রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন | গর্ভাবস্থায় পেটে ব্যাথা

গর্ভাবস্থায় একজন নারীর শরীরে অনেক ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তনের কারণে মায়েদের শরীরে অনেক ধরনের ব্যাথা এবং অস্বস্তি বোধ হতে পারে। এমনই একটি হোল রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন। এটি একধরনের তীব্র বা সুচালো ব্যাথা যা সাধারণত তলপেটে বা কুঁচকির একপাশে বা উভয় পাশে অনুভূত হতে পারে। এ ধরনের ব্যাথা গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক এবং সাধারণত দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে এর উপসর্গ শুরু হয়।

 

রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন কেন হয়?

মেয়েদের পেলভিসে একজোড়া লিগামেন্ট থাকে যা রাউন্ড লিগামেন্ট নামে পরিচিত। এগুলোর কাজ হোল জরায়ুকে সঠিক স্থানে ধরে রাখা। গর্ভধারণের আগে এ লিগামেন্টগুলো পুরু এবং ছোট থাকে। গর্ভধারণের পড়ে জরায়ুর আকার বাড়ার সাথে সাথে এ লিগামেন্টগুলো রাবার ব্যান্ডের মত প্রসারিত হয় এবং পাতলা হয়ে যায়। এ কারণে গর্ভাবস্থায় লিগামেন্টগুলো টান টান অবস্থায় থাকে এবং এতে হঠাৎ কোন চাপ পড়লে ব্যাথা অনুভূত হতে পারে।

রাউন্ড লিগামেন্ট

গর্ভবতী মায়েরা যখন হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তন করেন তখন সাধারণত  রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন অনুভূত হতে পারে, যেমন- বিছানা বা চেয়ার থেকে ওঠার সময়। কাশি দেয়ার সময় বা বিছানায় নড়াচড়া করার সময়ও এ ব্যাথা হতে পারে। রাউন্ড লিগামেন্ট পেইনের কারণে শারীরিক ধকল গেলেও চাপা ব্যাথা অনুভূত হতে পারে।

রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন এক ধরনের তীব্র ব্যাথা যা সাধারনত অল্প সময়ের জন্য হয় এবং অনেকটা মাংশপেশীর খিঁচুনির মত মনে হতে পারে। এ ব্যাথা দুপাশেই হতে পারে তবে ডান পাশে বেশী হয় যা কুঁচকি (gorin) পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

 

গর্ভাবস্থায় রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন এবং পেটের অন্যান্য ব্যাথার মধ্যে পার্থক্য কি ?

রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন গর্ভাবস্থায় খুবই স্বাভাবিক বিষয়। তবে এর ব্যাথা ব্যাক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। প্রথমবার গর্ভধারণে এটি মায়েদের উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কিন্ত এর লক্ষন গুলো জানা থাকলে মায়েদের উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে।

রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন এর কারণে তলপেটে বা কুঁচকিতে হঠাৎ করে তীক্ষ্ণ ব্যাথা অনুভূত হয়। এটি সাধারনত ডান পাশে বেশী হয় তবে কিছু কিছু মায়েদের দু পাশেই ব্যাথা হতে পারে। সু সংবাদ হোল এই ব্যাথা ক্ষণস্থায়ী। এটি সাধারণত কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের মধ্যে চলে যায়। কিছু কিছু কাজকর্ম এবং নড়াচড়ার কারণে এ ব্যাথা দেখা দিতে পারে। যেমন ব্যায়াম করার সময়, হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময়, বিছানায় নড়াচড়া করার সময়, হঠাৎ উঠে দাঁড়ানোর সময় ইত্যাদি।

তবে খেয়াল রাখতে হবে গর্ভাবস্থায় পেট ব্যাথা অন্যান্য আরও জটিলতার কারনেও হতে পারে, যেমন- প্রি-টার্ম লেবার, প্রি-এক্লাম্পশিয়া, প্লাসেন্টা অ্যাবরাপশন সমস্যা ইত্যাদি। এছাড়াও এপেন্ডিসাইটিসের কারণেও পেট ব্যাথা হতে পারে। তাই সাবধান থাকা জরুরী।

 

কখন ডাক্তার দেখাতে হবে ?

রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন সাধারনত কিছুক্ষনের মধ্যেই সেরে যায়। তবে যদি পেট ব্যাথা কিছুক্ষন বিশ্রাম নেয়ার পরও না সারে এবং এর সাথে যদি নীচের উপসর্গ গুলো দেখা দেয় তবে দেরী না করে অতিসত্বর তা চিকিৎসককে জানাতে হবে-

  • তীব্র ব্যাথা বা খিল ধরা অনুভুতি
  • এক ঘণ্টায় চার বা তার বেশী বার কন্ট্রাকশন অনুভূত হলে (যদি তাতে ব্যাথা নাও থাকে) বা কন্ট্রাকশন অনবরত চলতে থাকলে।
  • লোয়ার ব্যাক পেইন ( বিশেষ করে যদি আগে ব্যাক পেইন না হয়ে থাকে) বা পেলভিসে চাপ অনুভূত হলে (যাতে মনে হয় বাচ্চা নীচের দিকে চাপ দিচ্ছে)
  • যোনিপথে রক্তক্ষরণ বা স্পটিং দেখা গেলে বা যোনিপথে নির্গত তরলের পরিমান বেড়ে গেলে বা পরিবর্তিত হলে।
  • জ্বর হলে, শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেলে, বমি বমি ভাব বা বমি হলে।
  • প্রস্রাবের সময় ব্যাথা বা জ্বালাপোড়া করলে।
  • হাঁটাচলা করতে অসুবিধা হলে।

মনে রাখতে হবে গর্ভাবস্থা খুবই সংবেদনশীল সময়। তাই কোন ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়। মনে কোন ধরনের সন্দেহ হলে তা বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করা উচিত।

রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন থেকে কিভাবে স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে?

রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন গর্ভাবস্থার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটি পুরোপুরি দূর করার কোন উপায় নেই। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাবধান থেকে এর থেকে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে-

রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন হলেই বসে পড়ুন এবং রিলাক্স করার চেষ্টা করুন। কিছুক্ষন বিশ্রাম নিলেই এর থেকে স্বস্তি পাবেন। যদি বসে থাকা অবস্থায় ব্যাথা হয় তবে দাঁড়িয়ে পড়ুন বা হাঁটা চলা করুন। মোট কথা পজিশন পরিবর্তন করুন।

সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। চেষ্টা করুন যাতে দাঁড়ানোর সময় ঘাড় যাতে পেছনের দিকে থাকে। বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে না থাকার চেষ্টা করুন। দাঁড়িয়ে থাকতে হলে কিছুক্ষন পর পর বসে বিশ্রাম নিন। এমনসব নড়াচড়া কম করার চেষ্টা করুন যাতে রাউন্ড লিগামেন্টের উপর চাপ পড়ে।

গর্ভাবস্থায় বাম পাশ ফিরে শোওয়ার চেষ্টা করুন।এছাড়াও ঘুমানোর সময় দুপায়ের মাঝখানে বালিশ ব্যাবহার করতে পারেন যাতে উপরের পায়ের ভর বালিশের উপর পড়ে। পেটের নীচে বালিশ ব্যাবহার করতে পারেন বা পিঠের দিকে বালিশ দিয়ে সাপোর্ট দিতে পারেন।

বিছানা থেকে বা বসা থেকে ওঠার সময় আস্তে আস্তে উঠুন। হঠাৎ নড়াচড়ার কারণে রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন বেশী হয়। তাই ধীরে নড়াচড়া করুন।হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময় কোমর ও হাঁটু সামান্য বাঁকিয়ে নিন। এতে লিগামেন্টে চাপ কম পড়ে।

হালকা গরম সেঁক দেয়া যেতে পারে বা হালকা গরম পানিতে গোসল করে নিতে পারেন। এতে ব্যাথা নিরাময় হয়। তবে মনে রাখতে হবে বেশী গরম লাগানো চলবেনা কারণ এতে গর্ভের বাচ্চার ক্ষতি হয়।

প্রফেশনাল কাউকে দিয়ে মাসাজ করাতে পারেন। মাসাজের ফলে কিছুটা আরামাবোধ করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে মাসাজ আলতোভাবে করা হয় এবং বেশী চাপ প্রয়োগ করা না হয়।ম্যাটারনিটি বেল্ট ব্যাবহার করতে পারেন। এর ফলে রাউন্ড লিগামেন্ট পেইনের পাশাপাশি ব্যাকপেইন থেকেও স্বস্তি মিলতে পারে।

এ ক্ষেত্রে শরীরচর্চা বা ব্যায়াম খুবই উপকারী। তবে মনে রাখতে হবে গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম করার আগে অবশ্যয় ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে নিতে হবে কারণ আপনার এমন কোন কন্ডিশন থাকতে পারে যার জন্য কিছু কিছু ব্যায়াম বা ব্যায়াম করা পুরোপুরি আপনার জন্য নিষিদ্ধ হতে পারে। গর্ভাবস্থায় স্ট্রেচিং ব্যায়াম করলে রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন থেকে স্বস্তি মিলতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে এ ধরনের ব্যায়াম করার সময় তা দ্রুত করা না হয় বা স্ট্রেচিং বেশী করা না হয়। এর ফলে হিতে বিপরিত হতে পারে। ব্যায়ামের সময় সব সময় নিজের শরীরের কথা শোনার চেষ্টা করুন। যখনি মনে হবে অসুবিধা হচ্ছে বা ব্যাথা হচ্ছে তখন ব্যায়াম বন্ধ করুন।

যদি খুব বেশি সমস্যা হয় তবে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। তবে যে কোন ওষুধ সেবনের আগেই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

সবার জন্য শুভকামনা।

 

Related posts

Leave a Comment