গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়া । কিভাবে স্বস্তি পাবেন

গর্ভাবস্থায় অধিকাংশ মায়ের বুক জ্বালাপোড়া করে। এটা খুব সাধারণ ও স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় ঘটনা। গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়া হচ্ছে-বুকের ভিতরের মধ্যবর্তী স্থান থেকে শুরু করে গলা পর্যন্ত জ্বালাকর অনুভুতি। এই জ্বালা কখনও কখনও শুধু বুকে আবার কখনও কখনও শুধু গলায় বা উভয় স্থানে হতে পারে।গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম সন্তান জন্মের সময় এ সমস্যা বেশি হয়। অনেকেই গর্ভাবস্থায় প্রথমবারের মত এ সমস্যা অনুভব করে থাকেন। যদি বুক জ্বালাপোড়া করা খুবই স্বাভাবিক এবং তেমন ক্ষতিকর নয় তারপরও এ সমস্যা অনেক অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়া এবং এর সাথে সম্পর্কিত গ্যাসের সমস্যা সাধারণত দ্বিতীয় বা তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে শুরু হয়। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে তা আরও আগে শুরু হতে পারে। এ সমস্যা বাচ্চা জন্মদান পর্যন্ত আসা যাওয়া করতে পারে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এ সমস্যা বাচ্চা ডেলিভারির পর আর থাকেনা। তবে গর্ভাবস্থায় ওজন অতিরিক্ত বেড়ে গেলে এ সমস্যা বাচ্চা জন্মদানের পর বছর খানেক থাকতে পারে।

গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়া কেন হয়?

গর্ভাবস্থায় মায়েদের শারীরিক ও হরমোনের যেসব পরিবর্তন দেখা দেয় তার ফলে বুক জ্বালাপোড়ার সৃষ্টি হয়। গর্ভাবস্থায় প্লাসেন্টা থেকে যে প্রোজেস্টেরন হরমোন উৎপন্ন হয় তা জরায়ুর মাংশপেশীগুলোকে নমনীয় করে ফেলে। এই হরমোনের ফলে যে ভালভটি পাকস্থলী থেকে খাদ্যনালীকে আলাদা করে তাকেও নমনীয় করে ফেলে যার ফলে গ্যাস্ট্রিক এসিড উপর দিকে এসে খাদ্যনালিতে ঢুকে পড়ে বুক জ্বলা শুরু করে।

প্রোজেস্টেরনের কারণে খাদ্যনালীর এবং অন্ত্রের সঙ্কোচন এবং প্রসারণ ধীরগতির হয়ে যায় যার ফলে হজম কম হয়। এছাড়াও গর্ভাবস্থার শেষ দিকে বড় হয়ে যাওয়া জরায়ু পাকস্থলীর এসিডকে উপরের দিকে খাদ্যনালীর দিকে চাপ দেয় যার ফলে গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়া করে।

গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়া থেকে কিভাবে স্বস্তি পাওয়া যায়?

গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়ার সমস্যা পুরোপুরি দূর করা প্রায় অসম্ভব। তবে কিছু কিছু উপায় অবলম্বন করে আপনি তা নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারেন। যেহেতু আপনি কি ধরনের খাবার খাচ্ছেন তার উপর নির্ভর করে বুক জ্বালাপোড়া করতে পারে তাই কিছু কিছু খাবার খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে টা নিয়ন্ত্রনে রাখা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে সব কিছু বাদ দিলে গর্ভাবস্থায় শরীর পরিপূর্ণ পুষ্টি নাও পেতে পারে। তাই খেয়াল রাখুন কোন খাবারে খুব বেশী সমস্যা হচ্ছে এবং শুধুমাত্র সে খাবারগুলো পরিহার করার চেষ্টা করুন।

সাধারণত যেসব খাবার বুক জ্বালাপোড়ার সমস্যা সৃষ্টি করে সেগুলো হোলঃ

চা এবং কফি

চা, কফি অনেকের পছন্দের পানীয়। কিন্তু গর্ভকালে বেশি পরিমাণে চা-কফি পান বুক জ্বালাপোড়ার অন্যতম একটি কারণ হতে পারে।

ফ্যাটি খাবার

চর্বিযুক্ত খাবার যেমন মাখন, ঘি, ফ্যাটি অ্যাসিড যুক্ত খাবার, তেলে ভাজা খাবার এবং জাংক ফুড এই সময় এড়িয়ে চলুন। চর্বিযুক্ত খাবার বুক জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে থাকে।

