ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন বা ফলস লেবার পেইন

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন বা ফলস লেবার পেইন কি?

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন হোল জরায়ুর অনিয়মিত সংকোচন যা গর্ভাবস্থার মধ্যবর্তী সময়ে (দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার) দেখা দিতে পারে। তবে তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে এটি বেশী বোঝা যায় (কারো কারো ক্ষেত্রে নাও হতে পারে)। ডঃ. জন  ব্র্যাক্সটন হিক্সের নামে এর নামকরণ করা হয়েছে যিনি ১৮৭২ সালে প্রথম এটি ব্যাখ্যা করেন।গর্ভাবস্থা যত আগাতে থাকে ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন বা ফলস লেবার পেইন তত ঘন ঘন হতে থাকে তবে গর্ভাবস্থার শেষের কয়েক সপ্তাহ আগ পর্যন্ত এ ধরনের সংকোচন অনিয়মিত হয় এবং এতে কোন ব্যাথা থাকেনা।

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশনকে “প্র্যাকটিস কন্ট্রাকশন” ও বলা হয় কারন এ ধরনের কন্ট্রাকশন মায়ের শরীরকে আসল প্রসবের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। কিন্তু এ ধরনের কন্ট্রাকশনের ফলে প্রসব শুরু হয়না। ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন গর্ভাবস্থার ১৬ সপ্তাহের মধ্যে শুরু হতে পারে। তবে শুরুর দিকে এটি এতই মৃদু থাকে যে অনেক মাই তাই অনুভব করতে পারেনা। জরায়ু যতই বড় হতে থাকে ততই এ কন্ট্রাকশন বেশী অনুভূত হয়।

প্রসবের দু এক সপ্তাহ আগে প্রসবের প্রস্তুতি হিসেবে মায়ের জরায়ু মুখ আস্তে আস্তে নরম হতে থাকে। এ সময়ে কন্ট্রাকশন আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হতে পারে এবং এর ফলে মায়ের ব্যাথা অনুভূত হতে পারে বা অস্বস্তি হতে পারে। এ সময়ের কন্ট্রাকশনের ফলে মায়ের জরায়ুমুখ পাতলা (efface) হয়ে যেতে পারে এবং সামান্য খুলে (Dilate) যেতে পারে। এ সময়কে মাঝে মাঝে প্রি-লেবার বলা হয়।

তবে মনে রাখতে হবে ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন বা ফলস লেবার পেইন এবং প্রি-টার্ম লেবারের লক্ষনগুলোর মধ্যে পার্থক্য বোঝা অনেক সময় কঠিন হতে পারে। তাই সাবধান থাকা জরুরী। যদি ৩৭ সপ্তাহ হওয়ার আগেই নিয়মিত কন্ট্রাকশন হতে থাকে এবং প্রি-টার্ম লেবারের কোন লক্ষন দেখা যায় তবে দেরী না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন কেন হয়?

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশনের কিছু সম্ভাব্য কারন থাকতে পারে। কিছু কিছু বিশেষজ্ঞের মতে এ ধরনের কন্ট্রাকশনের ফলে জরায়ুর পেশীগুলো সুগঠিত হয় এবং প্লাসেন্টাতে রক্ত প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে। এছারাও প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে যেহেতু ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন তীব্রতর হয় তাই এর ফলে প্রসবের জন্য জারায়ুমুখের পাতলা হয়ে যাওয়া বা খুলে যাওয়া সহজতর হয়।

এর আরও কিছু কারণ থাকতে পারে, যেমন-

কিছু কিছু বিশেষজ্ঞের মতে ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশনের অন্যতম কারন হোল পানিশূন্যতা। আমাদের মস্তিষ্কের যে অংশ জরায়ুর কন্ট্রাকশন নিয়ন্ত্রন করে সে অংশ এবং যে অংশ আমাদের তৃষ্ণার অনুভুতি নিয়ন্ত্রন করে সে অংশ, পাশাপাশি থাকে।  তাই যখন মায়েরা পানিশূন্যতায় ভোগেন বা তৃষ্ণার্ত থাকেন তখন মায়েদের মস্তিষ্কের কন্ট্রাকশনের অংশটি সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন বা পেটে খিঁচুনি হতে পারে।

ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের কারনেও এ ধরনের কন্ট্রাকশন হতে পারে। এছারাও মায়ের অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারনেও ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন দেখা দিতে পারে। মুত্রথলী পরিপূর্ণ থাকা এবং সহবাসের সাথেও এর সম্পর্ক আছে। ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন বা ফলস লেবার পেইন যে কোন সময় হতে পারে তবে রাতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন কেমন হয়?

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশনের সময় জরায়ু, তলপেট বা কুঁচকির অংশে সংকোচন অনুভূত হয়। অর্থাৎ এসব অংশ একবার শক্ত হয়ে যায় আবার ছেঁড়ে দেয়। প্রসবের সময়ও এ ধরনের অনুভূতিই হয়। তবে ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন এবং আসল প্রসব যন্ত্রণার মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন সাধারণত অনিয়মিত এবং ব্যাথাহীন হয়। তবে তা মাঝে মাঝে তীব্র, ব্যাথাযুক্ত এবং অস্বস্তিকর হতে পারে। প্রসব শুরুর লক্ষন বা আসল প্রসব বেদনা সম্পর্কে আমাদের লেখা আর্টিকেল থেকে জেনে নিন।

প্রসবের কাছাকাছি সময়ে ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন নিয়মিত, ঘন ঘন এবং ব্যাথাযুক্ত হয়ে উঠতে পারে যার কারণে আপনার মনে হতে পারে যে আপনার প্রসব শুর হচ্ছে। তবে আসল প্রসব বেদনার সাথে এর কিছু পার্থক্য আছে, যেমন- প্রসব বেদনার মত এ ধরনের কন্ট্রাকশন আস্তে আস্তে বাড়তে থাকেনা বা তীব্রতর হয়না এবং কন্ত্রাকশনের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যাবধান কমতে থাকেনা। ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন সাধারণত ৩০ সেকেন্ড থেকে ২ মিনিট ধরে হতে পারে তবে ঘণ্টায় একবার বা দুবারের বেশী হয়না। বেশীরভাগ সময়ই শরীরের অবস্থান পরিবর্তন করলে বা বিশ্রাম নিলে এটি চলে যায়।

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন ও আসল প্রসব বেদনার মধ্যে পার্থক্য

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন থেকে স্বস্তির উপায়

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশনে সাধারনত ব্যাথা হয়না তবে তা অস্বস্তির কারণ হতে পারে। এর থেকে স্বস্তি পাওয়ার জন্য কিছুকিছু উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে-

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন হলে আপনার শরীরের অবস্থান বা কাজকর্মের ধরন পরিবর্তন করুন। কখনও কিছুক্ষন হাঁটলে বা বিশ্রাম নিলে এটি কমে যায়। কিন্তু প্রসব বেদনার ক্ষেত্রে আপনি যা ই করুন না কেন তা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকবে এবং ঘন ঘন হতে থাকবে।

পর্যাপ্ত পরিমানে পানি পান করুন। কারন এ ধরনের কন্ট্রাকশন পানিশূন্যতার সাথে সম্পর্কিত। রিলাক্সেশনের ব্যায়াম করতে পারেন বা আস্তে আস্তে গভীরভাবে শ্বাস নিতে পারেন। এগুলো করলে ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন চলে যাবেনা, কিন্তু এর অস্বস্তির সাথে আপনি মানিয়ে নিতে পারবেন। এ ধরনের শ্বাস প্রশ্বাস পরবর্তীতে আপনার প্রসব বেদনা নিয়ন্ত্রনেও সাহায্য করবে।

কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?

যদি গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহের আগে নিয়মিত, ব্যাথাযুক্ত, ঘন ঘন কন্ট্রাকশন হয় বা এর সাথে প্রি-টার্ম লেবারের লক্ষন দেখা যায় তবে দ্রুত ডাক্তারকে জানাতে হবে। প্রি-টার্ম লেবারের লক্ষন যেমন- পেটে ব্যাথা বা পিরিয়ডের মত পেটে খিল ধরা ভাব, নিয়মিত কন্ট্রাকশন ( ঘণ্টায় অন্তত ৪ বার বা তার বেশী বা ১০ মিনিট অন্তর, যদি তাতে ব্যাথা নাও থাকে), যোনী পথে রক্তপাত বা স্পটিং, যোনিপথে নির্গত তরলে পরিমান বেড়ে যাওয়া বা পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া, পেলভিসে বা তলপেটে চাপ অনুভব করা এবং পিঠের নিচের দিকে ব্যাথা ইত্যাদি দেখা গেলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

যদি গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহ অতিক্রম করে যায় এবং কিছু লক্ষন দেখা যায়, যেমন- পানি ভেঙ্গে যাওয়া (কন্ট্রাকশন না হলেও), যোনী পথে রক্তপাত, অল্প সময়ের ব্যাবধানে কন্ট্রাকশন, তীব্র ব্যাথা ইত্যাদি দেখা যায় তবে তা প্রসব শুরু লক্ষন হিসেবে ধরে নিতে পারেন এবং অতিসত্বর ডাক্তারকে জানাতে হবে।

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশনের কারণে বাচ্চার কোন ক্ষতি হতে পারে কি?

ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশনের কারণে গর্ভের বাচ্চার কোন ক্ষতি হয়না যদি না এর সাথে প্রি-টার্ম লেবারের কোন লক্ষন না থাকে। ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশনের কারণে প্রি-টার্ম লেবার বা প্রি-টার্ম ডেলিভারির কোন সম্ভাবনা থাকেনা। বরং কিছু কিছু বিশেষজ্ঞের মতে এ ধরনের কন্ট্রাকশনের ফলে জরায়ুর পেশীগুলো সুগঠিত হয় এবং প্লাসেন্টাতে রক্ত প্রবাহ স্বাভাবিক থাকে। এছারাও প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে যেহেতু ব্র্যাক্সটন হিক্স কন্ট্রাকশন বা ফলস লেবার পেইন তীব্রতর হয় তাই এর ফলে প্রসবের জন্য জারায়ুমুখের পাতলা হয়ে যাওয়া বা খুলে যাওয়া সহজতর হয়।

সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। সবার জন্য শুভ কামনা

 

 

Related posts

Leave a Comment