মায়ের কলম থেকেঃ “আমার আলী”

লিখেছেন ঃ Samantha Saberin Mahi

আলীর জন্ম 

আলী আমার ৩য় সন্তান। ওর বড় আব্দুল্লাহ , আমার বড় ছেলে। আর ওর বড় আঈশা, আমাদের মেয়ে। আলহামদুলিল্লাহ। আলী পেটে আসার আগে অনেক পরিকল্পনা , অনেক কিছু করেছি যেমনঃ ডায়েট কন্ট্রোল , এক্সারসাইজ , হাটা ইত্যাদি। যাতে ফিট থাকি , আলহামদুলিল্লাহ ফিট ছিলাম এবং আছি। আলী পেটে আসার ২ মাস আগে একটা মিসক্যারেজ হয়। তবে আলহামদুলিল্লাহ D&C লাগে নাই। ডাক্তার বললেন এরকম হতে পারে , অনেকে বোঝেনও না তবে আমি বুঝতে পেরেছি এই যা। তবে অনেক কেঁদেছিলাম , খুব কষ্ট লেগেছিলো। তাই ওজন কমানো বা যে পরিকল্পনা মত এগোচ্ছিলাম সব বাদ দিয়ে সন্তান চাচ্ছিলাম।আলহামদুলিল্লাহ ২মাস পরেই আলীর খবর পেলাম। সবকিছু ঠিকঠাক যাচ্ছিলো। তবে মধ্যে ভয়ানক গরম পড়লো। রাতে গরমে ঘুমাতে পারলাম না। এসি ছিল না। গায়ে, পায়ে হালকা পানি আসলো। কিন্তু ব্লাড প্রেসার নরমাল। খুব একটিভ থাকার চেষ্টা করেছি , ছিলামও।

চট্টগ্রাম গেলাম বেড়াতে শ্বশুরবাড়ি। আসার পরের দিন হঠাৎ আঈশার বাবা অফিস থেকে কল করে বললো “তোমার মনে হয় অনেক পানি চলে এসেছে একটু প্রেসারটা মাপো তো। ” প্রেসার মাপলাম , ১০০/১৫০!! ওকে ফোন করে জানালাম। ডাক্তার দেখলাম, ওষুধ দিলেন। ২ সপ্তাহ কন্ট্রোল থাকলো তারপর আবার বেশি। ডাক্তার বললেন ভর্তি হতে, মনিটরে রাখতে হবে। ওষুধের ডোজ বাড়াতে হলো। প্রেসার কন্ট্রোল হলো। ডাক্তার বললেন আল্ট্রাসাউন্ড করা লাগবে , দেখতে হবে বাচ্চা ঠিকভাবে বাড়ছে কি না।

আল্ট্রাসাউন্ড করানোর জন্য নেয়া হলো। তাতে দেখাচ্ছে আলী ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত বেড়েছে কিন্তু আমার তখন চলে ৩০ সপ্তাহ ! সোনোগ্রাফার ম্যাডাম ২০ মিনিট ধরে দেখলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম , ” ম্যাডাম, আমার বাবু ঠিক আছে?” উনি বললেন, ” হুম! তবে ছোট” খুব চিন্তিত মনে হলো ওনাকে। আমাকে রুমে আনার পর একটু শুয়েছি ঠিক তখনি, আমার গাইনি ডাক্তারের সহযোগী আরেকজন ডাক্তার পুরা টীম নিয়ে আমার রুমে ঢুকলেন। আমার বড় বোন ছিল সেইদিন হসপিটালে। আঈশার বাবা আমাকে রুমে দিয়ে সবে রওনা হয়ে গেলো অফিসের দিকে। ওনারা এসেই আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন আমার বোনকে। তারপর বললেন আজকেই সিজার করতে হবে আমার আলীর রিস্ক হয়ে যাচ্ছে।

আমার বোন বললো যে ওর ( আমার বোনের) প্রথম বাচ্চার সময় প্রেসার হাই ছিল কিন্তু ডাক্তাররা অপেক্ষা করেছেন ৩২ সপ্তাহ পর্যন্ত। তখন ডাক্তাররা বললেন আমার প্লাসেন্টা ম্যালফাংশন করছে। বাচ্চা পেটে বাড়া বন্ধ হয়ে গেছে। ওর ব্রেন এ শুধু ব্লাড ও অক্সিজেন যাচ্ছে , নিউট্রিশন যাচ্ছে না। এই কন্ডিশন কে IUGR ( inter uterine growth retardation ) বলে। যদি এই অবস্থা থাকে তাহলে স্টিল-বার্থ হতে পারে। তক্ষুনি আমার হাসব্যান্ড কে ডেকে আনার কথা বললেন। আঈশার বাবা পথেই ছিল। ও ব্যাক করলো সাথে সাথেই। আমি কিন্তু শুয়ে শুয়ে শুনছি সব। আমার মনে হচ্ছিলো সবকিছু কেমন ওলোটপালোট হয়ে যাচ্ছে। আমার আলী কে বের করে ফেললে অনেক কিছুই হতে পারে! আমি কাঁদলাম , আমার বোন কে জিজ্ঞেস করলাম ” কেন?”  ও বললো ” আপু ধৈর্য্য ধরো ইনশাআল্লাহ , আল্লাহ সাথে আছেন।”

