু সবসময় যেন মায়ের শরীরের ঘনিষ্ঠ ছোঁয়া পায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। শিশু যদি খাওয়ার সময় ঘনিষ্ঠ ছোঁয়া পায়, তাহলে মা-শিশু দু-জনেরই খুব আরাম ও আনন্দ হয়। শিশু নিজেকে খুব নিরাপদ মনে করতে থাকে।

শিশুকে এভাবে সঠিক অবস্থানে রেখে মা স্তনের বোঁটা শিশুর ওপরের ঠোঁটে কয়েকবার লাগাবেন, এতে শিশু বড় করে হাঁ করবে। এরপর নিপলসহ চার পাশের কালো অংশ (এরিওলা) বাচ্চা মুখে দিন। বাচ্চা এরিওলাই চুষবে। তাহলে ঠিকমতো দুধ পাবে। কিন্তু যদি শুধু নিপল চুষে, তাহলে নিপল ছিঁড়ে যেতে পারে, মা ব্যথা পাবে, বাচ্চাও দুধ কম পাবে। তাই স্তনের বেশি অংশ বাচ্চার মুখে দিন, বাচ্চা ঠিকমতো দুধ পাবে।

শিশুর জন্মের পরপর কয়েকবার এ পদ্ধতি অনুসরণ করলে পরে শিশুকে বুকের কাছে নেওয়া মাত্রই সে বুকের সঠিক স্থান চুষে খেতে পারবে। যত তাড়াতাড়ি শিশুকে সঠিক পদ্ধতিতে বুকের দুধ পান শেখানো যাবে, তত তাড়াতাড়ি শিশু সঠিকভাবে বুকের দুধ খেতে সফল হবে এবং সুস্থ থাকবে।

আরও পড়ুন ঃ বুকের দুধ বৃদ্ধি করার কিছু টিপস। 

পর্যায় ক্রম অনুসরণ করা

দু’দিকের স্তন থেকেই শিশুকে পর্যায়ক্রমে দুধ  খাওয়ানো দরকার। কোন কোন মায়েদের যে কোন একদিকের (ডান বা বাম) দুধ  খাওয়াতে সুবিধা মনে হয়। তাই একদিকের দুধ বেশি খাওয়ান। অপরদিকে স্তন থেকে কম খাওয়ানোর ফলে সেটিতে দুধ তৈরি ও সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং শিশুটিও একদিকের দুধ  খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।

বাচ্চাকে একটি স্তন পুরা শেষ করতে দিন। বাচ্চা ১৫ থেকে ২০ মিনিট চুষবে। দুই স্তন থেকে অল্প অল্প খাওয়াবেন না। একবারে একটা স্তন খাওয়া শেষ হলে অন্য স্তনে দিন। কারণ দুধের প্রথম অংশ যাকে আমরা foremilk বলি তাতে কার্বোহাইড্রেট ও পানি থাকে। পরের অংশ hind milk এ fat থাকে। দুই স্তন থেকে অল্প অল্প খেলে সে প্রতিবারই পানি আর কারবোহাইড্রেট পেল।

বাচ্চা প্রসাবের সাথে পানি বের হয়ে যাবে আর এই কার্বোহাইড্রেট হল ল্যাকটোজ, যেটা বেশি খেলে ওর ল্যাকটেজ এনজাইমটা অপর্যাপ্ত হবে। ফলে বেশি বেশি বা ফেনা ফেনা বা সবুজ পায়খানা হবে, মনেহবে ল্যকটোজ ইনটলারেনস হচ্ছে। বাচ্চা বারেবারে ক্ষুধার্ত হবে। একটি স্তন অনেকক্ষণ ধরে খাওয়ালে hind milk টাও পাবে তাতে fat বেশি বলে এটা ভাঙতে সময় নেয়। ফলে বাচ্চা দেরিতে ক্ষুধার্ত হবে। ওজনও দ্রুত বাড়বে।

তবে প্রতিবারে দু’দিকের স্তন থেকে দুধ  খাওয়ানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। একদিকের স্তন থেকে শিশুর পেট ভরে গেলে অপরটি পরবর্তী সময়ে খাওয়াতে হয়। শিশুর পেট ভরেছে কিনা বোঝার উপায় হলো : পেট ভরে গেলে শিশু আপনা আপনি দুধ খাওয়া ছেড়ে দেয়, তাছাড়া অপর বুকে দেয়ার পরেও শিশু আর খেতে চায় না।

আরও পড়ুন ঃ আপনার শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে তো? 

শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সময় মায়ের পোশাক যেমন হওয়া উচিত

শিশুকে দুধ  খাওয়ানোর সময় মাকে তার পোশাকের ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি রাখা উচিত। টাইট, ভারি পোশাক এড়িয়ে চলাই উচিত। এসময়টা শিশুকে বুকের দুধ  খওয়ানোর বিষয়টা মাথায় রেখে মাকে হালকা, কম ঘাম হয়, আরামদায়ক কাপড় (যেমন: নাইট গাউন, বোতাম দেয়া শার্ট,সুতির গ্যাঞ্জি, নার্সিং ব্রা ইত্যাদি) পোশাক পড়া উচিত। মায়ের এমন পোশাক পড়া উচিত নয় যাতে শিশুকে বুকের দুধ  খাওয়াতে কষ্ট হয়। সামনে খোলা রাখা যায় এমন জামা পরলে দুধ  খাওয়াতে মায়ের সুবিধা হয় সে কথা মাথায় রেখেই জামা কাপড় পছন্দ করা উচিত।

কর্মজীবী মায়েদের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো

কর্মজীবী মাকে সন্তান প্রসবের কিছুদিন পরেই কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে হয়। সেসব মায়েদের পক্ষে সময়মত বাচ্চাকে বুকের দুধ  খাওয়ানো সম্ভব হয়ে উঠে না। তারা ব্রেস্ট পাম্পের সাহায্যে বুকের দুধ  সংগ্রহ করে রাখতে পারেন। পরবর্তীতে বাড়ির অন্য কোন সদস্য ফিডারের সাহায্যে বাচ্চাকে সেই দুধ খাওয়াতে পারেন।

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, বুকের দুধ যত বেশি সময় আপনি সংরক্ষণ করবেন, এমনকি তা ফ্রিজে রেখে করলেও, তত বেশি তা থেকে ভিটামিন সি কমতে থাকবে এবং তার চর্বির গুনাগুন নষ্ট হতে থাকবে। সংরক্ষণ করে রাখা বুকের দুধ আপনার নবজাতকের চাহিদা মেটাতে পারলেও, সে যখন বড় হতে থাকবে তখন তার জন্য এটি যথেষ্ট হবে না। আমাদের দেশের গরম এবং আর্দ্র আবহাওয়ায় বুকের দুধ ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। প্রতিবার ১-৪ আউন্সের বেশি সংরক্ষণ করবেন না। এটি ফ্রিজে রাখলে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত ভাল থাকার কথা। যদি বিশেষ সুবিধা থাকে তবে কর্মক্ষেত্রে শিশুকে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন।

প্রচুর পানি পান করা

বাচ্চাকে বুকের খাওয়ালে মায়ের ডিহাইড্রেশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য মাকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩ লিটার পানি পান করা উচিত।এতে বুকের দুধের পরিমান বাড়ে এবং দুধের সরবরাহ নিয়মিত থাকে। যারা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান তারা সাধারণত যেসব মায়েরা বাচ্চাকে বুকের দুধ দেন না তাদের চাইতে এক লিটার পানি বেশি খান। তাই যখনই তেষ্টা পাবে তখনই পানি খান, এতেই আপানার পানির চাহিদা পূরণ হওয়ার কথা।

ঘড়ির দিকে না তাকিয়ে বাচ্চার দিকে নজর দিন

অসংখ্য  তথ্যের ভিড়ে আজকাল অনেক মা-ই ভুল করেন। অনেকেই মনে করেন যে ঘড়ি ধরে মেপে মেপে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ালেই বাচ্চা ছোট বেলা থেকেই একটা নিয়মের মাঝে গেঁথে যাবে-যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ঘড়ির দিকে নজর না দিয়ে বাচ্চার সুবিধা-অসুবিধার প্রতি যত্নবান হন।সময় ও পরিস্থিতিই আপনার ও বাচ্চার জীবনের ছন্দ তৈরি করে দিবে।

ধৈর্য রাখুন

শিশু যদি মায়ের দুধ খেতে অনীহা দেখায় তবে জোরাজুরি করবেন না, নিরিবিলিতে শিশুকে নিয়ে বসে বাচ্চাকে গান শুনাতে শুনাতে মাথায় হাত বুলিয়ে খাওয়াতে চেষ্টা করুন।অনেক সময় মায়ের বুকে দুধ বেশি জমে গেলে স্তন ভারী হয়ে শক্ত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে চেপে দুধ বের করতে হবে এবং নরম হয়ে আসলে বাচ্চাকে দুধ দিতে চেষ্টা করতে হবে। এছাড়া ঠাণ্ডা বা গরম পানিতে কাপড় ভিজিয়ে সেক নিলেও উপকার পাওয়া যাবে।

পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবার

মায়ের পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবার শিশুর পর্যাপ্ত বুকের দুধ পেতে সাহায্য করে। প্রচুর খাওয়ার দরকার নেই। আপনার শরীরের চাহিদার প্রতি খেয়াল রাখুন এবং খিদে লাগলে খান। তবে স্বাস্থ্যকর খাবার খান। প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, মাছ (সামুদ্রিক মাছ নয়), এবং উপকারি চর্বিযুক্ত খাবার খান। আপনার শিশু ঘন ঘন বুকের দুধ  খেলেও আপনি বাড়তি ক্যালরির চাহিদা একটা কলা বা আপেল অথবা পিনাট বাটার দিয়ে এক স্লাইস রুটি খেয়েও মেটাতে পারেন।

পরিশিষ্টঃ

বুকের দুধ খাওয়াতে চাইলেই যে সব মা প্রথমেই সহজে সফলভাবে তা করতে পারবেন সেটা নাও হতে পারে। এ ব্যাপারে প্রয়োজন মায়ের যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস, বুকের দুধ খাওয়ানোর ইচ্ছা, কখন কী করতে হবে তা জানা। মায়ের দুধে রয়েছে শিশুর জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি, রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা এবং বুকের দূধ খাওয়ানোর মাধ্যমে মা ও শিশুর মাঝে গড়ে ওঠে নিবিড় সম্পর্ক। অতএব শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে মা তার মাতৃত্ব পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেন।

 

 

 

 

Related posts

Leave a Comment