বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের রোজা রাখা কি উচিত?

অনেক মা মনে করেন, রোজা অবস্থায় শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ালে শিশুরা কম দুধ পায় এবং পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে অথবা রোজার ফলে মার শরীর অসুস্থ হবে ইত্যাদি। যে মায়েদের শিশুরা স্তন বা বুকের দুধ পান করে রমজান মাসে সেই মা’দের বেশ চিন্তিত দেখা যায়। কি ভাবে তার শিশুকে স্তন দান করবেন? রোজা রেখে শিশুকে স্তন দান করা যাবে কি না? রোজা রাখার ফলে বুকের দুধ কমে যাওয়র সম্ভাবনা থাকে কি না? এমন অনেক প্রশ্ন করতে শোনা যায়। তাই এসব প্রশ্ন নিয়েই আজকের আলোচনা।

বাচ্চাকে বুকের দুধ পান করান এমন মহিলাদের কি রোজা রাখতে হবে?

হাদিসে বর্ণনা করা আছে যে, “আল্লাহ্‌ মুসাফির ব্যক্তির জন্য রোজা এবং অর্ধেক নামাজ মাফ করেছেন এবং গর্ভবতী ও বাচ্চাকে বুকের দুধ দেন এমন মহিলাদের জন্য রোজা মউকুফ করেছেন।”

উপরের হাদিসটি থেকে দেখা যাচ্ছে যে বুকের দুধ পান করাচ্ছেন এমন মহিলাদের জন্য রোজা রাখা ফরজ নয় এবং আপনার সন্তানের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করলে আপনাকে রোজা রাখতে হবে না।

তবে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান এবং হিন্দু মহিলারা রোজার মত সময় অভুক্ত থাকেন, কারণ এরকম সংক্ষিপ্ত সময়কাল, যেমন সকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা, না খেয়ে থাকলে বুকের দুধের পরিমাণে বিশেষ তারতম্য হয় না । তবে না খেয়ে থাকার সময়কাল বেশি দীর্ঘ হলে এবং গরমের সময়ে হলে তা মায়ের জন্য কঠিন হতে পারে, কারণ বুকের দুধের পরিমাণ না কমলেও দিন শেষে উনি অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন।

আপানার বাচ্চার বয়স এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাচ্চার বয়স খুব কম (৬ মাসের কম) হলে এবং সে পুরোপুরি বুকের দুধের উপর নির্ভরশীল হলে আপনার রোজা রাখা উচিত নয়। শিশুর বয়স এক বছরের বেশি হলে এবং সে অন্যান্য খাবারের সাথে সাথে দিনে মাত্র কয়েকবার বুকের দুধ খেলে রোজা রাখতে কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরামগণ মনে করেন, মা রোযা রাখার কারনে যদি সন্তান দুধ না পায়, সন্তান ক্ষুধায় কষ্ট পায় সে ক্ষেত্রে ওই মা’র জন্য রমজান মাসের রোজা শিথিল করার বিধান আছে। যদি কোনো মা মনে করেন রোজা রেখে তার শিশুকে দুগ্ধ পান করালে অসুস্থ হয়ে পড়েন বা খারাপ লাগে তাহলে তিনি রোজা এ সময় না রাখলেও পরে এগুলো কাজা রোজা দিতে পারবেন। পরে একটা রোজার জন্য একটাই রোজা রাখতে পারবেন।

রোজা রেখে বুকের দুধ খাওয়ালে কি বাচ্চার কোন ক্ষতি হবে?

রোজা রেখে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ালে বাচ্চার কোন ক্ষতি হয়না কারণ আপনি রোজা রাখলেও আপনার শরীর আগের মতই দুধ উৎপন্ন করবে। রোজার কারণে শরীরে ক্যালোরির ঘাটতি হলেও তা বুকের দুধের পরিমাণের উপর কোন প্রভাব ফেলেনা।

এমনকি আপনি যদি ২৪ ঘণ্টাও না খেয়ে থাকেন সেক্ষেত্রেও বুকের দুধের পরিমাণ কমার সম্ভাবনা নেই। তবে যদি রোজা রাখার কারণে আপনার কষ্ট হয় বা কোন অসুবিধা বোধ হয় সেক্ষেত্রে নিজের স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করেই রোজা রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে।

বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান এমন মায়েদের উপর গবেষণা করে দেখা গেছে যে দুধের পরিমাণ বিশেষ না কমলেও দুধের গঠন-উপাদানে সামান্য পরিবর্তন হয়। তবে বুকের দুধের এই পরিবর্তনের সাথে শিশু সহজেই খাপ খাইয়ে নেয়। গবেষণায় আরও দেখা যায় যে বাচ্চা কেবল বুকের দুধের উপর নির্ভরশীল হলে মাই ভুগতে পারেন। বাচ্চার বৃদ্ধি বা ওজনের উপর তা প্রভাব ফেলেনা।

রোজা রেখে বুকের দুধ খাওয়ালে কি মায়ের কোন সমস্যা হবে?

রমাজন মাসে আপনি চাইলে রোজা রাখতে পারেন, তবে অবশ্যই আপনি সুস্থ বোধ করছেন কিনা, এবং বাচ্চা পরিপূর্ণ পুষ্টি লাভ করছে কিনা সে বিষয়ে খেয়াল রাখবেন। বাচ্চা সঠিক পরিমাণে পুষ্টি না পেলে সারাক্ষণ কান্নাকাটি করবে, তার প্রস্রাব-পায়খানা কমে যাবে এবং পায়খানার রঙ সবুজাভ হবে।

রোজা রেখে বুকের দুধ খাওয়ালে আপনার ওজনও সপ্তাহে এক কেজি করে কমতে থাকবে তবে দুধের পরিমাণে তারতম্য হবে না।। এর চেয়ে বেশি পরিমাণে ওজন কমতে থাকলে বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে রোজা রাখা বন্ধ করুন।

রোজা রেখে এবং না রেখে বুকের দুধ খাওয়ানো মায়েদের উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে দুধরনের মায়েদের রক্তের ক্যামিকেল ব্যালেন্স প্রায় একই  যার মানে হোল তাদের শরীর একই রকম ভাবে কাজ করছে।

তবে একটা বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। যারা বুকের দুধ খাওয়ান তারা জানেন দুধ খাওয়ানোর পর অনেক পিপাসা লাগে। এর ফলে যদি কোন কারণে পানিশূন্য হয়ে পড়েন তাহলে শরীর খারাপ লাগতে পারে। পানিশূন্যতার লক্ষণগুলো হোল-

  • অনেক পিপাশার্ত লাগা
  • গাঢ় বর্ণের প্রস্রাব হওয়া।
  • মাথা হালকা লাগা বা মাথা ঘোরা।
  • ক্লান্ত লাগা বা শরীরে শক্তি না থাকা
  • মুখ, চোখ বা ঠোট শুকিয়ে যাওয়া।
  • মাথা ব্যাথা করা

যদি এসব লক্ষণ দেখা দেয় তবে মায়ের উচিত হবে পানি খেয়ে রোজা ভেঙ্গে ফেলা। এসময় স্যালাইন খেয়ে বিশ্রাম করতে হবে। যদি এর আধা ঘণ্টা পড়েও খারাপ লাগতে থাকে তবে ডাক্তারকে জানাতে হবে।

রোজায় শিশুকে দুধ পান করালে মায়েদের যেসব বিষয় খেয়াল রাখা উচিত

স্তন্যদানকারী মায়ের সবচাইতে বড় সমস্যা হচ্ছে পানি। বুকের দুধ উৎপাদনেও পানির চাহিদা অপরিসীম। ইফতারের পর থেকেই অল্প অল্প করে পানি পান করতে মনে রাখবেন, অন্য সময়ের চাইতে বেশিই পানি পান করতে হবে আপনাকে ইফতার থেকে সেহেরি পর্যন্ত সময়ে। বিশেষ করে সেহেরিতে অনেকটুকু পানি পান করার চেষ্টা করুন।

পানির সাথে সাথে সুষম খাবার গ্রহণেরও চেষ্টা করুন। কারণ রোজায় আপনার অতিরিক্ত ক্যালোরির দরকার হবে। যেহেতু এ সময় বুকের দুধের পুষ্টির কিছু পরিবর্তন হয়, যেমন- জিঙ্ক, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়ামের পরিমাণ সামান্য কমে যায় তাই এসময় মায়ের এসব পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। প্রয়োজনে ডাক্তারের সাথে কথা বলে সাপ্লিমেন্ট খাওয়া যেতে পারে।

ঘরের কাজকর্ম বা যে কোন ধরনের পরিশ্রমের কাজ সেহেরির আগে সেরে ফেলুন। দিনের বেলা যত বেশী সম্ভব বিশ্রাম নেয়ার চেষ্টা করুন।

আপনার শিশুর বয়স যদি ৬ মাসের কম হয় তবে আপনার বুকের দুধই তার জন্য যতেষ্ঠ। প্রতি ২৪ ঘন্টায় ৬ বারের বেশি প্রসাব করলে বুঝবেন আপনার শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে। যদি বাচ্চার প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়, বাচ্চার ওজন কমে যায়, বাচ্চার ঠিকমত দুধ পাচ্ছেনা বলে মনে হয় তবে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন এবং রোজা রাখা থেকে বিরত থাখুন।

সবর জন্য শুভকামনা

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.