ব্যাক্তিস্বাধীনতা

শীলা একটি ব্যাংকে চাকুরী করে। পড়াশুনা শেষ করার পর নিজ যোগ্যতায় চাকুরী পেয়েছে সে। সমাজে এবং পরিবারে সবার কাছে সে এজন্য সমাদৃত। নিজের এবং সংসারের প্রয়োজন মিটিয়ে অন্যদিকে মা বাবা ভাই বোনকেও সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করতে পারে। ব্যাপারটা নিয়ে শীলার মা বাবার গর্বের কোন কমতি নেই।

 মৌলীর বয়স সাতাশ ছুঁই ছুঁই। মা বাবা বিয়ে দেবার জন্য পাত্র খুঁজছেন। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ আর এমবিএ শেষ করে মৌলী অল্পবিস্তর চাকুরীর জন্য চেষ্টা করছিল। কিন্তু লাভ হয়নি। অনেক জায়গায় সিভি দিয়েও তেমন কোন সারা পায়নি। তাছাড়া মৌলী নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা কি ধরনের চাকুরী তার জন্য মানানসই। সে কি আদৌ নিজের মনের মত চাকুরী পাবে বা ছোটখাটো চাকুরী হলে সেই বেতনে পোষাতে পারবে কিনা তা জানা নেই। শৈশব থেকেই তার মা বাবা তাকে বেশ রক্ষনশীল পরিবেশে বড় করেছেন। যার কারণে বাইরের জগতের সাথে মৌলীর সংযোগটা ঠিক হয়ে উঠেনি। বাইরে গিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবার মত মেয়ে সে নয়। তাই সে মনে মনে একদিন সিদ্ধান্ত নেয় সে বিয়ে করে সংসারী হবে। সম্পূর্ণভাবে নিজেকে নিয়োজিত করবে পরিবারের সবকিছুতে।

দু’জন মানুষের দুটি ভিন্ন পরিস্থিতি। যদিও নামগুলো কাল্পনিক কিন্তু বাস্তবে এরকম বহু উদাহারন পাওয়া যায়। একজন মানুষ সে ছেলে হোক বা মেয়ে, পড়াশুনা শেষ করার পর সে কি করতে চায় তা সম্পূর্ণ তার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। বিশেষ করে মেয়েদের ব্যাপারে চাকুরী বিষয়টা খুব জরুরী কিছু নয় যদি কেউ না করতে চান। কর্মজীবী মহিলারা নিঃসন্দেহে আমাদের সমাজে সম্মানিত কারণ তারা কর্মক্ষেত্রে আর পরিবারে সমানভাবে অবদান রেখে যাচ্ছেন। যুগের সাথে সমান তালে এগিয়ে জাওয়া, নিজের ক্যারিয়ারকে ধাপে ধাপে উন্নত করা এবং পরিবারে সন্তান সন্ততি থাকলে তাদেরকে সুশিক্ষা প্রদান করা এবং তাদের জন্য আত্মনির্ভরশীলতার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা ইত্যাদি কম দায়িত্বের কথা নয়। যারা বেচে থাকার তাগিদে চাকুরী করে সংসার চালাতে বাধ্য তাঁরা এই আলোচনার অন্তরভুক্ত নন। তাদের ব্যাপারটা ভিন্ন। আলোচনা করছি তাদের নিয়ে যারা কাজ করে নিজেকে সমাজের উচ্চতর অবস্থানে দেখতে চান এবং দেখাতে পছন্দ করেন। বস্তুত, কাজ করার মধ্যে যেমন অসম্মানের কিছু নেই তেমনি অহেতুক গর্বেরও কিছু নেই। কেউ বাইরে কাজ করছেন তার মানে এই নয় যে আশেপাশের সবাই তার কাছে নগন্য হয়ে গেছে। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে নারী পুরুষ সবাই কাজ করছে, কিন্তু এসব দেশে কেউ কার কাজের ব্যাপারে কারও কাছে জাহির করলে সেটাকে অভদ্রতা মনে করা হয়। কারন, আপনি যত ভাল কোম্পানিতেই চাকুরী করুন না কেন বা যত বড় সেলেব্রিটি হউন না কেন দিন শেষে আমার বাড়ির সব বিল আমাকেই পরিশোধ করতে হয়।

আমাদের দেশের মহিলা সমাজে দেখা যায় কেউ চাকুরী না করে গৃহিণী হয়ে আছেন জানলে তাকে কটাক্ষ করা হয় বা করুনার দৃষ্টিতে দেখা হয়। কিন্তু একজন গৃহিণীও কিন্তু তার সংসার গুছিয়ে রাখার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। একজন মেয়ে যখন মা হন তখন তার দায়িত্ব আর বেড়ে যায়। কর্মজীবী মহিলারা চাকুরী করেও ঘর সংসার সামলান কিন্তু অফিসে বা বাহিরে বেশ কয়েক ঘণ্টার জন্য তারা ঘর সংসারের একঘেয়ে কাজকর্ম থেকে এক্টু হলেও রেহাই পান। আর একজন গৃহিণীর উপর ঘরের সবারই একটা নীরব দাবী থাকে যে তিনি সবার মন রক্ষা করে চলবেন। আর কেউ ঘরে না থাকলেও তাঁকে ঘরে থাকতেই হবে। তিনি যদি নতুন মা হন তবুও সেই নীরব দাবী থেকে কেউ এক চুলও নড়তে চান না। কারন,তিনি তো বাইরে কাজ করেন না, শুতরাং, তার “অতটা” কষ্ট হবার কথা না! এই বৈষম্যটা কিভাবে সমাজে বীজ বুনল সেটা ব্যাখ্যা করতে গেলেই একজন কর্মজীবী আর একজন গৃহিণীর সামাজিক অবস্থানটা ধরা পরবে সহজেই। ঠিক যেমন যুগ যুগ ধরে আমরা সমাজের বিভিন্ন পেশার মধ্যে বৈষম্য প্রতিষ্ঠা করেছি, তেমনি একজন কর্মজীবী মহিলা আর গৃহিণীর মধ্যেও বৈষম্য প্রকাশ করছি অবলীলায়। ফলাফল, মহিলারা আজকাল ঘর সংসার সামলাবার পাশাপাশি বাইরেও কাজ করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এই প্রতিযোগিতায় জারা সফল তাদের জন্য সৌভাগ্য, আর যারা ব্যারথ হচ্ছেন তারা হীনমন্যতায় ভুগছেন।

 আজকাল এসব ব্যাপারে অভিভাবকরাও মেয়েদেরকে উৎসাহিত করতে গিয়ে মূলত বিভ্রান্ত করে ফেলছেন। পাশের বাড়ির প্রতিবেশী হয়ত খুব গর্ব করে বলছেন যে তাদের মেয়ে কত উচ্চ পর্যায়ে পড়াশুনা করে ভাল চাকুরী করছেন। কিন্তু কোনভাবে যদি নিজের বাড়ির মেয়েটি সমপরিমাণ অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাকে এ নিয়ে বেশ কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিতে কেউ পিছপা হন্ না। প্রতিযোগিতার মাঝে নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে হবে এটাই যেন সামাজিক প্রথা হয়ে গেছে। উদাহারন স্বরূপ বলা যায়, কারও বিয়ের অনুষ্ঠান যদি জাকজমকপুরন, ধুমধারাক্কা, নাচগান সমৃদ্ধ হয়, সেই অনুষ্ঠানকে আদর্শ ধরে সাধারণ মানুষও আজকাল টাকা পয়সা ধার করে হলেও বিয়ের অনুষ্ঠান করছেন। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার অর্থ যদি নিজের স্বাধীনতা আর সর্বস্ব খোয়ানোর আরেক নাম হয়, তাহলে জীবনের প্রকৃত অর্থটাও কিন্তু পালটে যায়। আমরা জানি, বাঁচতে হলে জানতে হবে। আর সেই জানার জন্যই শিক্ষা। ভাল ভাল ডিগ্রি নেয়াটাই শিক্ষা নয়। একজন মেয়ে যখন ছোটবেলা থেকে ভাল পরিবেশে ভাল শিক্ষা নিয়ে বড় হন, তিনিও একজন ভাল মানুষ হিসেবে সমাজে ভূমিকা রাখতে সক্ষম। ভাল ডিগ্রি বা চাকুরীটা একেবারেই মুখ্য নয়। অবশ্যই কেউ যদি তার ডিগ্রি বা চাকুরীর প্রভাবে দেশ ও সমাজের জন্য কল্যান বয়ে আনতে পারেন সেটা গর্বের বিষয় তারপরও সেটাই তার আসল পরিচয় নয়। আমাদের নারী সমাজের উচিৎ এই সীমাহীন প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে আসা, চিন্তাধারাকে আরও উন্মুক্ত অ সুদূরপ্রসারী করা। একজন নারীর পরিচয় হোক তার ব্যক্তিসাধিনতায়, আত্মমর্যাদায় আর নম্রতায়।

সবার জন্য শুভকামনা।

একজন Fairyland Mom এর লেখা

Related posts

Leave a Comment