গর্ভাবস্থায় লেগ ক্র্যাম্প বা পায়ে খিল ধরা থেকে স্বস্তির উপায়

গর্ভাবস্থায় মায়েরা অনেক ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। এমনই একটি হোল লেগ ক্র্যাম্প বা পায়ে খিল ধরা। আমরা নিজেদের ইচ্ছানুসারে হাত বা পায়ের মাংসপেশী সংকুচিত বা প্রসারিত করে নড়াচড়া করি। কিন্তু আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হঠাৎ কোনো পেশী সংকুচিত হয়ে গেলে পেশীতে খিঁচুনি (spasm) তৈরি হয়। আর এটাকেই গর্ভাবস্থায় লেগ ক্র্যাম্প বা পায়ে খিল ধরা বলা হয়।

লেগ ক্র্যাম্প সাধারণত গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে শুরু হতে পারে। এবং সময় বাড়ার সাথে সাথে মায়ের পেট যত বড় হয় এর তীব্রতা তত বাড়তে পারে। পায়ে খিল ধরা দিনের বেলা হতে পারে তবে রাতে বেশী হয়। এর কারনে গর্ভাবস্থায় মায়েদের ঘুমেরও সমস্যা হতে পারে। গর্ভবতী মহিলাদের প্রায় অর্ধেকই এ সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

গর্ভাবস্থায় লেগ ক্র্যাম্প বা পায়ে খিল ধরা কেন হয়?

গর্ভাবস্থায় কেন লেগ ক্র্যাম্প হয় তার কারণ এখনও অজানা। যদি এ উপসর্গ গর্ভাবস্থায় খুবই স্বাভাবিক তবু এর কোন কারন বিশেষজ্ঞরা এখন নির্ণয় করতে পারেননি। তবে গর্ভকালীন কিছু কিছু ব্যাপারকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধরা হয়-

গর্ভাবস্থায় জরায়ুর আকার বাড়ার কারণে এবং ওজন বেড়ে যাওয়ার কারনে পায়ের রক্তনালীতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলে রক্তনালী গুলো সঙ্কুচিত হয়ে যায় যার কারনে পা থেকে হৃদপিণ্ডে রক্ত চলাচল স্বাভাবিকের চাইতে আস্তে হয়। এ কারনে পায়ে ক্র্যাম্প হতে পারে। এর ফলে গর্ভাবস্থায় পায়ে পানিও আসে যা ইডেমা নামেও পরিচিত

গর্ভাবস্থায় মায়েদের অতিরিক্ত ওজন বহন করতে হয় যার বেশীরভাগটাই করতে হয় পা কে। এ কারনে পায়ের পেশী গুলো দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং লেগ ক্র্যাম্প বা পায়ে খিল ধরা হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে অতিরিক্ত পুষ্টি দরকার হয়।  এ সময় মায়ের শরীরে পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের অভাব হতে পারে। অনেকে শরীরে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের অভাব বা ফসফরাসের মাত্রা বেড়ে যাওয়াকে লেগ ক্র্যাম্পের কারন বলে দাবী করেন। তবে ক্যালসিয়াম এবং পটাসিয়াম গ্রহনের পরিমান বাড়ালে এর হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন প্রমান পাওয়া যায়নি।

পায়ে খিল ধরার কারণ হতে পারে অনেকক্ষণ একজায়গায় বসে থাকা। পায়ের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়া। কংক্রিটের মেঝেতে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কাজ করলে বসার ক্ষেত্রে গণ্ডগোল হলে এই রোগের লক্ষণ দেখা দেয়। এছারাও পানিশূন্যতাকেও লেগ ক্র্যাম্পের কারণ হিসেবে ধরা হয়ে থাকে।

লেগ ক্র্যাম্প বা পায়ে খিল ধরলে কি করা যেতে পারে?

গর্ভাবস্থায় যখন লেগ ক্র্যাম্প বা পায়ে খিল ধরে তখন নিচের দেখানো পদ্ধতি অনুসরণ করলে এ থেকে স্বস্তি পাওয়া যায়।

পায়ে খিল ধরার সাথে সাথে পা সোজা করে পায়ের কাফ মাসল স্ট্রেচ করুন। এরপর পায়ের গোড়ালি বাঁকা করে পায়ের আঙ্গুলগুলো পায়ের উপরের দিকে ওঠানোর চেষ্টা করুন। ( তবে মনে রাখতে হবে পায়ের আঙ্গুলগুলো আলাদা ভাবে নাড়াবেন না। এর ফলে পায়ের পেশী কন্ট্রাক্ট করতে পারে এবং অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে)। এভাবে বেশ কয়েকবার স্ট্রেচিং করুন। যদি এভাবে স্ট্রেচিং করতে সমস্যা হয় তবে ওড়না বা টাওয়েল পেঁচিয়ে পায়ের নিচ দিয়ে ঘুড়িয়ে এনে পা কে উপরের দিকে টানুন।   এ ধরনের স্ট্রেচিং করতে প্রথমে একটু ব্যাথা করতে পারে। তবে আস্তে আস্তে তা কমে আসবে এবং ক্র্যাম্প থেকে স্বস্তি পাবেন।

 পায়ে খিল ধরার স্ট্রেচিং

স্ট্রেচিং এর পড়ে পায়ের পেশী মাসাজ করুন বা হট ওয়াটার ব্যাগ ব্যাবহার করে পায়ের টিস্যুগুলোকে রিলাক্স করুন। কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করলেও উপকার হতে পারে। ক্র্যাম্প চলে যাওয়ার পর পেশীতে ব্যাথা হতে পারে এবং নমনীয় হয়ে থাকতে পারে। এ সময় হাল্কা গরম পানিতে গোসল করে নিলে পেশীর নমনীয়তা কমতে পারে।

গর্ভাবস্থায় লেগ ক্র্যাম্প বা পায়ে খিল ধরা প্রতিরোধে কি করা যেতে পারে?

গর্ভাবস্থায় লেগ ক্র্যাম্প বা পায়ে খিল ধরা প্রতিরোধের কোন নিশ্চিত উপায় নেয়। তবে কিছু কিছু নিয়ম মেনে চললে গর্ভাবস্থায় এর ঝুঁকি কম হতে পারে-

বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে বা পা নিচের দিকে মাটিতে রেখে বসে থাকলে শরীরের শিরার উপর চাপ পরে যার ফলে ক্র্যাম্প হতে পারে। তাই বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে না থেকে কিছুক্ষন পর পর কিছু সময় বসে থাকুন। বসার সময় পা কিছুর উপর তুলে রাখতে পারেন বা পায়ের গোড়ালি ঘুড়িয়ে কিছুক্ষন ব্যায়াম করে নিতে পারেন। পায়ের উপর পা তুলে বেশিক্ষন বসে থাকাও উচিত নয় কারণ এতে রক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্থ হয়।  আরামদায়ক জুতা ব্যাবহার করুন। টাইট জুতা বা লম্বা হীলের জুতার কারণে এ সমস্যা আরও বেশী হতে পারে।

পায়ের কাফ মাসল নিয়মিত মাসাজ করুন। শুতে যাওয়ার আগে স্ট্রেচিং করে নিন।নিয়মিত হাঁটাচলা বা ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন। ব্যায়ামের ফলে রক্ত প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে এবং অতিরিক্ত তরল দেহ থেকে বেড়িয়ে যায়। তবে কোন কোন ব্যায়াম গর্ভাবস্থায় আপনার জন্য উপযোগী সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞের সাথে আলাপ করে নিন। নিয়মিত হাঁটাচলা করুন এবং মুভমেন্টে থাকার চেষ্টা করুন।

প্রচুর পরিমানে পানি খান। গর্ভাবস্থায় এটা উপকারী। এতে আপনি যেমন হাইড্রেটেড থাকবেন তেমনি এর ফলে অতিরিক্ত তরল প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বেড়িয়ে যাবে। তবে চিনি সমৃদ্ধ পানীয়, যেমন সোডা বা প্যাকেটজাত জুস না খাওয়াই ভালো।

গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্যকর এবং সুষম খাবার চেষ্টা করুন। এতে শরীরে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো ঘাটতি থাকবেনা। ধুমপানের কারণে শরীরে রক্ত প্রবাহ ধীরগতির হতে পারে ফলে এ সমস্যা বাড়তে পারে তাই ধুমপানের অভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করুন।

কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত মাসাজের ফলে এ সমস্যা থেকে মুক্তি মিলতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে বেশী জোরে মাসাজ করা না হয় যাতে ব্যাথা লাগে। এমনভাবে মাসাজ করা উচিত যাতে মাসাজের স্ট্রোকগুলো হার্টের দিকে হয়।

গর্ভাবস্থায় বাম পাশ ফিরে শোওয়ার চেষ্টা করুন। এতে আপনার মেরুদণ্ডের উপর চাপ যেমন কমবে তেমনি শরীরের পা থেকে হৃদপিণ্ডের দিকে রক্তপ্রবাহ বাঁধা গ্রস্থ হবেনা। এছাড়াও ঘুমানোর সময় দুপায়ের মাঝখানে বালিশ ব্যাবহার করতে পারেন যাতে উপরের পায়ের ভর বালিশের উপর পড়ে। পেটের নীচে বালিশ ব্যাবহার করতে পারেন বা পিঠের দিকে বালিশ দিয়ে সাপোর্ট দিতে পারেন।

যখন বিশ্রাম নেবেন বা শুয়ে থাকবেন তখন পায়ের নীচে বালিশ বা আর কিছু দিয়ে পা উপরের দিকে তুলে রাখুন। এতে যেমন আপনার রিলাক্স হবে তেমনি এতে শরীরে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে। সবচাইতে ভালো হয় যদি শুয়ে থাকা অবস্থায় পা আপনার হার্টের চাইতে উপরে রাখা যায়। তবে যেটা আপনার জন্য আরামদায়ক সেটাই করুন।

আপনার শোওয়ার ঘর যাতে ঠাণ্ডা, আরামদায়ক এবং বাতাস চলাচলের ব্যাবস্থা থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন।গর্ভাবস্থায় ঢোলা এবং আরামদায়ক কাপড় পরার চেষ্টা করুন যাতে শরীর কোন চাপ না পরে। এ ছাড়াও সুতির কাপড় পড়লে অতিরিক্ত গরম লাগার হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে। অতিরিক্ত গরমের কারনে পায়ের শিরা সামান্য স্ফীত হয়ে যেতে পারে যার ফলে শিরায় অতিরিক্ত রক্ত এসে লেগ ক্র্যাম্প হতে পারে।

অনেক গর্ভাবস্থায় লেগ ক্র্যাম্প বা পায়ে খিল ধরা প্রতিরোধের জন্য ম্যাগনেসিয়াম বা ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে গবেষণায় অতিরিক্ত ম্যাগনেসিয়াম বা ক্যালসিয়াম গ্রহনের সাথে লেগ ক্র্যাম্প প্রতিরোধ হওয়ার কোন প্রমান পাওয়া যায়নি।

কখন ডাক্তারকে জানাতে হবে?

যদি অনবরত পায়ে ব্যাথা হতে থাকে, পায়ের কাফ মাসল ফুলে যায় বা নমনীয় মনে হয় এবং যদি আক্রান্ত স্থানে গরম অনুভুত হয় এবং লাল রঙ ধারন করে তবে দেরী না করে দ্রুত ডাক্তারকে জানাতে হবে।

 

সবায় ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment