শিশুকে ভালো ভাবে কথা বলতে শেখানোর কিছু টিপস

কিভাবে পায়চারি করতে হয় সেটা যেমন আপানার বাচ্চা সরাসারি শিখবেনা ঠিক একইভাবে কিভাবে কথা বার্তা বলতে হয় সেটাও আপনার বাচ্চা সরাসরি জানবেনা।জন্মের পরপরই একটি শিশু ভাষাজ্ঞান অর্জন করতে শেখে না। ভাষা বা কথা শেখার জন্য শিশুর মস্তিষ্ক তখন যথেষ্ট পরিপক্ক থাকে না। জন্মের প্রায় চার মাস পর্যন্ত একটি শিশুর ভাষা কান্নার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ সময় তার ভাষা জ্ঞান থাকে শূন্যের কোঠায়।

মৌখিকভাবে ভাব আদান প্রদান বা কথা বলা হোল এমন একটি দক্ষতা যা বিভিন্ন ধরনের সামর্থ্যের উপর নির্ভর করে। সেটা হতে পারে- অন্যের বলা শব্দ বোঝার ক্ষমতা থাকা, সঠিক শব্দ চিন্তা করতে সক্ষম হওয়া, বাক্যকে সঠিকভাবে যুক্ত করতে সক্ষম হওয়া, এবং শব্দ গঠনের প্রয়োজনীয় আওয়াজ প্রস্তুত করতে সমর্থ হওয়া। এইসব কিছুই নির্ভর করে একটা সুবিন্যস্ত মূলগত সামর্থ্যের উপর যা অধিকাংশ শিশুদের মধ্যে তাদের জন্মের পর মুহূর্ত থেকেই বিকাশ লাভ শুরু করে।

আপনার বাচ্চাকে ভালভাবে কথা বলা শেখাতে আপনি কি করতে পারেন

পৃথিবীর সব বাচ্চাদেরই কথা বলা শুরু করার পর্যায়গুলো একই ধরনের এবং বাচ্চাদের চারদিকে যেসব কিছু থাকবে সেসব কিছুই বাচ্চার এই দক্ষতার উন্নয়নে সাহায্য করবে। আপনার বাচ্চার কথা-বার্তা বলাতে সহযোগিতা করার জন্য পিতা বা মাতা হিসেবে আপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

শুরু করুন একেবারে প্রথম দিন থেকেই

প্রথম দিন থেকেই আপনার বাচ্চার সাথে কথা বলা আপনাদের দুজনের একে অপরকে চিনতে সাহায্য করবে এবং আপনার বাচ্চাকে চমৎকারভাবে জীবন শুরু করার সুযোগও দেবে। আপনার বাচ্চা জন্মানোর সাথে সাথেই আপনার গলার আওয়াজ চিনবে এবং সেদিকে মুখ ঘোরাবে। জন্মের মুহূর্ত থেকেই আপনার বাচ্চা সব কিছু শুনছে, সুতরাং তার সাথে কথা বলে যান।

কয়েক সপ্তাহ কেটে যেতে যেতে আপনার বাচ্চা আরও একটু বেশি সময় ধরে আপনার দিকে তাকাতে এবং ছোট ছোট অস্ফুস্ট শব্দ করতে শুরু করবে। তার মুখের শব্দগুলি নকল করে তার সঙ্গে কথা বলুন। একে অন্যের সাথে কথা বলার চমৎকার একটা উপায় এক সাথে খেলা করা। কোন  খেলনার দরকার নেই, কেবল আপনারা দুজনই যথেষ্ট। বাচ্চার হাতপায়ের আঙ্গুলগুলি গুনে বা তাকে সুড়সুড়ি দিয়ে খেলুন।

আপনার বাচ্চার সঙ্গে খেলা করুন

খেলাধুলা হলো বাচ্চাদের ও শিশুদের আমাদের এই জগত সম্পর্কে জানার প্রধান উপায়। আপনার সাহায্য নিয়ে এটা তাদের ভাষা ব্যাবহারের দক্ষতার বিকাশে সহায়তাদানেরও একটা চমৎকার উপায় হতে পারে।

