গর্ভাবস্থায় ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস বা যৌনাঙ্গে ইনফেকশন

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস কি?

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস বা BV হোল ১৫-৪৪ বছরের মহিলাদের সবচাইতে কমন যোনীসংক্রান্ত সংক্রমণ। এটি যোনীতে ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যহীনতার কারণে দেখা দেয়। শতকরা ১০-৩০ ভাগ মহিলায় গর্ভাবস্থায় এ সংক্রমণের শিকার হন।

যোনীতে সাধারণত বেশীরভাগ ভালো ব্যাকটেরিয়া বা lactobacilli এবং কিছু খারাপ ব্যাকটেরিয়া বা anaerobes থাকে। lactobacilli ব্যাকটেরিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকে এবং অন্য ব্যাকটেরিয়াদের নিয়ন্ত্রনে রাখে। কোন কারণে lactobacilli ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমে গেলে অন্য খারাপ ব্যাকটেরিয়া গুলো নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। সে সময় ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস বা BV দেখা দেয়।

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস কেন হয়?

যোনীতে ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার কোন নির্দিষ্ট কারন জানা যায়নি কিন্তু কিছু কিছু বিষয়  ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করা হয়-

  • Douche এর ব্যাবহার(Douching)। Douche হোল পানি ও ভিনেগার এর একধরনের মিশ্রণ যা যোনী পরিষ্কার করতে অনেকে ব্যাবহার করে। দোকানে যেসব Douche পাওয়া যায় তাত এন্টিস্যাপটিক এবং সুগন্ধি ব্যাবহার করা হয়।
  • অনিরাপদ যৌন সংগমের কারণে। (বিশেষ করে একাধিক যৌনসঙ্গী বা যৌনসঙ্গী পরিবর্তন হলে)
  • ভ্যাজাইনাল ডিয়োডোরেন্ট, ভ্যাজাইনাল স্প্রের ব্যবহার ।
  • এ্যান্টিবায়োটিক এবং স্টেরয়েডের ব্যবহার ।
  • জন্মনিয়ন্ত্রনের জন্য IUD বা Intrauterine Device

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিসের লক্ষন কি?

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিসে আক্রান্ত অর্ধেক মহিলাদের ক্ষেত্রেই কোন ধরনের লক্ষন দেখা যায় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্গন্ধযুক্ত সাদা বা ধুসর বর্ণের স্রাব নির্গত হতে পারে। পিরিয়ডের সময় বা শারীরিক মিলনের পর দুর্গন্ধ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। প্রস্রাবের সময় জ্বালা পোড়া এবং যৌনাঙ্গে চুলকানির উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

এ ধরনের লক্ষন দেখা গেলেই আপনার চিকিৎসককে জানান। তিনি BV বা অন্য ইনফেকশনের পরীক্ষা করে দেখবেন এবং সে অনুযায়ী নির্দেশনা দেবেন।

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস নির্ণয়ের পরীক্ষা

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস নির্ণয়ের জন্য আপনার চিকিৎসক বেশ কিছু পরীক্ষা করে দেখতে পারেন –

  • আপনার মেডিকেল হিস্ট্রি- আপনার চিকিৎসক এর আগে কোন সংক্রমণ বা যৌন বাহিত কোন রোগ হয়েছিল কিনা সে সম্পর্কে জানতে চাইবেন।
  • পেলভিক এক্সাম- পেলভিক এক্সামে যোনী পরীক্ষা করে দেখা হয় সংক্রমণের কোন লক্ষন আছে কিনা।
  • যোনী নিঃসরিত রস এর পরীক্ষা করে দেখা হবে।
  • ভেজাইনাল পি-এইচ টেস্ট করা হবে।

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস গর্ভধারণে কি ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?

গবেষণায় দেখা গেছে ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিসের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই বাচ্চা প্রসব, জন্মের সময় বাচ্চার ওজন কম হওয়া, এবং প্রসবের পর জরায়ুতে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিছু কিছু গবেষণাতে দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস ও গর্ভপাতের মধ্যে সম্পর্ক দেখা গেছে।

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস ও গরভকালীন জটিলতার মধ্যে সম্পর্ক এখন খুব একটা প্রমানিত না। BV  তে আক্রান্ত অল্প কিছু মায়েদের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। গর্ভবতী নয় এমন মেয়েদের ক্ষেত্রে পেলভিক ইনফ্লামেটরি ডিজিজ এর সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস  sexually transmitted infection এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। যেমন- গনোরিয়া, ক্লামাইডিয়া, HIV ইত্যাদি ।

গর্ভাবস্থায় ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিসের চিকিৎসা

আপনার যদি ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস  ধরা পড়ে সে ক্ষেত্রে আপনাকে কিছু অ্যানটিবায়োটিক দেয়া হবে যা গর্ভকালীন সময়ে নিরাপদ। তবে অবশ্যয় অ্যানটিবায়োটিকের কোর্স শেষ করতে হবে যদিও আপনি দেখেন যে সংক্রমণের লক্ষনগুলো চলে গেছে। অ্যানটিবায়োটিক আপনার সংক্রমণ সাড়িয়ে তুলতে পারে কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তা আবার যে কোন মুহূর্তে দেখা দিতে পারে।

৩০ ভাগ মহিলার ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস  তিন মাসের মদ্ধে আবার দেখা দেয়। অ্যানটিবায়োটিক এর কাজ হোল খারাপ ব্যাকটেরিয়াগুলো কে মেরে ফেলা কিন্তু তা ভালো ব্যাকটেরিয়া গুলোকে সৃষ্টি করতে পারেনা। তাই যখনি আবার এর লক্ষন দেখা দিবে অতি সত্বর বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করবেন।

ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস  কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়

ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্যহীনতা কেন তৈরি হয় সেটা যেহেতু এখন অজানা তাই ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস  প্রতিরোধের নির্দিষ্ট কোন উপায় নেয়। তবে আপনি কিছু ব্যাপারে সাবধান থেকে এর ঝুঁকি কমাতে পারেন।

নিরাপদ যৌন মিলনের চেষ্টা করুন। যদি এর সাথে ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস এর সরাসরি কোন সম্পর্ক প্রমানিত হয়নি। তবে যারা কখনও যৌন মিলন করেনি তাদের ক্ষেত্রে এ রোগের লক্ষন কম দেখা যায়।

ধূমপানের অভ্যাস থাকলে এখনি তা ত্যাগ করার সময়। ধূমপানের কারনে সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

হট টাব বা বাথ টাব এ গোসল না করে শাওয়ার নেয়ার চেষ্টা করুন। গোসলের পর যৌনাঙ্গ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে এবং শুষ্ক রাখতে হবে। সুগন্ধি যুক্ত ও রুক্ষ সাবান পরিহার করুন।

বিশেষ অঙ্গের যত্ন নেয়া জটিল কিছু নয়। নিয়মিত যত্ন ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ আপনাকে পরিছন্ন ও স্বাস্থ্যবান রাখবে। যত্ন নেয়া মানে শুধু গোসলের সময় পরিষ্কার করা নয়। নারীদের যৌনাঙ্গ প্রতিদিন তিন থেকে চারবার পরিষ্কার করা উচিত। বিশেষ করে বর্ষা ঋতু এবং পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে। যাতে করে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

সুতি কাপড় নরম এবং অধিক ত্বকবান্ধব। বায়ু চলাচল ও দ্রুত আদ্রতা শুষে নেয় সুতি কাপড়। বিশেষ কোনো উপলক্ষে সিল্ক বা অন্য কাপড়ের অন্তর্বাস পড়তে পারেন। তবু নিয়মিত পড়ার জন্য সুতি কাপড়ের অন্তর্বাস সবচেয়ে ভালো।

টাইট জামাকাপড় এড়িয়ে চলুন। কারণ এই ধরনের পোশাক বায়ু চলাচলে বাধা তৈরি করে।Douche ব্যাবহার করা থেকে বিরত থাকুন। এমনিতেও গর্ভাবস্থায় Douche এর ব্যাবহার উচিত নয়।

 

সবাই ভালো থাকুন, শুস্থ থাকুন। সবার জন্য শুভ কামনা।

Related posts

Leave a Comment