সাইট্রাস জাতীয় খাবার

সাইট্রাস জাতীয় ফল যেমন লেবু, কমলা, আঙ্গুর এবং টমেটো বুক জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে থাকে। কমলা অথবা আঙ্গুর আপনার বুক জ্বালাপোড়া সৃষ্টি নাও করতে পারে। তাই খাবার খাওয়ার সময় লক্ষ্য করুন, কোন খাবারটি বুক জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করছে।

চকলেট

চকলেট আরেকটি খাবার যা গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়ার কারণ হয়ে থাকে। অল্প পরিমাণে চকলেট খেতে পারেন। হ্যাঁ এটা ঠিক ডার্ক চকলেট স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবুও এই সময় চকলেট কিছুটা কম খাওয়া উচিত।

সোডা

সোডা এবং সোডা জাতীয় পানীয় এইসময় এড়িয়ে চলা উচিত। এটি শুধু বুক জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে না, এটি অন্যান সমস্যাও সৃষ্টি করে থাকে। এর পরিবর্তে ফলের রস খেতে পারেন।

রসুন

রসুন খাওয়ার পর অনেকেরই পেট ফোলাভাব বা গ্যাসের সমস্যা হয়। রসুনের মধ্যে রয়েছে প্রচুর স্বাস্থ্যকর উপাদান। তাই পেটে গ্যাস হবে ভেবে একে এড়িয়ে যাবেন না। পেটের ফোলাভাব প্রতিরোধে রসুন রান্না করে খান; কাঁচা খাবেন না। গ্যাস থেকে মুক্তি পাওয়ার এটি সবচেয়ে ভালো উপায়।

পেঁয়াজ

কাঁচা পেঁয়াজ গ্যাসের সমস্যা তৈরি করে। এই সবজিটির মধ্যে রয়েছে অনেক স্বাস্থ্যকর উপাদান। তাই গ্যাসের সমস্যা এড়াতে একে রান্না করে খান।

খাবার দাবার নিয়ন্ত্রন করা ছাড়াও এখানে কিছু সাধারন পরামর্শ দেয়া হোল যা খাবার ভালো ভাবে হজম হতে সাহায্য করার পাশাপাশি গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়া থেকে স্বস্তি পেতে সাহায্য করবে।

বুক জ্বালাপোড়ার সমস্যা থাকলে ৩ বেলা বেশি করে খাবার পরিবর্তে কম সময়ের বিরতি দিয়ে কম খাবার বার বার খান।এভাবে খেলে খাবার সঠিক ভাবে হজম হবে এবং সমস্যা কমবে।পেট ফুলে থাকা,গ্যাসের সমস্যা, বুক জ্বালাপোড়ার সমস্যা সাধারণত হয়ে থাকে খাবার ভালো ভাবে হজম না হওয়ার কারনে। ভালো করে চিবিয়ে খাবার খেলে তা সহজে হজম হয়।কারন খাবার হজমের প্রথম ধাপ শুরু হয় চর্বণ প্রক্রিয়ায় খাবার ভেঙ্গে লালার সাথে মিশে যাওয়ার মাধ্যমে।খাবার সময় কথা না বলার চেষ্টা করুন।

ধীরে খাবার খান। কারন যখন খুব দ্রুত খাবার খাওয়া হয় তখন খাবারের সাথে কিছু বাতাসও পেটে ঢুকে যায় এবং ফোলা ভাবের সৃষ্টি করে।খাওয়া সময় পানি কম পান করুন। খাওয়ার সময় পানি বেশি খেলে খাবার হজমে সহায়তাকারি হাড্রক্লোরিক এসিড পাতলা হয়ে যায়। ফলে খাবার হজমে সমস্যা হয় এবং এসিডকে উপরের দিকে চাপ দেয় ও বুক জ্বালাপোড়া বৃদ্ধি করে। তাই খাওয়ার সময় বেশী পানি না খেয়ে সারাদিন প্রয়োজনীয় পানি পান করার চেষ্টা করুন। গ্লাস বা কাপে ঢেলে পানি পান করুন। বোতল থেকে বা স্ট্র দিয়ে পানি না খাওয়ার চেষ্টা করুন। এতে পানির সাথে সাথে বাতাস ও পেটে ঢুকে যায়। পানি খাওয়ার সময় ছোট ছোট ঢোকে পানি খাওয়ার চেষ্টা করুন।

অনেকেই গর্ভকালীন সময় হাঁটাচলা করা কমিয়ে দেন। এই কাজটি করা একদমই উচিত নয়। প্রতিদিন নিয়ম করে কমপক্ষে ৩০মিনিট হাঁটুন। এটি শুধুমাত্র খাবার হজমে সাহায্য করবে না, এরসাথে মাংসপেশী সচল রাখবে। অন্য যেকোন ব্যায়াম করার পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।খাবার খেয়ে সাথে সাথে শুয়ে পড়া উচিত নয়। বরং বসে বই পড়া,ঘরের ছোট ছোট কাজ গুলো করা,ধীরে ধীরে হাঁটা উচিত। আবার এমন কোন কাজ করা উচিত না যা নুয়ে বা ঝুঁকে করতে হয়। ঘুমাতে যাওয়ার দুই থেকে তিন ঘন্টা আগে খাবার খাওয়া উচিত।

বমি বমি ভাব, পেটের গ্যাস, বদহজমের সমস্যা দূরে আদা বেশ কার্যকর। আদাতে জিনজারলোস( gingerols) এবং শাগোলোস( shgaols) নামক দুটি উপাদান রয়েছে যা পেটের সমস্যা দূর করে থাকে।  একটি আদা কুচি, এক কাপ পানিতে জ্বাল দিন। এরসাথে আপানর পছন্দমত লেবু বা মধু যোগ করতে পারেন। জ্বাল হয়ে আসলে এটি চুলা থেকে নামিয়ে ফেলুন। খাবার খাওয়ার আগে অথবা পরে এটি পান করুন।

অ্যাপেল সাইডার ভিনেগারের টক স্বাদ আপনার মুখে রুচি এনে দিতে পারে। এছাড়া এটি বুক জ্বালাপোড়া এবং গ্যাসের সমস্যা সমাধান করে। অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার পানির সাথে মিশিয়ে পান করবেন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করে পান করুন।খাবার সময় বা পান করার সময় তা বসে করার চেষ্টা করুন, এমনকি ছোট কোন স্ন্যাক খাওয়ার সময়ও বসে পড়ুন।

ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করুন। কারণ আঁটসাঁট পোশাক আপনার পাকস্থলী ও তলপেটে চাপ সৃষ্টি করে সমস্যার বৃদ্ধি ঘটায়।রাতে ঘুমানোর সময় বিছানা থেকে মাথা কমপক্ষে ৬ ইঞ্চি উঁচু রাখা দরকার।

ডাবের পানি বদহজম দূর করে এবং শরীর থেকে টক্সিন পর্দাথ বের করে দেয়। এতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এবং মিনারেল রয়েছে। ডাবের পানি তাৎক্ষনিকভাবে বুক জ্বালাপোড়া ভাব দূর করে দেয়।

ধূমপান করা যাবে না। এটি সেই পেশিগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়, যেগুলো গ্যাসকে পাকস্থলী থেকে খাদ্যনালিতে যেতে বাধা দেয়। শুধু খাওয়াদাওয়া মানাই তো সব নয়, তাই না? পাশাপাশি যথেষ্ট বিশ্রাম নিতে হবে। আরেকটা কথা, সামান্য সমস্যা হলেই নিজে নিজে প্যারাসিটামল, এসপিরিনসহ নন-স্টেরয়ডাল এবং ব্যথানাশক কিংবা জ্বালা-পোড়া নিরোধক বা অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটোরি ওষুধ সেবন পরিত্যাগ করুন।

যদি খুব বেশি সমস্যা হয় তবে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। তবে যে কোন ওষুধ সেবনের আগেই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় বুক জ্বালাপোড়া সমস্যা হতে পারে কোনো রকম শারীরিক কারণ ছাড়াই। মনে রাখবেন, সেটি কিন্তু পুরোপুরি মানসিক সমস্যা। এ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হলে আপনাকেই আপনার সবচেয়ে বড় চিকিৎসক হয়ে উঠতে হবে। দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত রাখতে হবে নিজেকে, যাপন করতে হবে চাপমুক্ত নিয়মমানা জীবন।

সবার জন্য শুভকামনা।

Related posts

Leave a Comment