তখন মনে পড়লো হাসপাতালে আমার রুমের পাশের বেডের মেয়েটার কথা, মাত্র ২৬ বছর বয়স , বিয়ের বয়স ৮ বছর। ৮ বছরে ২টা বাচ্চা মারা গিয়েছে। prematurely হয়ে যায় ওর। পেইনলেস কন্ট্রাকশন্স হয়। uterus ধরে রাখতে পারে না। তাই ৩য় বাচ্চার জন্য হসপিটালেই আছে , যে কোনো ইমার্জেন্সি তে যাতে কিছু করা যায়. ( আলহামদুলিল্লাহ ওর বাচ্চা হয়েছে , ভালো আছে, আল্লাহ যেন হায়াত দেন আর নেক মুসলিম হতে পারে দোআ রইলো ) ওর কথা ভেবে নিজেকে স্বান্তনা দিচ্ছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ বললাম। জোহর ও আসর সালাহ জমা করে পড়লাম।প্রতিটা সিজদাহ মনে হচ্ছিলো জীবনের শেষ সিজদাহ। আম্মু, আব্বু , আমার ছোট বোন, ছোট মামা আসল। আমার যেই বাবা যেকোনো বিপদে সবসময় সবার আগে বলে,”তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ ” , সে আজকে এসে কিছু বলতে পারছে না। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে নির্বাক হয়ে আছে। আমি বললাম ,” বাবা, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ”. বাবা কিছু না বলে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। আম্মুকে দেখে শুধু বললাম ,” মা, আমার আলী যদি থাকে তাহলে যেন সুস্থ থাকে আর না থাকলে যেন আমাদের জন্য শাফায়াত করে এই দুয়া করো। ” আম্মু বললো ,” অবশ্যই মা”….. আমরা সবাই কাঁদলাম। আমার স্বামীকে আল্লাহ রহমত করেন , ও হাসি মুখে ছিল। আমাকে সবাই অনেক সাহস দিলো। আমাকে যখন OT এর জন্য রেডি করে wheelchair এ বসানো হলো, আমি চিৎকার করে বলতে চাচ্ছি —-” আমাকে নিয়ো না। আমি যাবো না। আমার আলী অনেক ছোট্ট। কিন্তু মুখ দিয়ে কিছুই বলতে পারছিনা।

আলহামদুলিল্লাহ স্কোয়ার হসপিটাল এর পুরা টীম অপরিসীম সাহস দিয়েছেন এবং আমার পর্দার পূর্ণ হিফাজত ensure করেছে আলহামদুলিল্লাহ। OT তে যাওয়ার পর থেকেই অনেক সাহস পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিলো সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার ডাক্তার আসলেন আর বললেন ,”কি করবো বলেন রিস্ক হয়ে যাচ্ছিলো, আল্লাহ চাইলে সব ঠিক হবে ইনশাআল্লাহ। ” উনি অপারেট করছেন আমি শুনছি বলছেন ,” এই টুকু একটা সাইজ আবার শক্তি দেখায়।” কথাটা শুনে খুব ভালো লাগলো। মনে হলো আলহামদুলিল্লাহ আমার আলী দুর্বল না। ম্যাডাম আমার বাচ্চাটাকে এক ঝলক দেখালেন। NICU এর ডাক্তার ছিলেন ভিতরে, উনি হ্যান্ডওভার নিলেন আলীর। আলী কে নিয়ে যাওয়া হলো। ওর কান্না শুনছিলাম। পোস্ট অপারেটিভে নার্সরা খুব ভালো ছিলেন। আমার প্রতি সবাই খুবই সহানুভুতিশীল ছিলেন। আমি খুব অস্থির ছিলাম আলীর কোনো খবর পাচ্ছি না। বের হয়েই দেখি আঈশার বাবা দাঁড়িয়ে হাসছে , আমাকে বললো ,” মাশাআল্লাহ , কি বাচ্চা জন্ম দিসো? ওর ওজন ১.০৬২ কেজি। লাইফ সেভিং একটা ইনজেকশন লাগে premature বেবিদের , ওর সেটা লাগে নাই, লাইফ সাপোর্ট লাগে নাই। শুধু। .২লিটার অক্সিজেন লাগছে।” আমি বললাম ,” আল্লাহ দিসেন, আল্লাহু আকবার” আলহামদুলিল্লাহ। তখনি বুঝেছি আমার আলী স্পেশাল বাচ্চা। আল্লাহর প্রিয় ইনশাআল্লাহ।

অপেক্ষা:

অক্সিজেন লাগলো শুধু ৩ দিন। এরপর অপেক্ষা করছি খাবার স্টার্ট করবে কবে। সবাই, যাদের premature বেবিদের এক্সপেরিয়েন্স আছে , সাহস দিলো। এরকম বাচ্চা খুব দ্রুত বাড়ে শুধু খাবার টা start করার ব্যাপার। আমরা থাকি উত্তরা। আলীর জন্য স্কয়ার হাসপাতালের পাশে একটা বাসা খুজছিলাম। এক দ্বীনি ভাই এর সহায়তায় পেয়েও গেলাম। আলহামদুলিল্লাহ। ওনারা আমাদের জন্য যা করেছেন তা সারা জীবনেও ভুলার মতো না। আল্লাহ ওনাদের দুনিয়া ও আখিরাতে মঙ্গল করুন। ৭ দিন পর খাবার শুরু করলেন ডাক্তার। ৬ ঘন্টা পরপর ১ ml. প্রতিদিন ১ml করে বাড়ছে। ৩দিন পর ৬ ঘন্টার জায়গায় ৩ ঘন্টা পরপর হলো। হঠাৎ , ১৩ দিনের দিন ডাক্তার বললো ওই ফিডিং বন্ধ! কেন? পেট ফুলে উঠেছে , ও বমিও করেছে। তখন ৯ml ৩ঘন্টা পরপর চলছিল। আমি হতাশ হলাম। আলীর ওজন ১কেজি ৮৫গ্রাম মাত্র। খাবার বন্ধ করায় ৫দিনে কমে হলো ৯০০ গ্রাম! ডাক্তার ৬ দিনের দিন বললেন পেট ফুলা কমেছে আবার খাবার স্টার্ট করবেন। আবার ৬ঘন্টা পরপর ১ml দিয়ে শুরু। যখন ১০ml পর্যন্ত গেলাম, আবার ফিডিং বন্ধ! তখন ২৩ দিন আলীর বয়স। ওজন ১কেজি ৬০গ্রাম।

৪দিন পর লাক্টোজ ফ্রি ফর্মুলা দিলেন আমারটা বাদ দিয়ে। ওর যখন ৩৭ দিন তখন আবার পেট ফুলে উঠলো। আমরা কি করবো বুঝতে পারছিনা। ডাক্তাররা বললেন ওর NEC ( Necrotizing enterocolitis) স্টেজ ১। আমরা খুঁজতে লাগলাম বাংলাদেশে NICU ডাক্তারদের মধ্যে ভালো কে আছেন। তখন ডাক্তার জাবরুল এর নাম খুব শুনছি। আমরা খুঁজে পেলাম ওনাকে , গেন্ডারিয়াতে আসগর আলী হাসপাতালে আছেন। উনি সেখানকার সিইও। আমাদের আলী বাড়ছে না আর ৪০ দিন হয়ে গেছে হাসপাতালে। খরচ প্রচুর। তবে আল্লাহ সহজ করে দিলেন সেটাও। আমার বাবা, আম্মু, ছোট মামা, আমার বোনেরা অনেক হেল্প করেছে আলহামদুলিল্লাহ। ডাক্তার জাবরুল আমাদের বললেন উনি চেষ্টা করে দেখতে চান তবে আমাদের মনে রাখতে হবে উনিও মানুষ , হায়াত মতের মালিক এক মাত্র আল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ ডাক্তার সাহেব দ্বীনদার।

উনার কথায় আশ্বস্ত হয়ে আমার হাসব্যান্ড ঠিক করলেন পরের দিনই আলীকে আসগার আলী হাসপাতাল এ শিফট করা হবে। আলীর আবার চোখে ROP ( Retinopathy of Prematurity) পসিটিভ এসেছে। তাই ওর চোখে লেজার করতে হবে। যেদিন স্কোয়ার থেকে ওকে বের করা হলো সেইদিনই আসগার আলী NICU টীম ওর হ্যান্ডওভার নিলো আর বাংলাদেশ আই হাসপাতালে লেজার শেষে ওকে নিয়ে গেলো। আমরাও গেলাম। আলীর বয়স ৪০ দিন , ওজন ৯১০গ্রাম। ডাক্তার বললেন ওর যে কন্ডিশন তাতে ওকে খাবার দেয়া যাবে না কমপক্ষে ১৪ দিন! কিন্তু ওর ওজন খুবই কম আর অকাল্ট ব্লাড টেস্ট পসিটিভ এসেছে, অর্থাৎ ওর পায়খানার সাথে ব্লাডস্টেইন আসছে যা খালি চোখে দেখা যায় না। এজন্য একটু চিন্তার বিষয় আছে। তবে যদি আমরা কিছু নিউট্রিশন ইনজেক্টিবলস আনতে পারি যা ছোট বাচ্চাদের উপযোগী যেটা বাংলাদেশে পাওয়া যায় না…পাওয়া যাবে ব্যাংককে, তাহলে ওনারা চেষ্টা করবেন ওজনটা ধরে রাখার। আমি খুব ভেঙে পড়লাম তবে স্থির ছিলাম তখনও। আমাকে আলীর একটা জামা যেটা পরিয়ে NICU থেকে বের করেছে আর একটা তাওয়াল দেয়া হলো। আমরা পান্থপথের বাসাটায় তখনো আছি , আলীর জামা আর তাওয়ালটা বুকে নিয়ে অনেক কাঁদলাম।

আঈশার বাবা ঠিক করলো আমরা আমাদের উত্তরা বাসায় ফেরত যাবো। সপ্তাহে ২ দিন আলীকে দেখতে আসবো। ফ্রাইডে স্যাটারডে ছাড়া পসিবল না কারণ অনেক জ্যাম। আলীর মেডিসিন কিভাবে জোগাড় হবে তা নিয়ে কাজে নেমে পড়লাম।আমার হাসব্যান্ড খোঁজ করলেন। আমি ফেইসবুকে খোঁজ করলাম। আলহামদুলিল্লাহ সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লেন আমাদের সাহায্য করতে। ফেসবুকে যতবার যতজন বোন আমার পোস্টটা শেয়ার করেছেন লিখেছেন ” please help , she is my sister ” আমি কেঁদেছি। আলহামদুলিল্লাহ। আমি যখন প্রথম ইসলামিক জীবন বেছে নিয়েছিলাম তখন ছিলাম পুরা একা। আলহামদুলিল্লাহ এখন কত ভাই বোন , কত্ত বড় পরিবার! মাশাআল্লাহ। লা হাওলা ওয়া লা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ। ওই রাতটা বিভীষিকার মত কাটলো। পরের দিন সকালে চারিদিক থেকে খবর আসলো আলীর ওষুধ পাওয়া গেছে আলহামদুলিল্লাহ।

৫ সেট ওষুধ জোগাড় হলো। ৪ সেট আলী গিফট পেয়েছে। একবোন আমাকে personally চেনেন না , আলীর জন্য ওষুধ লোক দিয়ে আমার বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। আমার থেকে আলী ও ওর বাবার নাম জেনে নিলেন বললেন তিনি সাদকা করবেন। বারাকাল্লাহু ফীহা। যদিও আলীর আকীকাহ ৭ দিনের দিন করানো হয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ। ভাইরা ব্যাংকক , মালয়েশিয়াতে ডক্টর এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে প্রেসক্রিপশন জোগাড় করে আমার আলীর জন্য ওষুধ এনেছেন। বারাকাল্লাহু ফিহুম। আমি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ। যারা চেষ্টা করেছেন তবে সফল হন নি , যারা দুআ করেছেন সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। আল্লাহ আপনাদের দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যান করুন, আপনাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করুন আমিন।

আলীর জন্য তার খালামনি,মামা, ফুপি, চাচ্চুদের আনা ওষুধ গুলো দেয়া হলো।  ১৪ দিন খাবার বন্ধ থাকার পর ওর খাবার আবার শুরু করা হলো ১ ml ৮ ঘন্টা পরপর।  ১৮ই জুলাই ওর চোখের আরেকটা লেজার করানো লাগলো।  ঐ দিন ওকে দেখে খুব ফ্রেশ মনে হলো, ৪ টা ছবি তুললাম এম্বুলেন্সে বসে।  ওর দুধের পরিমান অল্প অল্প করে বাড়ছে। ডাক্তাররা খুব আশাবাদী, আমরাও খুশি। তবে আমার ফ্লো কমে গেছে। তাই বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশন এর lactation স্পেশালিস্ট একজন আপুর সাথে ফেইসবুক এ যোগাযোগ করলাম, এপয়েন্টমেন্ট নিলাম ২৪শে জুলাই। গেলাম, আপু কিছু টিপস দিলেন ও ওকেতানি থেরাপি দিলেন। এটা জাপানি একটা থেরাপি, ব্রেস্টমিল্ক এর ফ্লো বাড়ানোর জন্য। এরকম একটা ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে ১৯৮৯ থেকে আছে আর আমি জানতামই না! মহাখালী তে পাবলিক হেল্থ ইনস্টিটিউটে।  আলহামদুলিল্লাহ আমার জন্য খুব উপকারী ছিল।  আমি ডিপ ফ্রিজ করে রাখতে শুরু করলাম। জানলাম নরমাল রুম  temperature এ breast milk  ৬ ঘন্টা ভালো থাকে, রিফ্রিজারেটরে ২৪ অথবা ১২ ঘন্টা , আর ডিপ ফ্রিজে ৬ মাস ভালো থাকে। আর ডিপ ফ্রিজ করা দুধ যদি রিফ্রিজারেটর করা হয় তাহলে ৩ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে। আলহামদুলিল্লাহ অনেক কিছু জানলাম, শিখলাম।

৯ দিন পর, ২৭ শে জুলাই সকালে, আমার হাসব্যান্ড মাত্র অফিসে পৌঁছেছেন ওই সময় হাসপাতাল থেকে কল আসলো যে আলীর পেট আবার ফুলে উঠেছে আর ওর অবস্থা ক্রিটিকাল। ও সাথে সাথে হসপিটালে রওনা হয়ে গেছে। আমি কিছুই জানি না।  আঈশার বাবা হসপিটালে যাওয়ার সময় ভেবেছিলো হয়তো গিয়ে দেখবে আলী দুনিয়ায় নেই। কিন্তু ও গিয়ে শুনলো আলী লাইফ সাপোর্ট এ চলে গেছে। আমাকে তখন কল করলো। প্রথমে জিজ্ঞেস করলো, “কি করো?”  আমি বললাম ,”তেমন কিছু না, কেন?” তখন আমাকে বললো ,” মাহী , ঘাবড়িয়ো না একটা খারাপ খবর আছে। ” আমি আমার মনে একটা ব্যথা অনুভব করলাম। জিজ্ঞেস করলাম , ” আলীর কি হয়েছে?” ও বললো, ” ওর আবার পেট ফুলে গেছে আর গতরাতে লাইফ সাপোর্ট এ চলে গেছে। ” আমি অনেক কাঁদলাম। ফেইসবুক এ স্টেটাস দিলাম যাতে সবাই দুয়া করে।

২৮ তারিখ ওকে দেখতে গেলাম। আঈশার বাবা কখনই NICU এর ভিতরে ঢুকে আলীকে দেখতনা। ও নিতে পারবেনা বলতো। আমি যেতাম, তবে কম , ইনফেকশন হয়ে যাবে ভয় পেতাম। আমি ভিতরে গেলাম , লাইফ সাপোর্ট এ আমার আলী।  ওকে দেখে খুব অসুস্থ মনে হচ্ছে। এটা অবশ্য ওকে সবসময়ই মনে হতো আমার।মনে হতো ওর অনেক কষ্ট বলতে পারে না।  কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ ছোট শিশুদের কষ্ট দেন না।  আমি এটা এখনো বিশ্বাস করি।  আলীর মাথায় ক্যানোলা দেখলাম। পায়ে হাত দিলাম। ওর সাড়া শব্দ নাই।  কিন্তু বুঝলাম ও ঘুমাচ্ছে , বুক উঠানামা করছে। আমরা প্রতিদিন খবর নিচ্ছি। মিনিমাম লাইফ সাপোর্টে আছে, ২ দিন পরপর চেষ্টা করা হয় খুলে ফেলার কিন্তু খুললেই নিঃশ্বাস নেয় না।

ডাক্তাররা বললেন ও চেষ্টা করে না।  আমার খুব খারাপ লাগলো, আমার আলীর শক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে।  ওর চেষ্টা করার শক্তি নাই।  লাইফ সাপোর্ট এ ওজন মাপা যাচ্ছে না।  তবে আমি দেখছি ও অনেক শুকিয়ে যাচ্ছে। ও খেতে পারছেনা যে, তাই।  ডাক্তাররা বললেন NEC স্টেজ ২।  এই বাচ্চাগুলা এক সময় গিয়ে ডিটোরিয়েট করে।  রেসপিরেটরি প্রব্লেম হয়। তবে ওর কন্ডিশন এখনো ভালো কারণ লাইফ সাপোর্টে থাকলেও তা মিনিমাম সেটিং এ আছে।  ওর ফিডিং স্টার্ট হলো আবার। আলহামদুলিল্লাহ। এর মধ্যে ১ সপ্তাহ যেতে পারলামনা ওকে দেখতে।  আমরা থাকি উত্তরা আর আসগার আলী হাসপাতাল পুরান ঢাকা , অনেক দূর।  আমার শ্বশুরের নিমোনিয়া হলো, ওনাকে হসপিটালে ভর্তি করতে হলো।  তাই যেতে পারি নাই। ১১ ও ১২ আগস্ট দুইদিন গেলাম। ১১ তারিখ আলীর পাশে অনেকক্ষন ছিলাম। ওকে ডাকলাম, ওর মাথায় হাত বুলালাম, বুকে, হাতে, পায়ে হাত দিলাম। ওর কোনো সাড়া শব্দ নাই।  ডাক্তাররা বললো ওর একটিভিটি নাই।  যতবার লেজার করানোর জন্য ওকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ততবার ওর কান্না শুনেছি। এছাড়াও লাইফ সাপোর্ট এ যাওয়ার আগেও শুনেছি। ও হাত পা নাড়িয়ে কাঁদতো।কিন্তু ও কিছুই করে না এখন, লাইফ সাপোর্ট এ যাওয়ার পর।

এরপর আবারো পরের সপ্তাহ যেতে পারলাম না।  আমার হাসব্যান্ড এর চিকুনগুনিয়া হলো।  ওকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো। এর মধ্যে  ৩ দিন অন্তর অন্তর আলী কে দুধ দিয়ে আসতে হয়েছে। আমার বাবা, আম্মু দিয়ে এসেছেন কিন্তু ভিতরে ঢুকে আলী কে দেখার সাহস করে নাই।  একদিন আমি গেলাম আমার বাবার সাথে।  আমিও সেইদিন ঢুকতে পারলাম না।  NICU তে ঢুকার জন্য স্পেশাল একটা গাউন থাকে, খুব সকালে যাওয়ায় ঐটা ছিল না।  আসলে আল্লাহর ইচ্ছা। উনি আমার  কষ্ট কম করার ইচ্ছা করেছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহু আকবার।

২৮ তারিখে হাসপাতাল থেকে কল আসলো, আমাদের বলা হলো আলীর তো কোনো ইমপ্রুভমেন্ট নেই , আমরা কি কন্টিনিউ করবো কি না! আমার হাসব্যান্ড আর আমি খুবই বিরক্ত হলাম। আর বললাম আমাদের বাচ্চাকে আল্লাহ যতদিন হায়াত দিয়েছেন আমরা চেষ্টা বন্ধ করবোনা। আর ওর ফিডিং চলছে! ও একদিন ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আমরা দুপুরে আবার কল করলাম আর এই বিরক্তিকর প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তখন ডাক্তার বললেন ওর ফিডিং বন্ধ করা হয়েছে ৫ম বারের মত সকালে,  কারণ ওর ফিডিং টিউব দিয়ে রক্ত আসছে। আমরা দমে গেলাম। মনে হলো, that’s it ! আমার আলী জান্নাতের পথে! কাঁদলাম , দুআ করলাম। দুপুরে রওনা হলেও যাওয়া যাবে না, যে জ্যাম! সন্ধ্যায় attempt নিলাম, উত্তরা থেকেই বের হতে পারলাম না জ্যামের জন্য, ফিরে আসলাম। কিন্তু সব যেন কেমন লাগছে। ফজরের পর যাবো চিন্তা করলাম।

আমার আলীর চলে যাওয়া 

রাত ১১ টা , আঈশা ও আব্দুল্লাহ ঘুম।  আঈশার বাবা এখনো দুর্বল, ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি সালাহ শেষ করে চিন্তা করছি কোরআন পড়ব।  কি ভেবে হিসনুল মুসলিম থেকে বাচ্চার জানাজার দুআটা বের করে পড়ছি। রাত ১২ টা , হাসপাতাল থেকে কল আসলো। আমার মনে হচ্ছিলো কল আসবে। নিজেকে আগে থেকে রেডি করছি। দুআ করছি আল্লাহর কাছে যাতে সবর করি , উনি যেভাবে রিঅ্যাকশন পছন্দ করেন তাই যেন করি আর তাই যেন বলি।  আঈশার  বাবা কল ধরলো। ওর সাথে কি কথা হলো আমাকে বললো না।  শুধু বললো, ” মাহী , রেডি হও, আমাদের হাসপাতালে যেতে হবে, আলী আর বেশিক্ষন নাই। ” আমি বললাম , ” আলহামদুলিল্লাহ। ইন্না নিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।” বলেই কেঁদে দিলাম। আম্মুকে কল করে জানালাম। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি বাসায় ছিলেন, ঘুমাচ্ছিলেন। ওনাদের জানালাম। আঈশার  বাবা সালাতে দাঁড়িয়ে গেলো। আমি রেডি হচ্ছি , হাসপাতাল থেকে আবার কল।  আমি ধরলাম।  আমাকে বললো ,” আপনি কে হন আলীর?” আমি বললাম, ” আমি ওর মা, আমাকে বলেন, সমস্যা নাই। ” উনি বললেন, ” আপনারা আস্তে আস্তেই আসেন, ওর হার্টবিট পাওয়া যাচ্ছিলো না কিন্তু এখন অনেক চেষ্টা করে হার্ট বিট এসেছে।” আমি বললাম, ” আপা আমরা আসছি।  এখনই রওনা হবো ইনশাল্লাহ।” উনি বললেন, ” ঠিক আছে, আসেন।”

হাসপাতালে আমরা uber  করে রওনা হলাম। বাবা, আম্মু, আমার বড়বোন গাড়িতে রওনা হয়ে গেছে। যাবার পথে হঠাৎ খুব খারাপ লেগে উঠলো, কাঁদলাম। আঈশার  বাবা বললো, ” মাহী, জানি তুমি মা, তোমার কষ্ট আমার থেকে অনেক বেশি কিন্তু তোমাকে রিকোয়েস্ট, কাঁদবা কিন্তু চিৎকার করবানা। এটা  আমাদের আল্লাহর সন্তুষ্টির লাইফ টাইম অপরচুনিটি।  হেলায় হারায় ফেলো না।” আলহামদুলিল্লাহ।  আমি আর কাঁদলাম না।  হাসপাতালের যখন কাছাকাছি, রাত ১:৩০ টা।  হাসপাতাল থেকে আবার কল।  আমি বুঝে গেলাম আমার আলী আল্লাহর কাছে চলে গেছে। জিজ্ঞেস করলো,”আপনারা কতদূর?”  আমরা হাসপাতালে পৌঁছে দেখলাম বাবা, আম্মু, মৌরি আপু বসে আছে আমাদের জন্য।

আমরা হসপিটালে পৌছালাম ১:৪৫ এ।  আমাদের ডিউটি ডাক্তার বসালেন আর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন , ” ওর লাইফ সাপোর্ট আমরা এখনো খুলি নাই কিন্তু ও আসলে …” আর বলতে পারছিলেন না।  আমি বললাম , ” নাই , না আপা?” উনি বললেন , ” জ্বী ” আমি বললাম , ” আলহামদুলিল্লাহ, ইন্না নিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহী রাজিউন। ” আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,” ওকে কি আপনি এই অবস্থায় দেখতে চান নাকি সাপোর্ট টা  খুলে দিবো?” আমি বললাম, ” আপা খুলে দেন, আমার আলীকে কিছু লাগানো ছাড়া দেখতে চাই। ” আমরা বাইরে এসে বসে অপেক্ষায় থাকলাম।  আমি কাঁদলাম কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ আওয়াজ করি নাই।  আলহামদুলিল্লাহ একবারও আমার রবের প্রতি কোনো অসন্তোষ আসে নাই।  আমার মনে হলো আমার আলীর পেটটাকে দুনিয়ার খাবারের জন্য বানান নি।  ইনশাআল্লাহ আমার আলীর পেট জান্নাতি খাবারের জন্য। ইব্রাহিম (আঃ ) ওকে পালবে এটাই ওর জন্য আল্লাহ পছন্দ করেছেন আমি কি করে ওকে পালবো! আলহামদুলিল্লাহ।

কিছুক্ষন পর ভিতরে যেতে বলা হলো।  আমি আর আম্মু গেলাম। আমার আলীর NICU বেড এর পাশে একটা মনিটর আছে যা আমি আগেও দেখেছি। হার্ট রেট দেখতাম ৯৭।  আজকে দেখছি  (question mark )”?” এই চিন্হ।  আমার আলী কে খুঁজছি। দেখি ওর বেড এর সামনে লেখা ALI  IBN  ARIF …. ওকে সাদা কাফনের কাপড়ে ঢেকে রেখেছে। আমি অনেক কাঁদলাম।  নার্স কে বললাম ,” আপা প্লিজ একটু আমার বাচ্চাটা কে পুরা দেখবো, কখনো দেখি নাই.” নার্স কাপড়টা সরিয়ে দেখালেন। আমাকে একটা চেয়ার দেয়া হলো বসার জন্য।  আম্মু  পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। আমি বললাম, ” আপা প্লিজ একটু কোলে দিবেন? কখনো কোলে নেই নাই। ” নার্স আমাকে কোলে দিলেন। এই প্রথম আমার আলীকে কোলে নিলাম। ও অনেক শুকিয়ে গেছে , অনেক। আমার মা কোলে নিতে চাইলেন দিলাম।  আম্মুও ঐদিন প্রথম আলীকে কোলে নিলো। আম্মু বের হয়ে মৌরি আপু কে নিয়ে আসলো। ও এসেও অনেক কাঁদলো। আমি বললাম , ” আমি দেখেছি, এখন চলো বাইরে গিয়ে বসি। ” আমরা বাইরে গিয়ে বসলাম। আঈশার  বাবা দেখতে যায় নাই, ও বাইরে বসে কোরআন পড়ছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে ওর।  আমি বললাম , ” তুমি দেখবা  না?” ও বললো , ” তোমার কোলে নিবা যাওয়ার সময়, আমি তোমার কোলে দেখবো।”

আলীকে বের করা হলো একটা ট্রলি করে…. ওই একই ক্রেডেল টাইপ ট্রলিতে,  যেটাতে করে ওর চোখের লেজার করতে নেয়া হয়েছিল।তবে একটা কাপড় দিয়ে ঢাকা। আঈশার বাবা কাঁদলো, আমরা সবাই কাঁদছি।  গাড়িতে উঠার সময় আলীকে আবার কোলে নিলাম। গাড়িতে আমার পাশে আঈশার বাবা। ওকে দেখালাম। পুরা পথে মনে হচ্ছিলো এই বুঝি আলী নড়ে উঠলো। কিন্তু না!

বাসায় আসলাম। দীর্ঘ ৯০ দিন অপেক্ষা , আমার আলী বাসায় আসবে, আজকে আসলো। আমাদের বেড রুমে নিয়ে গেলাম, বিছানায় শুয়ালাম। আঈশার বাবা কে দেখালাম।ও অনেক কাঁদলো …

ফজরের জামাত বাকি তখন ১০ মিনিট। আমরা মেয়েরা সালাহ পড়লাম। আঈশার বাবা বললো মসজিদের সামনে যেতে। আলীকে আবার  কোলে নিলাম। মসজিদে গেলাম, ওকে একটা জায়গায় রাখতে বললো রাখলাম। ওর জানাজা হলো।  ওর কবরের জায়গা ঠিক করা, কবর খোঁড়া, এইসব কাজের জন্য কিছু সময় লাগবে তাই আবার বাসায় আসলাম।

আঈশা , আব্দুল্লাহ তখনও জানে না আলী বাসায় এসেছে ! ওরা তো ঘুম পাশের ঘরে।  আমি ওদের গিয়ে বললাম ,” আলী বাসায় এসেছে কে দেখবে?” দুইজনই ঘুম থেকে উঠে গিয়ে বললো ,” আমি দেখবো” আমি বললাম , ” ও কিন্তু জান্নাতে চলে গেছে। ও বেশিক্ষন বাসায় থাকবে না। চলো দেখব মানুষ যখন আল্লাহর কাছে যায় কেমন ভাবে যায়। ” আমার মেয়ে ৮ বছর, ও বুঝে গেছে। ও কান্না করলো। ওকে থামানোই যাচ্ছে না।  আব্দুল্লাহ আলীর কাফনে মোড়ানো ছোট্ট শরীরটা দেখে আমার বুকে মাথা গুঁজে কাঁদছে। আমি বললাম , ” বাবা, তোমার ভাইয়া ইব্রাহিম (আঃ )এর কাছে আছে ইনশাআল্লাহ , ও জান্নাতে আছে ইনশাআল্লাহ, আমাদের সবাইকে এভাবেই আল্লাহর কাছে যেতে হবে।”

আমার আব্দুল্লাহ কান্না থামিয়ে হাসলো। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ বাচ্চাদের ফিতরার উপরে রাখেন।  ও অনেক খুশি ওর ভাই জান্নাতি আলহামদুলিল্লাহ ইনশাল্লাহ। কিন্তু আঈশা  বার বার আলীর চেহারা দেখতে চাচ্ছিলো। আমি দেখাই নাই।  আলী অনেক শুকিয়ে গেছে, ওর দেখলে অনেক খারাপ লাগতো। আমি চেয়েছি ১৮ই জুলাই  তোলা আলীর ছবি গুলাই যেন ওদের স্মৃতিতে থাকে। আঈশার  বাবা ১৫ মিনিটের মধ্যেই কল করলো।  যেখানে ভেবেছি ২/৩ ঘন্টা সময় লাগবে , সেখানে ১৫ মিনিটেই সব ম্যানেজ হয়ে গেলো। আমাকে কল করে ও বললো ,” তুমি কি তোমার আলী কে গোরস্থান পর্যন্ত কোলে নিয়ে যেতে চাও?” আমি বুঝলাম ও কাঁদছে।  বললাম ,”    হ্যা , সাথে আঈশা , আব্দুল্লাহ ও যাবে। ” ও বললো , ” নিচে নামো গাড়ি নিয়ে এসেছি।” আমি নিচে নামলাম, লিফটে আমি আমার ৩ সন্তানকে নিয়ে , আঈশা , আব্দুল্লাহ আর আমার কোলে আলী।  এই দৃশ্য দেখে আঈশার  বাবা কান্না ধরে রাখতে পারে নাই আর।  আমি কেন জানি কাঁদছিলাম না।  আব্দুল্লাহ তো হাসছে , ও আর আমি কেন জানি মেনে নিয়েছি আলী জান্নাতে। আলহামদুলিল্লাহ ইনশাল্লাহ।

গোরস্থানের সামনে পৌছালাম আমি আলীকে আমার কোল থেকে ওর  বাবার  কোলে দিলাম। ও কাঁদছে। আঈশা  কাঁদছে, ও ওর ভাই এর কবর দেয়া দেখবে। আমি যেতে দিলাম না।  আব্দুল্লাহ গেলো ওর বাবার সাথে।  আমাদের দ্বীনি ভাইরা , আমার দুলাভাই , ছোটবোনের হাসব্যান্ড সবাই ছিলেন। আঈশা  কেঁদেই যাচ্ছে। কবর দেয়া শেষে আমার দুলাভাই এসে নিয়ে গেলেন ওকে আলীর কবর দেখাতে।

আমার আলী চলেই গেলো। আমাদের জন্য ইনশাআল্লাহ অনেক বড় পুরস্কার হিসেবে আল্লাহর কাছে জমা থাকলো। আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে গেলো।  আমি শিখলাম যদিও ব্যাপারটা জানতাম তারপরও নতুন করে জানলাম যে , আমাদের প্রত্যেকের একটা date আছে একটা টাইম আছে যখন আমরা আল্লাহর কাছে ফিরে যাবো ইনশাল্লাহ। আমার আলীর জন্য সেটা ছিল ২৮শে আগস্ট রাত ১:৩০ অর্থাৎ ২৯শে আগস্ট।

আমার আলী : জন্ম ৩০ মে ২০১৭ ( ৩রা রমাদান ১৪৩৮হিজরী) সময় : বিকাল: ৪:১৫ মি:

                     মৃত্যু : ২৯শে আগস্ট ২০১৭ ( ৬ই জিলহজ্জ্ব ১৪৩৮) সময় : রাত :১:৩০ মি:

আল্লাহ যেন আমাকে , আমার বাবা-মা,স্বামী, সন্তানদের,  বোনদের , আত্মীয় স্বজন , মুসলিম ভাইবোনদের সকল কে ক্ষমা করেন, ঈমানের সাথে মৃত্যু দেন আর সকলকে জান্নাতে একত্রিত করেন ইনশাল্লাহ।  আমিন।

সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়াবিহামদিকা আশহাদু আল লাইলাহা ইল্লা আনতা আস্তাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক।   

Related posts

Leave a Comment