একজন মা কিংবা বাবা হিসেবে আপনিই হলেন আপানার বাচ্চার সবচেয়ে ভালো খেলার সাথী। সুতরাং তার সঙ্গে খেলা করার জন্য প্রতিদিনই সময় দেয়ার চেষ্টা করুন। আপনার বাচ্চা একটু বড় ও মজবুত হয়ে ওঠার পর তাকে প্রচুর খেলনা কিংবা এমন ধরনের জিনিস দিন যেগুলি সে মুখে দিলে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই এবং সেগুলি নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলুন। দোকান থেকে দামী খেলনা না হলে চলবে। বাসার থালা বাসন বা বাটি চামচ খেলনা হিসেবে এ বয়সী বাচ্চাদের জন্য যথেষ্ট।

খেলার সময় যা খেলছেন তার সঙ্ঘে মানানসই প্রচুর শব্দ করুন, যেমন- একটা গাড়ি ঠেলে নিয়ে যাওয়ার সময় “ভ্রমম-ভ্রমম” বা ঐ ধরনের আওয়াজ। এসব করলে আপনার বাচ্চা নানা ধরনের শব্দ শুনবে এবং এটাও শিখবে যে লোকজনের গলার আওয়াজ শোনা একটা মজার ব্যাপার।

দেয়া এবং নেয়ার কোন খেলা শিশুর সাথে খেলুন যখন সে আপানর অনুরোধ বুঝতে শিখছে এবং নির্দেশ মেনে চলতে শিখছে- যেমন “আমাকে গাড়িটা দাও”। এমন খেলা খেলুন যাতে পালা আসার ব্যাপারটি আছে- যেমন একে অন্যকে বল গড়িয়ে দেয়া।

আপনার বাচ্চা বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে, খেলার সময় তাকে জোর করে কিছু শেখানোর চেষ্টা করবেন না। আপনার বাচ্চা যা খেলতে চায় সেটা সে নিজেই বেছে নিতে পারলে সবচেয়ে ভালো শিখতে পারবে এবং সে যা চায় তার সঙ্গে আপনিও তাই করুন।

আপনার বাচ্চার সঙ্গে বই পড়ুন

এক সাথে বই পড়া আপানর বাচ্চাকে কথা বলা শেখানোর একটা চমৎকার উপায়, একই সাথে একে অন্যকে একটু আদর করার আদর্শ সুযোগ এটা।একটা নিরিবিলি জায়গা বেছে নিন। টিভি বা রেডিও চালু থাকলে বন্ধ করে দিন যাতে কোনরকম ব্যাঘাত না ঘটে।গল্প পড়া ছাড়াও, ছবিগুলো নিয়ে কথা বলুন। যদি একটি কুকুরের ছবি থাকে তবে আপানর চেনা কোন কুকুর সম্পর্কে কথা বলুন।

খুব বেশি সময় ধরে পড়বেন না। ছোট শিশুরা সহজেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সুতরাং অল্প সময়ের জন্য আর ঘন ঘন পড়াই সবচেয়ে ভালো। পরিবারের অন্যান্য প্রাপ্তবয়স্কদেরও বই পড়াই অংশ নিতে দিন।ছবিগুলোর নাম করার জন্য আপনার বাচ্চার উপরে কোনরকম চাপ দেবেন না। তবে সে যদি আপনার বিভিন্ন কথা নকল করে বলে তবে তাকে প্রশংসা করুন এবং ঐ কথাগুলো আবার তাকে বলুন।

মনে রাখবেন আপনি কিন্তু আপনার বাচ্চাকে পড়াতে শেখাচ্ছেন না। পড়তে শেখার অনেক আগেই বাচ্চারা কথা বলতে শেখে, এবং বইপত্র একসাথে পড়া ভাষার উপর আপনার বাচ্চার দখল বাড়ানোর একটা চমৎকার উপায়।বাচ্চার প্রিয় বইগুলি বার বার দুজনে একসাথে পড়া ভালো। যে ভাষা বাচ্চারা শুনছে সেটা বুঝতে ও মনে রাখতে এই ধরনের পুনরাবৃত্তি তাদের সাহায্য করে।

ছড়া ও গান

বাচ্চারা গন ও ছড়া পছন্দ করে, বিশেষ করে তারা যদি সেগুলি আপনার গলায় শুনতে পায়। এবং এটা হলো আপনার বাচ্চার কথা বলা ও কথা শোনার দক্ষতা বাড়ানোয় সাহায্য করার একটা চমৎকার উপায়।

আপনার কণ্ঠস্বরই বাচ্চার কাছে তার প্রিয় সঙ্গীত। সুতরাং তাকে গান গেয়ে শোনান, এমনকি যদিও আপনার মনে হয় যে আপনার গলা ভালো শোনাচ্ছে না। আপনার বাচ্চা আপনার সমালোচনা করবেনা। টিভি বা রেডিও চালানো থাকলে সেটা বন্ধ করে দিন যাতে আপনার বাচ্চা আপনার কণ্ঠস্বর শুনতে পায়।

ছোট বাচ্চারা খেলাধুলার ভেতর দিয়েই সবচেয়ে ভালো শিখতে পারে, সুতরাং গান এবং ছড়াকে মজার খেলাই পরিনত করুন। আপনার গলার স্বর বার বার বদলান, কিছু অঙ্গভঙ্গী করুন অথবা আপনার বাচ্চার অথবা পরিবারের লোকজন ও বন্ধুবান্ধবের নাম যোগ করুন।

আপনার বাচ্চা যদি আপনার সঙ্গে যোগ দেয়, তাকে প্রচুর উৎসাহ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে তার চেষ্টা আপনি লক্ষ্য করছেন। এমনকি আপনার বাচ্চা যদি সদ্য কথা বলতে শিখে থাকে, আপনার গান গাওয়া বা ছড়া আবৃত্তির প্রতি তার প্রতিক্রিয়া শুনুন।

আপনি শিশুকে তার প্রিয় ছড়াগুলো গান গেয়ে শোনাতে পারেন। ছড়াগুলো গাইতে গাইতে আপনি ছড়া অনুযায়ী অভিনয় করতে পারেন। মনে রাখবেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হোল শিশুর সাথে সময় উপভোগ করা।

আপনার বাচ্চার সঙ্গে আপনার নিজের ভাষায় কথা বলুন

আপনার বাচ্চাকে কথা বলতে শেখায় সাহায্য করার সবচেয়ে ভালো উপায় হোল তার সঙ্গে আপানর নিজের ভাষায় যথাসম্ভব বেশী কথা বলা। এইভাবে আপনার বাচ্চা আস্থার সঙ্গে কথা বলতে শিখবে এবং সে যখন নার্সারি ক্লাসে বা স্কুলে যাওয়া শুরু করবে তখন ইংরেজী শেখার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকবে।

নিজের ভাষায় বাচ্চাকে গল্প বলুন। বাচ্চার জন্য নিজের ভাষায় লেখা বইপত্র যোগাড় করার চেষ্টা করুন অথবা নিজেই সেগুলো তৈরি করে নিন। আপনার বাচ্চার উচ্চারণের কারণে বা সে যদি কোন ভুল করে তবে তা নিয়ে হাসাহাসি করবেন না বা তাকে উপহাস করবেন না।

বাচ্চার সঙ্গে প্রচুর কথা বলুন

আপনার বাচ্চা যেসব অত্যন্ত জরুরি ও জটিল দক্ষতা অর্জন করতে শিখবে তাদের মধ্যে একটি হোল কথা বলতে শেখা। স্বাভাবিকভাবেই এটা ঘটে বলে মনে হলেও আসলে একটা খুবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আপনারও রয়েছে। আপনার বাচ্চার সঙ্গে আপনি যত বেশী কথা বলবেন ততই আপনি তাকে সাবলীলভাবে কথা বলতে সক্ষম এবং একটি আস্থাবান ও সুখী শিশুতে পরিণত করতে পারবেন।

আপনারা একসাথে যা করছেন তা নিয়ে আপনার বাচ্চার সঙ্গে নিজের ভাষায় কথা বলুন- যেমন, বাচ্চাকে গোসল করাচ্ছেন কিংবা খাওয়াচ্ছেন অথবা তার ন্যাপী বদলে দিচ্ছেন। দোকানে যাওয়ার পথে, অথবা সুপারমার্কেটে যা যা দেখছেন তাদের সম্পর্কে কথা বলুন। যেসব বিষয়ে আপানর বাচ্চা আগ্রহ দেখাচ্ছে সেগুলি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করুন।

কথা বলার সময় আপনার বাচ্চার দিকে তাকান এবং আপনি যা বলছেন তার উত্তর দেয়াড় সময় তাকে দিন। আপনার বাচ্চার কথাবার্তা মন দিয়ে শুনুন এবং তাকে কথা শেষ করার সময় দিন। দুজনে মিলে টিভি দেখার চেষ্টা করুন যাতে পর্দায় যা যা ঘটছে তা নিয়ে আপনারা কথা বলতে পারেন।

নতুন শব্দ শেখা

আপনার শিশুকে নতুন ধ্বনি বা আওয়াজের সাথে পরিচিত করান এবং শিশুকে বলুন বা তাকে বোঝান আওয়াজটা কিভাবে হচ্ছে- যেমন “ওই দরজার ঘণ্টা বাজলো”।  প্রতীকী আওয়াজের সাথে আপনার শিশুকে পরিচিত করান। যেমন তাকে যখন কোন সত্যিকারের বিড়াল বা বিড়ালের ছবি দেখাবেন তখন বিড়ালের আওয়াজ যে “মিয়াউ” সেটা তাকে বলুন।

যে সব শব্দ বর্ণনা প্রধান সেগুলি শিখতে আপনার শিশুকে সাহায্য করুন। শিশুকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নতুন শব্দের সাথে পরিচিত করান- উদাহরসরুপ, খেলার মাঠে নিয়ে যাওয়া।

খেলার সময় আপনার শিশু যেসব খেলনা চেনে সেগুলি দেখান ও তাদের নাম বলুন। যেমন গাড়ি, বল এবং এ সময় খেলনা শব্দটি উচ্চারণ করুন। আর একটি ভালো সুযোগ হোল খাবার সময়, যখন আপনি আপনার শিশুকে “খাবার” শব্দটির নানা শ্রেণিবিভাগের সাথে পরিচিত করাতে পারবেন।

যে শব্দগুলো শিশু শিখছে সেগুলি ব্যাবহারের করার জন্য তাকে যতটা পারেন সুযোগ দিন। যেমন, তার প্রিয় খেলনাটি তার নাগালের বাইরে রাখুন, সে যখন সেটি দেখবে আপনি তা তার কাছে নিয়ে আসার আগে সে খেলনার নাম বলতে তাকে উৎসাহ দিন।

যখন শিশুর কথা স্পষ্ট নয় বা সে শব্দটি সঠিক বলতে পারেনা তখন তার কটা বলার চেষ্টার উত্তর দিন এবং তাকে বাহবা দিন। যদি শিশু তার খাবারের থালার দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট কিছু বলে তবে আপনি তাকে বলতে পারেন “ তুমি কি আরও খাবার নেবে?”

দ্বিতীয় বছরে বাচ্চারা পরিষ্কার করে কথা প্রায়ই বলতে পারেনা। কিন্তু এরকম যদি চলতে থাকে তাহলে স্পীচ এবং ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের সাহায্য নেয়া দরকার হতে পারে।

শিশুর বেড়ে ওঠার পরিবেশ অনুকূল রাখুন

শিশুকে সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে উঠতে দিন। শিশুর সামনে তর্ক বা ঝগড়া করবেন না। কোনো ব্যাপারে দ্বিমত হলে তা শিশুর সামনে প্রকাশ করা যাবে না। শিশুকে যতটুকু সম্ভব হাসি খুশির মধ্যে রাখতে হবে। শিশু কান্না কাটি করলে অস্থির হলে চলবে না। শিশুকে কোলে তুলে নিয়ে হালকাভাবে চেষ্টা করতে হবে যাতে সে আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসে। বাবা মায়ের ঝগড়া শিশুর কোমল মনে আঘাত হানতে পারে। এতে করে শিশু অবস্থায় বাচ্চারা এক ধরণের মানসিক চাপ বা আঘাত প্রাপ্ত হতে পারে যা বাচ্চার কথা বলায় বা অন্যান্য স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ব্যঘাত করতে পারে।

 

শিশুর কথা বলা শেখাতে যা করা যাবে না

 

  • শিশুকে কথা বলার জন্য অত্যধিক চাপ যেমন- ‘বল, বল’ ইত্যাদি একেবারেই করা যাবে না।
  • বাবা মায়ের এক ধরণের প্রবণতা বেশী দেখা যায় সেটা হল শিশুকে একসঙ্গে অনেক শব্দ শেখানোর চেষ্টা করা। এতে শিশু কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে।
  • শিশুকে অযথা অপ্রাসঙ্গিক অথবা অতিরিক্ত প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

অনেক মা-বাবাই ভাবেন, অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুর সঙ্গে তাদের পিছিয়ে পড়া শিশুর খেলার পরিবেশ করে দিলেই আপনা আপনিই কথা শিখে যাবে। কিন্তু মনে রাখবেন, এমনটা না-ও হতে পারে। তাই নিজেরা বাড়িতে চেষ্টা করুন, প্রয়োজনে স্পিচ থেরাপির সহায়তা নিতে হবে।

আরও পড়ুন- বাচ্চার কথা বলা শুরু করার পর্যায়ক্রমিক ধাপ সমূহ

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment