নবজাতকের মাথার নরম অংশগুলো সম্পর্কে যেসব বিষয় জেনে রাখা জরুরী

আপনি যদি নতুন বাবা মা হয়ে থাকেন তাহলে এটা খুবই স্বাভাবিক যে শিশুর মাথায় বিভিন্ন নরম এবং নমনীয় অংশ, যেগুলো দেখতে কিছুটা গর্তের মত মনে হয় এগুলো নিয়ে আপনি বেশ অস্বস্তির মধ্যেই থাকেন সবসময়। এই অংশগুলো শিশুর হৃৎস্পন্দন এবং কান্নার সাথে সাথে একটু ফুলে উঠতে পারে। একদম নতুন বাবা-মায়েদের ক্ষেত্রে এই সমস্ত বিষয়গুলো একেবারেই রহস্যের কাতারে পড়ে।

সময়ের সাথে সাথে এই নরম ও গর্ত অংশগুলো ঠিক হয়ে যায় এবং এর আগে এই সমস্ত অংশগুলো নিয়ে খুব একটা দুশ্চিন্তা করবেন না। এই অংশগুলো বেশ নিরাপদ এবং আপনার শিশুর কোন ক্ষতি হবে না। আপনার এই অস্বস্তি অথবা ভয় তা সে যাই হোক, এগুলো কমানোর জন্য আমরা এই আর্টিকেলের মাধম্যে এই নরম অংশগুলো কি এবং কেন, এছাড়া এই অংশগুলোতে কি কি লক্ষণ দেখা গেলে আপনি ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন, তা তুলে ধরেছি।

নবজাতকের মাথায় এই নরম অংশগুলো আসলে কি এবং কেন?

নবজাতকের এই ধরনের নরম অংশগুলো তৈরি হয় মাথার দুটি অংশে। প্রথমটা নাম হল ‘fontanels’ যেটা মাথার সামনের একটা বড় অংশকে বলা হয়ে থাকে এবং দ্বিতীয় অংশটি অপেক্ষাকৃত ছোট এবং এটা মাথার ঠিক পেছনের অংশে অবস্থিত।এই অংশের নাম হল ‘posterior fontanel’। খুলির সামনের দিকের অংশটা কিছুটা ডায়মন্ড আকৃতির এবং পেছনের অংশটি একটি ছোট ত্রিভুজ আকৃতির।

নবজাতকের মাথার নরম অংশ
ছবিঃ firstcry.com

এগুলো দেখলে মনে হতে পারে যে আপনার নবজাতকের মাথার খুলিতে কিছু সমস্যার কারণে এগুলো তৈরি হয়েছে, তবে এগুলোর জন্য খুব একটা চিন্তার কিছু নেই। এই অংশগুলো প্রাকৃতিক ভাবেই তৈরি হয় যাতে করে শিশুর মাথার খুলি জন্মের সময় প্রসবের রাস্তা দিয়ে খুব অনায়াসে বের হতে পারে। জন্মের পর বেশ কয়েক মাস খুলির এ অংশগুলো খোলাই থাকে যখন শিশুর মস্তিষ্ক পরিপক্ব হতে থাকে।

শিশুদেহে এই ফন্টান্যালগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জন্মের সময় এতো সরু নালী দিয়ে শিশুর মাথা বের হয়ে আসা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ফন্টান্যালগুলোর স্থানে শিশুর মাথার অস্থি একটার সাথে আরেকটা ওভারল্যাপ হয়। ফলে শিশুর মাথা স্বাভাবিক থেকে ছোট আকার লাভ করে এবং মায়ের প্রসব কষ্ট অনেকটা হ্রাস পায়।

অন্যদিকে নবজাত শিশুর মস্তিষ্ক প্রাপ্তবয়ষ্ক মস্তিষ্কের প্রায় ২৫ ভাগ হয়, যা এক বছরে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৫০ ভাগ। মস্তিষ্কের এই বৃদ্ধি  প্রায় ২০ বছর বয়স পর্যন্ত চলে। ফন্টান্যাল না থাকলে জন্মের পর মস্তিষ্কের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হত। ফন্টান্যাল থাকায়, এগুলো অস্থি দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত শিশুর মস্তিষ্কে স্বাভাবিক বৃদ্ধি চলতে থাকে।

আপনি যদি দেখেন যে এই অংশগুলো শিশুর হৃৎস্পন্দনের সাথে সাথে স্পন্দিত হচ্ছে, তাহলে এ নিয়ে চিন্তা করবেন না। রক্ত যখন সেই অংশগুলো দিয়ে চলাচল করে তখন এমনটা হয়ে থাকে। মূলত মস্তিষ্ক মাথার এই খোলা অংশের নিচে একটি শক্ত আবরণের দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। 

নবজাতক শিশু যদি অসুস্থ হয় অথবা ঠিকমত তরল পানীয় না পেয়ে থাকে তাহলে আপনি এই নরম অংশগুলোর মাধ্যমে এটা চিহ্নিত করতে পারবেন। এছাড়া যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি শিশুকে একটু বাড়তি সতর্কতার সাথে নাড়াচাড়া করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত এগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই।

নবজাতকের মাথার এই নরম অংশগুলো কখন ঠিক হয়?

শিশুর মাথার খুলির সামনের ফাঁকা অংশটি পূর্ণ হয়ে যাবে ধীরে ধীরে। বেশিরভাগ সময়েই জন্মের প্রায় ছয় সপ্তাহের মধ্যে মাথার পেছনের নরম অংশ মিলিয়ে যায়।  মাথার সামনের দিকের নরম অংশটি প্রায় আঠারো মাসের আগে পুরোপুরি শক্ত হয়ে ঠিক হয়ে যায় না। এই সময়টায় শিশুর মস্তিষ্ক বৃদ্ধি পায় এবং পরিপক্ব হয়।

নবজাতক শিশুর মাথার এই নরম অংশগুলো কি ভঙ্গুর?

এই অংশগুলো দেখতে কিছুটা ভঙ্গুর মনে হলেও, মস্তিষ্ককে নিরাপদ রাখার জন্য এগুলোর নিচে আসলে শক্ত একটা আবরণ থাকে। আপনি চাইলে আলতোভাবে এই অংশগুলো স্পর্শ করতে পারবেন তবে জোরে চাপ দিবেন না।  আপনি যখন শিশুর চুল ধুয়ে দিবেন অথবা শিশুকে কোলে নিবেন তখন প্রতিনিয়তই নিজের অজান্তেই এইসব জায়গায় স্পর্শ লাগবে। তবে এই অংশগুলো ঠিক হচ্ছে কি না অথবা ধীরে ধীরে শক্ত হচ্ছে কি না এটা বুঝার জন্য আপনাকে প্রায় কিছুদিন পরপরই এই অংশগুলো স্পর্শ করে দেখতে হবে।

এই নরম অংশগুলোর জন্য কখন উদ্বিগ্ন হবেন?

কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে নবজাতক শিশুর মাথার এই অংশগুলোর আকার এবং অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে হবে। সাধারণত এগুলো ধরার সময় খুলিতে হালকা গর্তের মত অনুভব হবে। নিচের এই লক্ষণগুলো যদি দেখেন তাহলে অতি শীঘ্রই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হনঃ

যদি গর্তটি খুব বেশি গভীর হয় তাহলে বুঝতে হবে আপনার শিশু পানিশূন্যতায় ভুগছে। তখন আপনি লক্ষ্য করবেন যে আপনার শিশু কিছুটা অসুস্থ। তখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে উনারা পরীক্ষা করে দেখবেন যে সেই অংশগুলো কি ফুলে আছে নাকি বেশি গর্ত হয়ে আছে।

সামনের এই নরম অংশ বেশ ফুলে থাকলে। আপনার নবজাতক শিশু মাথায় আঘাত পেলে এমনটা হয়ে থাকে। তাই এই অংশগুলো ফুলে থাকলে এবং সাথে সাথে জ্বর ও নির্জীব হয়ে থাকলে সেটা উদ্বিগ্ন হওয়ার মতই একটা বিষয়। তবে সামনের নরম অংশটি শিশুর কান্না, কাশি, বমি অথবা মলত্যাগের সময়েও কিছুটা ফুলে উঠতে পারে এবং শিশু তার আগের অবস্থায় ফিরে গেলে এই অংশগুলোর ফুলাও ঠিক হয়ে যায়। তবে ফুলা যদি ঠিক না হয় তাহলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন সাথে সাথে।

আপনার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞই ভালো বুঝতে পারবেন যে এই সমস্ত নরম অংশুগুলোতে কোন সমস্যা হয়েছে কি না। তবে আপনি যদি হাসপাতালে ফোন দিয়ে অসুবিধার কথা জানান, তবে তারা আপনাকেই পরীক্ষা করে দেখতে বলবে যে স্বাভাবিক এর তুলনায় এটা কি গর্ত হয়ে আছে অথবা ফুলে আছে কি না।

যদি এই গর্তগুলো দ্রুত ঠিক হয়ে যায় তাহলে কি করবেন?

নবজাতকের মাথার এই অংশগুলো যদি খুব দ্রুতই ঠিক হয়ে যায় তাহলে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এই দ্রুত ঠিক হয়ে যাওয়াটাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘craniosynostosis’ বলা হয় এবং এর কারণে মস্তিষ্কের অপরিপক্বতা, মানসিক সমস্যা, অন্ধত্ব, হৃদরোগ এবং অস্বাভাবিক আকৃতির মাথা হতে পারে।

তাই প্রথম আঠারো মাসের মধ্যে আপনার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এই নরম ও গর্তের মত অংশগুলো নিয়মিত চেক করবেন এবং প্রয়োজনে বিশেষ ধরনের তৈরি মাথার হেলমেট অথবা অপারেশন করে এই অংশগুলো পুনরায় আগের মত করে দেয়ার জন্য পরামর্শ দিতে পারেন।

শিশুর মাথার অন্যান্য যে বিষয়গুলো আপনাকে ভাবিয়ে তুলতে পারে 

ফুলে ওঠা অথবা কোন ক্ষতঃ নবজাতকের জন্মের পরপর তার মাথার বেশ কিছু অংশ ফুলে যাওয়া অথবা ক্ষত দেখা যেতে পারে। এগুলো সাধারণত শিশুর মাথার পেছনের অংশে বেশি হয়ে থাকে। এছাড়াও আপনি ‘cephalohematoma’ অর্থাৎ প্রসবের সময় তৈরি হওয়া নরম ক্ষতও দেখতে পারেন। এগুলো নিয়ে খুব একটা চিন্তার কিছু নেই কারণ এগুলো খুব দ্রুত নিজ থেকেই ঠিক হয়ে যায়।

চুলের পরিবর্তনঃ আপনার নবজাতক শিশু হয়ত এক গুচ্ছ পুরু চুল নিয়েও জন্ম নিতে পারে অথবা তার মাথায় কোন চুল নাও থাকতে পারে। আবার কখনো দেখা যেতে পারে যে আপনার শিশু মাথা ভর্তি চুল নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছে।

কিছু শিশুর ক্ষেত্রে জন্মের কিছু পরেই সব চুল পড়ে যায়। এই ধরনের চুল সাধারণত গর্ভকালীন সময়ে শিশুর মাথাকে নিরাপদ রাখার জন্য তৈরি হয়। খুব দ্রুতই এগুলো পড়ে গিয়ে নতুন এবং স্বাভাবিক চুল মাথায় চলে আসে। 

আবার কখনো জন্মের পরবর্তী এক মাস থেকে বছর খানেকের মধ্যে দেখতে পারেন যে, আপনার নবজাতক শিশুর চুলের রং হালকা থেকে গাঢ় হচ্ছে আবার গাঢ় থেকে হালকা হয়ে যাচ্ছে। এগুলো সবই খুব স্বাভাবিক বিষয়, এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। 

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.