শিশুর ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স

ল্যাকটোজ হল দুধে থাকা চিনি বা শর্করা। আমরা যখন দুধ বা দুগ্ধজাত কোন খাবার খাই তখন আমাদের শরীর এক ধরনের এনজাইমের (Lactase) সাহায্যে ল্যাকটোজকে ভেঙ্গে ফেলে যেন আমাদের শরীর তা শোষণ করে নিতে পারে। অনেকেই আছেন যাদের শরীরে Lactase এর পরিমান কম থাকে, যে কারনে তারা দুধ বা দুগ্ধজাত কিছু খেলে সমস্যা দেখা দেয়।

 

ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স (Lactose Intolarence) কি?

ধরুন আপনি ল্যাকটোজ অসহনশীল, তার মানে আপনি যখন দুধ বা দুগ্ধজাত কোন কিছু খান তখন আপনার শরীর দুধে থাকা শর্করা পরিপাক করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে Lactase উৎপাদন করতে পারেনা। ফলে উক্ত শর্করা আপনার পেটে থেকেই যায় এবং তা গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যার সৃষ্টি করে। একে ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স বলে। যদিও ল্যাকটোজ প্রবলেম খুবই অসস্তিকর মনে হতে পারে কিন্তু এটা তেমন কোন বিপদজনক নয়।

মুলত যেসকল বাচ্চা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই জন্ম নেয় তারা সাময়িক সময়ের জন্য পর্যাপ্ত ল্যাক্টেজ উৎপাদন করতে পারেনা। কারণ বাচ্চার গঠন পুরো হতে শেষ ট্রাইমেস্টারের শেষ দিক পর্যন্ত সময় লাগে। তাই প্রি-ম্যাচিওর বাচ্চাদের জন্মের কিছুদিন পর্যন্ত ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স থাকতে পারে।

সচরাচর স্কুল পড়ুয়া ও উঠতি বয়সের বাচ্চাদের মাঝে ল্যাকটোজ ইন্টোলারেন্স সমস্যাটা বেশি দেখা যায়। যদিও শিশুর ক্ষেত্রে আগে থেকেই ল্যাকটোজ ইন্টোলারেন্সের লক্ষন গুলো দেখা দিতে পারে তবে তার মানে সবসময় এই না যে আপনার বাচ্চার ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্ট।

 

কি কি কারনে ল্যাকটোজ ইন্টোলারেন্স হয়?

অনেকেরই ল্যাকটোজ ইন্টোলারেন্স সমস্যা আছে আবার কারো কারো নেই কেন এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তবে এটা অসম্ভব কিছু না। জরিপ অনুযায়ী আমেরিকার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন মানুষের এই সমস্যাটি রয়েছে।

ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সের সাথে জেনেটিক্স এর সম্পর্ক আছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী এশিয়ান আমেরিকানদের মধ্যে প্রায় ৯০%, এছাড়াও আফ্রিকান আমেরিকান , হিস্পানিক আমেরিকান, খ্রিস্টান ও স্থানিয় আমেরিকান দের মধ্যে প্রায় ৭৫% মানুষের ল্যাকটস ইন্টোলারেন্স সমস্যা আছে।

জন্ম থেকেই বাচ্চার ল্যাকটোজে সমস্যা আছে এমন ঘটনা নজিরবিহিন।বাবা মা দুজনেরই ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স এর সমস্যা থাকলে এমনটা হতে পারে।  এমন হলে  জন্মের পর থেকেই বাচ্চার তীব্র ডাইরিয়া হতে পারে, যে কারনে বাচ্চা মায়ের দুধে বা কৃত্রিম দুধে থাকা শর্করা সহ্য করতে পারেনা। সেক্ষেত্রে বাচ্চাকে বিশেষ ধরনের ল্যাকটোজ মুক্ত ফর্মুলা খাওয়াতে হয়।

আবার বাচ্চার গুরুতর ডাইরিয়া হলে শরীরে Lactase উৎপাদন সাময়িক বাধাগ্রস্থ হয়। ফলে এক-দুই সপ্তাহের জন্য গুরুতর ইন্টোলারেন্সের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

এছাড়াও কিছু ওষুধের কারনেও শরীরে পর্যাপ্ত Lactase উৎপাদন কমে যেতে পারে ফলে তা সাময়িকভাবে  ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সের লক্ষনগুলো কি কি?

আপানার বাচ্চার যদি ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স থাকে তাহলে দুধ বা দুধ জাতীয় কোন কিছু যেমন- দই, পনির ইত্যাদি খাওয়ার পর ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টার মধ্যেই তার ডাইরিয়া, তলপেটে খিঁচুনি, পেট ফেঁপে উঠা ও গ্যাস হয়ে যেতে পারে (বাচ্চার ১ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে গরুর দুধ খাওয়ানো উচিত না)।

অনেক মানুষই আছে যাদের ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স থাকা সত্তেও অল্প পরিমানে দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পরেও কোন রকম সমস্যা ছাড়াই হজম করে নিতে পারে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে সামান্য ল্যাকটোজ আছে এমন খাবার খেলেই নানা ধরনের পেটের অসুবিধায় ভোগে।

 

ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সে আর দুধে অ্যালার্জি কি একই?

ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সে আর দুধে অ্যালার্জি দুইটা দুই ধরনের সমস্যা। অ্যালার্জি হল ইমিউন সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া, অন্যদিকে ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সে হল বধজমের একটা অবস্থা। অনেক সময় এই দুই ধরনের সমস্যার একই ধরনের লক্ষন দেখা যায়। যেমন- ডাইরিয়া, তলপেটে ব্যাথা ইত্যাদি দুধে অ্যালার্জির কারনে হতে পারে অথবা ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সের কারনেও হতে পারে।

যদি খেয়াল করেন যে বাচ্চাকে দুধ বা দুগ্ধজাত কিছু খাওয়ানোর পর তার শরীরে চুলকানি, মুখ বা মুখের চারপাশে ফুলে উঠা,র‍্যাশ, চোখ দিয়ে পানি পড়া, সর্দি, ডায়রিয়া এইসব লক্ষন দেখা দিচ্ছে তাহলে বুঝতে হবে আপনার বাচ্চা ঐ খাবারের প্রতি অ্যালার্জিক।

 

বাচ্চার ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সে আছে কি না নিশ্চিত হবো কিভাবে?

আবারো বলছি, এত কম বয়সে আপনার বাচ্চার ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সে হওয়া অসম্ভব। তারপরেও যদি খেয়াল করেন যে সেরকম কোন লক্ষন দেখা দিচ্ছে, সেক্ষেত্রে আপনাকে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে হবে। ডাক্তার নিশ্চিত হওয়ার জন্য বাচ্চার লক্ষনগুলো সম্পর্কে জানতে চাইবেন যে এটা আসলেই ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স কি না। তারপর  তিনি হয়ত বাচ্চার দৈনিক খাবারের তালিকা থেকে ৩-৪ সপ্তাহের জন্য ল্যাকটোজ আছে এমন সব খাবার বাদ দিতে বলবেন যাতে বাচ্চার লক্ষনগুলো কমছে কি না সেটা পরীক্ষা করে দেখা যায়।

 

ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সের কোন চিকিৎসা বা প্রতিরোধের উপায় আছে কি?

ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স প্রতিরোধ করা যায়না না, তবে আপনার বাচ্চার যদি ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স থেকে থাকে সেক্ষেত্রে কিছু বিষয় মেনে চলে বাচ্চাকে এই সমস্যা থেকে দূরে রাখা সম্ভব।

বাচ্চার খাবার কেনার আগে প্রোডাক্টের লেবেল পড়া

আপনার বাচ্চার ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স সমস্যা থাকলে স্বভাবতই আপনি দুগ্ধজাত যেকোনো খাবার কেনা থেকে দূরে থাকবেন। কেননা ইতিমধ্যেই আপনি জানেন যে দুধ বা দুধ জাতীয় খাবারেই ল্যাকটোজ বেশি থাকে। কিন্তু কিছু খাবার দুধের তৈরি মনে না হলেও তাতে দুধ জাতীয় উপাদান থাকতে পারে। যেমন- প্যানকেক ও কুকি মিক্স, ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল, সালাদ ড্রেসিং, পাউরুটি ও রান্না করা মাংস ইত্যাদি।

যেকোনো প্রোডাক্ট কেনার আগে প্রোডাক্টের লেবেলে উপাদানগুলো ভাল মত দেখে নিন যেমন- দই, গুঁড়ো দুধ, চর্বি মুক্ত গুঁড়ো দুধ ইত্যাদি আছে কি না।

সাম্প্রতিক আইন প্রণয়নের ফলে এখন সব প্রোডাক্টের উপাদান প্রোডাক্টের গায়ে লেখা থাকা বাধ্যতামূলক। ফলে কোন প্রোডাক্ট দুধ বা দুগ্ধজাত কোন উপাদান দিয়ে তৈরি কি না তা স্পষ্ট করে লেখা থাকে। মুলত যা আমাদের সঠিক প্রোডাক্ট বাছাইয়ের কাজটা আরও সহজতর করে দিয়েছে।

বাচ্চা কি ধরনের আচরন করে তা খেয়াল করুন

কারো কারো ক্ষেত্রে ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্স থাকার পরেও এক-আধটু ল্যাকটোজ জাতীয় খাবারে কোন প্রবলেম হয়না। আবার অনেকেই আছে যারা সামান্য ল্যাকটোজ জাতীয় খাবারেও অনেক সংবেদনশীল।

আপনার বাচ্চার ক্ষেত্রে দুগ্ধজাত বিভিন্ন খাবার দিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন যে কোন কোন খাবারে তার সহনশীলতা কেমন।

উদাহারন সরূপ এমন কিছু মাখন আছে যাতে ল্যাকটোজের পরিমান অনেক কম থাকে যেন তা সহজেই হজম হতে পারে। এছাড়াও টকদই,  দুধ বা অন্য যেকোনো ডেইরি প্রোডাক্টের তুলনায় খুব সহজেই হজম হয় কারণ এর উপকারি ব্যাকটেরিয়া আমাদের শরীরে পর্যাপ্ত Lactase তৈরি করতে সাহায্য করে।

বাচ্চা যদি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয় সেক্ষেত্রে বাচ্চাকে ল্যাকটোজ আছে এমন সব ধরণের খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আর যদি না হয়, সেক্ষেত্রে অন্যান্য খাবারের সাথে নির্দিষ্ট কিছু ডেইরি প্রোডাক্ট খুব অল্প পরিমানে খাওয়ানো যেতে পারে। এতে বাচ্চার হজমে তেমন কোন সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকেনা।

শিশুকে শুধু ল্যাকটোজ-সংবলিত খাবার দেওয়া যাবে না

শিশুর ল্যাকটোজ সহনীয়তা পরীক্ষা করার সময় তাকে এককভাবে ল্যাকটোজ-সংবলিত খাবার না দিয়ে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে তা খাওয়াতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, শুধু দুধ খেতে দিলে শিশুর হজমে যতটা অসুবিধা হবে, তার চেয়ে অনেক কম অসুবিধা হবে যদি দুধের সঙ্গে বিস্কুট, সেরিয়াল ইত্যাদি দেওয়া হয়।

শিশুকে খাওয়ানোর ওষুধের উপাদানগুলো জেনে নিন

এমন অনেক কিছুতে ল্যাকটোজ থাকতে পারে, যা হয়তো শিশুর পিতামাতা কল্পনাও করবেন না, তার মধ্যে একটি হলো ওষুধ। অনেক ওষুধে গাঠনিক উপাদান হিসেবে ল্যাকটোজ থাকে। তাই শিশুকে তার প্রয়োজনীয় ওষুধ খাওয়ানোর আগে অথবা ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনার আগে অবশ্যই লেবেল পড়ে দেখে নিতে হবে তার মধ্যে ল্যাকটোজ আছে কি না।

বাচ্চার দৈনিক পুষ্টির চাহিদা পূরণ হচ্ছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখুন

ল্যাকটোজ ইন্টলারেন্সের কারনে যদি মনে করেন যে বাচ্চার দৈনিক খাবার থেকে দুধ বা দুধ জাতীয় খাবার সরিয়ে ফেলা উচিত সেক্ষেত্রে বাচ্চার শারীরিক গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম এর বিকল্প উৎস  অবশ্যই ঠিক করে রাখতে হবে। ক্যালসিয়ামের বিকল্প উৎস হিসেবে সবুজ শাক, সয়া মিল্ক, ব্রকোলি, ক্যানেড স্যালমন, কমলা, ফুলকপি ইত্যাদি অন্যতম। এ ছাড়া শিশুকে ক্যালসিয়াম-সংবলিত ফলের রসও খাওয়ানো যেতে পারে।

শুধু ক্যালসিয়াম ছাড়াও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিউট্রিয়েন্ট যেমন- ভিটামিন ডি, ভিটামিন এ, রিবফ্লাবিন ও ফসফরাস ইত্যাদই যেন পর্যাপ্ত পরিমাণে পায় সেজন্য বিকল্প উৎস ঠিক করে রাখতে হবে। এ ব্যাপারে একজন ডায়েটিসিয়ান খুব ভালো পরামর্শ দিতে পারবেন।

সবথেকে ভালো দিক হল, বর্তমানে ল্যাকটোজ ফ্রি-ডেইরি প্রোডাক্ট অনেক দোকানেই পাওয়া যায়। এইসব ডেইরি প্রোডাক্টে ল্যাকটোজ ছাড়া বাকি সব পুষ্টি উপাদানই থাকে।

পরিশেষে আপনি যদি দেখেন যে দুধ বা দুধ জাতীয় খাবার ছাড়া বাচ্চার দৈনিক পুষ্টির চাহিদা ঠিক মত পূরণ হচ্ছেনা সেক্ষেত্রে আপনাকে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে হবে। এক্ষেত্রে ডাক্তার আপনাকে বলে দিবেন যে কোন ধরণের সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে বাচ্চার পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব কি না।

ডাক্তারের পরামর্শ ব্যাতিত বাচ্চাকে কোন ধরণের সাপ্লিমেন্টে দেওয়া উচিত না।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

বড়দের ক্ষেত্রে ল্যাকটোজ অসহনীয়তা একবার দেখা দিলে তা সারা জীবনের জন্যই রয়ে যায়। তবে শিশুদের বেলায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটা সাময়িক অসুবিধা হিসেবে দেখা দেয়। এটি সাধারণত শিশুর ক্ষুদ্রান্ত্রে ভাইরাসের আক্রমণ অথবা খাদ্যে অ্যালার্জিজনিত কারণে হয়। এ ধরনের অসুবিধা কয়েক মাস পর্যন্ত থাকতে পারে। তবে ভাইরাসের আক্রমণকাল বা অ্যালার্জির মেয়াদকাল শেষ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অসুবিধাও দূর হয়ে যায়।

এ ছাড়া অপ্রাপ্ত নবজাত বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রেও কিছু সময়ের জন্য ল্যাকটোজ অসহনীয়তা দেখা দেয়, যত দিন না তাদের ল্যাকটোজ এনজাইম পূর্ণকালপ্রাপ্ত হয়। তাই ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে ল্যাকটোজ অসহনীয়তা দেখা দিলে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে তার তত্ত্বাবধানেই রাখতে হবে, যেন তিনি বুঝতে পারেন শিশুর এই অসুবিধা সম্পূর্ণরূপে দূর হয়েছে কি না। যদি এটি ক্ষুদ্রান্ত্রের কোনো অসুবিধার কারণে ঘটে, তাহলে ডাক্তারই প্রয়োজনমতো তার চিকিৎসা দেবেন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment